বাজেট ভাবনা

আগামী বাজেট কৃষি ও কৃষকবান্ধব হওয়া জরুরি

শিগগিরই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা হবে। এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।

এমনটি হলে তা চলতি বছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি হবে। অর্থাৎ এবারো বাজেট হবে সম্প্রসারণমূলক। তবে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি ও বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাবহেতু একটি আঁটসাঁট বাজেট কাম্য ছিল। এর লক্ষ্য হতে হবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস, নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘব ও দুর্বৃত্তায়নের লাগাম টেনে ধরা। উৎপাদনশীল কৃষি খাত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতগুলোর খরচ কমানো এখন খুবই প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধি বাজেটের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। সরকারের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে খরচের গুণগত মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি বাস্তবসম্মত বাজেট অনুসরণ করা প্রয়োজন।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রধান নির্দেশক হচ্ছে দেশজ আয়ের প্রবৃদ্ধির হার। প্রতিটি বাজেটেই এ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস হচ্ছে অনেক কম। বিশ্বব্যাংক যে পূর্বাভাস দিচ্ছে তাতে এ অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। আইএমএফের পূর্বাভাস হলো ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলছে, প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৪ শতাংশ। এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম অনুমিত হওয়ার কারণ হলো নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যনীতি, বিনিয়োগ হ্রাস, জ্বালানি খাতের সংকট, বহির্বিশ্বের ঘটনাবলির নেতিবাচক প্রভাব এবং উৎপাদনে স্থবিরতা। অর্থবছরের শেষ প্রান্তে হাওরের ভয়াবহ বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে বোরো ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া সার্বিকভাবে কর্মসংস্থান হ্রাস পায়। মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি মানুষের আয়ও কমছে। আগামী বছর প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রধান নিয়ামক হবে সুস্থির সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ। তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।

প্রবৃদ্ধির হার মাঝারি গোছের হলেও জনজীবনে স্বস্তি থাকতে পারে যদি তা উচ্চ মূল্যস্ফীতির অতলে তলিয়ে না যায়। অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুষ্টক্ষত হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা গরিব ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষদের চরমভাবে ভোগান্তিতে ফেলে। জনজীবনে কষ্ট ও দুর্ভোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে প্রায় চার বছর ধরে বিরাজ করছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এর মাত্রা গড়ে ৯-১০ শতাংশের ওপর। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল গড়ে ৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে বাড়ে। ২০২৪-২৫ সালে তা আরো বেড়ে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে পৌঁছায়। এবার তা হতে পারে ৯ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে কয়েক মাস ধরে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রণীত বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। গত ১০ মাসের গড় অর্জন প্রায় ৯ শতাংশ। আইএমএফের পূর্বাভাস হলো ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি, যা নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ২০২৪-এর জুলাইয়ে ছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ আর নভেম্বরে ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। পরে তা ক্রমাগতভাবে কমে ২০২৬-এর এপ্রিলে নেমে আসে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। এরই মধ্যে পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও আফগানিস্তানের খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অনেক নিচে নেমে গেছে। ভারত, মিয়ানমার ও নেপালের খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার আমাদের চেয়ে প্রায় অর্ধেক কম। বিশ্বব্যাংকের খাদ্যনিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি সম্পর্কিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে চার বছর ধরে লাগাতার ঝুঁকির লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে এ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে অনুসৃত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে কঠোর রাজস্বনীতির সমন্বয় করে সুস্থির রাজনীতি নিশ্চিতের মাধ্যমে কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন বাড়িয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে রাজস্ব আয়ন-ব্যয়নে শৃঙ্খলা আনা প্রয়োজন। সরকারের ব্যয় যথাসম্ভব রাজস্ব আহরণের সঙ্গে সংগতপূর্ণ হওয়া দরকার। বাংলাদেশের মতো মাথাপিছু কম আয়ের একটি দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের নিচে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২-৩ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাসের প্রধান শর্ত হলো কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি। সম্প্রতি কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এর প্রবৃদ্ধির হার এগিয়ে চলছে অনেক ধীরগতিতে। এখন কৃষি খাতে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি খুবই কম। ২০০৯-১০ অর্থবছরে অর্জিত প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ২ দশমিক ৪২ শতাংশে অবস্থান করছে। সার্বিক কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এ হার ২০০৯-১০ অর্থবছরে অর্জিত ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশের অর্ধেক মাত্র। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষি খাতের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ৪-৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এজন্য কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। ২০১১-১২ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৪ দশমিক ৮৩ গুণ বেড়েছে। সে তুলনায় কৃষি বাজেট বাড়েনি। এ সময় কৃষি বাজেট বেড়েছে ৩ দশমিক ৬৯ গুণ। ২০১১-১২ অর্থবছরের মোট বাজেটে কৃষি বাজেটের হিস্যা ছিল ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তা নেমে আসে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশে। একইভাবে কৃষি ভর্তুকির হিস্যা নেমে আসে ৬ দশমিক ৪ থেকে ২ দশমিক ১৮ শতাংশে। অর্থাৎ যে হারে মোট বাজেট বেড়েছে সে হারে কৃষি বাজেট ও ভর্তুকি বাড়েনি।

