স্বৈরাচারের স্থায়িত্ব

কেন কিছু স্বৈরাচার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকে থাকে?

কেন কিছু স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় আর কেন কোনো শাসন ব্যবস্থা আবার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না? কেন কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো বা ইরানের আয়াতুল্লাহ খামেনির মতো নেতারা এমন শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছেন, যা দশকের পর দশক টিকে আছে।

কেন কিছু স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় আর কেন কোনো শাসন ব্যবস্থা আবার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না? কেন কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো বা ইরানের আয়াতুল্লাহ খামেনির মতো নেতারা এমন শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছেন, যা দশকের পর দশক টিকে আছে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার স্বৈরশাসন—যেমন বাংলাদেশ, শ্রীলংকা বা নেপালের স্বৈরশাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্টিভেন লেভিতস্কি ও লুকান ওয়ের লেখা ‘‌বিপ্লব ও একনায়কতন্ত্র: দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসনের সহিংস উৎপত্তি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। তুলনামূলক রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন—কেন কিছু স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় আর কেন কিছু দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না?

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য লেভিতস্কি ও ওয়ে যুক্তি দেন যে সহিংস বিপ্লবের এখানে একটা ভূমিকা আছে। কিছু বিপ্লব ‘‌আকস্মিকভাবে স্থায়ী’ স্বৈরাচারী শাসন তৈরি করে ও এসব বিপ্লবের বেশির ভাগই সহিংস বিপ্লব। এসব সহিংস বিপ্লবের মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে জনগণের এক ধরনের ঐক্য, প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা ও রাষ্ট্রীয় শক্তির সৃষ্টি হয়। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, যুদ্ধ ও দমননীতি এ বিপ্লবী সরকারগুলোকে দৃঢ় করে তোলে ও তাদের পতনের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। ফলে বিপ্লবী শাসন ব্যবস্থা সাধারণত যেসব রাষ্ট্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যায়নি সেসব শাসন ব্যবস্থার তুলনায় অনেক কম দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাদের এ যুক্তিকে সমর্থন করার জন্য লেভিতস্কি ও ওয়ে একটি মিশ্র-পদ্ধতিগত প্রমাণ প্রদান করেছেন, যেখানে তারা আন্তঃদেশীয় তথ্যকে তুলনামূলক ঐতিহাসিক গবেষণার সঙ্গে একত্রিত করে বিশ্লেষণ করেছেন। তারা প্রথমে গেডেস, রাইট ও ফ্রানৎসের স্বৈরশাসন ভাঙনবিষয়ক তথ্যভাণ্ডার ডাটাসেট ব্যবহার করে বৃহৎ আকারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ পরিচালনা করেন, যেখানে ১৯০০ সালের পর থেকে তিন শতাধিক স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার মধ্যে তারা ২০টি বিপ্লবী শাসন ব্যবস্থা শনাক্ত করেন।

ক্যাপলান মেয়ার পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে তেল সম্পদ ও শাসন ব্যবস্থার ধরন নিয়ন্ত্রণকারী পরিসংখ্যান পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা দেখান যে বিপ্লবী স্বৈরশাসনগুলো সাধারণত বিপ্লবহীন শাসনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি স্থায়ী হয়। এরপর কেন এমন ঘটে তা ব্যাখ্যা করার জন্য তারা রাশিয়া, চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম, ইরান, মেক্সিকো এবং এর ওপর বিস্তারিত কেস স্টাডির মাধ্যমে পরিচালনা করেন, যার মাধ্যমে সহিংস বিপ্লব কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যায়, তার প্রক্রিয়াগত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।

পরিমাণগত বিশ্লেষণের ব্যাপকতা এবং গুণগত গবেষণার গভীরতা একত্রে ব্যবহার করে তারা বিপ্লবী শাসনের স্থায়িত্বের ধারা ও প্রক্রিয়া—দুই দিকই স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। লেভিতস্কি ও ওয়ে দেখিয়েছেন যে সহিংস রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া তিনটি মূল ভিত্তি তৈরি করে—অভিজাত শ্রেণীর ঐক্য, অনুগত প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমনের, যা মিলিতভাবে বিপ্লবী শাসনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।

