তথ্যপ্রযুক্তি

ডিজিটাল ভারত থেকে শিক্ষা

পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল সংযোগ ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারত সাধারণের তুলনায় দ্রুত বিস্তৃতি লক্ষ করছে। অর্থনৈতিক বিকাশ ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে, বিশেষত খুচরা পর্যায়ে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অর্থায়ন এমনকি উদ্যোক্তা উন্নয়নে এটি একটি ইতিবাচক প্রভাব রাখছে।

পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল সংযোগ সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারত সাধারণের তুলনায় দ্রুত বিস্তৃতি লক্ষ করছে। অর্থনৈতিক বিকাশ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে, বিশেষত খুচরা পর্যায়ে দক্ষতা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অর্থায়ন এমনকি উদ্যোক্তা উন্নয়নে এটি একটি ইতিবাচক প্রভাব রাখছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে ভারতের সংযোগের সূচনা আশির দশকে। প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর সরকারের সময়ে (১৯৮৪-৮৯) কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষায় প্রধান বিনিয়োগগুলো হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকে ইন্টারনেট সুবিধা শুরু হওয়ার পর থেকে আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলোর আইটি বিভাগ, ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ গ্রাহকসেবার জন্য ভারত আদর্শ স্থান হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকার কারণে বিস্তৃত মোবাইল ইন্টারনেট সেবা দেয়া সম্ভব হয়নি। সেবার সুবিধা লাভ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে খরুচে সেবায় পরিণত হয়।

অতঃপর ২০১০ সালে যখন দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই টুজি কিংবা থ্রিজি সেবা প্রদান করছিল, সে সময় আইবিএসএল নামে একটি ছোট টেলিকম কোম্পানি নিলাম থেকে স্পেকট্রাম কিনে নেয়; যার মধ্যে ফোরজির তুলনায় বেশি ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড ছিল। আইএসবিএল পরবর্তী সময়ে আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ কিনে নেয় এবং ফোরজি সেবা প্রদানের অনুমতি লাভ করে।

ব্রডব্যান্ড সুবিধা জাতীয়ভাবে মোবাইল ইন্টারনেট সিস্টেমের উন্নতিকল্পে পরবর্তী পাঁচ বছরে নতুন সম্পূরক প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স জিওর পক্ষ থেকে ফাইবার অপটিকস অবকাঠামো নির্মাণে প্রচুর বিনিয়োগ করা হয়। সময়ে ইন্টারনেট ডাটার সঙ্গে সঙ্গে ভয়েসকলের ক্ষেত্রে একই স্পেকট্রাম ব্যবহারে জিওকে অনুমতি দেয়া হয়। ফলে সাশ্রয়ী স্মার্টফোনে স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া সম্ভব হয়। ২০১৬ সালে রিলায়েন্স জিওতে ফোন ভয়েস এবং ডাটা সার্ভিস চালু করা হয়।

ফলে জিওর গ্রাহক স্মার্টফোন গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ২০২০ সালে এর পরিমাণ ৪০০ মিলিয়নে উন্নীত হয়। ডাটা ব্যবহারের খরচের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ থেকে ভারত সর্বনিম্ন খরচে চলে আসে। জিও আসার আগে প্রতি গিগাবাইটে খরচ দশমিক ডলার থেকে জিও আসার পরে খরচ ৩০ সেন্টের নিচে নেমে আসে।

কম খরচ দ্রুতগতির কারণে -কমার্স, সোস্যাল মিডিয়া, ভিডিও স্ট্রিমিং ডিজিটাল কনটেন্টের অন্যান্য সেক্টর, অর্থাৎ ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। অ্যামাজন, নেটফ্লিক্স ফেসবুকের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে তাদের উপস্থিতি বিস্তৃত করে।

ইন্টারনেট ডাটার জন্য প্রাথমিকভাবে জিও যে মূল্য নির্ধারণ করে তা দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য উপযুক্ত। তবে কোম্পানিটি তাদের নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর জন্য বেশি সুবিধা লাভ করেছে। তার চেয়ে বড় কথা, প্রতিষ্ঠানটি তাদের মুনাফা কাজে লাগিয়ে নেটওয়ার্কে আরো বিস্তৃত লাভজনক সেবা যুক্ত করেছে। ফলে স্বল্পমূল্যে মোবাইল ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া সহজ হয়েছে।

২০১৯ সালে জিও প্লাটফর্ম তৈরি করা হয়। জিও স্মার্টফোন, ডাটা প্ল্যানের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ব্যবসার নানা সেবা এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০২০ সালের প্রথমার্ধে প্রধান প্রধান বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানফেসবুক (বর্তমানে মেটা), গুগল (অ্যালফাবেট), ইনটেল, কোয়ালকম এবং অন্য আরো নানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানথেকে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার আয় করে।

