শ্রদ্ধাঞ্জলি

কর্মমগ্নতাই ছিল ড. আকবর আলি খানের জীবনের ধ্যান

ড. আকবর আলি খান তার সুদীর্ঘ কর্মজীবনে সরকারের আমলা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পাশাপাশি নানা পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকতাই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় পেশা ও আন্তরিক অনুভবের জায়গা এবং সে কারণে নিজের পেশাগত জীবনও তিনি বুয়েটের শিক্ষকতা দিয়েই শুরু করেছিলেন।

. আকবর আলি খান তার সুদীর্ঘ কর্মজীবনে সরকারের আমলা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পাশাপাশি নানা পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকতাই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় পেশা আন্তরিক অনুভবের জায়গা এবং সে কারণে নিজের পেশাগত জীবনও তিনি বুয়েটের শিক্ষকতা দিয়েই শুরু করেছিলেন। আর সে ধারাবাহিকতায় পুনরায় শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার জন্য একসময় আমলার চাকরিটিও ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। পরে অবশ্য ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অনুরোধে চাকরিতে থেকে গেলেও সেটি ঘটেছিল শর্তে, কিছুকালের জন্য হলেও তাকে শিক্ষকতার সুযোগ দিতে হবে এবং সে অনুযায়ী লিয়েন নিয়ে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। আমলাজীবন থেকে অবসর নেয়ার পরও তিনি আবার শিক্ষকতায়ই ফিরে আসেন, যোগদান করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন।

. আকবর আলি খানের অন্তরতম অনুভবের পেশা শিক্ষকতা হলেও তিনি এমন এক আদর্শিক চেতনা মূল্যবোধতাড়িত মানুষ ছিলেন, নিজের দায় অঙ্গীকারবদ্ধতার কারণে যখন যে পেশায় নিয়োজিত থেকেছেন তখন সেটাকেই সবচেয়ে আপন মনে করছেন এবং সেখানেই তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। আর যখন যে কাজ করেছেন, লিও টলস্টয়ের থ্রি কোশ্চেনস-এর পরামর্শ মেনে সেটাকেই মনে করেছেন ওই মুহূর্তের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ। ফলে সংশ্লিষ্ট সব পেশায় তার প্রতিটি কাজই হয়ে উঠেছে একেকটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আর সেসব দৃষ্টান্তেরই ফসল তার অনন্য সব গ্রন্থ, যা তার অবর্তমানে তার চিন্তা কর্মকে আমাদের সামনে তুলে ধরছে। বলা প্রাসঙ্গিক হবে, তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা মোট ১৭টি এবং সম্ভবত আরো কিছু পাণ্ডুলিপি অপ্রকাশিত অবস্থায় রয়ে গেছে। আশা করব, কেউ না কেউ সেগুলো খুঁজে বের করে প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন।

২০১৯ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে (এসইউবি) কর্মরত থাকা অবস্থায় . আকবর আলি খানের কাছে অনুরোধ রেখেছিলাম বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য: কারণ প্রতিকার বিষয়ে বক্তব্য রাখার জন্য। বিষয়ে তার দীর্ঘ কর্মঅভিজ্ঞতা গবেষণা ক্ষেত্রের সঙ্গে বিষয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা ভেবেই প্রস্তাবটি করা হয়েছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে উদ্বেগও ছিল, বয়স শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তিনি হয়তো ওই বক্তৃতাদানে সম্মত হবেন না। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে তিনি সম্মতি জানিয়ে প্রস্তাবের বিষয়টিতে শুধু এটুকু পরিবর্তন আনলেন, তিনি বৈষম্য নয়, দারিদ্র্যের ইতিহাস নিয়ে কথা বলবেন, যা বস্তুত প্রস্তাবিত বিষয়েরই শাব্দিক রূপান্তর মাত্র। কারণ বৈষম্যের বিকাশ আর দারিদ্র্যের ইতিহাস প্রায় এক অভিন্ন।

