মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থা আবারো সেই শঙ্কা জাগিয়ে তুলছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। যদিও এ পরিস্থিতি এড়ানো যেত, যদি দেশের জ্বালানি নীতি আমদানিনির্ভর না হতো।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা দীর্ঘকাল ধরে চলমান রয়েছে এবং জ্বালানি আমদানির পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে। আর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)—প্রায় সব জ্বালানির সিংহভাগই আনা হয় মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশ কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে। ফলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ বা জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলো সরাসরি দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে প্রভাবিত করে। এ প্রেক্ষাপটে ধারণা করা যাচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তা দেশে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটাবে। অতীতেও এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে।
এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়ে যায়। যুদ্ধ শুরু হতেই রাশিয়া পণ্যটির সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এতে অনেক দেশ জ্বালানি সংকটের মুখে পড়ে বা চড়া দামে পণ্যটি আমদানি করে। বিশেষ করে এ তালিকায় ছিল আমদানিনির্ভর ইউরোপীয় অনেক দেশের নাম। এসব দেশ সেই সময় প্রায় ১০ গুণ বেশি দাম দিয়ে জ্বালানি পণ্য কিনেছে। এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ হওয়ায় অতিরিক্ত দাম দিয়ে জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশের পক্ষে উচ্চমূল্য দিয়ে জ্বালানি আমদানি করা একদিকে সক্ষমতার বাইরে, অন্যদিকে তা অর্থনীতিতেও এক প্রকার চাপ সৃষ্টি করে। যে কারণে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকালীন বা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পাওয়া গেলেও ডলার সংকটের কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিতে হয়েছিল। ফলাফল ছিল দীর্ঘ লোডশেডিং, শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়া। অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের অন্যতম কারণ সরবরাহ ঘাটতি নয়, বরং ডলার সংকট ছিল। প্রশ্ন হলো বর্তমানে কি দেশে ডলার সংকট রয়েছে।
এখনো দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধ করাই বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এটি শোধ করতে হয় ডলারে। উপরন্তু এখনো সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ পতন ঠেকানো গেলেও তা খুব বেশি বৃদ্ধি পায়নি। অন্যদিকে দেশে ডলার প্রবাহের বড় উৎস হলো প্রবাসী আয়। কিন্তু বাংলাদেশী প্রবাসীদের বড় অংশই রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষত সৌদি আরবে। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার অর্থ হলো প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমার আশঙ্কা। সুতরাং বাংলাদেশের মতো সংকটে থাকা অর্থনীতির দেশের পক্ষে উচ্চমূল্য দিয়ে জ্বালানি আমদানি কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক না। বরং এতে পুনরায় ডলার সংকট ও রিজার্ভ ক্ষয় বাড়তে পারে। যদিও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের ওয়ার্ল্ড এনার্জি আউটলুক ২০২৫ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারক হবে। সেই সময় বছরে প্রায় ৪২-৪৪ বিলিয়ন ঘনমিটার এলএনজি কেনা হবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, তখনো যদি আবার কোনো বৈশ্বিক সংকট দেখা দেয় তাহলে দেশের জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি কী হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট আবারো এ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। এ অঞ্চল যদি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, রেমিট্যান্স প্রবাহও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। রেমিট্যান্স কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে, আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে জ্বালানি আমদানির ওপর। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে জ্বালানি প্রয়োজন থাকলেও ডলারের ঘাটতির কারণে তা আমদানি করা সম্ভব হবে না। ফলে দেশ জ্বালানি সংকটের মধ্যে পড়বে। কারণ এক্ষেত্রে নির্ভরতার বিকল্প আজও তৈরি করা যায়নি।
নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধিতে দেশের নীতিনির্ধারকরা পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেননি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। স্থল ও সমুদ্র উভয় অঞ্চলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার সীমিত। অথচ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব ছিল। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারত। কিন্তু সৌর ও বায়ুশক্তির সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন এখনো নগণ্য। শিল্প এলাকা, সরকারি স্থাপনা কিংবা নগর অবকাঠামোয় পরিকল্পিতভাবে সৌরশক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহারে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের নামও। উদাহরণ হিসেবে শ্রীলংকার কথাই বলা যায়। দেশটি ২০২২-২৩ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে পড়ে। তীব্র জ্বালানি ঘাটতি, ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নতা ও বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। এসব সংকট উত্তরণে দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে এক ধাপ বাড়ায়। বর্তমানে শ্রীলংকার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যা মূলত জলবিদ্যুৎ। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৭০ শতাংশে নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গ্রিডে নবায়নযোগ্য শক্তি সংযোজনের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভোল্টেজ ওঠানামা কমানো ও সাপ্লাই স্থিতিশীল করা। কিন্তু এমন কোনো অগ্রগতি বাংলাদেশে লক্ষণীয় নয়। এমনকি প্রতিবেশী ভারত-নেপালসহ অনেক দেশ বর্তমানে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনে মনোনিবেশ করেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উৎসে পরিণত করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ যদি জ্বালানি সংকটমুক্ত এবং অর্থনীতিকে চাপহীন রাখতে চায় তবে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে এগোনোর বিকল্প নেই। নয়তো বারবার ভূরাজনৈতিক সংকট উৎপন্ন হবে এবং দেশকে জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।