দেশের দুজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর ও ড. জাহিদ হোসেন বেশ কিছুদিন ধরেই ডলারের দাম নির্ধারণ বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়ার জন্য ওকালতি করে চলেছেন। তাদের মত হলো, ডলারের দাম নির্ধারণ বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে কিছুদিন ডলারের দাম বেড়ে একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে এসে একক দামে ডলার বিক্রি হবে। এরপর হুন্ডিওয়ালারা ডলারের যে বেশি দাম দিচ্ছে সে সমস্যা নাকি আর থাকবে না। আমি তাদের এ মতকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি, কারণ তারা বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ না করেই এ মতামত ব্যক্ত করেছেন। হুন্ডি প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারের চাহিদা-কাঠামো সম্পর্কে তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন না বলেই সমস্যার সহজ সমাধান খুঁজে পাওয়ার দাবি করছেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি মনে করি, পুঁজি পাচারের জন্য ডলারের চাহিদাকারীদের দমন না করে শুধু ডলারের দাম বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে ডলারের দাম বাজারে যতই বাড়বে তার চেয়ে ৫-৬-৭ টাকা বেশি দাম দিয়ে হুন্ডিওয়ালারা প্রবাসীদের কাছ থেকে বিদেশে ডলার কিনে নেবে। কারণ পুঁজি পাচারকারীদের কাছে তাদের অর্থ বিদেশে পাচার করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। অতএব বাজারে ডলারের দামের চেয়ে হুন্ডিতে দাম কত বেশি সেটি তাদের বিবেচ্য নয়। আইনি ঝামেলা ছাড়া নিরাপদে যেহেতু পাচারকারীরা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করতে পারে তাই হুন্ডিওয়ালার কাছ থেকে তারা বেশি দামে ডলার কিনতে মোটেও অনাগ্রহী হবে না। এর মানে, বাজারে ডলারের দাম বাড়তে থাকলেও হুন্ডি ব্যবস্থায় পুঁজি পাচার অব্যাহত থাকবে, বাজারে ডলারের একক দাম নির্ধারিত হবে না।
২০২৩ সালের ১৩ জুলাই ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এক্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের (বিএমইটি) বরাত দিয়ে দেশের পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশ হয়েছে যে বাংলাদেশের ১ কোটি ৫৫ লাখ অভিবাসী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন ও কর্মরত রয়েছেন। তারা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার ফরমাল চ্যানেলে দেশে পরিবারের সদস্যদের কাছে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। কিছুদিন আগে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, প্রায় অর্ধেক রেমিট্যান্স এখন হুন্ডি পদ্ধতিতে দেশে আসছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের সিংহভাগ রেমিট্যান্স প্রেরকরা হুন্ডি পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। অতএব ২১-২২ বিলিয়ন ডলার যদি ফরমাল চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স আসে তাহলে কমপক্ষে আরো ২১-২২ বিলিয়ন ডলার বা তার চেয়েও বেশি রেমিট্যান্স (টাকার আকারে) হুন্ডি পদ্ধতিতে দেশের অর্থনীতিতে ঢুকছে। দেশের বেশির ভাগ প্রবাসী হুন্ডি পদ্ধতিতে রেমিট্যান্স প্রেরণ করায় প্রমাণিত হচ্ছে যে প্রবাসীদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হুন্ডি পদ্ধতির জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান। এক্ষেত্রে শুধু দেশপ্রেমের ধুয়া তুলে তাদের এ ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে সহজে দমন করা যাবে না। ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য সরকার আগে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা প্রদান করত, সম্প্রতি এ প্রণোদনাকে ৫ শতাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ সত্ত্বেও প্রবাসীদের ফরমাল চ্যানেলগুলো ব্যবহারে যথেষ্ট উৎসাহিত করা যাবে কিনা তা দেখার বিষয়। কারণ হুন্ডিওয়ালারাও ডলার ক্রয়ের সময় ডলারের দাম আরো বাড়িয়ে দিয়ে হুন্ডির আকর্ষণ ধরে রাখার চেষ্টা করবে। গত আগস্টে আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ২১ শতাংশ কম রেমিট্যান্স এসেছে ফরমাল চ্যানেলে, সেপ্টেম্বরে মাত্র ১৩৪ দশমিক ৩৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ দুই বছর ধরে প্রতি মাসে লক্ষাধিক বাংলাদেশী অভিবাসী বিদেশে যাচ্ছেন বলে খবর দিয়েছে এ সম্পর্কীয় সরকারি সংস্থা ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি)। অবশ্য অক্টোবরে ১৯৭ দশমিক ৭৫ কোটি, নভেম্বরে ১৯৩ কোটি ও ডিসেম্বরে ১৯৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স ফরমাল চ্যানেলে দেশে এসেছে। তবুও আমার দৃঢ় অভিমত হলো, হুন্ডি ব্যবস্থার চাহিদা কাঠামোতে অবস্থানকারী পুঁজি পাচারকারীদের প্রতি অবিলম্বে সরকারের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বহুদিন ধরেই আমি বলে চলেছি, হুন্ডি ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে দমন না করলে ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাড়ানো কঠিন থেকে যাবে। কারণ হুন্ডি ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচার দেশের ‘এক নম্বর সমস্যায়’ পরিণত হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে এ সত্য মেনে নেয়া উচিত। এর মানে দেশের পরিবারের সদস্যদের কাছে রেমিট্যান্স প্রেরণেচ্ছু প্রবাসীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রাগুলো (প্রধানত ডলার) বিদেশের হুন্ডিওয়ালাদের এজেন্টের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। এর প্রধান কারণ ডলারপ্রতি তারা বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রিত বাজারের ডলারের দামের চেয়ে ৫-৭ টাকা বেশি দাম পাচ্ছেন। ফলে তাদের পরিবারের সদস্যরা হুন্ডিওয়ালাদের এ দেশীয় এজেন্টের মাধ্যমে ওই বর্ধিত দামে প্রেরিত রেমিট্যান্সের সমপরিমাণ টাকা অতিদ্রুত পেয়ে যাচ্ছেন কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়া। হুন্ডি পদ্ধতিতে কোনো কাগজপত্র স্বাক্ষর করার প্রয়োজন হয় না। হুন্ডিওয়ালাদের স্থানীয় এজেন্ট প্রায়ই রেমিট্যান্স প্রেরক এবং রেমিট্যান্স গ্রহীতাদের পূর্বপরিচিত থাকার কারণে এসব লেনদেনে ঠকে যাওয়ার আশঙ্কাও তেমন থাকে না। আরো যেটা গুরুত্বপূর্ণ তাহলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের বাইরের কেউ জানতেও পারে না যে পরিবারে রেমিট্যান্স এসেছে। টেলিফোনে খবর পেয়ে যথাস্থানে গিয়ে বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা পেয়েই রেমিট্যান্স গ্রহীতারা যথাসম্ভব দ্রুত তা নিকটবর্তী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে আমানত হিসেবে জমা করে দেন, তাই আগের দিনের মতো চোর-ডাকাত-মস্তানদের আক্রমণের শিকার হতে হয় না পরিবারকে। যেহেতু বিশ্বস্ততাই হুন্ডি ব্যবসার সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তাই সাধারণত রেমিট্যান্সের টাকা মার যায় না, লেনদেনের গোপনীয়তাও রক্ষা করা হয় সযতনে। ওপরে প্রবাসীদের জন্য হুন্ডি পদ্ধতির সাধারণ সুবিধাগুলোর যে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদত্ত হলো তার সঙ্গে ফরমাল ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ কি পাল্লা দিতে পারবে?
হুন্ডি পদ্ধতিতে প্রেরিত অর্থ রেমিট্যান্স প্রেরকের পরিবারের সদস্যরা ও আত্মীয়-স্বজনরা যেহেতু পেয়ে যাচ্ছেন তাই এ অর্থ প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগে ব্যাপক অবদান রাখছে। ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রক্ষাকারী ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দেশে এখন ১ লাখ ১১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং এসব অ্যাকাউন্টের উল্লেখযোগ্য অংশই গ্রামীণ এলাকার ব্যাংক শাখাগুলোয়। বিবেচনা করুন, সারা দেশে বিশেষত গ্রামাঞ্চলে প্রবাসীদের পরিবারের পাকা বাড়ি নির্মাণের যে হিড়িক চলেছে তার খরচের কত শতাংশ ফরমাল চ্যানেলে দেশে এসেছে? স্বীকার করতেই হবে, ফরমাল চ্যানেল বা হুন্ডি পদ্ধতি—যেভাবেই রেমিট্যান্সের অর্থ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হোক তার বহু ধরনের সুফল পাচ্ছে অর্থনীতি। হুন্ডি পদ্ধতিতে প্রেরিত রেমিট্যান্সের বৈদেশিক মুদ্রা (প্রধানত ডলার) যদিও দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের জন্য পুঁজি পাচারকারীরা অপব্যবহার করে চলেছে, তবুও এ ব্যাপারটা অর্থনীতির জন্য পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ সত্ত্বেও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো যে বড়সড় সংকটে পড়ছে না তার পেছনে ফরমাল চ্যানেলে এবং হুন্ডি পদ্ধতিতে প্রেরিত রেমিট্যান্স থেকে উদ্ভূত বিশাল আমানত প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এক অর্থে এ বিপুল রেমিট্যান্সের অর্থ বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিকল্পের ভূমিকা পালন করছে। চীন ও ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ যে ভূমিকা পালন করেছে তার অনুরূপ ভূমিকা বাংলাদেশে পালন করছে ক্রমবর্ধমান রেমিট্যান্স প্রবাহ। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের চমকপ্রদ উল্লম্ফনও ঘটাচ্ছে প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান রেমিট্যান্স। বাংলাদেশের অনেক এলাকার গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতে যে বিপুল গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তার পেছনে প্রধান অবদান রেখে চলেছে এলাকার প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংখ্যাধিক্য। আমার মতে, হুন্ডি পদ্ধতিতে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হওয়া রেমিট্যান্স ও অন্যান্য ব্যবস্থায় দেশে নিয়ে আসা বিদেশে উপার্জিত আয়-উপার্জন ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাচ্ছে প্রতি বছর। তার মানে, প্রবাসী বাংলাদেশীদের ফরমাল-ইনফরমাল চ্যানেলে মোট রেমিট্যান্স ও দেশে নিয়ে আসা বৈদেশিক মুদ্রার যোগফল ৪৫-৫০ বিলিয়ন ডলার। দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ অনেকে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ‘প্যারাডক্স’ আখ্যায়িত করে থাকেন। কারণ তারা বৈদেশিক অভিবাসনের গুরুত্বকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন না। এত দুর্নীতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকে তাদের কাছে আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হয়। ৪৫-৫০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ প্রতি বছর অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়া কি সামান্য ব্যাপার? আমার মতে, তারা দেশের অর্থনীতিতে যোগ হওয়া এ বিপুল আয় প্রবাহের ইতিবাচক অভিঘাতকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করেন না বলেই ব্যাপারটাকে ‘আন্ডার-এস্টিমেট’ করছেন।
