স্মরণ

সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্ব আনয়নে আবুল মনসুর আহমদের ভূমিকা

বাংলা সংবাদপত্রের ‘ইন্ডাস্ট্রি’করণে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারীদের অন্যতম হলেন আবুল মনসুর আহমদ। উনার সাংবাদিকতার শতবর্ষ পূরণ হচ্ছে এ বছর। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় খ্রিস্টাব্দ ১৯২৩-এ সাংবাদিকতা শুরু করে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিন দশক। সহসম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতায় ঢুকে সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব পালন করেননি কেবল, অনেকগুলো ক্ষেত্রে পালন করেছেন যুগন্ধর ভূমিকা। যার অন্যতম হলো

বাংলা সংবাদপত্রের ‘ইন্ডাস্ট্রি’করণে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারীদের অন্যতম হলেন আবুল মনসুর আহমদ। উনার সাংবাদিকতার শতবর্ষ পূরণ হচ্ছে এ বছর। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় খ্রিস্টাব্দ ১৯২৩-এ সাংবাদিকতা শুরু করে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিন দশক। সহসম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতায় ঢুকে সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব পালন করেননি কেবল, অনেকগুলো ক্ষেত্রে পালন করেছেন যুগন্ধর ভূমিকা। যার অন্যতম হলো সংবাদপত্রের ‘ইন্ডাস্ট্রি’করণ। 

বাংলা সংবাদপত্রের সূচনা হয় মিশনারি ওয়ার্ক, হাসপাতাল পরিচালনা, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো কেবলই সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। অবশ্য এ সেবাধর্মিতা সত্ত্বেও ‘বাংলা সংবাদপত্রের মুখ্য উদ্দেশ্যই ছিল সংস্কার ও পরিবর্তন। (পরিবর্তন অর্থে শুধু বদল নয়, বাঞ্ছিত ও ঈপ্সিত লক্ষ্যে সমাজকে পরিচালনা।)’ কিন্তু ঠিক মোটা অংকের মূলধন বিনিয়োগ, লাভ-ক্ষতির কড়ায়-গণ্ডায় হিসাবের ‘ইন্ডাস্ট্রি’ বলতে যা বোঝায় সেটা ছিল না। এ সত্য জেনেবুঝেই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় শিক্ষকতার নিশ্চিত বেতনের চাকরি ছেড়ে ‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ণ রিভিউ’ পত্রিকার দায়িত্ব নেন এবং নিজেকে একজন বিরলপ্রজ সম্পাদকের উচ্চতায় মহিমান্বিত করেন। বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে সংবাদপত্রের ইন্ডাস্ট্রি ধারণার বীজ উপ্ত হয়। আবুল মনসুর আহমদের সাংবাদিক-সম্পাদকীয়তার সময়েই শুরু হয় সংবাদপত্রের ‘ইন্ডাস্ট্রি’ হওয়ার সংস্কৃতি। যোগ্যতম হিসেবে টিকে থাকার লড়াইয়ে টেকসই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার দায়িত্বশীল রূপ-রূপান্তর ও বাস্তবায়নে যারা অগ্রণী ভূমিকা রাখেন এবং সদর্থক অর্থেই সংবাদপত্রকে অনন্য নেতৃত্ব ও কর্মপ্রতিভা দিয়ে ‘ইন্ডাস্ট্রি’তে পরিগণিত করেন তিনি হলেন সেসব মেধাবী সাংবাদিক-সম্পাদকের অন্যতম। বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের প্রযত্নে-নেতৃত্বে ও সংবাদপত্র শিল্পের বিকাশের কালে তিনি পালন করেছেন একজন যোগ্য ও দায়িত্বশীল অভিভাবকের ভূমিকা। উনার নেতৃত্বে বৃহদায়তনিক জায়গায় সংবাদপত্র সমৃদ্ধ হয়েছে বহুধাভাবে, যেমন ইংরেজি পত্রিকা ‘দি মুসলমান’; পাশাপাশি বাংলা সংবাদপত্রের বিকাশে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা, যেমন ‘কৃষক’ ও ‘নবযুগ’; বাঙালি মুসলমানের সংবাদপত্র সৃজন-নির্মাণ ও সংলগ্নতার জায়গা-জমি পেয়েছে ইতিহাস নির্মাণের সুযোগ, যেমন ‘ইত্তেহাদ’।

আবুল মনসুর আহমদ মনে করতেন সংবাদপত্রকে ‘ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম শর্ত হলো: এক. জনপ্রিয় রাজনৈতিক মতবাদের সমর্থন, দুই. সু-সম্পাদন, তিন. সুন্দর ছাপা, চার. ভালো মানের কাগজের জোগান নিশ্চিত করা, চার. সর্বাধিক পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য সাইজে কাগজ প্রকাশ, পাঁচ. নিয়মিত প্রকাশ ও ছয়. সময়মতো সুষ্ঠু সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ।

এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এ সময়ে এসেও যদি কেউ একটা পত্রিকাকে জনপ্রিয়, প্রভাবশালী, লাভজনক—এক কথায় ‘ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে দাঁড় করাতে চান এ শর্ত পূরণ ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। সুতরাং আবুল মনসুর আহমদের এ পাঁচ দফাকে আমরা একটা পত্রিকার ‘প্রাণভোমরা’ কিংবা ‘ইন্ডাস্ট্রি’ হওয়ার মৌল শর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। সময় পরিক্রমায় ও প্রযুক্তির বিকাশের কারণে এর সঙ্গে হয়তো আরো নতুন বিষয় যুক্ত হতে পারে, কিন্তু তার এ পাঁচ দফাকে উপেক্ষা করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এ তো গেল সংবাদপত্রকে ‘ইন্ডাস্ট্রি’ করে তোলা নিয়ে তার বহিরঙ্গের ভাবনা। একইভাবে তিনি সাত দফা অভ্যন্তরীণ ভাবনার কথাও বলেছেন। 

সংবাদপত্র সম্পাদনার অভিজ্ঞতা থেকে আবুল মনসুর আহমদ অভ্যন্তরীণ সাত দফাকে সাংবাদিকতার ক, খ জ্ঞান করেছেন। এগুলো হলো:

“‍এক. সাংবাদিকতা নিছক সংবাদ সরবরাহ নয়, সংবাদের সুষ্ঠু ব্যাখ্যাও বটে।

দুই. সাংবাদিকতার সাথে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজনীতিতে পার্টি-গত শ্রেণি-গত মতভেদ অপরিহার্য। কিন্তু এই মতভেদ সত্ত্বেও সাধু সাংবাদিকতা সম্ভব। তিন. বিরুদ্ধ পক্ষকে অভদ্র কটূক্তি না করিয়াও তাঁর তীব্র সমালোচনা করা যাইতে পারে ভদ্রভাষায়। বস্তুত সমালোচনার ভাষা যত বেশি ভদ্র হইবে, সমালোচনা তত তীক্ষ্ণ ও ফলবতী হইবে। চার. প্রত্যেক মতবাদের সুষ্ঠু, উদার, বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ আলোচনার দ্বারা নিজের মতের পক্ষে এবং বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে জনমত তৈয়ার করা অধিকতর সহজসাধ্য।

পাঁচ. মরহুম মৌলবি মুজিবর রহমান বলিতেন: সংবাদ-পত্রের কেবলমাত্র সম্পাদকীয় কলমটাই সম্পাদকের; বাকি সবটুকু পাবলিকের। চিঠি-পত্র কলমটা টাউন হল, সম্পাদকের বৈঠকখানা নয় অতএব সংবাদ প্রকাশে নিরপেক্ষতা চাই। স্বয়ং সম্পাদকের নিন্দা-পূর্ণ পত্রও চিঠি-পত্র কলমে ছাপিতে হইবে।

ছয়. সাংবাদিকতা সাহিত্য, আর্ট, সায়েন্স, ইন্ডাস্ট্রি ও কমার্সের সমবায়। এর একটার অভব হইলে সাংবাদিকতা ত্রুটিপূর্ণ এবং পরিণামে নিষ্ফল হইবে। 

সাত. বিখ্যাত সাহিত্যিক থেচারে বলিয়াছেন, ‘ছাপার মেশিনের মতো সংবাদপত্র নিজেও একটা ইঞ্জিন। সকল যন্ত্রপাতির ঐক্য ও সংহতি অন্যান্য ইঞ্জিনের মতো প্রেস ইঞ্জিনেরও অত্যাবশ্যক বটে, কিন্তু তার উপরেও প্রেস ইঞ্জিনে দরকার ইনটেলেকচুয়াল ইউনিটি’।’’

সংবাদপত্র একটা বৌদ্ধবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান। সুতরাং এখানে যা কিছুই উৎপাদিত কিংবা সংঘটিত হোক তার সবটাতেই বুদ্ধির ছাপ ও চর্চা থাকা জরুরি। এর অনুপস্থিতি বা চর্চা ব্যতীত কোনো সংবাদপত্রই সমাজ-রাষ্ট্রে এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত হয়ে উঠতে পারে না। এ কারণে আবুল মনসুর আহমদ যে ‘ইনটেলেকচুয়াল ইউনিটি’র কথা বলেছেন সেটা একটা সংবাদপত্রের ‘ইন্ডাস্ট্রি’ হয়ে ওঠার জন্য ‘চাবিকাঠি’ বিশেষ। যা তার কালে সত্য ছিল, আজও রয়েছে।

আবুল মনসুর আহমদের উদ্যম, উদ্ভাবনী শক্তি, সৃজনশীলতা, তীক্ষ্ণধী মনন ও যৌক্তিক মানস সংবাদপত্র শিল্পকে দিয়েছিল জাত্যভিমানের গৌরব ও ‘ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে টিকে থাকার মর্যাদা মুদ্দত। সংবাদপত্র শিল্পকে ‘ইন্ডাস্ট্রি’ রূপে গড়ে তোলার পাশাপাশি ‘সংবাদ চেতনা’ দ্বারা নবজীবন দান করেছিলেন। তার সমসময়ের শ্রেষ্ঠ সাপ্তাহিক খবরের কাগজ ‘বঙ্গবাসী’তে একবার এমন খবরও লেখা হয়েছিল, ‘সভায় কতিপয় ভদ্রলোক ও অনেক মুসলমান যোগ দিয়েছিলেন।’ উনি এর প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। উনি কখনই সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। কিন্তু সবার মর্যাদা রক্ষাকল্পে এবং সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতিটি বর্গে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় ও সাম্য অনুশীলনের পদক্ষেপে শিরদাঁড়া সোজা রাখায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করতেন সবাইকে সমঅধিকার দেয়ার মধ্যে রয়েছে মানবিকবোধের প্রকাশ। সাংবাদিকতায় উনার পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যাশা ছিল হিন্দুরা তো এক্ষেত্রে সামনের সারিতে রয়েছেন। এখন সবার দায়িত্ব হলো মুসলমানদেরও এগিয়ে নেয়া। কোনো একটা ক্ষেত্রে দেশের একক কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় যদি এগিয়ে যায় কেবলই, তাহলে সেখানে যে ‘সমতা’র চর্চা হয় না, সে কথা বলা বাহুল্য। এ লক্ষ্যেই তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছেন সাংবাদিকতায় বাঙালি মুসলমানও এগিয়ে আসুক, অন্যদের সমান্তরালে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে নিক। এ দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি মুসলমানের সাংবাদিক হওয়ার কণ্টকাকীর্ণ জমিনকে করেছেন কুসুমাস্তীর্ণ। তিনি লিখেছেন, ‘হিন্দু সংবাদপত্রে মুসলিম শিক্ষার্থীদের চান্স ছিল না।’ উনার প্রযত্নের অনেক সাংবাদিকই পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক হিসেবে খ্যাত হয়েছেন, সংবাদপত্র শিল্পে গৌরবজনক অবদান রেখেছেন। এঁদের কয়েকজন হলেন (‘আত্মকথা’য় উনি যেভাবে লিখেছেন): মি. ওয়ালী উল্লাহ, মি. মোহাম্মদ মোদাব্বের, মি. জনাব আলী, মি. খোন্দকার ইলিয়াস, মি. কে. জি. মোস্তফা, মি. সিরাজুদ্দীন হোসেন, মি. রশীদ করীম, মিস হাযেরা খাতুন, মিস মরিয়ম খানম, কবি আহসান হাবীব, মি. রুকনুযযামান খান, মি. মোহাম্মদ নাসির আলী, মি. কাযী মোহাম্মদ ইদ্রিস, মি. তালেবুর রহমান, মি. খোন্দকার আবদুল হামিদ, মি. জহুরুল হক, কবি গোলাম কুদ্দুস, মি. এম. শাহাবুদ্দীন প্রমুখ।

আবুল মনসুর আহমদ জন্মেছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় খ্রিস্টাব্দ ১৮৯৮-এর ৩ সেপ্টেম্বর। ইহজাগতিকতার বর্ণিল ও বিরল অধ্যায় সমাপ্ত হয় খ্রিস্টাব্দ ১৯৭৯-এর ৩ মার্চ। তিনি ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়ের কয়েক দশকের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। পেশার কারণে এ সময়ের প্রায় পুরোটাই কাটিয়েছেন শহর কলকাতায়। যে শহর তখন অবিভক্ত ভারতের কেন্দ্রীয় রাজধানীর গৌরব হারালেও অবিভক্ত যুক্ত বঙ্গের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ছিল সবকিছুর কেন্দ্রে। এ শহরেই আবুল মনসুর আহমদের সাংবাদিকতার শুরু। সক্রিয় ও পেশাদার সাংবাদিকতার দাঁড়িও পড়ে এখানে। শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন ময়মনসিংহে। শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় আইএ ও বিএ পর্বে থেকেছেন ঢাকায়। আট দশকের জীবনরেখার তারুণ্যদীপ্ত ও সাংবাদিক-সম্পাদকতার কর্মমুখর অধ্যায়ের সাক্ষী কলকাতা। এ কলকাতাকে আবর্তন করে ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে হিন্দু কলেজ (১৮১৭) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইতালীয়-ইউরোপীয় নবজাগরণের মতো প্রাতিস্বিক এক নবজাগরণ ঘটে, সর্বজনে যা বাংলার রেনেসাঁ বা বেঙ্গলি রেনেসাঁ হিসেবে পরিচিত। 