চীনের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব গড়ে ওঠে লংমার্চ, জাপানবিরোধী যুদ্ধ এবং জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধের মতো যৌথ যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা থেকে। এসব সংগ্রাম একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ নেতৃত্বগোষ্ঠী তৈরি করে, যাদের আনুগত্য মাও সেতুং ও পার্টির বিপ্লবী আদর্শের প্রতি অটুট ছিল সংকটকালীন সময়েও। যেমন গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়।

একইভাবে ইরানে দীর্ঘ ও বিধ্বংসী ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮) ধর্মীয় নেতৃত্ব ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে ঐক্যকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। এ অভ্যন্তরীণ সংহতি বিচ্যুতি নিরুৎসাহিত করে ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে বহু দশক ধরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও টিকে থাকতে সাহায্য করে (লেভিতস্কি ও ওয়ে ২০২২, পৃ. ৯৪-৯৬)। ১৯৫৯ সালের কিউবান বিপ্লবের পর, ফিদেল কাস্ত্রো একটি নতুন সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলেন—বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, যা তার সঙ্গে যুদ্ধ করা গেরিলা যোদ্ধাদের দ্বারা গঠিত ছিল। তাদের আদর্শিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক সেনা অভ্যুত্থানের যেকোনো সম্ভাবনা দূর করে দেয়। একইভাবে ভিয়েতনামে, পিপলস আর্মি অব ভিয়েতনাম ঘনিষ্ঠভাবে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে একীভূত ছিল, যা দীর্ঘ যুদ্ধ ও পুনর্গঠনের সময়জুড়ে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও শাসনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে (লেভিতস্কি ও ওয়ে ২০২২, পৃ. ৮৯-৯১)।

বিপ্লবী শাসন ব্যবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতার উৎসগুলোও ভেঙে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে বলশেভিকরা জারবাদী অভিজাত শ্রেণী বিলুপ্ত করে বেসরকারি শিল্পজাত সম্পদ জাতীয়করণ করে ও অর্থোডক্স চার্চকে রাষ্ট্রের অধীনস্থ করে। চীনে মাও সেতুংয়ের ভূমি সংস্কার ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব জমিদার, স্থানীয় অভিজাত ও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক স্তরগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে কমিউনিস্ট শাসনের কোনো সংগঠিত বিকল্প অবশিষ্ট থাকেনি। এ উদাহরণগুলো দেখায়, কীভাবে বিপ্লব শাসন ব্যবস্থাকে অভিজাতদের বিভাজন, সামরিক অভ্যুত্থান ও জনগণের বিদ্রোহ থেকে সুরক্ষা দেয়।

লেভিতস্কি ও ওয়ের এ বিশ্লেষণ কাঠামোকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রয়োগ করলে বোঝা যায়, কেন এ অঞ্চলের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা পূর্ব-এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার তুলনায় কম স্থিতিশীল ও কম দীর্ঘস্থায়ী। সহিংস সামাজিক রূপান্তরের মাধ্যমে গঠিত বিপ্লবী শাসনের বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ স্বৈরশাসন উদ্ভূত হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থান, সমঝোতাভিত্তিক ক্ষমতা হস্তান্তর অথবা অভিজাতদের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেগুলো বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো ধ্বংস করেনি বা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার মতো আদর্শিক ঐক্য সৃষ্টি করতে পারেনি।

বাংলাদেশ: বিপ্লব কিন্তু বিপ্লবী শাসন নয়

বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা এক সহিংস মুক্তিযুদ্ধের ফল হলেও এটি লেভিতস্কি ও ওয়ের সংজ্ঞায় একটি সামাজিক বিপ্লবে পরিণত হয়নি। যুদ্ধ পাকিস্তানি নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেয় বটে কিন্তু পুরনো আমলাতান্ত্রিক ও শ্রেণীভিত্তিক কাঠামোর অনেকটাই অক্ষুণ্ন থাকে। ভূমি পুনর্বণ্টন বা অভিজাত শ্রেণীর প্রকোপ কমানো অথবা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর মতো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বাকশাল একদলীয় শাসন ব্যবস্থাও তার হত্যার পর পরই ভেঙে পড়ে।