চলতি অর্থবছরে কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪৬ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শস্য খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন ও পরিবেশ, ভূমি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। এটা অপ্রতুল। ফসল কৃষি খাতের বরাদ্দে আগের বছরের সংশোধিত বরাদ্দ থেকে ১৮ দশমিক ২১ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমিয়ে রাখা হয় ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে কৃষি খাতের হিস্যা বাড়ানো উচিত। বৃহত্তর কৃষি খাতে মোট বাজেটের ন্যূনপক্ষে ১০ শতাংশ এবং ভর্তুকিতে মোট কৃষি উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাতে বৃহত্তর কৃষি খাতে বরাদ্দ করতে হবে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা এবং ভর্তুকির জন্য রাখতে হবে ন্যূনতম ৪০ হাজার কোটি টাকা।

কৃষি গবেষণায় সরকারি ব্যয় অপ্রতুল। ন্যূনপক্ষে কৃষি-জিডিপির ১ শতাংশ গবেষণা পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ করা উচিত। চীন, ভিয়েতনাম, জাপানসহ পৃথিবীর অনেক দেশে গবেষণা ব্যয় ৩-৫ শতাংশ। আমাদের ক্ষেত্রে তা শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। কৃষি বিজ্ঞানীদের বেতন-ভাতা কম। মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন ও পদোন্নতির সুযোগের অভাব। অনেক প্রতিষ্ঠানে পেনশনের সুযোগ নেই। চাকরিকালীন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক মেধাবী বিজ্ঞানী দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। অনেকে গবেষণা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ভিন্ন পেশায়। এমন পরিস্থিতিতে কৃষি গবেষণায় প্রণোদনা কাঠামো পরিবর্তন করা উচিত। বাজেট প্রণয়নের সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি কত হবে তা বলা হয় না। অষ্টম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কৃষি খাতে ২০২৪-২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরের গড় প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৪ শতাংশ। অর্জিত হয়েছে ৩ শতাংশ। এ হার বাড়ানো দরকার। ন্যূনপক্ষে তা ৪ শতাংশ অর্জন করা উচিত। অন্যথায় মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বর্তমানে কৃষিতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। ১৯৭২-৭৩ সালে কৃষি-জিডিপিতে শস্য খাতের শরিকানা ছিল ৭৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। প্রাণী, মৎস্য ও বনজসম্পদের শরিকানা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬৬, ১০ দশমিক ৪৮ এবং ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০২৪-২৫ সালে কাঠামোগত পরিবর্তন সাধনের ফলে শস্য খাতের শরিকানা কমে গিয়ে ৪৬ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়ায়। প্রাণী, মৎস্য ও বনজ সম্পদের শরিকানা বেড়ে যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৫৭, ২১ দশমিক ৪৪ এবং ১৫ দশমিক ৭৭ শতাংশে উপনীত হয়। দেশের মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে তাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ঘটছে এবং অপেক্ষাকৃত অধিক পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তাই দুধ, ডিম, মাংস ও মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো দরকার। আগামী বাজেটেও তার প্রতিফলন থাকা উচিত। উপখাতওয়ারি বরাদ্দ ও ভর্তুকির নীতিমালায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হওয়া বাঞ্ছনীয়।

বর্তমানে দেশে পশুপাখির উৎপাদন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এদের উৎপাদিত দুধ, মাংস ও ডিমের মূল্য অনেক চড়া। ক্ষেত্রবিশেষে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে না। এর প্রধান কারণ উৎপাদনের উপকরণ খরচ বেশি। বিশেষ করে পশুখাদ্যের মূল্য খুবই চড়া। এর দাম কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া উচিত। মাছের ক্ষেত্রে সম্প্রতি উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। প্রতি বছর প্রায় ১ শতাংশ হারে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো দখল হয়ে যাচ্ছে বা দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলো সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। সমুদ্রের বিশাল ভাণ্ডার থেকে মৎস্য আহরণের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।