সূচনা থেকেই ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে জিও প্লাটফর্ম অনেক নতুন সেবা এনেছে এবং একই ধরনের সেবা দেয়ার মতো প্রতিষ্ঠান তৈরিতে প্রধান অবদান রেখেছে। ভারতের মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্টার্টআপ শুরু করার ক্ষেত্রে ধরনের কৌশল বিস্তৃত সুযোগ তৈরি করে।

সামাজিক ব্যবসা, শিক্ষা, আর্থিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ২০২১ পর্যন্ত ৩৮টি ভারতীয় স্টার্টআপ ইউনিকর্ন স্ট্যাটাস (অর্থাৎ বেসরকারিভাবে তাদের বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে) পেয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে কিছু ডিজিটাল ফার্মের ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিংয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি হতাশাজনক ঘটনা লক্ষ করা গেছে। সার্বিকভাবে চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ শুরুর পর বৈশ্বিক মূলধন প্রবাহ চীন থেকে সরে যাওয়ার কারণে ভারতে অর্থায়ন বেড়েছে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতের বিকাশের সঙ্গে মেক্সিকোর ঘটনা তুলনা করা শিক্ষণীয় হবে। সেখানে মাথাপিছু আয় (পাওয়ার প্যারিটির কারণে) ভারতের তিন গুণ। ৭২ শতাংশ মানুষের কাছে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে মেক্সিকোর সময় লেগেছিল ১৬ বছর। সেখানে জিও আসার পাঁচ বছরের মধ্যে ভারত ১৬ দশমিক শতাংশ কভারেজ বাড়িয়ে ৪১ শতাংশে নিয়ে আসে।

আগামী দিনগুলোয় ডিজিটাল ভারতের গল্পে আরো অনেক অধ্যায় যুক্ত হবে। কিন্তু উন্নয়ন মডেল বোঝা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে দেশটি এরই মধ্যে বেশকিছু শিক্ষণীয় উদাহরণ তৈরি করেছে। কিছুদিনের মধ্যেই সনাতন কর্মসংস্থানের (বিশেষত উৎপাদন) জায়গাগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।

ইন্টারনেটভিত্তিক ডিজিটাল প্রযুক্তিগুলো অর্থনৈতিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, মোবাইল ইন্টারনেটের দ্রুত বিস্তৃতির মাধ্যমে কর্মসংস্থান, মূলধন সৃষ্টি বিকাশ বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ থেকে বেশি। ধরনের অতিরিক্ত মুনাফাকে ডিজিটাল সেবার সুযোগের সঙ্গে মিলিয়ে অধিকার করা যায়। এক্ষেত্রে মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তৃতি উন্নতি (গতির ক্ষেত্রে) নিশ্চিত করতে হবে।

হ্যাঁ, শুরুর দিকের বিনিয়োগ যথেষ্ট এবং বহুদিন পর্যন্ত মুনাফার পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। রিলায়েন্স একটি বৃহৎ লাভজনক এনার্জি কোম্পানি, যা তার সম্পদ ব্যবহার করে মোবাইল ইন্টারনেটে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেছে। ফলে জিও প্লাটফর্মের দ্রুত বিস্তৃতিও সম্ভব হয়েছে। সরকারি বিনিয়োগ (পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট) প্রয়োজন না হওয়া রকম প্রজেক্ট সব ক্ষেত্রে কার্যকর হবে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

সে যা- হোক, মোবাইল ইন্টারনেটের দ্রুত বিস্তৃতির ক্ষেত্রে জনসমর্থন বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। সঠিক প্রণোদনা পেলে এখান থেকে আরো অভ্যন্তরীণ বিকাশ অর্জন সম্ভব। তা সম্ভব হলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক, সামাজিক উন্নয়ন ক্ষেত্রে লাভবান হওয়া যাবে।

ভারতের (এবং অন্যান্য দেশের) অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় তুলনামূলক দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেটই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টির মূল সম্পদ। এখান থেকে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা কার্যক্রম বিস্তৃত ভোক্তাসেবার আগমন এবং বৃদ্ধি সম্ভব। কোটি কোটি ভারতীয় এরই মধ্যে এই দ্রুত উন্নতির সুবিধা ভোগ করছে।

অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের নীতিনির্ধারকদের বিষয়গুলো লক্ষ করা উচিত। এক হিসাবে মোবাইল ইন্টারনেট মূলত ইতিবাচক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সনাতন অবকাঠামোগত বিনিয়োগের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। এর মাধ্যমেও বৃহত্তর ক্ষেত্রে বিপুল মুনাফা লাভ করা সম্ভব। চীন সাম্প্রতিক ভারতীয় অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় ডিজিটাল ধারার উন্নয়ন সহায়ক খাতগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। এগুলো খুব দ্রুত এবং এমনকি নিম্ন আয়ের মানুষের কাছেও পৌঁছে দেয়া সম্ভব, যা আগে চিন্তাও করা যায়নি।

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

মাইকেল স্পেন্স: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক হুভার ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো  

ভাষান্তর: মাহমুদুর রহমান

আরও