বিপ্লবী ঐক্য বা অনুগত দমনমূলক প্রতিষ্ঠান না থাকায় বাংলাদেশ পরবর্তী সময়ে সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও প্রতিযোগিতামূলক তোষামোদমূলক রাজনীতির মধ্যে দোদুল্যমান থেকেছে, যা বিপ্লবী শাসন ব্যবস্থায় দেখা যায় এমন দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশে দেখা যায়নি রিয়াজ (২০১৬) ও লুইস (২০১১)। আমরা আরো দেখতে পাই, সম্প্রতি শেখ হাসিনা ১৫ বছরের স্বৈরশাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

শ্রীলংকা ও নেপাল: সংস্কারবাদী, বিপ্লবী নয় এমন পথ

শ্রীলংকা ও নেপাল—উভয় দেশই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু কোনোটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতা অর্জন করেনি। শ্রীলংকায় প্রধান দুটি দল—শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি এবং ‘‌ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি’ জনমুখী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রভাবশালী ছিল, কিন্তু কখনই প্রকৃত অর্থে বিপ্লবী নয়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ সত্ত্বেও কলম্বো সরকার সমাজের মৌলিক পুনর্গঠন করেনি বা প্রতিদ্বন্দ্বী অভিজাত ক্ষমতাবান ও ধনী শ্রেণীকে নির্মূল করতে পারেনি।

নেপালে মাওবাদী বিদ্রোহ (১৯৯৬-২০০৬) বিপ্লবী উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা গণতান্ত্রিক রূপান্তরে পরিণত হয়, স্বৈরাচারী সংহতিতে নয়। মাওবাদীরা সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে ও একটি নতুন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী সংবিধান প্রণয়নে অংশ নেয়। ফলে কোনো দেশই লেভিতস্কি ও ওয়ের বর্ণিত আদর্শনির্ভর অভিজাত ঐক্য তৈরি করতে পারেনি, যা দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারী শাসনের জন্য অপরিহার্য।

পাকিস্তান: বিপ্লবী উৎস ছাড়াই সামরিক শক্তি

পাকিস্তানে আইয়ুব খান, জিয়াউল হক ও পারভেজ মোশাররফের শাসনামলগুলো দেখায় যে দেশটি শক্তিশালী দমনমূলক সামরিক ক্ষমতা গড়ে তুলতে পেরেছিল। কিন্তু সেখানে ছিল দুর্বল আদর্শিক ঐক্য ও অভিজাত সংহতি। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ছিল শক্তিশালী কিন্তু মূলত আমলাতান্ত্রিক, বিপ্লবী নয়। প্রতিটি সামরিক সরকারই ঔপনিবেশিক যুগের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করেছে ও বিদ্যমান অভিজাত শ্রেণীকে টিকিয়ে রেখেছে, তাদের বিলুপ্ত না করে।

ফলে পাকিস্তানের স্বৈরশাসন ছিল চক্রাকারে পুনরাবৃত্তিমূলক, একদিকে সামরিক শাসন, অন্যদিকে বেসামরিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু কখনই দীর্ঘস্থায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংহত স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় রূপ নেয়নি।

ভারত: বিপ্লব ছাড়াই গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা

ভারত একটি বিপরীত উদাহরণ উপস্থাপন করে। একটি বিপ্লবহীন রাষ্ট্র, তবু দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে। উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ের নেতারা ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখেন। তবে সেটিকে নির্বাচনী গণতন্ত্র ও ধীরে ধীরে সংস্কারের মাধ্যমে বৈধতা প্রদান করেন। ভারতের উদাহরণ লেভিতস্কি ও ওয়ের পার্থক্যটিকে স্পষ্ট করে, বিপ্লবী উৎস স্বৈরশাসনের স্থায়িত্ব ব্যাখ্যা করে, কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়। প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা কখনো কখনো বিপ্লব ও দমন নয় বরং অন্তর্ভুক্তি ও গণতন্ত্রের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

আঞ্চলিক অন্তর্দৃষ্টি

লেভিতস্কি ও ওয়ের তত্ত্ব দক্ষিণ এশিয়ায় প্রয়োগ করলে স্পষ্ট হয় যে সামাজিক বিপ্লবের অনুপস্থিতিই এ অঞ্চলের স্বৈরাচারী শাসনের অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। যেসব দেশে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে সামরিক অভ্যুত্থান বা নির্বাচনের মাধ্যমে কিন্তু গভীর সামাজিক রূপান্তর ছাড়াই সেসব শাসন ব্যবস্থা হারিয়েছে বিপ্লবী স্থায়িত্বের তিনটি স্তম্ভ: অভিজাতদের ঐক্য, অনুগত দমনমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন।

ফলস্বরূপ দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো ক্রমাগত দোদুল্যমান থেকেছে গণতন্ত্র, স্বৈরশাসন ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে। সংক্ষেপে, দক্ষিণ এশিয়া স্বাধীনতার বিপ্লব দেখেছে কিন্তু রূপান্তরমূলক সামাজিক বিপ্লব নয়। এ পার্থক্যই ব্যাখ্যা করে কেন কিউবা বা ইরানের স্বৈরাচারী শাসন দশকের পর দশক টিকে আছে। অথচ বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলংকার শাসন ব্যবস্থা বারবার ভাঙন ও সংস্কারের চক্রে আটকে থেকেছে।

বিপ্লবী স্বৈরশাসন কেন টিকে থাকে

লেভিতস্কি ও ওয়ের মতে, বিপ্লবী স্বৈরাচারগুলো টিকে থাকে কারণ তাদের সহিংস উৎপত্তি ঐক্য, আনুগত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি গড়ে তোলে। সামাজিক বিপ্লব পুরনো ক্ষমতার কাঠামো ধ্বংস করে ও তার জায়গায় এমন একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র ব্যবস্থা স্থাপন করে, যা অভ্যুত্থান ও বিদ্রোহ প্রতিরোধে সক্ষম। এ শাসন ব্যবস্থায় অভিজাতরা ঐক্যবদ্ধ থাকে, সামরিক বাহিনী অনুগত থাকে ও সমাজ রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে। বাহ্যিক হুমকি ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাও তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে। কারণ এগুলো ‘অবরোধ মানসিকতা’ ও আদর্শিক প্রতিশ্রুতি শক্তিশালী করে তোলে।

কিউবা, চীন, ভিয়েতনাম, ইরান ও মেক্সিকোর উদাহরণগুলো দেখায়, কীভাবে বিপ্লবী উৎস এসব শাসন ব্যবস্থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকিয়ে রাখে। অন্যদিকে জাম্বিয়া, মিসর, বাংলাদেশ বা শ্রীলংকা মতো অ-বিপ্লবী স্বৈরাচারগুলো, যারা দুর্বল আমলাতান্ত্রিক বা সামরিক জোটের ওপর নির্ভরশীল, সাধারণত অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক চাপে ভেঙে পড়ে।

যদিও বিংশ শতাব্দীর মহান মার্ক্সবাদী বিপ্লবগুলো ইতিহাসে পরিণত হয়েছে, তবু ‘‌বিপ্লবী স্থায়িত্বের’ প্রক্রিয়া এখনো প্রাসঙ্গিক। যখনই কোনো আন্দোলন সহিংসভাবে পুরনো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে একটি অনুগত রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ে তোলে ও অভিজাতদের ঐক্যবদ্ধ করে। তার ফলাফল প্রায়ই হয় আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসন।

ইতিহাস তাই দেখায়, বিপ্লব অনেক সময় মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু বাস্তবে তা মাঝেমধ্যে সৃষ্টি করে স্থায়ী স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা।

সানজিদা বারী: ডক্টরাল ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগো

আরও