বিদ্যুৎ সংকটে বিভিন্ন স্থানে ব্যাহত সংরক্ষণ, নষ্ট হচ্ছে পেঁয়াজ-আলুর মজুদ

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া কৃষিপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে

দেশের কৃষি খাতে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে, যেগুলো উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। কৃষিজমির পরিমাণ ও এর পুষ্টিগুণ কমছে।

প্রতি বছর দেশের কয়েকটি অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, বন্যার কারণে বিপুল পরিমাণ ফসল নষ্ট হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনে খরা বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া কৃষি উৎপাদনের অন্যতম অনুষঙ্গ সারের ঘাটতিও কৃষকদের বড় মাথাব্যথার কারণ। এর ওপর রয়েছে উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে বিভিন্ন উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, যা কৃষিতেও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। এমন বহুমুখী সংকটের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে যখন কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাও ক্ষতির মুখে পড়ে, তখন কৃষি পণ্যের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হয়। বিশেষ করে আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং চাল-গমের পর প্রধান খাদ্যপণ্যের মজুদ নষ্ট হলে জোগান ঘাটতি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এর দামও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে। অর্থাৎ সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি কৃষক থেকে ভোক্তা সবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কোল্ড স্টোরেজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হচ্ছে। পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় এয়ার ফ্লো মেশিনও নিয়মিত চালানোয় বিঘ্ন ঘটছে। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু, পেঁয়াজ ও বীজ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। কোথাও কোথাও এরই মধ্যে পচন ও গুণগত মানের অবনতির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। আবার বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা হচ্ছে, যার প্রভাব পণ্যের দামে পড়বে। সুতরাং সরকারকে এ পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

দেশব্যাপী বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট তীব্র। বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ ও চাহিদার ঘাটতি প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুট। জ্বালানির অভাবে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকগুলো সীমিতভাবে চালু রাখা হচ্ছে বা রেশনিং করে চলছে। লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনও বিপন্ন। এসবের পাশাপাশি বর্তমানে কৃষি খাতেও এর প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার অন্যতম উপায় হলো সরকারকে বিদ্যুৎ সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ সংকট কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন, যেটা সরকারের পক্ষ থেকেও একাধিকবার বলা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া আবশ্যক। কারণ এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি স্ফীত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট সীমিত। উৎপাদনের মৌসুমগুলোয় প্রয়োজনীয় হিমাগারের অভাবে কৃষকরা পণ্য সংরক্ষণে বিপাকে পড়েন। আবার হিমাগারের অতিরিক্ত ভাড়ার কারণেও অনেকে আর্থিক চাপে পড়েন। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, বর্তমানে সক্রিয় ৩৫১টি কোল্ড স্টোরেজে প্রায় ২৬ লাখ টন আলু সংরক্ষিত রয়েছে। এসব হিমাগারে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, সবজি, ফল, বীজসহ নানা কৃষিপণ্যও রাখা হয়। অর্থাৎ হিমাগারে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অর্থ হচ্ছে কৃষিপণ্যের একটি বড় অংশের সরবরাহ ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়া। সুতরাং সরকারকে ভাবতে হবে কীভাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কৃষিপণ্য সংরক্ষণে অব্যাহতভাবে বিদ্যুৎ দেয়া যায়। তাছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘ বিরতি হলে আলুতে অঙ্কুরোদ্গমসহ নানা গুণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে পরবর্তী মৌসুমে আলু উৎপাদন কমতে পারে। একইভাবে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা না গেলে পচন বাড়তে পারে। এর অর্থ, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে বর্তমানে সংরক্ষিত পণ্যের একটি অংশ বাজারে পৌঁছার আগেই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

এ অবস্থায় কৃষি খাতকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। বিদ্যুৎ সংকট সাময়িক—সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, স্থানীয় গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেয়ার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু কৃষিপণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি আরো বড় সংকট ডেকে আনতে পারে, যা মোটেও কাম্য না। যেসব হিমাগারে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য সংরক্ষিত রয়েছে, সেগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে নিরবচ্ছিন্ন বা নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

এজন্য বিদ্যুৎ ও কৃষি—দুই মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে জরুরি সমন্বয় প্রয়োজন। কোন এলাকায় কত কৃষিপণ্য সংরক্ষিত রয়েছে, কোন হিমাগারে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন এবং কোথায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেশি—এসব তথ্যের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সংকটকালে হিমাগারগুলোকে বিশেষ বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় আনা এবং জেনারেটর পরিচালনার অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে ডিজেল সরবরাহে নীতিগত সহায়তা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

এটি কেবল তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবেলার বিষয় নয়। দীর্ঘমেয়াদে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, জ্বালানিসাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো, কোল্ড স্টোরেজে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রণোদনা দেয়া এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে পেঁয়াজের মতো পণ্যের জন্য উন্নত বায়ু চলাচল ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা দরকার।

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় সামগ্রিকভাবে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সংকটের সময় কোন খাতের ক্ষতি সবচেয়ে দ্রুত এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এমনই একটি খাত, যেখানে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের অব্যবস্থাপনাও পরবর্তী সময়ে বড় আর্থিক ক্ষতিসহ খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

আরও