১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে মোট পাঁচটি ব্রিগেড ছিল—ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, যশোর ও রংপুরে। প্যারামিলিটারি ফোর্স হিসেবে গঠন করা হয়েছিল জাতীয় রক্ষীবাহিনী। দেশের সর্বত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে, বিশেষ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে (জাসদ) দমনের উদ্দেশ্যে এ বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিছু কিছু নথিতে পাওয়া যায়, জাসদকে নির্মূল করার জন্য প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এমন একটি পরিস্থিতিতে আগস্ট-পরবর্তী সময়ে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে জেনারেল জিয়াউর রহমান জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পাঁচটি ব্রিগেডকে পাঁচটি ডিভিশনে রূপান্তর করেন। এ পাঁচটি ডিভিশনকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নতুন যাত্রা শুরু হয়। সে সময় জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। জাতীয় রক্ষীবাহিনী যেভাবে গুম ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাতে চাইলে তাদের সহজেই চাকরিচ্যুত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, একটি প্রশিক্ষিত বাহিনীর সদস্যদের চাকরিচ্যুত করা হলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে। তাই তাদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে একদিকে তিনি সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেন, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার এ রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম ভিত্তি ছিল দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। সেই লক্ষ্যেই তিনি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
সামরিক নীতির পাশাপাশি জিয়াউর রহমান দেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বহুমাত্রিকতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। তার দৃষ্টিতে, কোনো একটি দেশ বা নির্দিষ্ট বলয়ের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। সেই বিবেচনা থেকেই তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে বহুমুখী করার উদ্যোগ নেন।
তিনি ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং দেশের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও চীনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এভাবেই জিয়াউর রহমান সামরিক ও কূটনৈতিক নীতিকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশকে নিয়ে আসিয়ানের আদলে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার ধারণা থেকেই সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পারস্পরিক বাণিজ্য, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোই ছিল এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যেন সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারে, সেই সম্ভাবনা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সার্ক কেন কার্যকর আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি, তা সবারই জানা। ভারতের একক আধিপত্যের প্রবণতা মোকাবেলা করাও সার্ক গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। সে কারণে ভারত সার্ককে কার্যকর হতে দেয়নি।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তার শাসনামলে আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। দলটি তখন রাজনৈতিকভাবে সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিল। জিয়াউর রহমান শেখ হাসিনাকেও দেশে ফিরে আসার সুযোগ করে দেন। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পথও উন্মুক্ত করা হয়। এভাবে বাকশালভিত্তিক একদলীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন। নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তির যোগ্যতা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতেন। তার সবচেয়ে বড় গুণগুলোর একটি ছিল, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উপযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচন করতে পারা। বিশ্বের সফল রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যেও এ গুণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তার নিয়োগ ও ব্যক্তিনির্বাচনের সক্ষমতা লক্ষণীয় ছিল। বিএনপিতে তিনি সাইফুর রহমান, মুস্তাফিজুর রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামসুল হকের মতো অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়ে আসেন। তার সরকারের সাফল্যের পেছনে যোগ্য ব্যক্তিদের যথাযথ দায়িত্বে নিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এ কারণেই স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ হয়তো আরো সুন্দর ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারত।
বর্তমান সময়েও রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের যথাযথ স্থানে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর। যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া না হলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা তৈরি হওয়া অনিবার্য।
অন্যদিকে ৭ নভেম্বরের ঘটনা বিএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ৭ নভেম্বর না ঘটলে বর্তমান বিএনপির অস্তিত্বও তৈরি হতো না। ৭ নভেম্বরের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই ১৯৭১ সালে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনও ৭ নভেম্বরের চেতনার ধারাবাহিকতা। ৭ নভেম্বরের যে স্পৃহা, তা থেকেই জুলাই আন্দোলনের অনুপ্রেরণা এসেছে। এ চেতনা কখনো শেষ হওয়ার নয়। যখনই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে পড়বে, তখনই ৭ নভেম্বরের চেতনার পুনরুত্থান ঘটবে। কারণ বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনচেতা। দেশের মানচিত্র, ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে তারা কখনো আপস করবে না।
ফজলে এলাহী আকবর: অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডিএস)