২০১৮
সালে বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থার
পরিচালক ট্রেডস
আধানম দুবাইয়ে
অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড
গভর্মেন্ট সামিটে
বলেছিলেন, ‘পৃথিবী
এক ভয়ংকর
বিপদের সম্মুখীন।
যেকোনো মুহূর্তে
জীবনবিধ্বংসী বৈশ্বিক
মহামারী দেখা
দিতে পারে
এবং সেটা
পৃথিবীর তাত্পর্যপূর্ণ
জনসংখ্যা ধ্বংস
করে দিতে
পারে। মৃতের
সংখ্যা হতে
পারে ভয়ংকর,
তা ১০
কোটি ছাড়িয়ে
যেতে পারে।’
ট্রেডস সবাইকে
স্প্যানিশ ফ্লুর
কথা স্মরণ
করিয়ে দিয়ে
বলেছিলেন, তার
সতর্কবার্তাকে অলীক
ভাবাটা অত্যন্ত
বড় ধরনের
ভুল হবে।
এ ধরনের
মহামারী যেকোনো
দেশে শুরু
হতে পারে,
যা ক্রমান্ব্বয়ে
সারা বিশ্বে
ছড়িয়ে পড়তে
পারে, হতে
পারে ব্যাপক
প্রাণহানির উৎস।
ট্রেডস বলছিলেন,
আমরা প্রস্তুত
নই, ফলে
বিশ্ব এখন
মহাঝুঁকির মধ্যে।
এই ঝুঁকির
অন্যতম কারণ
হচ্ছে সবার
জন্য স্বাস্থ্য
সুবিধার ব্যবস্থা
করা বিশ্বের
অধিকাংশ দেশের
আর্থিক সক্ষমতার
মধ্যে থাকা
সত্ত্বেও বিশ্বের
৩৫০ কোটি
মানুষ এখনো
প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য
সুবিধা থেকে
বঞ্চিত।
জিডিপি, মাথাপিছু
আয়, জাতীয়
প্রবৃদ্ধি দিয়ে
উন্নয়নকে পরিমাপ
করছি আমরা
অনেক দিন
ধরেই। স্বল্পোন্নত
দেশ ভুটানের
সুখে থাকার
সূচক বা
গ্রস হ্যাপিনেস
ইনডেক্স আমাদের
উন্নয়ন ভাবনাকে
নতুন চিন্তার
খোরাক জোগালেও
উন্নয়নের প্রথাগত
ধারণাকে বড়
ধরনের ঝুঁকির
মধ্যে ফেলতে
পারেনি। উন্নয়নের
চলমান ধারণা
ও প্রচলিত
বিশ্বব্যবস্থাকে অবশেষে
ভয়ংকর ঝাঁকুনিতে
ফেলতে সক্ষম
হলো নভেল
করোনা। করোনা
আমাদের প্রচলিত
ধ্যান-ধারণাকে
নতুনভাবে প্রশ্ন
করতে পেরেছে।
ভৌত অবকাঠামোগত
উন্নয়নের বৈশ্বিক
মডেলে অগ্রাধিকারে
তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে
থাকা সামাজিক
অবকাঠামো, স্বাস্থ্য
ও কমিউনিটি
সুবিধা, খাদ্যনিরাপত্তা
ব্যবস্থার দিকে
নতুনভাবে দৃষ্টি
দিতে বাধ্য
করেছে রাষ্ট্র
ও সমাজকে।
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা
বিল গেটস
২০১৫ সালে
টেডএক্সের এক
বক্তৃতায় সংক্রামক
ভাইরাসের যে
আশঙ্কার কথা
বলেছিলেন, ২০২০
সালে এসেই
তা এক
নির্মম বাস্তবতা
হয়ে আমাদের
সামনে দেখা
দিয়েছে। বিল
গেটস সেদিন
বলছিলেন, ‘আগামী
কয়েক দশকে
কোনো কারণে
যদি লাখ
লাখ মানুষ
মারা পড়ে,
তাহলে কারণটি
মোটেও যুদ্ধ
হবে না;
মানুষ মারা
পড়বে ভীষণ
সংক্রামক কোনো
ভাইরাসের সংক্রমণে।
মানুষ মিসাইলের
আঘাতে প্রাণ
হারাবে না,
