পর্যালোচনা

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, আধুনিকীকরণ ও উদ্যোক্তার বিকাশ

সংস্কৃতি ও শিল্পোদ্যোগের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বেশির ভাগ আচরণগত গবেষণার ভিত্তি হলো প্রখ্যাত লেখক গের্ট হফস্টেডির জাতীয় সংস্কৃতি ধারণাগতকরণ। তার সাংস্কৃতিক মাত্রা পরবর্তীকালে উদ্যোক্তা কর্মতত্পরতার স্তর পরিমাপ ও ব্যাখ্যা করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়। শিল্পোদ্যোগ নিয়ে পশ্চিমা সমাজে যে গবেষণা হয়েছে, তাতে দেখা যায় যে উদ্যোক্তা কর্মতত্পরতা সেখানেই প্রসারিত হয়, যেখানে

সংস্কৃতি শিল্পোদ্যোগের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বেশির ভাগ আচরণগত গবেষণার ভিত্তি হলো প্রখ্যাত লেখক গের্ট হফস্টেডির জাতীয় সংস্কৃতি ধারণাগতকরণ। তার সাংস্কৃতিক মাত্রা পরবর্তীকালে উদ্যোক্তা কর্মতত্পরতার স্তর পরিমাপ ব্যাখ্যা করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়। শিল্পোদ্যোগ নিয়ে পশ্চিমা সমাজে যে গবেষণা হয়েছে, তাতে দেখা যায় যে উদ্যোক্তা কর্মতত্পরতা সেখানেই প্রসারিত হয়, যেখানে ব্যক্তিবাদ, যৌক্তিকতা, ঝুঁকি গ্রহণ, সম্পদ উৎপাদন, আত্মস্বার্থ, স্বায়ত্তশাসন, কৃতিত্ব স্বনির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযাত্রার মতো মূল্যবোধ লালন করা হয়। তবে মূল্যবোধগুলোকে সর্বজনীন বলে ধরে নেয়া যায় না; বরং সংস্কৃতি যেমন পৃথক হয়, তেমনিভাবে তাদের শিল্পোদ্যোগের ঝোঁকও পৃথক হয়।

শিল্পোদ্যোগের সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী উদ্যোক্তা এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যক্তি বা সমাজ সুযোগের সন্ধান বা আবিষ্কার করে একে ব্যবসায়িক সত্তায় পরিণত করে। ফলে বিবিধ সম্পদের সঞ্চালনের মাধ্যমে সম্পদ অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হয়। উদ্যোক্তার বিকাশ বিভিন্ন ধরনের বাস্তবধর্মী অদম্য উপকরণের ওপর নির্ভর করে। সুতরাং উন্নয়নের আধুনিকীকরণ তত্ত্বগুলো একদিকে যেমন প্রচলিত মূল্য ব্যবস্থা, পুরস্কার কাঠামো উদ্যোক্তা ধারণার প্রতি সাধারণ মনোভাবের মতো অদম্য বিষয়গুলোর ভূমিকা ব্যাখ্যা করে, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বটি একটি প্রাসঙ্গিক এবং নির্ভরযোগ্য ধারণাগত কাঠামো দেয়, যার সাহায্যে উদ্যোক্তা বিকাশের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক পরিবেশগত/প্রাতিষ্ঠানিক উভয় কারণের (রাজনৈতিক, আইনি, অর্থনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক) প্রভাব অন্বেষণ করা যায়।

শিল্পোদ্যোগের ওপর বহু গবেষণা লক্ষ করা গেলেও থমাস মুয়েলার ১৯৯৮ সালের এক গবেষণায় উল্লেখ করেন, আমেরিকা বা পাশ্চাত্যের বাইরে বিষয়ে গবেষণার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তারা দেখান যে -পশ্চিমা পরিবেশে পরিচালিত  হওয়া গবেষণাগুলোয়ও পশ্চিমা মান, পরিমিতি এবং পদ্ধতির ব্যবহার লক্ষণীয়। তারা সতর্ক করেন যে -পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে শিল্পোদ্যোগের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের গবেষণাগুলোর প্রেসক্রিপশনগুলো চোখ বুঝে অনুসরণ না করতে। ২০০৫ সালের এক গবেষণায় লিংগেলবাখ, ডি লা ভিয়া এসেল উন্নয়নশীল দেশগুলোয় শিল্পোদ্যোগ প্রসারের জন্য তাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে নানা ধরনের গবেষণা হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন, যাতে এর পরিবেশের বাস্তবতাগুলো ফুটে ওঠে এবং নিজস্ব প্রয়োজনের  আলোকে শিল্পোদ্যোগকে ধারণ এবং পরিচালিত করা যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিল্পোদ্যোগে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। গবেষণায় এটি উঠে এসেছে যে এর নেপথ্যে রয়েছে আমেরিকার স্বতন্ত্রসূচক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে নিয়ন্ত্রণের অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রবিন্দু লক্ষণীয়ভাবে বিদ্যমান এবং পৃথক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হয়। উদ্যোক্তা সমাজগুলোকে বাকিদের থেকে আলাদা করে তা হলো শিক্ষার প্রক্রিয়ার অংশ এবং সাফল্যের দিকে এক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যর্থতাকে মেনে নেয়ার ক্ষমতা। তারা ইতিবাচক মনোভাবের কারণে সফল হওয়ার পুরস্কারগুলো ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিকে সহজেই ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে হাফস্টেডি ১৯৯১ সালে সৌদি আরবসহ আরব দেশগুলোর সাংস্কৃতিক মাত্রার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে দেশগুলো সমষ্টিবাদী, পুরুষোচিত, উচ্চক্ষমতার দূরত্ব, অনিশ্চয়তা এড়ানোর ক্ষেত্রে শক্তিশালী ছিল এবং স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। হাফস্টেডির সাংস্কৃতিক মাত্রাগুলোর আলোকে সৌদি আরবের ইসলামি সংস্কৃতিকে বিচার করলে দেখা যাবে যে সৌদি আরবের সংস্কৃতি উদ্যোক্তাবান্ধব নয়।

পশ্চিমা সমাজ মনে করে মূল সাংস্কৃতিক মাত্রা বিশেষত ব্যক্তিবাদ এবং ঝুঁকি গ্রহণ-এর ওপর শিল্পোদ্যোগের প্রচার প্রসার হয়। ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে, জাপানি সমাজ কোনোভাবেই একটি স্বতন্ত্রবাদী সমাজ নয়, বরং এটি একটি গোষ্ঠীভিত্তিক সংস্কৃতি, যেখানে স্বতন্ত্র অর্জনের পরিবর্তে জোর দেয়া হয়েছে সাংগঠনিক একাত্মতার (প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন, সরকারি সংস্থা) ওপরে। পরিবারকেন্দ্রিক চীনা উদ্যোক্তা এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ফলপ্রসূ অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে জাতীয় সমষ্টিবাদী মূল্যবোধগুলো সংরক্ষণ করে এবং পশ্চিমা না হয়েই স্বনির্ধারিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।

সাংস্কৃতিক বিশ্বজনীনতা বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি

১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রসারিত হওয়ার বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী তার প্রভাবকে ছড়িয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ায় আধুনিকীকরণ তত্ত্বের উত্থান ঘটে। কারণে গত শতকের আশির দশকের শেষভাগে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন অনেকের কাছে একটি যুগের সমাপ্তি হলেও বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা একে ইতিহাসের সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফুকুয়ামার মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে পশ্চিমা উদারপন্থী চেতনা এবং মুক্ত বাজার আরো গতিশীল হবে এবং শাসনকার্য পরিচালনায় পশ্চিমা সংস্কৃতিই একমাত্র সর্বজনীন সংস্কৃতি হিসেবে টিকে থাকবে।  

অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের আকাঙ্ক্ষা একটি স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা, যা সবাই ধারণ করেন। ফুকুয়ামার অনুযায়ী যুক্তিসংগত এবং ন্যায্য বলে মনে হলেও তিনি আধুনিকতার সঙ্গে যেসব পূর্বশর্ত যুক্ত করেছেন, তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট বিতর্ক। ফুকুয়ামার পরামর্শ মোতাবেক যারা অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন, তাদের পশ্চিমা মডেলকে উন্নয়নের একমাত্র মডেল হিসেবে বিবেচনা করে নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বিসর্জন দিয়ে পশ্চিমা মূল্যবোধ ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। ফুকুয়ামা বিশ্বাস করেন যে বিশ্বব্যাপী পশ্চিমা সংস্কৃতির দিকে সাংস্কৃতিক একীকরণ একটি অনিবার্য পরিণিতি

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা পণ্ডিত স্যামুয়েল হান্টিংটন শুধু ফুকুয়ামার তত্ত্ব নয়, আরেক প্রখ্যাত আমেরিকান পণ্ডিত ড্যানিয়েল লারনারের সাংস্কৃতিক সর্বজনীনতার তত্ত্বটিকেও প্রত্যাখ্যান করেন। তার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী জাতিগততা ধর্ম দুটি প্রভাবশালী উপাদান হিসেবে দেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক বিভাজন আরো বাড়িয়ে তুলছে। অবস্থায় বিশ্বায়ন যুগে  সীমানাবিহীন বিশ্বের আহ্বান সাংস্কৃতিক একীকরণের দিকে নিয়ে গেলেও তা একটি সর্বজনীন সংস্কৃতিতে পরিণত হবে না; বরং বিশ্বায়নের ফলে সাংস্কৃতিক পার্থক্যগুলো সহজে চোখে পড়ছে এবং বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য স্বীকৃত হচ্ছে। ধর্মীয় পার্থক্যের নিরিখে বিশ্বের প্রধান দ্বন্দ্বের কারণগুলো ব্যাখ্যা করে হান্টিংটনের দাবি, ধরনের সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে সংস্কৃতির মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। তার যুক্তি, পশ্চিমা ইসলামী সংস্কৃতির মধ্যে অসামঞ্জস্য এতটাই বিস্তৃত এবং দুটি সংস্কৃতির মধ্যে বিরোধ এতটাই সংবেদনশীল, যা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব। সুতরাং তিনি তার বহুল আলোচিত সভ্যতার সংঘাত থিসিসে ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে পশ্চিমা ইসলামী সভ্যতার মধ্যে সংঘাত একটি বাস্তবতা।

বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাঈদ সভ্যতার সংঘর্ষ না  অজ্ঞতার সংঘাত বলে  হান্টিংটনের থিসিসটি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি মনে করেন, সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে স্বীকৃতি দেয়া, এর গ্রহণযোগ্যতা গুণগ্রাহিতাকে আরো সুসংহত করে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমেই প্রকৃত অর্থে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিতে পারে। ইসলামী পশ্চিমা সভ্যতাকে দুটি মহান সভ্যতা হিসেবে অভিহিত করে সাঈদ বলেন, ধর্মীয় দিক থেকে একই উৎস থেকে আসা সত্যের কারণে খ্রিস্টান পশ্চিম এবং মুসলিম পূর্ব-এর মধ্যে যে টানাপড়েন রয়েছে, তা শুধু ধর্মীয় বিবেচনায় ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। 

সাম্প্রতিক বিশ্বে মুসলিম, চীনা ভারতীয় সভ্যতার পুনরুত্থান এবং দৃঢ় উপস্থিতি একক সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্বের বিপরীতে সংস্কৃতির বহুত্ববাদকে জোরদার করে। জিয়াউদ্দিন সরদারের (১৯৯৭) যুক্তিমতে, ধরনের সাংকৃতিক বৈচিত্র্য সভ্যতার মধ্যে সংঘর্ষের কারণ হতে পারে না। তিনি মনে করেন যে পশ্চিমারা অযৌক্তিকভাবেই সাংকৃতিক সংঘাতের ভয় করে। পশ্চিমাদের উন্নয়ন অগ্রগতির একমাত্র মতবাদ হিসেবে এর মূল্যবোধ ব্যবস্থা ছড়িয়ে দিতে হলে অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে এবং সত্যিকার বৈচিত্র্য বহুত্বের উত্থানকে সাগ্রহে গ্রহণ করতে হবে। 

আধুনিকীকরণ পাশ্চাত্যকরণের জবাব

-পাশ্চাত্য দেশগুলো আধুনিকীকরণ পাশ্চাত্যকরণকে একইভাবে গ্রহণ করেনি। উভয়কে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করার মতো দেশ যেমন রয়েছে, তেমনটি রয়েছে উভয়কে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করার। আবার কোনো কোনো দেশ দুটোর মধ্যে সংমিশ্রণ করার চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পর্যায়ে আধুনিকীকরণ পাশ্চাত্যকরণের বিষয়ে মুসলিম সমাজের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। প্রতিটি দেশে মুসলিম সমাজ বিভিন্ন গোষ্ঠীর আধুনিকীকরণ-এর বিষয়ে ভিন্ন মনোভাব ছিল এবং প্রত্যেকে তার নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডাকে বিবেচনায় রেখে আধুনিকীকরণের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে।

-পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে আধুনিকীকরণ পাশ্চাত্যকরণ উভয়কেই অনেকটা অযৌক্তিকভাবে প্রত্যাখ্যানকারীদের ধারণা ছিল যে পশ্চিমা আধুনিকতা গ্রহণ করার ফলে তারা পশ্চিমা উপনিবেশে পরিণত হতে পারে। -জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে তাদের দুটি যুক্তি ছিল। প্রথমটি, আধুনিকীকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অর্জন করতে গিয়ে মুসলমানদের তাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ত্যাগ করতে বা নিজস্ব পরিচয় নিয়ে আপস করতে হতে পারে। কারণে তারা মনে করে, আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়নের নামে নিজেদের ধ্বংস না করে পশ্চাদপদ থাকাই শ্রেয় তারা পশ্চিমা আধুনিকতার সংস্পর্শে আসা থেকে নিজেদের দূরে রেখে  পশ্চিমা প্রভাবের মধ্যে না পড়াকে সর্বোত্তমভাবে নিশ্চিত করতে চায়। পশ্চিমা আধুনিকতার প্রতি নেতিবাচকতাকে কিছুটা হলেও পশ্চিমা পরিবেশ-রাজনীতি, তাদের একচেটিয়া নীতি এবং মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাবের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বাস করেন যে তাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে পিছিয়ে রাখা বাদ দেয়া হচ্ছে। এমনকি তাদের নিজস্ব সম্পদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে তাদের অনুভূতি হচ্ছে যে তাদেরকে আবার নতুন করে উপনিবেশ করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় যুক্তিটি, মুসলমানদের মূল্যবোধ বিশ্বাস এবং অন্যান্য সংস্কৃতির ওপর পশ্চিমা আধুনিকতার ধ্বংসাত্মক প্রভাব-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও তারা প্রথম গ্রুপের মতো নিষ্ক্রিয় প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে  আধুনিকতাবাদী প্যারাডাইম-এর বিকল্প প্রস্তাব দেয়ার পক্ষে। তারা বিশ্বাস করে, বিশ্বমানবতাকে (পশ্চিমাসহ) পশ্চিমা আধুনিকতার ব্যাধিগুলো থেকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে মুসলমানদের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।

অন্যদিকে কয়েকটি মুসলিম দেশ পাশ্চাত্যকরণ আধুনিকায়ন উন্নয়নের পূর্বশর্ত অনুমানের ভিত্তিতে আধুনিকীকরণ পাশ্চাত্যকরণ উভয়কেই গ্রহণ করেছিল। তারা স্পষ্টভাবে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির হীনম্মন্যতা মেনে নিয়েছে এবং তাদের মূল্যবোধ ব্যবস্থার সাবলীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ফলস্বরূপ তারা সাংস্কৃতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে তাদের সাফল্য দেখতে চেয়েছে। যেমন মুসলিম বিশ্বে তুরস্ক এবং ইসলামী বিপ্লবপূর্ব ইরান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরেই তুরস্কে ইসলামবিহীনকরণ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে সফল হলেও তৃণমূল পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান সাধারণ জনগণকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বা আদর্শের প্রতি প্রভাবিত করতে পারেনি।   

যারা কোনো আপস না করে আধুনিকায়নকে গ্রহণ করার পক্ষে, তারা পাশ্চাত্যকরণকে প্রত্যাখ্যান করে অনুমানের ভিত্তিতে যে আধুনিকীকরণ (রূপ/কৌশল) পাশ্চাত্যকরণের (বিষয়বস্তু/ উদ্দীপনা) মধ্যে কার্যকরভাবে পৃথকীকরণ সম্ভব এবং পশ্চিমীকরণ ছাড়াই আধুনিকায়ন করা সম্ভব। -পশ্চিমা দেশগুলোয় আধুনিকীকরণ পাশ্চাত্যকরণের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানোর ধরন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পছন্দসই পন্থা হিসেবে বিবেচিত। চীন জাপান এক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তারা আধুনিকীকরণ পাশ্চাত্যকরণ উভয়কে দীর্ঘকাল ধরে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের নিজস্ব শর্তাদিতে আধুনিকীকরণের পক্ষে। সৌদি আরব এবং অন্যান্য তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোও আধুনিকীকরণের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।

