১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি গ্যাট-এর উত্তরসূরি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। লক্ষ্য ছিল নিয়মভিত্তিক, স্বচ্ছ ও অধিকতর উদার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—এ কি সত্যিই নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, নাকি গ্যাটের পুরোনো নীতিরই নতুন মোড়ক? গ্যাটের হাত ধরে যে মুক্তবাজারের দর্শন, বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থরক্ষা এবং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ডব্লিউটিও কি তারই আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও বাধ্যতামূলক রূপ? বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশ বিশ্ববাণিজ্যের মূলধারায় যুক্ত হওয়ার আশায়, বিশ্ব বাণিজ্য প্রসারে দৈত্যের সঙ্গে বামনের লড়াই হিসেবে খ্যাত গ্যাট চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। গ্যাট জাতিসংঘের কোনো অঙ্গসংস্থা নয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে ১৯৪৭ সালে জেনেভায় মাত্র ২৩টি দেশের অংশগ্রহণে এই সংগঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল শুল্ক ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ। তবে নীতিনির্ধারণে উন্নত দেশগুলোর প্রভাব সবসময়ই ছিল সুস্পষ্ট।
গ্যাট অর্থ জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড বা শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে সাধারণ চুক্তি। গ্যাটের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৮৬ সালের উরুগুয়ে রাউন্ড। এই রাউন্ডে দীর্ঘ প্রায় আট বছর আলোচনার পর ১৯৯১ সালে গ্যাটের মহাপরিচালক আর্থার ডাংকেল ৪৫০ পৃষ্ঠার একটি খসড়া প্রস্তাব দেন, যা ১৯৯৩ সালে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে গৃহীত হয় এবং পরবর্তীকালে ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে। এ সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব একমেরুকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। যদিও সামরিক সক্ষমতায় তার শ্রেষ্ঠত্ব দৃশ্যমান হলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তখন বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি, শিল্প প্রতিযোগিতা এবং কর্মসংস্থানের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। তাই প্রাথমিক অবস্থায় গ্যাট-এর বিরুদ্ধবাদী যুক্তরাষ্ট্রই মুক্তবাজার অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রবক্তায় পরিণত হয়। যদিও সে সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি পৃথিবীর সমস্ত গরিব দেশগুলোর সর্বমোট বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণের চেয়ে ছিল বেশি। সমালোচকদের মতে, নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার কৌশল হিসেবেই তারা মুক্তবাজারের ধারণাকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা করে।
গ্যাটের মূল দর্শন ছিল ‘আন্তর্জাতিকীকরণ’। অর্থাৎ সমস্ত পৃথিবী নিয়ে হবে একটা বাজার, আমদানি ও রফতানি হবে অবাধ, চাহিদা অনুযায়ী জিনিসের দাম ও উৎপাদন, পুঁজির অনায়াসে সীমান্ত পার ইত্যাদি বিশ্ব বাণিজ্য পথে কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু উৎপাদনের মূল উপকরণ জমি, পুঁজি ও শ্রম। জমি স্থাবর আর পুঁজি ও শ্রম অস্থাবর। পুঁজি ধনী দেশের এবং শ্রম গরিব দেশের। গ্যাট ও পরবর্তীকালে ডব্লিউটিওর কাঠামো পুঁজির অবাধ চলাচলকে উৎসাহিত করলেও শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করেনি। অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী পুঁজি অনায়াসে সীমান্ত পার হয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাবে—কিন্তু শ্রম এই সুবিধা পাবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও আমরা এক কোটি মানুষ তাদের দেশে পাঠাতে পারব না। এই যে মৌলিক বৈপরীত্য, মুক্ত বাণিজ্যের সুফল সমানভাবে বণ্টিত না হওয়া তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষের মাঝে আজও সন্দেহের উদ্রেক করে।
