অভিমত

রাজনৈতিক প্রভাব ও বস কালচারমুক্ত স্থানীয় প্রশাসন

বাংলাদেশের প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের অভিযোগের মধ্যে দুর্নীতি, ঘুস, জবাবদিহিতার অভাব, স্বজনপ্রীতির চর্চা এবং অদক্ষতা অন্যতম। এসব অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও দক্ষতাকে

বাংলাদেশের প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের অভিযোগের মধ্যে দুর্নীতি, ঘুস, জবাবদিহিতার অভাব, স্বজনপ্রীতির চর্চা এবং অদক্ষতা অন্যতম। এসব অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং দেশের প্রশাসনের সুনাম এবং জনসেবার মানকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। তবে এ সমস্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় যে উপাদান দুটি প্রশাসনকে দুর্বল ও রোগগ্রস্ত করে তুলছে তা হলো অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ "বস কালচার।

রাজনীতি প্রশাসনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে, যা দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে দলীয় রঙে রাঙিয়ে ফেলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবের কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থের জন্য নেয়া হয়, যা দেশ ও জনগণের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ফলে প্রশাসন আর জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে পারে না, বরং তারা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনকে প্রাধান্য দিতে থাকে।

বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের ১৬ বছর প্রশাসনকে সম্পূর্ণরূপে দলীয়করণ হয়েছিল, যার ফলে প্রশাসনের স্বাধীনতা ও কার্যক্ষমতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ সময় প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো দেশের উন্নতির পরিবর্তে দলীয় স্বার্থ রক্ষার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। দেশের প্রতি ভালোবাসা বা দেশপ্রেমের পরিবর্তে দলপ্রেমকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ফলে অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাদের কর্তব্যের প্রতি যতটা না দায়বদ্ধ ছিলেন, তার চেয়ে বেশি তারা দলীয় আদর্শ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করেছিলেন বা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

অন্যদিকে “বস কালচার" প্রশাসনে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা এবং সিনিয়রদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যকে উৎসাহিত করে। এ সংস্কৃতি প্রশাসনের কার্যক্রমকে আরো জটিল এবং অদক্ষ করে তোলে। এক্ষেত্রে তোষামোদ ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রশাসনের উন্নতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলে সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও কার্যকরী পরিবর্তন বাধাগ্রস্ত হয়।

আমাদের দেশের প্রশাসন এক ধরনের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সিনিয়র বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মন রক্ষা করাকে প্রশাসনিক যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। এ প্রথা প্রশাসনের কার্যক্রমকে অনেকাংশে দুর্বল করেছে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একজন এডিসি (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক) একবার আমার সন্ধাকালীন (ইএমপিএ) ক্লাসে বলেছিলেন, ‘দেশের সবাই প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলে, কিন্তু আমাদের প্রশাসনিক কালচারে যে পচন ধরেছে, তা সারানোর জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।’ তার এ মন্তব্য আমাদের প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তবতা এবং এর সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতাকে খুব ভালোভাবে তুলে ধরে।

প্রশাসনকে জনসম্পৃক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার এবং সংস্কার কমিশন কাজ করছে। কিন্তু যদি প্রশাসনিক কালচারকে বিশেষ করে ‘বস কালচার’কে উপেক্ষা করে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয়, তবে সেগুলোর সফলতা অত্যন্ত কঠিন। স্থানীয় প্রশাসন সর্বদা জনগণের সেবা দিতে পারছে এমনটি নয়; বরং তাদের অধিকাংশ সময় কাটে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রটোকলে বা তাদের মন রক্ষার্থে বিভিন্ন কাজে সময় ব্যয় করে।

এডিসি ছাত্রটি বলেছিলেন, ‘আমাদের দিনে তিনবার এয়ারপোর্টে যেতে হয়—সকাল, বিকাল ও রাতে—ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বা উপদেষ্টাদের প্রটোকল দেয়ার জন্য। আমাদের ছুটির দিন বলতে কিছু নেই। শুক্র ও শনিবার আমাদের আরো বেশি কাজ থাকে।’ এটি শুধু তার একক অভিজ্ঞতা নয়, প্রায় সব স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরই এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তাদের মূল কাজ জনগণের সেবা প্রদান, সরকারের নীতি বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় জনগণের সমস্যার সমাধান করা, তাতে সময় দেয়া হয় না। এর পরিবর্তে তাদের অধিকাংশ সময় দিতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তুষ্টি বা তাদের আর্জি পূরণ করার জন্য।

এ প্রক্রিয়া প্রশাসনের কার্যক্ষমতা ও দক্ষতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যদি তাদের সময়ের মূল অংশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মন রক্ষায় ব্যয় করতে হয়, তবে দেশের সাধারণ মানুষ তাদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে একদিকে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

প্রথমত, অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে কর্মকর্তারা সর্বদা মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। দ্বিতীয়ত, তাদের ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের জন্য সময় বের করার সুযোগ কম থাকে, যার ফলে তাদের পারিবারিক জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তৃতীয়ত, নতুন কিছু শেখা, উদ্ভাবন করা বা নতুন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার জন্য তাদের কাছে পর্যাপ্ত সময় থাকে না, যা তাদের পেশাগত উন্নয়ন ও ক্যারিয়ারকে বাধাগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে যে পরিমাণ ক্ষমতা রয়েছে, তা তাদের বস কালচারের প্রতি উৎসাহিত করছে। এ পরিস্থিতির পেছনে তিনটি প্রধান উপাদান দায়ী। প্রথমত, প্রমোশন—কোনো কর্মকর্তার পদোন্নতি অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত, বদলি—এটি প্রায়ই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বা তাদের অনুকূলে ব্যবহার করা হয়। যদি কোনো কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতনদের মন জয় করতে ব্যর্থ হন, তবে তাকে একেবারে প্রত্যন্ত বা দুর্গম এলাকায় বদলি করা হয়। তৃতীয়ত, বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন—এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে কর্মকর্তার কার্যক্ষমতা এবং অবদান মূল্যায়ন করা হয়, যা অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। যদি কোনো কর্মকর্তা তার ঊর্ধ্বতনদের সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হন, তবে তার প্রতিবেদন নেতিবাচক হতে পারে, ফলে তার কর্মজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ তিন বিষয়ের ওপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীলতা স্থানীয় প্রশাসনের কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। তারা সবসময় আতঙ্কিত থাকেন যে তাদের ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের মতামত বদলানো হলে তাদের কর্মজীবন বিপদে পড়তে পারে।

আমাদের দেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে যে ধরনের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় না। প্রশাসনে প্রধানত যে মূল্যবোধগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে অনুগত্য, সম্মান প্রদর্শন, তোষামুদি ও বিশ্বস্ততা। এসব বৈশিষ্ট্যকে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য মনে করা হয়। তবে এসবের বিপরীতে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগগুলো প্রশাসনের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে আমাদের প্রশাসনে ‘বস কালচার’ বা নেতাকেন্দ্রিক মানসিকতা এক ধরনের প্রতিষ্ঠিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এবং কার্যকরী সংস্কারের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।

অতএব প্রশাসনিক সংস্কার শুধু নিয়মকানুন বা নীতিমালা পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সংস্কারের প্রক্রিয়াটি অবশ্যই বহুমুখী হতে হবে, যেখানে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের কার্যক্রম এবং তার বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নেয়া হবে। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রশাসন অনেক ধরনের দায়িত্ব পালন করে, তাই এটি যেন অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকে, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যেন কেবল আদেশের অনুসারী নন, বরং জনগণের সেবক হিসেবে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পায়, সেদিকেও বিশেষ মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

ড. সৈয়দা লাসনা কবির: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও