মাত্র কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বন্ধুর
ফরওয়ার্ডেড একটি বার্তা পেলাম। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ
প্রকাশিত ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান,
অনুসন্ধানী পাঠ, ৭ম শ্রেণি’ বইটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ধর্ম
ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বইটির পক্ষপাতিত্বের কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে বার্তাটি সংশয়
প্রকাশ করে যে এটা ভারতের ইতিহাস কিনা। এমনকি মন্তব্য করা হয় যে, তার ‘দৃঢ় বিশ্বাস ভারতেও ক্লাসে এমনভাবে হিন্দুত্ববাদ
শেখানো হয় না’।
আমরা ক’জনা এটাকে বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিতে চাইলে আমাদের সপ্তম শ্রেণীর বই দেখতে বলা হলো। nctb.gov.bd তে প্রথমে খুঁজে পেলাম না। নানা পথ ঘুরে আমরা https://khudro.link/Xga9B এর সূত্র ধরে নির্দিষ্ট বইটির সন্ধান পেলাম। তবে ৭ বা ৮ জানুয়ারি থেকে মূল ওয়েবসাইটে বইটি পাওয়া যায় বলে জানি।
বইটির প্রথম দর্শনে মনে কিছু প্রশ্ন জাগে। বিস্তারিত
বিশ্লেষণে না গিয়ে আগামীদিনে বিশেষজ্ঞদের আলোচনার অপেক্ষায় থাকব। প্রশ্ন বা
বিষয়গুলো নিম্নে তালিকাবদ্ধ করা হলো।
১. কার (কোন জাতি বা নৃ-গোষ্ঠী) ইতিহাস বা কোন
ভূখণ্ডের এবং কোন সময়কার ইতিহাস? সে বিষয়ে নামকরণে কোনো
উল্লেখ নেই।
২. বাংলার বা বাঙালির কথা না উল্লেখ করে ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষের
জীবন, অর্থনীতি ও পরিচয়ের রূপান্তর’ দিয়ে আলোচনার সূত্রপাত কাম্য
ছিল না।
৩. ইতিহাস পাঠের সঙ্গে প্রত্নতত্বের সংশ্লিষ্টতা
তুলে ধরা প্রশংসনীয়। তবে, পাহাড়পুর, নটেশ্বর বা বটেশ্বর দৃশ্যমান নয়।
৪. চিত্র বা ছবির ক্রমিক সংখ্যা না দেয়ায় উপযুক্ত
রেফারেন্স দিয়ে বইটির বিষয়-বস্তু নিয়ে মতবিনিময় দুরূহ।
৫. সাম্রাজ্যের বিস্তারের পূর্বে (৩১ পরবর্তী
পৃষ্ঠায়) নৃ-গোষ্ঠী-ভিত্তিক জনপদের বিস্তার নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন ছিল।
৬. রাজ-রাজাদের গল্প থেকে বেরিয়ে আসা প্রশংসার দাবী
রাখে। তবে সেটা করতে গিয়ে ইতিহাসের উল্লেখজনক কিছু পর্ব বাদ দেয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
৭. ৩৪ নং পৃষ্ঠায় বাংলায় ভাষা গঠনে ও এখানকার
অধিবাসীদের সংকরত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া তুলে ধরা যেত। কিন্তু মানচিত্রে বাংলাদেশকে
সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
৮. ভাষার সরলীকৃত বিবর্তন-তত্ত্ব আজ অনেকেই বর্জন
করেছে। ভাষা, ধর্ম ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সম্প্রসারণ (অভিবাসন
প্রক্রিয়া)-এর মাঝে যে যোগসূত্রতা রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করলে বাংলাদেশের মানুষের সংকরত্ব ও প্রাচীন
বাংলা ভাষার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী নৃগোষ্ঠীদের ভাষার যোগসূত্রতার (অর্থাৎ, অত্র এলাকার মানুষের পরিচয়) বাস্তবমুখী
উপলব্ধি সম্ভব হতো।
৯. মানচিত্রের এবং ছবির তথ্যসূত্রের (উৎসের) উল্লেখ
নেই।
১০. আঞ্চলিক পরিচয়ের অধ্যায়ে বাংলা অস্তিত্বহীন! ৭৮ ও ৭৯ পৃষ্ঠার মানচিত্র দুটো কী উদ্দেশ্যে এমন বিকৃত, তা বোধগম্য নয়।
পৃথকভাবে দুজন ব্যক্তি বইটি পড়ে তাদের মতামত ব্যক্ত
করেছিলেন। তাদের সম্মতি নিয়ে অতিরিক্ত কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করব।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রকৌশলী জনৈক ফাররুখ
মোহসেন অনেকগুলো গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন, যা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিব।
ভাষান্তরে তার সাধারণ বক্তব্য উদ্ধৃত করলাম, ‘ধারণাভিত্তিক উপস্থাপনা চমৎকার।