ওই তাত্ক্ষণিক সম্মতির বিষয়ে তার অবর্তমানে আজ মর্মে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চাই, স্বভাবগত ধাঁচের আমলা হলে প্রথমেই হয়তো তিনি বলতেন, অনুরোধটি উপাচার্যের কাছ থেকে এলো না কেন (বিষয়টি নতুন প্রজন্মের আমলাদের জন্য শিক্ষণীয়) দ্বিতীয়ত, প্রচলিত জীবনবোধসম্পন্ন মানসিকতার অধিকারী হলে এরূপ শারীরিক দুর্বলতা অসুস্থ শরীর নিয়ে কোনোভাবেই হয়তো দেড়-দুই ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতা প্রদানে সম্মত হতেন না। তৃতীয়তপ্রতিনিয়ত তিনি চিকিৎসকের নির্দেশনা তথা -সংক্রান্ত বারণ -বারণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন। কিন্তু প্রচণ্ড মানসিক শক্তি জীবনমুখিনতার অধিকারী আকবর আলি খানকে তার শারীরিক দুর্বলতা কিংবা রোগাক্রান্ত শরীর কোনোটাই এতটুকু স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ কর্মমগ্নতাই ছিল তার জীবনের মূল ধ্যান সাধনা। ফলে নিজেকে তিনি নিয়ত কর্মমুখর রাখতে চেয়েছেন এবং বেঁচে থাকা অবস্থায় কিছুতেই শারীরিক অসুস্থতার কাছে হার মানতে রাজি ছিলেন না। আর সে কারণেই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তার কর্মের মাধ্যমে সমাজের জন্য অবদান রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

যা হোক, ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর তিনি অত্যন্ত গোছানো প্রস্তুতি চমত্কার ব্যক্তিত্বময় শারীরিক অবয়ব নিয়ে দারিদ্র্যের ইতিহাস বিষয়ে বক্তৃতা করতে দাঁড়ালেন। তাকে দেখে তখন এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি, তিনি অসুস্থ। তার শরীরের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে যারা জানতাম তাদের উদ্বেগকে উড়িয়ে দিয়ে মিলনায়তনভর্তি দর্শক-শ্রোতাকে পিনপতন নীরবতার মধ্যে মোহাবিষ্ট রেখে প্রশ্নোত্তর পর্বসহ প্রায় ঘণ্টা তিনি কথা বললেন। আর পাওয়ার পয়েন্টের স্লাইডগুলোকে তিনি বক্তব্যের সারকথা দিয়ে এমন চমত্কারভাবে সাজালেন, মিলনায়তনে উপস্থিত তরুণ শিক্ষার্থীদের পক্ষেও তা হূদয়ঙ্গম করতে এতটুকু কষ্ট হয়নি। বস্তুত ওই বক্তৃতাটি ছিল তার দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির প্রাক-উপস্থাপনা, যা পরে প্রথমা প্রকাশন থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল।

আকবর আলি খান যখন যেখানে যে দায়িত্বের সঙ্গেই যুক্ত থেকেছেন, চেষ্টা করেছেন চারপাশে থাকা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্ট, হয়রানি ভোগান্তিগুলোকে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে। আমলা থাকাকালে সহকর্মীদের কার্যকলাপ যেমনি কাছ থেকে অবলোকন করেছেন, তেমনি আবার সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ কোথায় ঠেকে যাচ্ছে, অফিসের সহকর্মীরা তাদের কার সঙ্গে কী আচরণ করছে, জনপ্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের ধরনটি কেমন বিষয়গুলোও তিনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করতেন। আর সেসব নিবিড় পর্যবেক্ষণ অভিজ্ঞতারই বাস্তব ফসল হচ্ছে তার অসাধারণ সব গ্রন্থ, যা পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আমলাদের মধ্যে আকবর আলি খানের ভূমিকাকে যদি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, তাহলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে তার অসীম সাহসের কথা। ২৫ মার্চ-পূর্ব অসহযোগ আন্দোলনে তার সমর্থন ভূমিকা ছিল প্রায়-প্রকাশ্য। অথচ ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষিত হওয়ার পরও বাস্তব সুযোগ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমলাদের মধ্যকার একটি বড় অংশই যেখানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, সেখানে তিনি শুধু অংশগ্রহণই করেননি, সে অংশগ্রহণকে উদ্যম সাহসিকতা দিয়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় হবিগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) থাকা অবস্থায় তিনি নিজ স্বাক্ষরে আদেশ জারি করে সেখানকার অস্ত্রাগারের সব অস্ত্র স্থানীয় প্রতিরোধযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, কোষাগারের টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ তহবিলের জন্য।