প্রাণ যাবে
ক্ষুদ্র জীবাণুতে।
এর কারণগুলোর
মধ্যে একটি
হলো, আমরা
পারমাণবিক প্রতিরোধক
তৈরিতে বিপুল
পরিমাণ বিনিয়োগ
করেছি অথচ
একটি মহামারী
ঠেকানোর প্রয়োজনীয়
উদ্যোগের বেলায়
সত্যিকার অর্থে
আমাদের বিনিয়োগ
সামান্যই। আমরা
পরবর্তী মহামারীর
জন্য প্রস্তুত
নই।’
নভেল করোনাভাইরাস
সারা বিশ্বে
মহামারী আকারে
ছড়িয়ে পড়া
এবং প্রাণসংহারী
বিস্তার ঘটানোর
পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবীর
বিভিন্ন দেশের
সংক্রামক ব্যাধি
মোকাবেলার সক্ষমতা
কেমন, তা
আলোচনার কেন্দ্রে
এসেছে। নভেল
করোনা চিরন্তন
সত্যটা আমাদের
সবাইকে আবার
জানিয়ে দিয়েছে
যে অর্থনৈতিক
উন্নতির চেয়ে
স্বাস্থ্য অবকাঠামো
ও মৌলিক
সেবার সহজলভ্যতা
আমাদের জন্য
গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক
সক্ষমতা বৃদ্ধির
চেয়েও রোগ-ব্যাধি
মোকাবেলার সক্ষমতা
জাতি-রাষ্ট্র-সমাজের
কাছে প্রধান
বিবেচ্য হওয়া
উচিত। একটা
দেশের অর্থনৈতিক
সক্ষমতা এবং
সামরিক শক্তির
পাশাপাশি স্বাস্থ্য
ব্যবস্থা কতটা
শক্তিশালী এবং
দুর্যোগকালীন রাষ্ট্র
সাধারণ মানুষকে
কতটা সুরক্ষা
দিতে সক্ষম,
সেটাই জনমানুষের
জন্য সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ ও
তাত্পর্যবহ। নভেল
করোনা সেটাই
স্মরণ করিয়ে
দিচ্ছে আমাদের।
বিশ্বের বিভিন্ন
দেশের মধ্যে
সংক্রামক ব্যাধি
ও মহামারী
মোকাবেলার সক্ষমতার
তুলনামূলক বিশ্লেষণ
করে বৈশ্বিক
স্বাস্থ্য সুরক্ষা
সূচক (গ্লোবাল
হেলথ সিকিউরিটি
ইনডেক্স) তৈরি
করা হয়
২০১৯ সালে।
নিউক্লিয়ার থ্রেট
ইনিশিয়েটিভ (এনটিআই),
জন হপকিনস
সেন্টার ফর
হেলথ সিকিউরিটি
ও ইকোনমিস্ট
ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের
(ইআইইউ) যৌথ
উদ্যোগে এ
সূচক তৈরি
করা হয়।
২০১৪ সালে
পশ্চিম আফ্রিকায়
ইবোলা মহামারী
ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে
পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে
এ ধরনের
বিশ্লেষণের গুরুত্ব
বাড়তে থাকে।
‘বৈশ্বিক
স্বাস্থ্য সুরক্ষা
সূচক-২০১৯’
প্রধানত বড়
আকারের সংক্রামক
ব্যাধি অথবা
মহামারীর প্রকোপে
দেশগুলো কতটা
প্রস্তুত, তার
ওপর ভিত্তি
করে তৈরি
করা হয়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি
মোকাবেলার সঙ্গে
ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত
প্রধান ছয়টি
বিষয় যথা
‘সংক্রামক
রোগ প্রতিরোধ,
রোগ শনাক্তকরণ,
ব্যাধি মোকাবেলায়
সাড়া প্রদান
ও প্রতিক্রিয়ামূলক
