সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে। দলটির মূলনীতি হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, ন্যায্যতা, মানবিকতা, সৃষ্টিশীলতা, আত্মমর্যাদা, স্বনির্ভরশীলতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং দেশের গণমানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি ও ন্যায়বিচার। বিএনপির নীতি—ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড় এবং বিএনপি বিশ্বাস করে সবার আগে জনগণ এবং সবার আগে বাংলাদেশ। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে আহ্বায়ক করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে একটি দল গঠন করেন। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ঢাকার রমনা ময়দানে ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বিএনপির প্রথম আহ্বায়ক এবং অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন বিএনপির প্রথম মহাসচিব।
প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামক একটি কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন এবং গণমাধ্যমের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার চারটি গণমাধ্যম ব্যতীত সকল গণমাধ্যমকে নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেন। ক্রমান্বয়ে শেখ মুজিব শাসনামল একটি জনবিচ্ছিন্ন কর্তৃত্ববাদী শাসনে পরিণত হয় এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একটি রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবের কর্তৃত্ববাদী অপশাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। বাকশাল-উত্তর বাংলাদেশে বাকশালী এবং কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি আওয়ামী লীগকে একটি জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছিল এবং কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে বাংলাদেশের গণমানুষ প্রত্যাখ্যান করেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাণ্ড এবং বিতর্কিত ভূমিকার কারণে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশের গণমানুষ প্রত্যাখ্যান করেছিল। তৎকালীন সময়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলসমূহ বাংলাদেশের গণমানুষের রাজনৈতিক প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বাংলাদেশের গণমানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষা, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা, আত্মমর্যাদা ও স্বনির্ভরশীলতা এবং বাংলাদেশের গণমানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি ও ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বাংলাদেশের গণমানুষের গণআকাঙ্ক্ষা পূরণে জন্মলাভ করেছিল। এই জনমুখী রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য, আত্মমর্যাদা এবং জনগণের মধ্যে স্বনির্ভরতার চেতনা, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা। ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল বিএনপির মৌল আদর্শ। বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা; জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনসংখ্যা সমস্যার কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা; দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা; বেসরকারি খাতের বিকাশ ও সম্প্রসারণে সরকারের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সহযোগিতা প্রদান করা; এবং ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও জাতিসত্তার ভিন্নতা ভুলে সকল নাগরিকের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করা। বিএনপি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা-উত্তর সরকারের অনুসৃত ভারত নির্ভরতা নীতি এবং ইন্দো-সোভিয়েত বলয় থেকে বের হয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার নীতি অনুসরণ করে, যা বাংলাদেশকে বিশ্বরাজনীতিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশ পেয়েছে নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি, যার ভিত্তি হলো পারস্পরিক জাতিগত শ্রদ্ধাবোধ, সাম্য এবং ন্যায্যতা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকার খাল খননের মাধ্যমে বাংলাদেশে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছিল। বিএনপির কালজয়ী ১৯ দফা কর্মসূচি বাংলাদেশের শহর ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করেছিল এবং বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিল আত্মনির্ভরশীলতার রাজনীতি ও স্বনির্ভরশীলতার অর্থনীতি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ক্ষেত্রে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। গণতন্ত্রকে অধিকতর কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার লক্ষ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। একই সময়ে জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীতে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়। বিশ্বপরিসরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা নতুন মাত্রা অর্জন করতে থাকে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি নতুন আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি শাহাদাতবরণ করলে তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর এক দশক পর, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৪০টি আসনে বিজয় অর্জন করে একক বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সরকার গঠন করে। ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালে ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে এবং ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১১৬টি আসনে জয়যুক্ত হয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৯৩টি আসনে বিজয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি রাষ্ট্রীয় তথ্য সন্ত্রাসবাদের কারণে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। নির্বাচনে দলটি ৩০০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৩০টি আসনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে এবং সংসদীয় রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ দুর্বার গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন ঘটে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ৩০০টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে এবং দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে, সবার আগে বাংলাদেশ নীতিতে দেশ পরিচালনা করছে।
মো. মেহেদী হাসান সোহাগ: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়