. আকবর আলি খান অর্থসচিব থাকাকালে একাধিকবার তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় যোগদানের সুযোগ হয়েছিল। সরকারি দপ্তরের ছকবাঁধা সভা হলেও সেখানটাও তার ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা কমনীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখে শুধু মুগ্ধই হইনি, অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে তার জ্ঞান চিন্তার গভীরতাকে আঁচ করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু তার মতো একজন পণ্ডিত মানুষের ভেতরকার গভীরতাকে পরিমাপ করার সামর্থ্য আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের আক্ষরিক অর্থেই ছিল না। কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব আমাকে এতই মুগ্ধ করছিল, সেই সময়ের পর থেকে তাকে আর কখনই ভুলতে পারিনি এবং অবস্থায় ২০০৬ সালে তিনি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা নির্বাচিত হন এবং পরে পদত্যাগ করেন, তখন ওই পদত্যাগের ঘটনায় ভীষণভাবে আপ্লুত হয়েছিলাম। কারণ একজন বিবেকবান মানুষের কাছে ওইটিই ছিল সঠিকতম সাহসী সিদ্ধান্ত।

আমলা হিসেবে তিনি সরকারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব পর্যন্ত উন্নীত হয়েছিলেন। কিন্তু তার চাকরি জীবনের প্রকৃত উন্নীতকরণ ছিল এটি, যেখানেই তিনি কাজ করেছেন সেখানেই নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। আর ভাবতে ভালো লাগে, এরূপ দৃষ্টান্ত স্থাপনের হার চাকরি থেকে অবসরগ্রহণের পর ক্রমান্বয়ে আরো বেড়েছে। ২০০১ সালে অবসরগ্রহণের আগে তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে ছিল মূলত পরার্থপরতার অর্থনীতি (প্রকাশকাল: ২০০০) আর অবসরগ্রহণের পর পরবর্তী ২০ বছরে সেটি প্রায় বিশের কাছাকাছিতে পৌঁছে গেছে। আর কিছুটা সময় পেলে সংখ্যা বৃদ্ধির হার হয়তো পুরনো হারকেও অতিক্রম করে যেত। এটি বলছি কারণে, ৭৮ বছর বয়সে স্বাভাবিকভাবেই নানাবিধ শারীরিক অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও কখনোই তিনি এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে কর্মবিমুখ রাখেননি। বস্তুত কর্মই ছিল তার জীবনধর্ম, যার মূলে ছিল অসীম মানসিক শক্তি।

. আকবর আলি খান আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু তার বহুমাত্রিক জীবনদর্শন, জনমানুষের প্রতি তার অসীম ভালোবাসা, অকপট সত্য উচ্চারণের সাহস, মুক্তচিন্তা বিশ্বাসের প্রতি নিরন্তর আস্থা, তোষণমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মেরুদণ্ড সোজা রেখে পথচলার মানসিকতা ইত্যাদি গুণাবলির কারণে বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বহুকাল তিনি অনন্য মর্যাদায় স্মরিত হবেন। আর তার যে গ্রন্থগুলো সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি অর্থনীতির পাঠকের কাছে সেগুলোও দীর্ঘকাল আকর গ্রন্থ হিসেবে টিকে থাকবে। আর মানুষ হিসেবে তিনি শুধু টিকেই থাকবেন না, যুগ যুগ ধরে আমাদের পথ চলতে সাহায্য অনুপ্রাণিত করবেন।

 

আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়

আরও