সাধারণত বর্ষার শুরুতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। এদিকে বর্ষা মৌসুম চলছে। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে আমাদের কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল এবং এখন তা কোন পর্যায়ে দেখছেন?
বর্ষার সঙ্গে ডেঙ্গুর একটি সম্পর্ক আছে এবং ডেঙ্গুর ইতিহাস বলে যখনই বর্ষা শুরু হয় তখন ক্রমেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। এভাবে আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবরের দিকে বেশ প্রকট রূপ নেয়। দীর্ঘ সময় ধরে একই ঘটনা ঘটছে। তার পরও আমরা ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।
যেকোনো স্থানে জমা পানি থেকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কোনো কোনো সময় পানি স্বল্পতা থাকায় নিজেরাও পানি জমিয়ে রাখি বাড়িতে। আবার বিগত কয়েক বছরে নগরায়ণের পরিবর্তনের ফলে একটা ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। যেটা আমরা আমাদের রেগুলার গবেষণার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছি। সেটি হলো ঢাকা শহরে অনেক বহুতল ভবন হয়েছে। বহুতল ভবনগুলোর বেজমেন্ট, বেজমেন্ট ওয়ান টু থ্রি, কোনো কোনো জায়গায় বেজমেন্ট ফোরও আছে। একদম শেষ যে বেজমেন্ট বা মাঝখানের যে বেজমেন্ট এর মধ্যে দেখা যায় ছোট-বড় বিভিন্ন জায়গায় বা এর কোনায় পানি জমে থাকে। এ জায়গাগুলোয় আমরা এডিসের লার্ভা পাচ্ছি। ঢাকা শহরে বহু জায়গায় বর্তমানে গাড়ির পার্কিংয়ে গাড়ি ধোয়া হয়। গাড়ি ধোয়ার পানি নিষ্কাশনের জন্য আবার ড্রেনেজ সিস্টেমও রাখা হয়েছে। কিন্তু ড্রেনেজের মুখের মধ্যে প্রচুর ময়লা জমে জ্যাম হয়ে থাকে। সেখানেও লার্ভা পাওয়া যায়। অন্যদিকে ঢাকা শহরে কিছু কিছু স্থানে মানুষের পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকার কারণে মানুষ ড্রামে বা বালতিতে পানি জমিয়ে রাখছে। এ জায়গাতেও এডিস মশা জন্মাতে পারে। এভাবে বাসাবাড়িতে পানি জমে থাকে যার সঙ্গে বৃষ্টির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে পানি বৃষ্টির কারণে জমে। দেশে প্রচুর ক্যান ফুড, প্যাকেট ফুডের ব্যবহার বেড়েছে। ওয়ান টাইম কাপ বেড়েছে। পানির বোতল বেড়েছে। এগুলো যখন বাইরে পড়ে থাকে এবং সেগুলোয় বৃষ্টির পানি জমা হয় সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়ে এবং মশার প্রজনন হয়। এভাবে বর্ষাকালে ধীরে ধীরে এডিস মশার বংশবিস্তার হয়। আর এ সময় উপযোগী তাপমাত্রা, উপযোগী আর্দ্রতা থাকার কারণে ডেঙ্গুটা আরো বেশি বাড়তে থাকে। যে কারণে বর্ষায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়।
দীর্ঘ আড়াই দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ডেঙ্গুর ধরন বদলে যাচ্ছে। এ সময় আমরা বর্ষার আগে ডেঙ্গুটা কম দেখেছি। কিন্তু পাঁচ-সাত বছর ধরে দেখেছি যে বর্ষা ছাড়াও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী থাকছে। কেন?
এটা ঠিক যে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বর্তমানে সারা বছরই কমবেশি থাকছে। বর্ষাকালে বেশি হয়। আর শীত বা বর্ষা যখন থাকে না তখন একটু কম হয়। কারণ এটা আসলে এডিস মশার ঘনত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন এডিস মশার ঘনত্ব বেশি থাকে তখন ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হয়। এডিস মশার ঘনত্ব যখন কম থাকে তখন এটি কম হয়। তবে ডেঙ্গু সারা বছরই থাকে। এজন্য আমরা সবসময় বলি যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বছরব্যাপী এভিডেন্স বেজড (প্রমাণভিত্তিক) এডিস মশার বিস্তার রোধের দিকে যাওয়া। যেমন শীতকালে এডিসের বিস্তারটা কোথায় বাড়ছে বা বর্ষাকালে কোথায় বাড়ছে। এ দুই বিষয় যদি আমরা শনাক্ত করতে পারি তাহলে কম পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয়ে সহজে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য সিটি করপোরেশনের যেমন কার্যক্রম আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার-আপনারও কিন্তু একটি দায়িত্ব আছে। আপনার-আমার বাড়িতে যেন এডিস মশার প্রজনন না হয়। কোথাও তিনদিনের বেশি পানি জমে না থাকে।
সিটি করপোরেশনগুলো প্রতি বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শতকোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দিয়ে থাকে এবং তাদের কার্যক্রম মূলত কীটনাশক নির্ভর হয়ে থাকে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন শুধু কীটনাশক নির্ভর হওয়াটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়। সব মিলিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা কোন পথে হাঁটছি এবং তা কি সঠিক?
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে শুধু মশা নিয়ন্ত্রণ হিসেবে বিবেচনা করলে এটি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। কারণ আমরা মশা বলতে বুঝি কিউনেক্স মশা। যেই মশা ড্রেন-ডোবা-নর্দমায় জন্মে। এডিস মশা ভিন্ন প্রজাতির। আমাদের বাসাবাড়ির ভেতরে-বাইরে বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে এটি জন্ম নেয়। কিন্তু আমরা মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য কীটনাশক প্রয়োগ করছি রাস্তায়। রাস্তার দুই ধারে ড্রেনে, বিভিন্ন জলাশয়ে। অথচ এসব জায়গায় এডিস মশার প্রজনন হয় না। এডিস মশার প্রজনন হয় শুরুতে যেই স্থানগুলোর কথা বলেছি সেগুলোয়। অর্থাৎ আমাদের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সে জায়গাগুলোয় পৌঁছাচ্ছে না। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে চারটি পদ্ধতি একসঙ্গে বাস্তবায়ন হতে হবে। প্রথমটি হচ্ছে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা। এক্ষেত্রে লার্ভা জন্মানোর উপযোগী পরিবেশ রাখা যাবে না। যেমন ভবনের বেজমেন্টে পানি জমার কোনো সুযোগ রাখা যাবে না। ঘরে-বাইরে কোথাও ছোট-বড় পাত্রে পানি জমার কোনো সুযোগ দেয়া যাবে না। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল বা জৈব নিয়ন্ত্রণ। অন্য জীবকে দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা। একটা সময় আমাদের দেশে ফড়িং ছিল। ফড়িং মশা খায়। একটা সময় আমাদের পানিতে ছোট ছোট গাপ্পি মাছ ছিল। মাছগুলো মশা খায়। ব্যাঙ ছিল। ব্যাঙ মশা খায়। এ বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনা ও সংরক্ষণ করা গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের তৃতীয় কৌশল হলো কীটনাশক প্রয়োগ। যদি আমরা প্রথম দুটিতে সমাধান করতে না পারি তাহলে কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। যেমন লিফটের গর্ত করেছেন। সেই পানিটা ফেলে দেয়া যাচ্ছে না অথবা আপনি বিল্ডিং করছেন—কোনো অবকাঠামো বা নির্মাণাধীন ভবন কিউরিংয়ের জন্য পানি দিতেই হবে। সেখানে প্রয়োজন হলে কীটনাশক প্রয়োগ করবেন। সর্বোপরি প্রয়োজন হলো জনগণকে সম্পৃক্ত করা। নিজের বাড়ির আঙিনায় আমাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন এডিস প্রজনন না হয়।
পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, জৈব নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশক এবং জনসম্পৃক্ততা—এ চার পিলারকে যদি আমরা এক করতে পারি এবং বছরব্যাপী এটা চলমান রাখতে পারি, তাহলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ হবে। অন্যথায় গতানুগতিক পদ্ধতিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
একসময় ডেঙ্গু শুধু ঢাকার সমস্যা ছিল। বর্তমানে এটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এটি বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
নগরায়ণ এখন আর শুধু চার দেয়ালের চেনা শহরের সীমানায় বন্দি নেই; তা সমান্তরালে ছড়িয়ে পড়েছে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও। তবে এ রূপান্তরকে পূর্ণাঙ্গ নগরায়ণ বলা চলে না; এটি মূলত একধরনের ‘অর্ধ-নগরায়ণ’ বা চরম অপরিকল্পিত নগরায়ণ। গ্রামীণ জনপদে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আসায় এখন প্রায় সবার মধ্যে একটি আধুনিক বহুতল ভবন বা পাকা দালান তোলার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। মানুষ নিজ উদ্যোগে দালান ঠিকই তুলছে, কিন্তু সেই ভবনে আধুনিক ও টেকসই পানি সরবরাহ (ওয়াটার সিস্টেম) কিংবা বর্জ্য নিষ্কাশনের (ড্রেনেজ সিস্টেম) কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামো রাখছে না। ফলে বাইরে থেকে দৃষ্টিনন্দন একেকটি দালান গড়ে উঠলেও ভেতরে আধুনিক নাগরিক সুবিধার অনুপস্থিতি এক নতুন সংকট তৈরি করছে। ভেতরের শৌচাগারগুলোয় সার্বক্ষণিক পানির লাইনের ব্যবস্থা না থাকায় বাসিন্দাদের বাধ্য হয়ে বড় বড় ড্রাম বা পাত্রে পানি জমিয়ে রাখতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গৃহস্থালির কাজের জন্য কিংবা শৌচাগার ব্যবহারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির পানিও জমিয়ে রাখা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে মশা ও কীটতত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে—এমনকি সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরেও আমি একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি দেখেছি। একেকটি অঞ্চলের ভৌগোলিক চিত্র ভিন্ন হলেও এ কাঠামোগত গলদ সর্বত্র এক।
যেখানে নগরায়ণের ছোঁয়া লাগবে, সেখানে সুপরিকল্পিত জল সরবরাহ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকাটা ছিল প্রথম শর্ত। কিন্তু তা না করে কেবল দৃশ্যমান অবয়ব পরিবর্তন করায় অর্ধ-নগরায়ণ জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম আত্মঘাতী হয়ে উঠছে।
আমরা এটাও দেখছি যে ঢাকার বাইরে অনেক খালে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বদ্ধ জলাশয় রয়েছে। এগুলো থেকেও কি ডেঙ্গু বিস্তারের ঝুঁকি রয়েছে?
আমাদের সমাজ ও নীতিনির্ধারণী মহলে একটি প্রচলিত আছে যে নর্দমা বা ড্রেনের নোংরা আবর্জনা ডেঙ্গুর প্রধান উৎস। কিন্তু মশার প্রজনন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবতার সঙ্গে এ ধারণার বড় ধরনের অমিল রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি দৃশ্য নজরে এসেছে—যেখানে দেখা যাচ্ছে, স্বয়ং সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাই সড়কের ওপরের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে তা উল্টো ড্রেনের ভেতরে ঠেলে দিচ্ছেন! একজন সাধারণ নাগরিকের অজ্ঞতাবশত ড্রেনে ময়লা ফেলা যেমন অপরাধ, একজন প্রাতিষ্ঠানিক কর্মীর এ আচরণ তার চেয়েও বড় দায়িত্বহীনতা। ড্রেনের পানির সাধারণ স্রোতে ভারী শক্ত বর্জ্য কখনো ভেসে যায় না, বরং তা জমে গিয়ে ড্রেনের স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ বা ওয়াটার লগিং তৈরি করে। এভাবে ড্রেন আটকে গিয়ে যে বদ্ধ নোংরা জলের আধার তৈরি হয়, তা মশার প্রজননের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশে পরিণত হয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে মূলত জন্ম নেয় ‘কিউলেক্স’ মশা। ড্রেনের পচা ও নোংরা পানি ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র নয়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে যদি আমরা সত্যিই সফল করতে চাই, তবে ঢালাওভাবে ড্রেন-নর্দমা পরিষ্কারের পেছনে সমস্ত শক্তি ব্যয় না করে এডিস মশার সুনির্দিষ্ট প্রজনন স্থানগুলোকে টার্গেট করতে হবে। এডিস মশা অত্যন্ত সংবেদনশীল; এটি ড্রেনের নোংরা পানিতে ডিম পাড়ে না, বরং মানুষের তৈরি বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা একদম পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানিতে বংশবৃদ্ধি করে। পাকা ভবনের ছাদবাগান, লিফটের নিচে জমে থাকা পানি, এয়ার কন্ডিশনার কিংবা রেফ্রিজারেটরের ট্রে, ভাঙা প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা বা টায়ার—যেখানে বৃষ্টির পরিষ্কার পানি তিনদিনের বেশি জমে থাকে, সেটাই হলো এডিসের আসল আস্তানা। অতএব, ড্রেন সচল রাখা নগরের জলাবদ্ধতা দূর করা এবং কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি হলেও ডেঙ্গু দমন করতে হবে ভিন্ন আঙ্গিকে।
ঢাকার বা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিটিআই কতটা উপযোগী?