ব্যবস্থা গ্রহণ,
স্বাস্থ্য অবকাঠামোগত
সুবিধা, জনস্বাস্থ্যজনিত
উদ্যোগ এবং
স্বাস্থ্য ঝুঁকি’-কে
সূচক নির্ণয়ে
বিবেচনা করা
হয়েছে। ৩৪টি
সূচক ও
৮৫টি উপসূচকের
ওপর ভিত্তি
করে তৈরি
করা হয়েছে
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সূচক।
সূচকের মান
০-১০০-এর
মধ্যে ধরা
হয়েছে, যেখানে
১০০-কে
সর্বোচ্চ প্রস্তুতির
মানদণ্ড হিসেবে
ধরা হয়েছে।
স্বভাবতই উচ্চ
আয়ের দেশগুলোই
এ সূচকে
ভালো অবস্থানে
আছে। বৈশ্বিক
স্বাস্থ্য সুরক্ষা
সূচক অনুযায়ী
বড় আকারের
মহামারী মোকাবেলায়
বিশ্বে প্রথম
অবস্থানে আছে
আমেরিকা, তার
পরই যুক্তরাজ্য
ও নেদারল্যান্ডসের
অবস্থান। স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সূচকে
সারা পৃথিবীর
বৈশ্বিক গড়
মান পাওয়া
গিয়েছে মাত্র
৪০, এমনকি
উচ্চ আয়ের
৬০টি দেশের
গড় মান
৫২। শতকরা
৭৫ শতাংশ
দেশ এই
সূচকে নিম্ন
মান পেয়েছে,
যারা সংক্রামক
ব্যাধি মোকাবেলায়
অতি ঝুঁকি
প্রবণতার মধ্যে
রয়েছে।
২০১৯ সালের
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সূচকে
যে চিত্র
উঠে এসেছিল,
তা আমাদের
জন্য যথেষ্ট
উদ্বেগের কারণ
ছিল। এ
সূচকে উঠে
এসেছিল, বৈশ্বিক
প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন
দেশের জাতীয়
স্বাস্থ্য সুরক্ষা
ব্যবস্থা মৌলিকভাবেই
দুর্বল এবং
কেউই বড়
আকারের মহামারী
মোকাবেলার জন্য
পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত
নয়। একই
সঙ্গে বৈশ্বিকভাবে
জৈবিক অথবা
জীবাণু ঝুঁকি
যে গতিতে
বাড়ছে, বিজ্ঞানের
আবিষ্কার কিংবা
রাষ্ট্রগুলোর প্রস্তুতি
তার সঙ্গে
তাল মেলাতে
পারছে না।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সূচকে
তাই বলা
হয়েছিল, জীবাণু
ঝুঁকি মোকাবেলায়
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে
একসঙ্গে কাজ
করার কোনো
বিকল্প নেই।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সূচক
অনুযায়ী ১২টি
দেশ মহামারী
মোকাবেলায় ‘অধিক
প্রস্তুত’, সূচকে
যাদের মান
৮৩ দশমিক
৫ থেকে
৬৭-এর
মধ্যে এবং
এগুলো প্রধানত
উচ্চ আয়শ্রেণীর
দেশ; ক্রমানুযায়ী—আমেরিকা,
যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস,
অস্ট্রেলিয়া, কানাডা,
থাইল্যান্ড, সুইডেন,
ডেনমার্ক, দক্ষিণ
কোরিয়া, ফিনল্যান্ড,
ফ্রান্স, স্লোভেনিয়া
ও সুইজারল্যান্ড।
থাইল্যান্ড একমাত্র
ব্যতিক্রম, যারা
মধ্য আয়শ্রেণীর
দেশ ও
থাইল্যান্ড ছাড়া
এশিয়ার অন্য
দেশ হলো
দক্ষিণ কোরিয়া।
