জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকায় জমিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। লবণাক্ততার প্রভাব কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু, মানবস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে দৃশ্যমান। এর মধ্যে কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধান সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ফসল। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকায় বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উৎপাদন কমে যাচ্ছে। উৎপাদিত ফসলেও থাকছে নানা ত্রুটি। ফলন কমে যাওয়ায় গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ক্ষত। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্যমতে, দেশের আবাদযোগ্য জমির ৩০ শতাংশের বেশি উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০০৯ সালের শেষের দিকে দেশের উপকূল ও চরাঞ্চলে লবণাক্ততায় আক্রান্ত জমির পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর। আর বর্তমানে ১১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। অর্থাৎ দেড় দশকে লবণাক্ত জমির পরিমাণ এক লাখ হেক্টরের মতো বেড়েছে। যদি এ প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে উপকূলীয় এলাকায় আরো অনেক জমি শিগগিরই লবণাক্ততায় আক্রান্ত হতে পারে। অর্থাৎ যে হারে কৃষিজমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে দেশের ওই অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা সেখানকার জনস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রেও ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, লবণাক্ততার প্রভাবে কৃষির ফলন কমে গিয়ে জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, লবণমুক্ত ও ‘খুব সামান্য লবণাক্ত’ চাষযোগ্য জমি দিন দিন কমছে। বাড়ছে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা। তুলনামূলকভাবে উপকূলীয় দক্ষিণ-মধ্য অঞ্চলের কিছু অংশ (বরিশাল বিভাগের বরগুনা ও পটুয়াখালী ছাড়া এবং নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী বাদে) কম লবণাক্ততার শিকার হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এ অঞ্চলে পদ্মা ও নিম্ন মেঘনা থেকে স্বাদু পানির যথেষ্ট প্রবাহ রয়েছে। অন্যদিকে উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গড়াই, মধুমতী, কপোতাক্ষ প্রভৃতি নদীর স্বাদু পানির প্রবাহ কমে গেছে। এ কারণে অনেক এলাকায় উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা দেখে দিয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন কমছে। লবণাক্ততার বিস্তার গোপালগঞ্জ ও যশোর জেলার নিম্নাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী, মুকসুদপুর ও যশোর সদর—এ তিন উপজেলা নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে লবণাক্ততা দেশের মধ্যাঞ্চলের দিকে বিস্তৃত হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
লবণাক্ততার ক্ষতিসহ জলবায়ু পরিবর্তনে নানা সংকট এখন বিপন্ন করছে দেশের কৃষি, প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশকে। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনকে ঠেকিয়ে রাখার কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই, সেহেতু এ মুহূর্তে আমাদের জোর দিতে হবে বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত অভিযোজন কৌশলের দিকে। কৃষি, জীবন-জীবিকা এবং জীববৈচিত্র্য যাতে এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সেই পথ খুঁজে বের করা এবং তার কার্যকর প্রয়োগের দিকে মনোযোগ দেয়া এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বিভিন্ন মাত্রায় উপস্থিতির কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ এবং উজান থেকে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, খুলনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও সাতক্ষীরা জেলায় ফসল উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষকরা বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। শুষ্ক মৌসুমে তারা জমি পতিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে খরার মৌসুমে (অক্টোবর-মে পর্যন্ত) নদীর লবণাক্ততায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, যা পানীয় ও সেচযোগ্য পানির ঘাটতি তৈরি করবে এবং জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটাবে। নদীর লবণাক্ততা ও মিঠা পানির প্রাপ্যতার পরিবর্তন মাছ চাষের উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করবে। এতে মিঠা পানির মাছ ও চিংড়ির প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় মাটির লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। ২০৫০ সালের মধ্যে গড়পড়তা লবণাক্ততা ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বৃদ্ধির হার ৫৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। আবার লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবেলায় স্থানীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে যেসব কৌশল বিদ্যমান রয়েছে সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে এমন কিছু অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে এ অঞ্চলের মানুষের উপকারে আসে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রভাব শুধু কৃষিজমি বা ফসল উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের স্বাস্থ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হওয়ায় এসব অঞ্চলের মানুষ ধীরে ধীরে নানা জটিল স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগছে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনি, কলেরা, অকাল গর্ভপাত, অপুষ্টি এবং বিকলাঙ্গ শিশু জন্মের মতো সমস্যা। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। আইসিডিডিআর,বি গবেষকরা তাদের পর্যবেক্ষণাধীন এলাকায় ১২ হাজার ৮৬৭টি গর্ভধারণের তথ্য নথিভুক্ত করেছেন। তারা প্রতিটি গর্ভবতী নারীকে সন্তান প্রসব পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেন এবং দেখতে পান, যারা উপকূলীয় সমতলে, সমুদ্রতট থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাত মিটার উচ্চতায় বসবাস করেন, তারা অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের নারীদের তুলনায় গর্ভপাতের ঝুঁকিতে ১ দশমিক ৩ গুণ বেশি থাকেন। তারা মনে করছেন, এ পার্থক্যের মূল কারণ হলো নারীরা যে পানি পান করেন, তাতে অতিরিক্ত লবণের উপস্থিতি।
লবণাক্ত পরিবেশে চাষাবাদ অভিযোজনে বিভিন্ন কৌশলের কথা উঠে এসেছে। যেমন উন্নত সেচ ব্যবস্থা, সার ব্যবহার, জমি উঁচু করা, উঁচু বেডে চাষ, খাড়াভাবে উদ্যান চাষ (ভার্টিক্যাল হর্টিকালচার) ও লবণাক্ত সহনশীল গাছপালা। এসবের মধ্যে স্থানীয় কৃষকরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মিঠা পানির সেচ ব্যবস্থাকে। এ সেচ ব্যবস্থা তাদের চাষাবাদের জন্য অপরিহার্য। মিঠা পানির সহজলভ্যতা থাকলে ফসল উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু তা না থাকলে অন্য কোনো কৌশলই কার্যকর নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাই মিঠা পানির উৎস ও প্রবাহ বাড়াতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। খাল, নদী বা পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে। মিঠা পানি সংরক্ষণ করে প্রতিটি বাড়ি ও কৃষিজমিতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি লবণাক্ত জলাধার থেকে অন্য কোথাও যাতে পানি প্রবেশ করতে না পারে সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। নোনাপানির ঘের থেকে যাতে লবণমুক্ত এলাকায় লবণ প্রবেশ করতে না পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
লবণ সহনশীল গাছপালা, বিশেষ করে ধান ও গমের জাত এবং বেগুন, টমেটো, কুমড়োর মতো সবজির জাত নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা এগুলোকে সম্ভাবনাময় মনে করলেও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার সঙ্গে প্রযুক্তি কতটা তাল মিলিয়ে চলতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য আরো সহনশীল জাত প্রয়োজন। আরো একটি চ্যালেঞ্জ হলো একটি নতুন জাত মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করে বিস্তৃত করতে চার-পাঁচ বছর সময় লাগে, যার মধ্যে লবণাক্ততা আরো বেড়ে গিয়ে সেই জাতটি অকার্যকর হয়ে যায়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় ছাড়া এ লবণাক্ত সমস্যার মোকাবেলা কঠিন। কৃষিকে কেন্দ্র করে কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা টিকে আছে; সেই বাস্তবতায় লবণাক্ততার বিষয়টিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। লবণাক্ততা শুধু একটি মৃত্তিকা সংকট নয়, এটি খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও৴মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এক সর্বব্যাপী হুমকি। তাই এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।