স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল এবং উন্নয়নশীল থেকে মধ্যম আয়ের বা উন্নত দেশ হতে গেলে যেকোনো দেশেরই অগ্রাধিকার থাকা উচিত মানবসম্পদ উন্নয়নে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে মনোযোগ মানবসম্পদ উন্নয়নের পূর্বশর্ত। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই ভঙ্গুর কাঠামোর মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চ শিক্ষা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রয়োজনীয় শিখন দক্ষতা নিয়ে এগোনোর ফলে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে সবল, বৈশ্বিক পর্যায়ে মর্যাদার জায়গা নিতে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তৃত সংস্কার আবশ্যক এবং এটা শুরু করা উচিত প্রাথমিক শিক্ষা থেকে।
প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আমাদের সাফল্যের হিসাব দীর্ঘদিন ধরে আবর্তিত হয়েছে শিক্ষার্থী ভর্তি, উপস্থিতি ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামোকে ঘিরে। কিন্তু এখন আরো মৌলিক একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিদ্যালয়ে শিশুরা আসলে কতটা শিখছে? সাম্প্রতিক এক গবেষণার বরাতে এ বিষয়টিই উঠে এসেছে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে। পিপিআরসি, ইউনিসেফ ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (এসএলআইপি)’ মূল্যায়নে দেখা গেছে, সরকারি প্রাথমিক পর্যায়ের ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ৪৪ শতাংশই সব বিষয়ে প্রাইভেট পড়ে। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের পাশাপাশি একটি সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থা এখন প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ প্রবণতার পেছনে অভিভাবকদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেমন আছে, তেমনি আছে বিদ্যালয়ের ওপর আস্থার ঘাটতি। গবেষণায় ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, ভালো ফলের জন্য সন্তানকে টিউশনে দেন; ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশের উদ্দেশ্য একাডেমিক দক্ষতা বাড়ানো। আবার ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন, শ্রেণীকক্ষের পাঠদান যথেষ্ট নয়। এ পরিসংখ্যানের তাৎপর্য হলো টিউশননির্ভরতা কেবল পরীক্ষামুখী সামাজিক প্রতিযোগিতার ফল নয়; শ্রেণীকক্ষে প্রত্যাশিত শিখন নিশ্চিত না হওয়ার প্রতিক্রিয়াও এটি।
বাংলাদেশের শিখন ঘাটতির অন্যান্য তথ্যও একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ১০ বছর বয়সী ৫১ শতাংশ শিশু বয়স উপযোগী সাধারণ বাংলা-ইংরেজি লেখা পড়তে ও বুঝতে পারে না। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২-এও প্রাথমিক পর্যায়ে ভিত্তিগত দক্ষতার ঘাটতি ধরা পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থী শ্রেণী পার করছে কিনা, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সে শ্রেণী অনুযায়ী শিখছে কিনা। ‘স্কুলিং’ ও ‘লার্নিং’-এর এ ব্যবধানই টিউশনের বাজারের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
এখানে রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা রয়েছে। বিদ্যালয়ের ভেতরের দুর্বলতা রেখে বাইরের টিউশন বন্ধ করার উদ্যোগ টেকসই হবে না। কোনো শিশু পড়ায় পিছিয়ে পড়লে তাকে শ্রেণীকক্ষেই অতিরিক্ত সহায়তা দিতে হবে। ছোট দলে পাঠদান, রেমিডিয়াল এডুকেশন, নিয়মিত শিখন মূল্যায়ন এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একজন শিক্ষার্থী নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন না করেই পরবর্তী শ্রেণীতে উঠে যাবে—এ ব্যবস্থা পরিবর্তন করা জরুরি। শিখন ঘাটতি শনাক্ত ও পূরণ করা বিদ্যালয়ের দায়িত্বের মধ্যেই থাকতে হবে।
শিক্ষক সংকট ও শিক্ষকদের দক্ষতার প্রশ্নটিও তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক কম হলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহায়তা দেয়া কঠিন হয়। আবার শুধু শিক্ষক নিয়োগ করলেই হবে না; প্রশিক্ষণ শ্রেণীকক্ষে কতটা কাজে লাগছে, সেটিও নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এর সঙ্গে প্রয়োজন বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় কার্যকর জবাবদিহি। কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিত, পাঠ্যসূচি সম্পন্ন এবং পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে—এগুলোই যথেষ্ট সূচক হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা পড়া বুঝতে পারছে কিনা, মৌলিক গণিত করতে পারছে কিনা, লিখিতভাবে নিজের কথা প্রকাশ করতে পারছে কিনা—এসব ভিত্তিগত দক্ষতার অগ্রগতিই হওয়া উচিত বিদ্যালয়ের কার্যকারিতা পরিমাপের অন্যতম মাপকাঠি। স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কাঠামোকে সে অনুযায়ী পুনর্গঠন করা দরকার। টিউশননির্ভরতার আরেকটি বড় ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষায় বৈষম্য। সামর্থ্যবান পরিবার সন্তানকে একাধিক বিষয়ে গৃহশিক্ষক ও কোচিং করাতে পারে; নিম্ন আয়ের পরিবার তা পারে না। ফলে একই বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগ পারিবারিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। প্রাথমিক স্তরেই এ ব্যবধান তৈরি হলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনে তা আরো গভীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলের মধ্যে আটকে রাখাও এ প্রবণতাকে বাড়িয়ে দেয়। ভালো স্কুলে ভর্তি, বৃত্তি, পরবর্তী ধাপের প্রতিযোগিতা—সবকিছুকে কেন্দ্র করে প্রাথমিক পর্যায়েই কোচিং সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। এতে শিশুর পড়াশোনার বাইরে খেলা, বই পড়া, শিল্প-সংস্কৃতি ও সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের সময় সংকুচিত হচ্ছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া নয়; শিশুর ভিত্তিগত জ্ঞান, কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দক্ষতা তৈরি করাও এর অংশ। ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ যদি বাস্তব অর্থে প্রয়োগ করতে হয়, তাহলে বিদ্যালয়ের পরিবেশকে পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ থেকে বের করে আনতে হবে। সরকার ফাউন্ডেশনাল লার্নিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, মিড ডে মিল ও মনিটরিং জোরদারের মতো উদ্যোগের কথা বলছে। এগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের মানের ওপর।
অভিভাবকদেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, হোমওয়ার্ক তদারকি এবং শিশুর শেখার পরিবেশ তৈরি করা পরিবারের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু সেই দায়িত্বকে বিদ্যালয়ের দুর্বলতার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো যাবে না। প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক শিখন নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও স্কুল ব্যবস্থারই।
নতুন সরকার শিক্ষা নিয়ে বেশকিছু ইতিবাচক পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। সেগুলো যাতে পরিকল্পনা ও প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ না থাকে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ এটা কথার কথা নয়। তারা যে শিক্ষা ও দক্ষতা নিয়ে বড় হবে তা প্রভাব রাখবে দেশের সার্বিক উন্নতি-অবনতিতে। শিক্ষায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। শিক্ষক সংকট দূর করা, প্রশিক্ষণের মান ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ে রেমিডিয়াল শিক্ষার ব্যবস্থা করা, শিখন ফলভিত্তিক মনিটরিং চালু করা এবং শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশের সুযোগ বাড়ানোয় মনোযোগ দিতে হবে। আর টিউশননির্ভরতার প্রকৃত সমাধান টিউশন নিষিদ্ধ করা নয়; বিদ্যালয়কে কার্যকর করে তোলা।