এশিয়ার দেশ
থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্য
সুরক্ষা ব্যবস্থা
অন্যান্য দেশের
জন্য অনুপ্রেরণার
উদাহরণ হতে
পারে, যারা
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সূচকে
সারা বিশ্বের
মধ্যে ষষ্ঠ
অবস্থানে আছে
এবং একমাত্র
মধ্যম আয়ের
দেশ ও
এশিয়ার মধ্যে
প্রথম। থাইল্যান্ড
প্রমাণ করে
দেখিয়েছে জনস্বাস্থ্যকে
গুরুত্ব দিতে
অর্থের চেয়েও
রাষ্ট্রের সদিচ্ছাই
গুরুত্বপূর্ণ এবং
প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য
ব্যবস্থা ও
স্বাস্থ্য অবকাঠামো
গড়ে তোলাটা
সংক্রামক ব্যাধি
মোকাবেলায় কতটা
কার্যকর হতে
পারে।
‘অধিক
প্রস্তুত’ দেশগুলোর
মধ্যে অধিকাংশই
উত্তর আমেরিকা,
অস্ট্রেলিয়া এবং
ইউরোপের দেশ।
মহামারী মোকাবেলায়
‘মোটামুটি
প্রস্তুত’ শ্রেণীতে
আছে ১০৯টি
দেশ, যাদের
সূচক মান
৬৬ থেকে
৩৩ দশমিক
৭-এর
মধ্যে। ইন্দোনেশিয়া,
মেক্সিকো, ব্রাজিল,
মালয়েশিয়া, দক্ষিণ
আফ্রিকা, তুরস্ক,
আলবেনিয়া, মধ্য
আয়শ্রেণীর দেশ
হওয়া সত্ত্বেও
তুলনামূলকভাবে এ
সূচকে ভালো
করেছে এবং
প্রথম ৪০টি
দেশের মধ্যে
তাদের অবস্থান।
বিশ্বের অন্যতম
অর্থনৈতিক পরাশক্তি
চীনের অবস্থান
৫১তম এবং
স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিশ্বে
আমেরিকার প্রবল
প্রতিদ্বন্দ্ব্বী রাশিয়া
৬৩তম অবস্থানে।
নিউক্লিয়ার থ্রেট
ইনিশিয়েটিভের প্রধান
আর্নেস্ট মনিজ
বলছেন, ‘বৈশ্বিক
স্বাস্থ্য সুরক্ষা
সূচকের মান
সব রাষ্ট্র,
সব আয়শ্রেণীর
দেশের জন্যই
শঙ্কার বিষয়টি
তুলে ধরেছে
এবং এটা
স্পষ্ট যে
রাষ্ট্রগুলো জৈবিক
সুরক্ষার জন্য
সক্ষমতা অনুযায়ী
বিনিয়োগ করছে
না।’ বৈশ্বিক
স্বাস্থ্য সুরক্ষা
সূচকে ‘স্বল্প
প্রস্তুত’ শ্রেণীতে
অবস্থান ৭৩টি
দেশের, যাদের
সূচক মান
৩৩ থেকে
১৬ দশমিক
২-এর
মধ্যে। এই
সূচকে পৃথিবীতে
মহামারী মোকাবেলায়
সবচেয়ে অপ্রস্তুত
দেশগুলোর মধ্যে
অন্যতম ইয়েমেন,
মার্শাল আইল্যান্ড,
উত্তর কোরিয়া,
সোমালিয়া, ইকুটেরিয়াল
গিনি। স্বল্প
প্রস্তুত দেশগুলোর
মধ্যে আফ্রিকা
মহাদেশের অনেক
দেশ রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার
মধ্যে সবচেয়ে
ভালো অবস্থানে
আছে ভারত,
যার অবস্থান
৫৭তম, তারপর
যথাক্রমে ভুটান
(৮৫), পাকিস্তান
(১০৫), নেপাল
(১১১), বাংলাদেশ
(১১৩), শ্রীলংকা
(১২০), মালদ্বীপ
(১২১) ও
আফগানিস্তান (১৩০)।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সূচকে
১৯৫ দেশের
মধ্যে বাংলাদেশের
অবস্থান ১১৩তম
এবং সূচক
মান ৩৫।
