মার্চের রাতের ঘটনাগুলো গণহত্যার উদাহরণ হিসেবে অধিক আলোচনা হয়, যেটা স্বাভাবিক। তবে এর সঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রু নির্ধারণ কাঠামো ও প্রক্রিয়া, আক্রমণের পরিকল্পনার চরিত্র ও রাষ্ট্রিক কাঠামোর ব্যর্থতাও দেখা যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ‘অলীক’ বাস্তবতা প্রমাণ হয় এ ঘটনা ও তার উপসংহার দেখে।
২০০০ সালে আমরা তিনজন, ইউপিএলের প্রধান মহিউদ্দিন আহমেদ, ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন ও আমি পাকিস্তান যাই সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের সঙ্গে আলাপ করতে একাত্তর নিয়ে (সেই সব পাকিস্তানি, ইউপিএল)।
সেখানে কয়েকটি সাক্ষাৎকারে এ তথ্য উঠে আসে যে ১৯৭০-এর নির্বাচনের পর পরই পাকিস্তানি সেনা সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। এর বদলে প্রথম থেকেই তারা ২৫ মার্চ কিসিমের আক্রমণ চালাবে কিনা বলতে পারছি না। তবে তাদের পরিকল্পনা ছিল সামরিক কর্মকাণ্ডভিত্তিক, রাজনৈতিক সমঝোতাভিত্তিক নয়। এছাড়া পাকিস্তানের রক্ষক সেনাবাহিনীর কাছে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। ক্ষমতা হস্তান্তর মানে রাষ্ট্র হস্তান্তরের সমান তাদের কাছে। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার আব্দুর রহমান সিদ্দিকী লিখিত ‘এন্ডগেম’ গ্রন্থে এ বিষয়ে আলোচনা আছে।
অবশ্য প্রস্তুত হতেও সময় লাগে। তাই ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত লাগারই কথা। তবে মার্চে এসে তারা অনেকটাই প্রস্তুত ছিল যেটা জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা লিখিত গ্রন্থে উল্লেখ/ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জনসমক্ষে ৭ মার্চের ঘোষণা হলে তারা সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত ছিল বলা হচ্ছে।
কেন এই আক্রমণ?
পাকিস্তান রাষ্ট্র তার নিজের ব্যর্থতার সবচেয়ে বাস্তব শিকার। দুই অঞ্চলভিত্তিক একটি রাষ্ট্র যেটি আবার এককভাবে পরিচালিত, যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল না। যারা ১৯৪৭-এর পর পূর্ব পাকিস্তানি হয়, তারা বঙ্গীয় মুসলিম লীগের রাজনীতিবিদও ছিলেন। তারা ১৯৪০-এর পর থেকেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করছিল, যেটা উত্তর ভারতীয় পাকিস্তান থেকে কিছুটা আলাদা। ১৯৪৬-৪৭-এর যৌথ বাংলা আন্দোলনের প্রচেষ্টা থেকেই বোঝা যায়।
তারা যে ‘পাকিস্তানের’ জন্য আন্দোলন করে সেটা ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্র। কিন্তু এটা পাল্টানো হয় ১৯৪৬ সালে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ দ্বারা। এর প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কর্মীরা তার সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিমের নেতৃত্বে বঙ্গীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যৌথ বাংলা আন্দোলন করে। এতে সমর্থন দেয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজে এবং তার আদেশে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গীয় দল প্রধান, যিনি একক পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেন ১৯৪৬ সালে—যুক্ত হয়। অর্থাৎ একক পাকিস্তান রাষ্ট্র ভাবনার কোনো বলিষ্ঠ ধারার রাজনৈতিক ইতিহাস নেই। এক অর্থে এর বয়স বড় জোর এক বছর, ১৯৪৬-৪৭। উত্তর ভারতীয়দের কাছে অন্য কিছু মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলার মুসলিম লীগের কাছে নয়, যেটা তাদের কার্যক্রম ও দলিলে পাওয়া যায় (দেখুন আবুল হাশিমের ‘ইন রেট্রোস্পেকশন’)
কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের চাপের কারণে বঙ্গীয় কংগ্রেস যৌথ বাংলা আন্দোলন বাদ দিয়ে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব করে ১৯৪৭ সালে। একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা শুরু হয়। আবুল হাশিমপন্থী লীগ কর্মী মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘ইনার গ্রুপ’ নামে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। এটা দলের ভেতর কর্মীদের কাছে জানা ছিল। বোঝা যায় দলের অনেক কর্মী ১৯৪৭-এর একক পাকিস্তানের প্রতি আস্থাবান ছিল না তেমন। ১৯৪৯ সালে গণহারে কর্মীরা বঙ্গীয় মুসলিম লীগ ত্যাগ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে নতুন দল গঠন করে যেটা পরে আওয়ামী লীগ হয়। অর্থাৎ পাকিস্তান নেতৃত্বদানকারী দলের কোনো সামগ্রিক আনুগত্য বলয় ছিল না পূর্ব পাকিস্তানে।
অতএব একক পাকিস্তান রক্ষার বোঝা এসে পড়ে কেন্দ্রীয় বা করাচিভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রিক নেতাদের ওপর। এ দুই বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কোনো পূর্ব ভাবনা বা পরিকল্পনা বা কাঠামো ছিল না, রাজনীতি তো নয়ই। তাই এমন রাষ্ট্র পরিচালনা বা রক্ষা করার কাজটি ছিল দুরূহ, কারণ পাকিস্তান কোনো বাস্তবভিত্তিক রাষ্ট্র ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানিরা যে এ অলীক রাষ্ট্র সমর্থন করে না তা পাকিস্তানিরা বুঝত, যার ইঙ্গিত তাদের নথিতে পাওয়া যায় (মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র: প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)।
এছাড়া প্রশাসনিকভাবেও পাকিস্তানের বেসামরিক রাজনৈতিক নেতারা ব্যর্থ হয় এবং ১৯৪৭-১৯৫৮, এ এগারো বছর কেবল তারা সরাসরি শাসন করে। বাকি ১৯৫৮-১৯৬২ ছিল সামরিক শাসন ও সামরিক নেতাদের অধীনে সিভিল শাসন, ১৯৬২-৬৯ তথা সাত বছর। তারপর আবার সেনাশাসন।
পাকিস্তানিরা সেনাবাহিনীকে তাদের নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে শুধু দেখেনি, দেখেছে তার রাষ্ট্ররক্ষক হিসেবে। ফলে তাদের ভূমিকা অন্য রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী থেকে রাষ্ট্রিকভাবেই আলাদা ও অধিক ছিল। তাই ১৯৭১ সালে তাদের সামরিক অভিযান ছিল রাষ্ট্র রক্ষার লড়াই।
সেই দিক থেকে আওয়ামী লীগের ছয় দফা ছিল প্রকারান্তরে লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। এটি বাস্তবায়িত হলে যে একক কেন্দ্রভিত্তিক পাকিস্তান আর থাকে না সেটা পাকিস্তানিরা বোঝে। তাই তাদের দুশ্চিন্তা ছিল প্রাদেশিক শাসনভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে।
একই ঘটনা ঘটে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনে বিজয়ের পর। ২১ দফাও ছিল লাহোর প্রস্তাবকেন্দ্রিক প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ভাবনাভিত্তিক। যুক্তফ্রন্ট সরকারকে পাকিস্তানি কেন্দ্র বাতিল করে এ অভিযোগ তুলে যে তাদের নেতা ফজলুল হক দেশ স্বাধীন করার কথা বলেছে এক সাক্ষাৎকারে।
অর্থাৎ পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক অর্থে ১৯৪৬-এর পাকিস্তানকে রক্ষা করতে চেয়েছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক পাকিস্তান প্রস্তাব থেকে। এটি পাকিস্তানের আদি রাষ্ট্রিক কাঠামোর দুর্বলতা এবং ১৯৪৬-এর মডেলের পাকিস্তানের মৃত্যু ঘটে ১৯৭১ সালে এসে।
আক্রমণের লক্ষ্যস্থল ও কেন?