দেশের কৃষকদের জন্য পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি একটি বড় সমস্যা। বাজারের নিয়ন্ত্রণ একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর হাতে। তাদের কারসাজিতে একদিকে কৃষক তার পণ্যের উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না। অন্যদিকে ভোক্তা অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করে দারুণভাবে ঠকছেন। এক্ষেত্রে বিপণন খরচ ও মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ বাড়ানো দরকার। ধান-চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ যৌক্তিক পর্যায়ে হওয়া উচিত। এবার বোরো ফসলের আবাদ উপকরণ সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তদুপরি হাওরে অকাল বন্যায় প্রায় ২৫ শতাংশ ধান বিনষ্ট হয়েছে। ফলে প্রতি ইউনিট ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের মূল্য প্রতি কেজি গত বছরের সমানই রয়ে গেছে। এটি পরিমার্জন করা উচিত। উৎপাদন খরচের ওপর ন্যূনপক্ষে ২০ শতাংশ মুনাফা দিয়ে সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। দুই বছর ধরে আলু ও পেঁয়াজের উৎপাদন অনেক বেড়েছে। কিন্তু এদের বাজারদর দ্রুত কমে গেছে। টমেটো ও মুলার ক্ষেত্রেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক। এ অবস্থায় সরকারিভাবে ফসল সংগ্রহের তালিকা বাড়াতে হবে। ন্যূনপক্ষে ১০ শতাংশ উৎপাদিত ফসল কৃষকদের কাছ থেকে সরকারকে সরাসরিভাবে কিনে গুদামে বা হিমাগারে সংরক্ষণ করতে হবে। এসব পণ্যের দাম বাড়লে তা খোলা বাজারে বিক্রি করে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

বর্তমান উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে প্রান্তিক কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক চাপ পড়েছে। তাদের জন্য ভর্তুকি ও সহায়তা বাড়ানো দরকার। তাদের সুরক্ষা কাঠামো সম্প্রসারণ করা দরকার। গ্রাম ও নগর উভয় ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়ন ও কৃষি বিনিয়োগে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে বাজেটে। মৌসুমি কর্মহীনতার সময় কর্মসংস্থান গ্যারান্টি স্কিম চালু করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড দেয়া শুরু করেছে। এর আওতা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করতে প্রায় পাঁচ বছর লেগে যাবে। ফলে দেশের এক প্রান্তের দরিদ্র মানুষ যখন এসব কার্ডের সুবিধা ভোগ করবে তখন অন্য প্রান্তের মানুষ কেবল আশায় বুক বাঁধবে। এতে সমতা লঙ্ঘিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে বঞ্চিত এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রই কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে আমাদের সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এখানে ইস্পিত লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। মৌসুমি ফল, শাকসবজি ও পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে উপযুক্ত কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। ধান-চাল সংরক্ষণের জন্য ন্যূনপক্ষে ৬০ লাখ টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন গুদাম নির্মাণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে চালু থাকা গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা মাত্র ২২ লাখ টন। এগুলো কৃষি বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কৃষিপণ্যের রফতানি উৎসাহিত করার জন্য একসময় ২০-৩০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়া হতো। বর্তমানে তা ১০ শতাংশের বেশি নয়, ক্ষেত্রবিশেষে বাড়ানো যেতে পারে।

কৃষিকাজে এখনো যন্ত্রের ব্যবহার সীমিত। সে কারণে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন খরচ বেশি। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ উৎপাদন খরচ হ্রাস ও পণ্যের মান বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। চার বছর আগে যান্ত্রিকীকরণ উৎসাহিত করার জন্য ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের যন্ত্র সরবরাহ করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এখন প্রকল্পটি অকার্যকর। বিগত সরকারের আমলে দুর্বৃত্তায়নের কারণে এটি বন্ধ করে দেয়া হয়। বর্তমানে তা নতুন আঙ্গিকে চালু করা যেতে পারে। বাংলাদেশের কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব খুবই বেশি। এর মোকাবেলায় অভিযোজন ও প্রশমনের প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নেয়া দরকার। এক্ষেত্রে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকা উচিত। কয়েক বছর ধরে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষির উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। তাতে দারুণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষক। তাদের সহায়তার জন্য দুর্যোগ মোকাবেলা তহবিল গঠন করা দরকার। আসন্ন বাজেটটি কৃষি ও কৃষকবান্ধব হবে এটাই প্রত্যাশা।

ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি); সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)

আরও