সূচকের মান
নির্ধারণে সংক্রামক
ব্যাধি মোকাবেলায়
সম্পৃক্ত ছয়
ধরনের বিষয়ের
মধ্যে বাংলাদেশের
মান সংক্রামক
রোগ প্রতিরোধে
২৭, রোগ
শনাক্তকরণে ৫১,
ব্যাধি মোকাবেলায়
সাড়া প্রদান
ও প্রতিক্রিয়ামূলক
ব্যবস্থা গ্রহণে
২৩, স্বাস্থ্য
অবকাঠামোগত সুবিধায়
১৫, জনস্বাস্থ্যজনিত
উদ্যোগে ৫৩
এবং স্বাস্থ্য
ঝুঁকিতে ৪৪।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
প্রধানত ঘূর্ণিঝড়
ও সাইক্লোন
মোকাবেলায় বাংলাদেশ
বিশ্বের অনেক
দেশের জন্য
অনুকরণীয় হলেও
সংক্রামক ব্যাধি
ও মহামারী
মোকাবেলায় আমাদের
সক্ষমতা আপেক্ষিকভাবে
দুর্বল বলেই
প্রতীয়মান।
স্বাস্থ্য সুরক্ষার
বিভিন্ন সূচকের
মধ্যে বাংলাদেশ
টিকাদান ও
দুর্যোগ মোকাবেলায়
আর্থসামাজিক দক্ষতা
ও সহনশীলতা
সূচকে তুলনামূলকভাবে
ভালো করেছে।
পক্ষান্তরে অণুজীব
প্রতিরোধ ও
স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন
সূচক যেমন
হাসপাতাল, ক্লিনিক
ও কমিউনিটি
হেলথ সেন্টারগুলোর
সক্ষমতা, সংক্রামক
ব্যাধি মোকাবেলায়
প্রয়োজনীয় চিকিৎসাকর্মী
নিয়োগ প্রদানের
সক্ষমতা, স্বাস্থ্য
সুবিধা পাওয়ার
সর্বজনীন সহজলভ্যতা,
জরুরি অবস্থায়
স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তঃযোগাযোগ,
জীবাণু প্রতিরোধের
সক্ষমতা ও
প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য
উপকরণের সহজলভ্যতা
এবং নতুন
স্বাস্থ্য পদ্ধতি
উদ্ভাবনে গবেষণা
ও অনুমোদনে
প্রয়োজনীয় দক্ষতা
প্রভৃতি বিষয়ে
বাংলাদেশের অবস্থান
তুলনামূলকভাবে বেশ
দুর্বল। ফলে
অত্যন্ত উচ্চ
জনসংখ্যা ও
অতি জনঘনত্ব,
একই সঙ্গে
দারিদ্র্যপীড়িত এ
দেশে সংক্রামক
ব্যাধি ও
মহামারীর আগ্রাসনে
জনস্বাস্থ্যের সার্বিক
চিত্র অত্যন্ত
ঝুঁকিপূর্ণ ও
বিপদসংকুল।
‘কেউই
বড় আকারের
মহামারী মোকাবেলার
জন্য পরিপূর্ণভাবে
প্রস্তুত নয়’—স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সূচক
প্রতিবেদনের এই
শঙ্কা করোনা
আঘাতে বৈশ্বিকভাবে
চরম সত্য
বলে প্রমাণিত।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা
সূচকে অগ্রগামী
পরাক্রমশালী আমেরিকা
থেকে ইউরোপের
উন্নত দেশগুলো
করোনা মোকাবেলায়
নিজ দেশের
নাগরিকদের জীবন
বাঁচাতে অসহায়
হয়ে পড়েছে।
নিরুপায় হয়ে
বিশ্বের অন্য
দেশগুলোর কাছে
সহায়তা চাইছে
বিভিন্ন ধরনের
জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্যসামগ্রী।
অথচ অর্থনীতির
মানদণ্ডে এগিয়ে
থাকা শৌর্য-বীর্যে
অমিত শক্তিধর
এই রাষ্ট্রগুলোর
কী নেই!