পাকিস্তানিদের ২৫ মার্চের রাতের আক্রমণের নির্দিষ্ট লক্ষ্যকেন্দ্র ছিল। বড় মাপে ছয়টি টার্গেটের দেখা পাওয়া যায়।
১. প্রাদেশিক সশস্ত্র বাহিনী যেমন বিডিআর পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানি বাহিনীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ বন্ধ করা।
২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস। প্রতিবাদী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অসহযোগ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় কেন্দ্রস্থল দমন করা।
৩. শিক্ষকদের আবাসস্থল। তাদের বাংলাদেশ আন্দোলনের বুদ্ধি ও মদদদাতা মনে করত তারা।
৪. ঢাকার কয়েকটি বস্তি। তারা বস্তিবাসীকে বিশেষভাবে শত্রু মনে করত। কারণ মিছিলে তাদের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে তারা শঙ্কিত হয়। সিদ্দিক সালেকের ‘উইটনেস টু স্যারেন্ডার’ গ্রন্থেও এ বিষয়টি উল্লেখিত।
৫. নির্বাচিত ব্যক্তিরা। যেমন শেখ মুজিবকে তারা গ্রেফতার করে কিন্তু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, যিনি তখন অন্য প্রাক্তন আসামিদের নিয়ে লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি নামের একটি সংগঠন করতেন, তাকে বাড়িতেই হত্যা করে পাক আর্মি।
৬. ঢাকার হিন্দু জনগোষ্ঠীর কয়েকটি কেন্দ্রস্থল যেমন জগন্নাথ হলের চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীদের আবাসভূমি, রমনার কালী মন্দির, মগবাজার-বেগুনবাড়ী খাল এলাকার পাল পাড়া বস্তি ইত্যাদি।
এ আক্রমণ থেকে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায় যা নিচে উল্লেখ করা হলো।
আক্রমণাত্মক না রক্ষণাত্মক আক্রমণ?
বিডিআর বা পুলিশ রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেনি। কিন্তু পাকিস্তান জানত তারা সশস্ত্র প্রতিরোধ করবে প্রয়োজন হলে কারণ তারা কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল না প্রাদেশিক ছিল, তাই আগেই শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করে।
ঢাকা ইউনিভার্সিটির হোস্টেলগুলো বেসামরিক সক্রিয় বাহিনী, যারা এরই মধ্যে স্বাধীনতা ঘোষণাও করেছে তাদের কেন্দ্রস্থল। তাই তাদের বিরুদ্ধে বড় মাপের সশস্ত্র অভিযান নেয়া হয় তাদের পরের ধাপে যাওয়ার আগেই।
শিক্ষকদের আক্রমণ করা হয় কারণ তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাজুকতা জনসমক্ষে তুলে ধরে, যার ফলে কেন্দ্রীয় পাকিস্তানের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানিদের দুর্বলতা কমে যায়। তারা থাকলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাস্তবতার দিকগুলো যাতে উন্মোচিত না হয় এবং আগেকার কাজের শাস্তি হিসেবে আক্রমণ করা হয়।
বস্তি হচ্ছে প্রতিবাদের সামাজিক আঁতুড়ঘর, যেটা তারা বুঝতে পারে। এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী একত্রিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে, তাই তাদের আক্রমণ করা হয় আগাম কিছু করার আগেই।
শেখ মুজিবকে গ্রেফতার স্বাভাবিক কাণ্ড, তবে মোয়াজ্জেম হোসেনকে হত্যা হচ্ছে প্রতিশোধ ও শাস্তি দেয়া।
কিন্তু হিন্দু আবাসস্থল, বস্তি, এমনকি মন্দির আক্রমণ কেন করল? বিশেষ করে রাজনীতিতে এ জনগোষ্ঠী জড়িত ছিল না তেমন।
