রাষ্ট্রের ইতিহাসে একেক পরিবর্তন একেক ধরনের তাৎপর্য বহন করে। কোনো পরিবর্তন ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়, কোনোটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন বদলায়, আবার কোনোটি জনগণের রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনই একটি যুগান্তকারী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবহুল দিন। দিনটিকে শুধু একটি অভ্যুত্থানের বিবরণে সীমাবদ্ধ করলে এর রাজনৈতিক অর্থনীতি, সামাজিক অভিঘাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়, বরং ৭ নভেম্বরকে বুঝতে হবে এমন এক সময়ের প্রেক্ষাপটে, যখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, অর্থনীতির সক্ষমতা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, সবকিছুই অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়েছিল। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তার অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বের এক দোদুল্যমান সংকটে নিমজ্জিত হয়েছিল।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের সংকটের উদ্বেগজনক দিক ছিল রাষ্ট্রের বৈধতা ও কার্যকারিতা একই সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়া। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই তার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান বাড়তে থাকে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, খাদ্যবাজারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে। উইলেম ফান শেন্ডেল তার ‘এ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে ১৯৭৫ সালের সংকটকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের সংঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার বিশ্লেষণে একদিকে ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সমাজতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাসের ধারণা, অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোগ ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের পক্ষে অবস্থান। অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের সংকটটি কেবল নেতৃত্বের সংকট ছিল না; বাংলাদেশ কোন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মডেলে এগোবে, সেই প্রশ্নেও তখন জাতীয় ঐকমত্য অনুপস্থিত ছিল।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে সংকটের গভীরতা আরো স্পষ্ট হয়। বিশ্বব্যাংকের সে সময়ের দেশওয়ারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল মাত্র ৯৫ মার্কিন ডলার। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে দেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষিতে নিয়োজিত ছিল। অথচ কৃষি উৎপাদন ছিল প্রকৃতিনির্ভর ও প্রযুক্তিগতভাবে সীমিত। এ পরিসংখ্যান দেখায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা কেবল সাময়িক খাদ্যসংকটের ফল ছিল না; এর পেছনে ছিল উৎপাদনশীলতার সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের সংকীর্ণতা এবং সম্পদের অসম বণ্টন। অমর্ত্য সেন তার ‘পভার্টি অ্যান্ড ফ্যামিন্স’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, খাদ্য উৎপাদন থাকলেই দুর্ভিক্ষ ঠেকানো যায় না; মানুষের খাদ্যে প্রবেশাধিকার ও ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৪ সালের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতির সামনে এ মৌলিক প্রশ্নটি রেখে যায়: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কার জন্য, যদি সাধারণ মানুষের খাদ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়?
এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থানগুলো রাষ্ট্রকে আরো অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন প্রকাশ্য রূপ নেয়। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে সৈনিকদের বিদ্রোহ এবং ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের মুক্তির মধ্য দিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটে। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ সেনানিবাসের সীমানা অতিক্রম করে জাতীয় রাজনীতির প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল। সাধারণ সৈনিকদের অংশগ্রহণের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে: রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা যায় না। এ সংহতির তাৎপর্য ছিল সামরিক ও বেসামরিক শ্রেণীর মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে জাতীয় সংকটের মুহূর্তে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক প্রত্যাশা প্রকাশ করা। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্নও রয়েছে, জনতার অংশগ্রহণে সংঘটিত কোনো পরিবর্তন কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে? ইতিহাসের উত্তর হলো, না। গণতন্ত্রের বৈধতা নির্ধারিত হয় পরবর্তী সময়ে জনগণের ভোটাধিকার, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার জবাবদিহি কতটা প্রতিষ্ঠিত হলো, তার মাধ্যমে।
এ পার্থক্যটি ৭ নভেম্বরের মূল্যায়নে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের উত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের পথ তৈরি হয়। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন, এসব ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন পরিসর সৃষ্টি করে। তবে উইলেম ফান শেন্ডেল তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৯৭৫ সালের পরও সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বাস্তবতা বহাল ছিল। ড. এম এরশাদুল বারী তার ‘মার্শাল ল ইন বাংলাদেশ: এ লিগ্যাল এনালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণায় সামরিক আইনের অধীনে সাংবিধানিক কর্তৃত্ব, বিচার বিভাগের ক্ষমতা এবং মৌলিক অধিকার প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করেছেন। এ গবেষণা আমাদের সামনে ফুটিয়ে তোলে, বহুদলীয় রাজনীতির সুযোগ সৃষ্টি এবং সাংবিধানিক গণতন্ত্র সুসংহত করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা করতে পারে; দ্বিতীয়টির জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও কার্যকর জবাবদিহি অপরিহার্য।
বিশ্বব্যাংকের তখনকার মূল্যায়নে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া স্থিতিশীলতামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে বার্ষিক প্রায় ৮০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সময়ে অনুকূল কৃষি উৎপাদন এবং উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সহায়তায় গড় প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি হয়। এ অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ; তবে একে কোনো একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখা যথার্থ হবে না। কৃষি উৎপাদন, আন্তর্জাতিক সহায়তা, বৈদেশিক বাণিজ্য, বেসরকারি উদ্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ নীতির সম্মিলিত প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রকৃত সাফল্য বিচার করতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, কৃষকের আয়, শ্রমিকের কর্মসংস্থান, খাদ্যের ক্রয়ক্ষমতা এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনও বিবেচনায় নিতে হবে।
আজ ২০২৬ সালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য তাই নতুনভাবে উপলব্ধি করা জরুরি। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক পরিবর্তনকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় রূপান্তর করা। নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করা, সংসদকে কার্যকর রাখা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং অর্থনৈতিক নীতিতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা—এসব ছাড়া গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়। একইভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক শিক্ষা কোনো ব্যক্তি বা দলের রাজনৈতিক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীর তাৎপর্য হলো রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে জনগণের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার ওপর। সিপাহি-জনতার সংহতি আমাদের জাতীয় ঐক্যের শক্তি স্মরণ করিয়ে দেয়; আর ইতিহাসের গভীর পাঠ আমাদের শেখায়—সেই ঐক্যকে সাংবিধানিক শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতিতে রূপান্তর করাই প্রকৃত দায়িত্ব। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ২০২৬ সালের অঙ্গীকার হোক—ক্ষমতার নয়, প্রতিষ্ঠানের শক্তি বৃদ্ধি; প্রতিশোধের নয়, ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা এবং কেবল প্রবৃদ্ধির নয়, মানুষের মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বাংলাদেশ নির্মাণ।
মাহমুদুল হাসান কমল: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুখপাত্র, বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (বিডিএসএফ)