বিশ্বের যেকোনো
প্রান্তের মানুষকে
মুহূর্তের মধ্যে
ধ্বংস করে
দেয়ার মতো
শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র,
পারমাণবিক অস্ত্র
এমনকি আছে
জীবাণু বোমাও।
অথচ বর্তমান
ভয়াল বাস্তবতায়
জীবাণু আর
ব্যাধি থেকে
নিজ দেশের
সাধারণ জনগণকে
সুরক্ষা দেয়ার
মতো অত্যাবশ্যকীয়
স্বাস্থ্য সুরক্ষার
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার
স্বল্পতার বিষয়টি
এখন করুণ
বাস্তবতা।
সার্বিক বিচারে
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সূচকে
এগিয়ে থাকা,
বিশ্বে তুলনামূলকভাবে
প্রস্তুত উন্নত
দেশগুলোই করোনা
মোকাবেলায় জনগণকে
পুরোপুরি স্বাস্থ্য
সুরক্ষা দিতে
পারছে না।
এ বাস্তবতায়
অর্থনৈতিক ও
স্বাস্থ্য অবকাঠামোয়
দুর্বল উন্নয়নশীল
ও অনুন্নত
দেশগুলোর জন্য
করোনার প্রকোপ
হতে যাচ্ছে
ভয়াবহ। বাংলাদেশ,
ভারতসহ এশিয়া
ও আফ্রিকার
অনেক দেশের
জন্য করোনা
এক ভয়ংকর
দুর্যোগ নিয়ে
আসতে পারে,
যার আলামত
এখন সুস্পষ্ট।
বিদ্যমান বৈশ্বিক
বাস্তবতায় সামনের
দিনগুলোয় সংক্রামক
ব্যাধি মোকাবেলায়
ও জনস্বাস্থ্য
রক্ষার্থে বিশ্বের
দেশগুলোকে সংক্রামক
ব্যাধি প্রতিরোধ
পরিকল্পনা এবং
জাতীয় দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাকে
সমন্বিতভাবে একই
কর্মকৌশলের অধীনে
সাজাতে হবে,
যাকে বলা
হচ্ছে ‘একীভূত
স্বাস্থ্য কৌশল’।
এ কৌশলের
অধীনে মানুষ,
প্রাণী ও
পরিবেশের স্বাস্থ্য
নিয়ে যারা
কাজ করেন,
তারা একে
অন্যের সঙ্গে
তথ্য বিনিময়
করবেন এবং
ভূমি ব্যবহার
পরিকল্পনা, নগর
পরিকল্পনা, জলবায়ু
দুর্যোগ পরিকল্পনা
ইত্যাদির সমন্বিত
উদ্যোগের মাধ্যমেই
সংক্রামক ব্যাধি
মোকাবেলা করা
এবং প্রাণীসৃষ্ট,
মানবসৃষ্ট অথবা
পরিবেশগত বিপর্যয়গুলোর
বৃহৎ প্রভাব
সামনের দিনগুলোয়
এড়ানো সম্ভব
হবে।
আমরা জাতি-রাষ্ট্রগুলো
প্রবৃদ্ধির উন্মাদনায়
মশগুল ছিলাম
এতকাল। উন্নয়নের
রোশনাই আর
ক্ষমতার আভিজাত্যের
গৌরব এখন
মিথ্যে প্রহেলিকা
হয়ে দেখা
দিয়েছে এক
নতুন অণুজীবের
আগমনে। নভেল
করোনা আমাদের
বাধ্য করেছে
রাষ্ট্রের মৌলিক
কর্তব্যগুলোর দিকে
দৃষ্টি ফেরাতে।
আমরা এখন
নিরুপায় হয়ে
জানার চেষ্টা