চিরচারিত রাজ-রাজাদের নিয়ে রচিত ইতিহাস থেকে বেরিয়ে আসা প্রশংসার দাবী রাখে। তবে
পরিতাপের বিষয় এই যে, বিষয়বস্তুতে ভ্রান্ত পথ নেয়া হয়েছে।
বইটি পড়ে প্রথমে মনে হয়েছিল, আমি ভারতের ইতিহাস পড়ছি। সেটাই
যদি হয়, ছাত্রছাত্রীরা সরাসরি ভারতে প্রকাশিত কোনো
পাঠ্যপুস্তক পড়তে পারে।’
‘বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য হলো, দিল্লি থেকে অনেক দুরে অবস্থান সত্ত্বেও মুসলমান-প্রধান দেশ হিসেবে এর গড়ে উঠা। এটা কেরালাতে ঘটেনি, কিন্তু বাংলাদেশে হয়েছে।’ এ বিষয়ে অধিক তথ্যের জন্য জনাব মোহসেন অধ্যাপক রিচার্ড ইটনের গবেষণার উল্লেখ করেছেন, যা যথার্থভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। (https://khudro.link/TZqKH)
সরকারী কর্ম থেকে অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন বন্ধু
নিম্নোক্ত দিকগুলোর প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
১১. বাইরের মলাটের ছবিটি সুদূর অতীতে স্থাপিত
মন্দিরের পরিবর্তে বাংলাদেশ ভূখণ্ড কেন্দ্রিক কোনো পূরাকীর্তির ছবি আরো প্রাসঙ্গিক
হতো।
১২. মলাটের ভেতরের পৃষ্ঠায় ইন্দিরা গান্ধীর
বৃহদাকৃতির ছবি প্ররোচনামূলক মনে হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের পাশে যারা ছিলেন, তাদের প্রতি আমরা
নিঃসন্দেহে কৃতজ্ঞ। কিন্তু বিদেশীদের ছবি সম্বলিত ঐ পৃষ্ঠাটি প্রাক-স্বাধীনতা
কালের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অপ্রাসঙ্গিক।
১৩. বইটি হঠাৎ যেন শেষ করা হলো সুলতানী আমলে এসে।
বাংলাদেশের অভ্যুদয় ত হনৌজ দূর অস্ত থেকে গেল। বইয়ের শিরোনামের সঙ্গে সামঞ্জস্য
কোথায় বোঝা গেল না। একটু খাপছাড়া মনে হলো।
অপর একজন, ভাষাজ্ঞানে উচ্চশিক্ষিত সংস্কৃতি-কর্মী স্বল্প কথায় জানালেন, ‘এক
কথায় আমার ভালো লাগেনি। পেশাদারিত্বের অভাব প্রচণ্ড। কমিশনে করা দায়সারা কাজ
হয়েছে।’
আমি ইতিহাসবিদ নই। তবে এটা অনুধাবন করি যে রাজনীতি
ও অর্থনীতিক ব্যবস্থাপনায় পক্ষপাতিত্ব থাকে এবং তারই ধারাবাহিকতায় ইতিহাস
প্রতিনিয়ত নতুন রূপে হাজির হয়। ইংরেজরা যেমন অতীতের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা
করেছিল এবং সেসব জনগোষ্ঠীর প্রাচীন ভাষাকেও উন্মুক্ত জ্ঞানভাণ্ডারে অবাধ গমনে বাধা
দিয়েছিল, তেমনই ধর্মের বিবর্তন ও মিশ্রণকে অস্বীকার করে সংস্কৃত ভাষাকে আদি হিসেবে
প্রতিষ্ঠা দেয়ার প্রচেষ্টা কোনো কোনো এলাকার জনগোষ্ঠী ও ব্যবসা-গোষ্ঠীর মাঝে
রয়েছে। বিশেষত, দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে বাংলা ও
বাংলা-ভাষাভাষীদের প্রান্তিকীকরণের প্রচেষ্টা বহুদিনের। মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে যাত্রা শুরু
করে যে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং যারা সেই স্বাধীনতাকে এই ভূখণ্ডে প্রথমবারের
মত রাষ্ট্র-গঠনের যাত্রাশুরু হিসেবে গণ্য করে, আগামী
প্রজন্মকে সেই ভূখণ্ডকে কেন্দ্রে রেখে সেখানকার জনগোষ্টীর ইতিহাস জানতে উদ্বুদ্ধ
করা প্রয়োজন। তাই নতুন পাঠক্রমে ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে বাংলাকে সদ্যপ্রসূত দেখতে
মর্মাহত হই। আমি বাংলা ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদকে ইতিহাস পাঠের কেন্দ্রে দেখতে
চাই।
পরিশেষে, আমাদের নতুন প্রজন্মের মানসে আত্মপরিচয়
প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে অহেতুক একপেশে অবস্থান বর্জনীয়। তাই আশা করব যে, ন্যুনতম, ইতিহাস বিষয়ক পাঠ্যপুস্তকের ওপর গঠনমূলক
আলোচনা হোক এবং সমাজের বিচিত্রতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ
প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনবে।
[এ নিবন্ধের বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।]
ড. সাজ্জাদ জহির: নির্বাহী পরিচালক
ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