বিটিআই একটা ভালো কীটনাশক। এতে কোনো সন্দেহ নেই। পৃথিবীর অনেক দেশে বিটিআই ব্যবহৃত হয়। উন্নত দেশগুলোয় এখন আর অর্গানোফসফেট বা কার্বামেট অথবা অর্গানোক্লোরিন পারিথ্রড এই ইনসেক্টিসাইডগুলো ব্যবহার হয় না। কারণ এগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে। বিটিআইয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি কম; পরিবেশের অন্য পোকামাকড়ের ক্ষতি করে না। সেজন্য পৃথিবী এখন সেফ পেস্টিসাইড যেটাকে বলে সেদিকে হাঁটছে। টার্গেট স্পেসিফিক পেস্টিসাইড বা বায়ো পেস্টিসাইড ব্যবহার করছে। বিটিআই কিন্তু ব্যবহার করা কোনো অপরাধ নয়। অপরাধ হচ্ছে কোন প্রক্রিয়ায় এবং আসল বিটিআই কিনছেন নাকি নকল বিটিআই কিনছেন সেটা। প্রক্রিয়াটায় যদি গলদ থাকে তাহলে সমস্যা।
আপনি সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে আয়োজিত ডেঙ্গু সামিটে গিয়েছিলেন। সেখানে ডেঙ্গু মোকাবেলার বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। গোটা বিশ্বে ডেঙ্গু মোকাবেলার ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে?
সিঙ্গাপুরে আয়োজিত ডেঙ্গু সম্মেলনে এবার ৬৩টি দেশের নীতিনির্ধারক, গবেষক ও বিজ্ঞানীরা অংশ নিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ ওই সম্মেলনে অংশ নেননি। অথচ ডেঙ্গু আমাদের জন্য এক ভয়াবহ সংকট। গোটা পৃথিবীর অর্ধেক এখনো ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে। কারণ এ মশা ট্রপিক্যাল ও সাব ট্রপিক্যাল উষ্ণ আর্দ্র অঞ্চলে বিস্তার লাভ করছে। সম্প্রতি আমাদের গবেষণাগারে ক’জন ইউরোপীয় গবেষক এসেছিলেন। তারা জানালেন, এডিস আলবোপেক্টাস ইউরোপ দখল করছে। ইউরোপের মতো ঠাণ্ডা জায়গাতেও এর বিস্তার ঘটছে। এজন্য তারা উদ্বিগ্ন ও আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য গবেষণায় জোর দিচ্ছে। এ ধরনের মানসিকতা ইতিবাচক। সারা পৃথিবীর গবেষকরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ‘এক বিশ্ব, এক স্বাস্থ্য’ পদক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে। এ ধরনের মানসিকতা শুধু গবেষকদের মধ্যে থাকলেই হবে না। নীতিনির্ধারকদেরও এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। কারণ নীতিনির্ধারকরা যদি কোনো সমঝোতা আদায় করতে পারেন তাহলে কাজ করার পরিসর বাড়ে।
ডেঙ্গু মোকাবেলায় বিশ্বজুড়েই জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনেকটা সামাজিক আন্দোলনের মতো এটিকে পরিচালনা করতে হয়। এই মডেলের পাশাপাশি বিটিআই ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো কোনো দেশ এডিসের প্রজনন নিয়ন্ত্রণে ওলবাকিয়া মশা ব্যবহার করছে। আমাদের এখানে এ নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু তার বাস্তবিক প্রয়োগে ঘাটতি আছে।
আগামী পাঁচ-দশ বছরে পর্যাপ্ত উদ্যোগ না নিলে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কেমন হতে পারে?
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দেশব্যাপী ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়বে। একসময় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে ও জনজীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এজন্য এখন থেকেই এটি নিয়ে ভাবতে হবে। শুধু সরকার নয়, সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে অবহেলা ঠিক হবে না। সামান্য অবহেলাও বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে সরকারি উদ্যোগ ও জনসাধারণের সচেতনতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়টা গড়তে হবে। এটা এখন বেশি জরুরি।