করছি রাষ্ট্রের
মৌলিক স্বাস্থ্য
অবকাঠামোর বিদ্যমান
অবস্থা, খাদ্যনিরাপত্তার
কথা। জরুরি
অবস্থায় আমাদের
প্রয়োজনীয় সুরক্ষা
দিতে রাষ্ট্রের
সক্ষমতা এখন
আলোচনার কেন্দ্রে।
এখানেই নভেল
করোনাভাইরাসের অভিনবত্ব,
তার নভেল
নামের সার্থকতা।
উন্নয়নের স্বপ্নিল
বহুরঙা চাদর
এখন করোনা
ঢেউয়ে সরে
গেছে; প্রবৃদ্ধির
মায়াহরিণের পেছনে
নিরন্তর ছুটে
চলা এখন
হয়ে পড়েছে
অসার ও
অর্থহীন। আমরা
এখন বেঁচে
থাকার অধিকারের
কথা বলছি,
খেটে খাওয়া
মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার
কথা বলছি;
বলছি সবার
ন্যায্য পাওনার
কথা। আমাদের
স্বাস্থ্য সুরক্ষার
উপকরণ, হাসপাতালের
শয্যা, ভেন্টিলেটর,
আইসিইউ বেড
প্রভৃতির সংখ্যা
ও গুণগত
মান নিয়ে
আমরা এখন
কথা বলছি।
নভেল করোনার
সৌজন্যে।
একই সঙ্গে
আমরা এখন
আসন্ন মৃত্যুভয়ে
চরমভাবে ভীত,
লুকোনোর জায়গা
খুঁজছি সবাই।
বেশুমারে মানুষ
আগেও মরেছে;
বোমায় আর
গুলিতে; ক্ষুধা,
অপুষ্টি আর
অনাহারে; আর
মরেছে বিনা
চিকিৎসায়ও। আফ্রিকা,
এশিয়ায় মানুষ
মরেছে পিপীলিকার
মতো; মরেছে
মধ্যপ্রাচ্যে আর
লাতিন আমেরিকায়ও।
কিন্তু করোনা
ধনী-নির্ধন
চিনেনি, মানছে
না জাত-অজাত;
তাই করোনা
এত নভেল।
অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলো
করোনা ঝড়ে
ব্যাপকভাবে পর্যুদস্ত।
উন্নয়নশীল আর
অনুন্নত দেশগুলোর
দুর্যোগের শঙ্কা
তাই এত
প্রবল। করোনার
জন্য উদ্বেগও
তাই এত
ভয়াল।
চরম সত্যটা
হচ্ছে, সংক্রামক
ব্যাধির বৈশ্বিক
বিস্তার মোকাবেলায়
আমরা প্রস্তুত
নই, কখনই
ছিলাম না।
আমাদের উন্নয়ন
আর প্রবৃদ্ধির
দর্শনে মানুষ
আর মানবিকতা
উপেক্ষিত ছিল
বরাবরই। নভেল
করোনা কি
রাষ্ট্রগুলোকে মানুষের
প্রকৃত আশা-আকাঙ্ক্ষার
নিকটবর্তী করবে।
উন্নয়নের দর্শনকে
কি অধিকতর
মানবিক করবে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থায়
নভেল করোনা
সবাইকে জানাচ্ছে
স্বাগতম। করোনা-উত্তর
বিশ্বব্যবস্থায় নব
ধ্যান-ধারণার
আগমন এখন
তাই কালের
দাবি।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: নগর পরিকল্পনাবিদ
সাধারণ
সম্পাদক, বাংলাদেশ
ইনস্টিটিউট অব
প্ল্যানার্স (বিআইপি)