গ্যাটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল স্বনির্ভরতার পরিবর্তে তুলনামূলক সুবিধার ভিত্তিতে উৎপাদন। অর্থাৎ যা দেশে ভালোভাব তৈরি করা সম্ভব তাই উৎপাদন করে বিদেশে বিক্রি করে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় ঘাটতি জিনিস ক্রয় করতে হবে। এই দর্শনের ভিত্তিতেই গ্যাটের আওতায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি যুক্ত হয়—গ্যাটস, ট্রিমস এবং ট্রিপস।
এর মধ্যে প্রথমটি হলো গ্যাটস (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড ইন সার্ভিসেস) যাকে বাংলায় বলা যায় পরিষেবা নিয়ে বাণিজ্য সম্পর্কিত চুক্তি। অর্থনীতিকে সাধারণভাবে কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্প এবং সেবা—এই তিনটি বৃহৎ খাতে ভাগ করা হয়। প্রথমটি জমিভিত্তিক। দ্বিতীয়টি শিল্প। আর তৃতীয়টি বাদবাকি সবকিছু। গ্যাটসের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সেবা খাতকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ব্যাংক, বিমা, পর্যটন, পরিবহন, হাসপাতাল, নার্সিং সেবা, শিক্ষা, বিমান, হোটেল, তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম, খুচরা ব্যবসা, পরামর্শসেবা, এমনকি অবকাঠামো ব্যবস্থাপনাও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
বর্তমানে সেবা খাতই বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাভজনক ক্ষেত্র। গত কয়েক দশকে উন্নত দেশগুলো শিল্পের তুলনায় সেবা খাতকে বহুগুণ বেশি সম্প্রসারিত করেছে; তাদের কর্মসংস্থানের বড় অংশ এই খাতনির্ভর। ফলে গ্যাটস শুধু একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির চরিত্র পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রযুক্তি, পুঁজি ও দক্ষতায় পিছিয়ে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সেবা খাত কি এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে, নাকি আন্তর্জাতিক বাজার ক্রমেই বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে গ্যাটের আওতায় সম্পাদিত অপর দুটি চুক্তি—ট্রিমস এবং ট্রিপস-এর প্রভাবও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন; কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিল্প, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও মেধাস্বত্ব ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে এই দুটি চুক্তিই।
ট্রিমস অর্থাৎ ট্রেড রিলেটেড ইনভেস্টমেন্ট মেজার্স বা বাণিজ্য-সম্পর্কিত বিনিয়োগ ব্যবস্থাবলি। এর মূল নীতি হলো, একটি দেশে বিনিয়োগকারী বিদেশি কোম্পানিকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মতোই বিবেচনা করতে হবে; তাদের ওপর অতিরিক্ত শর্ত বা বিধিনিষেধ আরোপ করা যাবে না। গ্যাট চুক্তির আগে প্রতিটি দেশ নিজ নিজ অবস্থান বিবেচনা করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার, লাভের নির্দিষ্ট অংশ দেশে রাখা, দেশীয় জনবল নিয়োগ বা রফতানির বাধ্যবাধকতার মতো নানা শর্ত আরোপ করত। কিন্তু ট্রিমস কার্যকর হওয়ার পর এসব নীতিগত স্বাধীনতার বড় অংশ সীমিত হয়ে যায়। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ সহজ হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিল্পনীতি পরিচালনা ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়; বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
অপরদিকে ট্রিপস বা বাণিজ্য-সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব চুক্তি, যা আন্তর্জাতিকভাবে কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ও পেটেন্টের অভিন্ন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। কপিরাইট, ট্রেডমার্ক এবং পেটেন্ট—এই তিনটি ক্ষেত্রই ট্রিপসের মূল ভিত্তি। কপিরাইটের মাধ্যমে সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকর্ম, সফটওয়্যার বা অন্যান্য সৃজনশীল কর্মের ওপর স্রষ্টার আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ শিল্পী বা স্রষ্টার অনুমতি ছাড়া তার সৃষ্টিকর্ম বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যায় না। যেমন একটা সময় পর্যন্ত রবি ঠাকুরের কোনো লেখা বিশ্বভারতীর অনুমতি না নিয়ে বা একটা ফি দিয়ে অধিকার না কিনে কোথাও ছাপানো যেত না। ট্রেডমার্ক হলো কোনো প্রতিষ্ঠান বা পণ্যের স্বতন্ত্র নাম, প্রতীক বা চিহ্ন। বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলোর ব্র্যান্ড পরিচিতির পেছনে ট্রেডমার্ক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বড় বড় কোম্পানিগুলোর নাম বা প্রতীক চিহ্ন এত পরিচিত যে মানুষ তা দেখেই আকৃষ্ট হয়। মানুষ তাদের উৎপাদিত দ্রব্যের নাম ভুলে কোম্পানির নামেই দ্রব্যকে পরিচিত করে ফেলে। নাম আর চিহ্ন ব্যবহার করে বড় বড় কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা রোজগার করতে পারে।
মেধাস্বত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো পেটেন্ট। কোনো গবেষক, বিজ্ঞানী বা রসায়নবিদ নতুন ওষুধ, প্রযুক্তি বা যন্ত্র আবিষ্কার করে পেটেন্ট অফিসে তা রেকর্ড করলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেই আবিষ্কারের বাণিজ্যিক অধিকার একমাত্র তারই থাকবে। অন্য কেউ যদি বাণিজ্যিক সুবিধাভোগে তা ব্যবহার করতে চায় তবে আবিষ্কারকের অনুমতি নিতে হবে এবং সম্মানী দিতে হবে। গ্যাট থেকে ডব্লিউটিওতে রূপান্তরের পর ট্রিপস চুক্তির আওতায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন করা হয় পেটেন্ট আইনের প্রকৃতিতে।
গ্যাট চুক্তির মেধাস্বত্ব আইনের ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া ও উৎপাদিত বস্তুর মধ্যে এতদিনকার আইনের পার্থক্য তুলে দেওয়া হয়। আগে অনেক দেশে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ছিল মূলত উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর। কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ফি দিয়ে উৎপাদন প্রযুক্তি কিনে একই পদ্ধতিতে নিজ দেশে ওষুধ বা অন্যান্য পণ্য উৎপাদন করতে পারত। ট্রিপস সেই ব্যবস্থাই বদলে দেয়। যার ফলে শুধু উৎপাদন প্রক্রিয়া নয়, উৎপাদিত পণ্যের ওপরও পেটেন্ট সুরক্ষা কার্যকর হয়। ফলে প্রযুক্তির লাইসেন্স থাকলেও, পণ্যের পেটেন্ট অন্যের নামে থাকলে তার অনুমতি ছাড়া সেই পণ্য উৎপাদন বা বাজারজাত করা যাবে না—এ শর্ত আরোপিত হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষের মতে, এখানেই সবচেয়ে বড় বিতর্কের সূত্রপাত। এই ব্যবস্থায় বহুজাতিক কোম্পানির একচেটিয়া কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়েছে। দেশীয় শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে হয়েছে এবং ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরের অন্যতম শর্ত ছিল এই যে, ১০ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০০৩ সালের মধ্যে এই আইন পূর্ণভাবে স্ব স্ব দেশে কার্যকরী করতে হবে। মেধাস্বত্বের আন্তর্জাতিকীকরণ হবে, দেশের প্রচলিত পেটেন্ট আইনকে গ্যাটের মতো করে সাজাতে হবে। এই মেধাস্বত্বে গবেষক বা আবিষ্কারকের ২০ বছর অধিকার থাকবে। ফলে জং ধরার আগে আর কেউ তা ব্যবহার করতে পারবে না। সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে কোনো দেশে পেটেন্ট অধিকার চালু রাখতে অফিস বা কারখানা খুলতে হবে না, এমনকি কোনো রেজিস্ট্রিও করতে হবে না। জিনিসটি কোনো দেশে আমদানি হলেই ধরে নেওয়া হবে পেটেন্ট আইন কার্যকর হয়েছে।
গ্যাটস, ট্রিমস ও ট্রিপস—এই তিনটি চুক্তি একত্রে বিচার করলে বোঝা যায়, বিশ্ববাণিজ্যের নামে এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে পুঁজি, প্রযুক্তি ও সেবার অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা হলেও প্রতিযোগিতার শক্তি সব দেশের সমান নয়। একদিকে উন্নত বিশ্বের হাতে বিপুল পুঁজি, আধুনিক প্রযুক্তি ও বহুজাতিক কোম্পানির অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা; অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বলা হচ্ছে একই মাঠে নেমে সমান প্রতিযোগিতা করতে। দৈত্যের সঙ্গে বামনের এই প্রতিযোগিতায় ফলাফল কী হবে, তা অনুমান করতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন হয় না।
অনেকে এখনো মনে করেন বিদেশি বিনিয়োগ এলেই শিল্পায়ন হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, প্রযুক্তি আসবে এবং দেশ সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসার মূল লক্ষ্য মানবকল্যাণ নয়, মুনাফা। তারা যতটুকু প্রযুক্তি দিলে উৎপাদন চলবে, ততটুকুই দেবে; কিন্তু যে প্রযুক্তি তাদের বাজার নিয়ন্ত্রণের শক্তি, তা সহজে কারও হাতে তুলে দেবে না। ফলে কারখানা তৈরি হতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তির মালিকানা থেকে যাবে বিদেশির হাতে; শ্রমিক কাজ পাবে, কিন্তু জ্ঞানের চাবিকাঠি থাকবে অন্যের কাছে।
বিদেশি পুঁজি আসে, কিন্তু তার সঙ্গে আসে মুনাফা প্রত্যাবাসনের পথও। আজ যে অর্থ বিনিয়োগ হিসেবে আসে, আগামীকাল তার চেয়ে বেশি অর্থ লভ্যাংশ, রয়্যালটি ও নানা ফি-র নামে দেশ ছেড়ে চলে যায়। তাই বিনিয়োগের অঙ্ক দেখে উল্লসিত হওয়ার আগে হিসাব করতে হবে—দেশ কী পেল, আর কী হারাল।
গ্যাট থেকে ডব্লিউটিও, আর আজ ডব্লিউটিওর পাশাপাশি একের পর এক দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি—নাম বদলেছে, কৌশল বদলেছে, কিন্তু শক্তির রাজনীতি বদলায়নি। যে রাষ্ট্রগুলো একসময় বহুপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বাজার খুলতে চেয়েছিল, আজ তারাই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আরও গভীর অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হলো, এসব চুক্তি কি সত্যিই সমান অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি দুর্বল অর্থনীতিগুলোকে আরও নির্ভরশীল করার নতুন কৌশল?
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তার প্রতিটি ধারা জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিচার করতে হবে। সংসদে আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত, কৃষক, শ্রমিক, শিল্পোদ্যোক্তা ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে এমন কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যার প্রভাব আগামী কয়েক দশক দেশের মানুষকে বহন করতে হবে।
আজকের বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই। কিন্তু নিজের বাজার, শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি ও নীতিগত স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে বিশ্বায়নের যাত্রী হওয়ারও কোনো অর্থ নেই। যে মুক্তবাজার দেশের উৎপাদনশক্তিকে দুর্বল করে, প্রযুক্তিতে পরনির্ভরশীল করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অন্যের হাতে তুলে দেয়, সেই মুক্তবাজার শেষ পর্যন্ত স্বাধীন অর্থনীতির নয়, নির্ভরশীল অর্থনীতির জন্ম দেয়।
তিন দশক আগে যে প্রশ্ন উঠেছিল—গ্যাট কি উন্নয়নের পথ, নাকি শক্তিশালীদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার—আজও সেই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর মেলেনি। বরং ডব্লিউটিও থেকে নতুন নতুন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির যুগে প্রশ্নটি আরও গভীর হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিশ্ববাণিজ্যে অংশ নেওয়া নয়; বরং এমন শর্তে অংশ নেওয়া, যেখানে দেশের সার্বভৌম অর্থনীতি, শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।
একসময় অন্তত বৈদেশিক চুক্তির দু-একটি শর্ত জনগণের সামনে আসত; এখন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না। যেখানে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট এসব বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হওয়ার কথা, সেই জাতীয় সংসদও প্রায় নীরব। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন কিংবা অন্যান্য শক্তিধর দেশের বাণিজ্যিক সমঝোতা কতটা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে, তা সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ খুবই সীমিত।
লেখক: সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)