উন্নয়ন চিন্তাধারায় বিস্ময় নিয়ে যে প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসে তা হলো, অন্য অনেক অর্থনীতি প্রাকৃতিক সম্পদের যথেষ্ট অভাব থাকা সত্ত্বেও সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হলেও মধ্যপ্রাচ্যের  মুসলিম দেশগুলোর অর্থনীতি -জাতীয় সম্পদের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও কেন অত্যন্ত নাজুক? উন্নয়নের এশীয় মডেলটি প্রশ্নের একটি সহজ বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারে। মুসলিম দেশ মালয়েশিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্বেষণে তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ব্যবস্থার বিসর্জন দেয়নি; বরং উন্নয়নমূলক কৌশলকে অগ্রসর করার জন্য তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক, নৈতিকতা ধর্মীয় মূল্যবোধকে সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে। দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা উন্নয়ন মডেল এমনভাবে তৈরি করেছেন, যেখানে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটে। জাপানিদের অভিজ্ঞতাও মুসলিম সমাজের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। জাপান তার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়েছে এবং নিজস্ব মূল্যবোধ ব্যবস্থা সুসংহত রেখেই আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করেছে।

ইসলামী প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তার বিকাশ

ওপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট করে বলা যায় যে পশ্চিমা দেশে উন্নয়নের তত্ত্ব প্রয়োগ নিয়ে যে গবেষণাগুলো করা হচ্ছে, তা -পশ্চিমা পরিবেশে সহজেই স্থানান্তরযোগ্য নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি হিতে বিপরীত হতে পারে। বিশেষ করে যে দেশগুলো পশ্চিমা দেশ থেকে মূল্যবোধ ব্যবস্থা অন্যান্য সামাজিক, অর্থনৈতিক আইনি ব্যবস্থার দিক থেকে  ভিন্ন, সেখানে পশ্চিমা উন্নয়নের তত্ত্ব প্রয়োগ করা আরো কঠিন। যেমন, স্বতন্ত্রবাদের চেতনায় গড়ে ওঠা আধুনিকীকরণ তত্ত্বের প্রয়োগ পশ্চিমা দেশে উদ্যোক্তা অভিযোজন শক্তিশালী করলেও তা এশীয় মূল্যবোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য নয়, যেখানে স্বতন্ত্রবাদের বিপরীতে পারিবারিক সম্পর্কের ওপর জোর দেয়া হয়। তদুপরি মুসলমানরা স্বতন্ত্রবাদ মুক্ত বাজারের নীতিগুলোর ওপর অত্যধিক জোর দেয়াকে তাদের পরিবার সম্প্রদায়গত মূল্যবোধ এবং তাদের আর্থসামাজিক কাঠামোর একেবারে মৌলিক বিষয়গুলোর জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। অতএব, এশীয় বা ইসলামী প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তা অভিযোজনের একটি মানদণ্ড হিসেবে স্বতন্ত্রবাদকে ব্যবহার করা অনুচিত বলে মনে হয়। অন্যান্য শিল্পোদ্যোগের মাত্রার ব্যাপারে একই যুক্তি প্রযোজ্য হতে পারে: যৌক্তিকতা, ঝুঁকি গ্রহণ, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার দূরত্ব এবং পুরুষতত্ত্ব। 

সুতরাং অপাশ্চাত্য দেশগুলোয় উদ্যোক্তার বিকাশের মডেলগুলো নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে অন্বেষণ করা দরকার। এভাবে আমরা পশ্চিমা মডেলের বিকল্প হিসেবে সাংস্কৃতিকভিত্তিক উদ্যোক্তা মডেল নির্মাণে এশিয়ান মডেল, আফ্রিকান মডেল, লাতিন আমেরিকান মডেল বা ইসলামিক মডেল পেতে পারি।

গবেষণায় উঠে এসেছে যে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো উদ্যোক্তা তৈরিতে সফল হয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয়করণ দ্রুত আধুনিকীকরণ করে। মুসলিম দেশগুলো -জাতীয় সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাপকভাবে শিখতে পারে কীভাবে তারা তাদের নিজস্ব ইতিহাস সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সংহত করার মাধ্যমে উন্নয়নের কৌশলগুলো নিরূপণ করবে।

 

এম কবির হাসান: অধ্যাপক, ফাইন্যান্স বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিয়েন্স, যুক্তরাষ্ট্র, পর্ষদ সদস্য, এএওফি

আরও