এখন দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে বলে ধারণা করা হয়। পুঁজি পাচারের বহুল প্রচলিত পদ্ধতি আমদানির ওভারইনভয়েসিং, রফতানির আন্ডারইনভয়েসিং এবং রফতানি আয় দেশে ফেরত না আনার পাশাপাশি এখন প্রবাসী বাংলাদেশীদের বহুল ব্যবহৃত হুন্ডি পদ্ধতিতে রেমিট্যান্স প্রেরণের অভ্যাস বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারকারীদের একটি সহজ বিকল্প উপহার দিয়েছে। বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে এখন আগের তিনটি প্রধান পদ্ধতিকে ছাড়িয়ে গেছে হুন্ডি প্রক্রিয়ায় পুঁজি পাচার। যে ‘হুন্ডি ডলার’ বিদেশেই রয়ে যাচ্ছে সেগুলোর চাহিদা জোগাচ্ছে প্রধানত দেশের দুর্নীতিবাজরা ও কালো টাকার মালিকরা এবং ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার ‘কালচার’ সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ীরা। মার্জিনখোর রাজনীতিক বলুন, দুর্নীতিবাজ সিভিল আমলা-প্রকৌশলী বলুন, রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি বলুন, ডাকসাইটে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি বলুন—হুন্ডি ডলারের সহায়তায় গড়ে উঠছে প্রবাসীদের ঘরবাড়ি, ব্যবসাপাতি, কানাডার টরন্টোর বেগমপাড়া, অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ফ্রেটারনিটি কিংবা মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমগুলো। পুরনো পদ্ধতিগুলোর পাশাপাশি হুন্ডি ব্যবসা পুঁজি পাচারকে বাংলাদেশের ‘এক নম্বর সমস্যায়’ পরিণত করেছে। এ ক্রমবর্ধমান পুঁজি পাচারের কারণেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ বিপজ্জনকভাবে কমে ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল, এখন কিছুটা বেড়ে ১৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। টাকার বৈদেশিক মানের ২৭-২৮ শতাংশ অবনমন, মারাত্মক ডলার সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির তাণ্ডবও ঘটাচ্ছে হুন্ডি ব্যবসা।
প্রবাসী আয় ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে যে ৫ শতাংশ প্রণোদনা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে শুধু এ সিদ্ধান্ত পুঁজি পাচারকে কমাতে পারবে বলে মনে হয় না। পুঁজি পাচারের চাহিদাকে টার্গেট না করলে হুন্ডি ব্যবসা চাঙা থেকে যাবে। আমদানির ওভার ইনভয়েসিং, রফতানির আন্ডার ইনভয়েসিং এবং রফতানি আয় দেশে ফেরত না আনার সমস্যাগুলো পুরনো সমস্যা। ওগুলোকে কঠোরভাবে দমনের ব্যবস্থা করতেই হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ যাতে পুঁজি পাচারকারীদের দখলে না যায় সেদিকেও কড়া নজর দিতে বলছি আমি। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সম্পর্কে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি মারাত্মক ভুল। ২ শতাংশ খেলাপি ঋণ ফেরত দিলে ১০ বছর সময় দেয়ার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে ফেলার যে আয়োজনকে তিনি জোরালো করেছেন সেটা পুঁজি পাচারকে একেবারেই সহজ করে দিয়েছে, খেলাপি ব্যাংক ঋণের সিংহভাগ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ায় এ ঋণগুলো কখনই ব্যাংকে ফেরত আসবে না। পুঁজি পাচারকারী ব্যাংক ঋণ গ্রহীতাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিলে দেখা যাবে যে এরই মধ্যে তাদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্য-সদস্যা বিদেশে চলে গেছে। এক সময় দেখা যাবে খেলাপি ঋণগ্রহীতা নিজেও নীরবে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। অতএব খেলাপি ঋণ ও পুঁজি পাচারের গভীর সম্পর্ককে অস্বীকার করে সমস্যার সমাধান খুঁজতে যাওয়া স্রেফ আহাম্মকি। অর্থনীতিবিদ সহকর্মীদের প্রতিও আমার বিনীত অনুরোধ, আপনারা বাজার অর্থনীতির নীতিগুলোকে সব সমস্যার ‘ধন্বন্তরী সমাধান’ হিসেবে জাহির করার বদখাসলত পরিত্যাগ করুন। বিবেক দিয়ে পরিচালিত হয়ে সমস্যা সমাধানের সঠিক প্রেসক্রিপশন দিন।
ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়