এর কারণ হচ্ছে পাকিস্তানের কাছে ইন্ডিয়া হচ্ছে প্রধান শত্রু আর ’৪৭-পূর্ব রাজনীতির ধারাবাহিকতায় তারাই কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছে এ যুদ্ধ অনেকটাই ছিল ইন্ডিয়ার বিপক্ষে, যার সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক বিবাদ। তাছাড়া তারাই মুজিবনগর সরকার, বাংলাদেশী সেনা সদস্য, গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্প পরিচালনা, গোলাবারুদ সরবরাহ—সবকিছু দিয়ে বাংলাদেশ আন্দোলনকে সহায়তা করে। তারা এটাও ভাবত পাকিস্তানে বসবাসকারী প্রায় সব হিন্দু ছিল ভারতপন্থী এবং তাই তারা তাদের গণউচ্ছেদ করে ও বহু হিন্দু ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
২০০০ সালে আমরা যখন পাকিস্তানে যাই, তখন কয়েকজন মানুষ বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে স্কুলে সব হিন্দু মাস্টার পড়ায় এবং তারা মগজ ধোলাই করেছিল পূর্ব পাকিস্তানিদের কেন্দ্রীয় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাই একাত্তর ঘটে। অর্থাৎ ’৪৭-এর পর ও আগে তাদের ভাবনা একই ছিল এবং এ কারণেই তারা হিন্দু নিধন ও নির্যাতন নীতি গ্রহণ করে, তাদের মতে পাকিস্তানকে নিরাপদ করতে।
শত্রু নির্বাচনের খেসারত ও রাষ্ট্রিক মেধা
পাকিস্তানের ২৫ মার্চ অভিযান একটি অসাধারণ ব্যর্থতা, কারণ প্রত্যেকটি উদ্দেশ্য উল্টো ফল দেয়। ২৫ মার্চ রাতের পর গোটা দেশে প্রতিটি অঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়, যাতে বিডিআর ও পুলিশ ছিল অন্যতম অগ্রণী বাহিনী সেনাসদস্যদের সঙ্গে। এতে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ, যার ফলে দেশ পাকিস্তানের হাতে আর থাকেনি। সাধারণ মানুষ জড়িত হয়ে একটি জনযুদ্ধের চরিত্র প্রদান করে যেটা সামাল দেয়ার ক্ষমতা পাকিস্তানের কোনোদিন ছিল না। অতএব পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য তাদের সম্পূর্ণ বিপক্ষে যায়।
শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে তারা তাকে একটি প্রতীকে পরিণত করে। ফলে যাকে সামনে রেখে যুদ্ধ চলতে থাকে সরকারি ও রাজনৈতিক পরিসরে।
কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের মতো নির্বাচিত ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড তারা আরো করে, যেমন কুমিল্লায় ভাষা সংগ্রামী ধীরেন দত্তকে। এতে প্রতিশোধ হয়েছে কিন্তু রাজনৈতিক, সামরিক বা অন্য কোনো লাভ হয়নি পাকিস্তানের। হিন্দু জনগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তারা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করে কিন্তু শরণার্থীরা পাকিস্তানি নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে উপস্থিত হয় বিশ্বের সামনে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাদের সম্পর্কে প্রচার সব পর্যায়ে জনমত গঠন করে পাকিস্তানের বিপক্ষে। ইন্ডিয়ার যে এ বিশাল বোঝা একা সামলানো সম্ভব নয়, এটাও দাম পায় বিশ্ব দরবারে এবং তার যুদ্ধে যাওয়ার পেছনে নৈতিক বৈধতা দান করে। সম্মতি না থাকলেও মেনে নেয় অনেকে।
পাকিস্তান শরণার্থীদের ফেরানোর চেষ্টা করে কিন্তু ওই প্রচেষ্টা ছিল অবাস্তব হত্যা-নির্যাতন কার্যক্রম পরিচালনা করার পর। ফলে ডিসেম্বরে এসে যৌথ বাহিনীর হাতে ১৯৪৭-এর পাকিস্তানের মৃত্যু হয় এবং নয়া পাকিস্তান জন্মায়।
বোঝা যায় পাকিস্তানের ২৫ মার্চের আক্রমণের প্রতিটি উদ্দেশ্য পাকিস্তানকেই আঘাত করে সবচেয়ে বেশি। আসলে ১৯৪৬ সালে লাহোর প্রস্তাব পাল্টে দিল্লি প্রস্তাব বা দুই অঞ্চলভিত্তিক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র কোনো মেধাবী সিদ্ধান্ত ছিল না এবং প্রমাণিতভাবে ব্যর্থ। সেই মেধাহীনতার ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চের আক্রমণও মেধাভিত্তিক ছিল না, যার ফলে একটি রাষ্ট্রের মৃত্যু ও অন্য একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয় আক্রমণকারী রাষ্ট্রের মৃত্যুর মাঝ দিয়ে।
আফসান চৌধুরী: অধ্যাপক ও গবেষক