বেঙ্গলি রেনেসাঁর সীমাবদ্ধতা বা দুর্বলতার কারণে এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতায় বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গে একটা নবজাগরণ বা রেনেসাঁ সংঘটিত হয়। যার নাম ‘বাংলাদেশের নবজাগরণ’ বা ‘বাংলাদেশের রেনেসাঁ’। এই নবজাগরণ ১৯২১ থেকে ১৯৭১ অবধি সময়ে তিন পর্বে বিভাজিত হয়ে—এক. সূচনা পর্ব, দুই. বিকাশ পর্ব ও তিন. নির্মাণ পর্বের মধ্য দিয়ে তার মহত্তম অভিপ্রায় সম্পন্ন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নবজাগরণের সূচনা হয় এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের মধ্য দিয়ে তার পূর্ণতা ঘটে।

বাংলাদেশের নবজাগরণের দার্শনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় যারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন আবুল মনসুর আহমদ সেই সব মনীষার অন্যতম। সাংবাদিকতা-সম্পাদকতা ও বহুমাত্রিক লেখালেখির মধ্য দিয়ে এবং পরবর্তী সময়ে সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে রেখে গেছেন সক্রিয় ও দিকনির্দেশক ভূমিকা। বাংলা ও বাঙালির জন্য সমৃদ্ধ এক অতীত। আজকের বাংলাদেশ যদি ভাষার প্রশ্নে, সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক স্বাধীনতায়, গণতন্ত্রচর্চায়, অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থানে, বাক্‌স্বাধীনতার অধিকারে, মানবিকতা সমুন্নতকরণে, নৈতিকতা ও ন্যায্যতাভিত্তিক মহত্তম এক বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায় উপনীত হতে চাই তাহলে আবুল মনসুর আহমদ পাঠ কেবল জরুরি নয়, আবশ্যক। তিনি কেবল জাতীয়তাবাদী নন, স্বাতন্ত্র্যবাদীও ছিলেন। যেকোনো পরাধীন জাতির জন্য জাতীয়তাবাদী হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি স্বাধীন জাতির জন্য স্বাতন্ত্র্যবাদী হওয়া কতটা অপরিহার্য তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। কেবল উপলব্ধি করেননি, কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায়, কিসের ভিত্তিতে, কোন অবস্থানসমূহের ওপর দাঁড়িয়ে একটা জাতি-দেশ স্বাতন্ত্র্যবাদী হয়ে উঠতে পারে এবং তার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদে কী অর্জিত হয় তার ‘এ টু জেড’ বলে গেছেন তিনি। 

আবুল মনসুর আহমদ সাংবাদিকতা ও সম্পাদকতাকে সাধনা হিসেবে নিয়েছিলেন। যেখানে মানুষ-সমাজ-রাষ্ট্রের কল্যাণই ছিল ‍মুখ্য বিবেচনা। সাংবাদিকতা-সম্পাদকতাকে ব্রতরূপে, পবিত্র জ্ঞানে ভালোবেসেছেন-শ্রদ্ধা করেছেন এবং সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। যে দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে তিনি নাগরিক সমাজ, মানবতাবাদ ও বাক্‌স্বাধীনতার প্রশ্নকে সমুন্নত করতে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে গেছেন। যা বাংলা সংবাদপত্রকে ও বাঙালি মুসলমানের সাংবাদিকতাকে যেমন উচ্চকিত করেছে, তেমন উনাকে দিয়েছে বাংলাদেশের নবজাগরণের দার্শনিক ভিত্তিভূমি প্রতিষ্ঠার মহিমা ও মর্যাদা। আবুল মনসুর আহমদের সম্পাদনায় ‘ইত্তেহাদ’ স্বল্প সময়ের মধ্যে পাঠকপ্রিয় একটি পত্রিকায় পরিণত হয়। এর নেপথ্যের কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন আত্মকথায়: ‘ইত্তেহাদ’ অল্পদিনেই খুব জনপ্রিয় হইয়া উঠে। ইহার প্রচার সংখ্যা অনেক-পুরাতন দৈনিকের দুই তিন গুণ হইয়া যায়। প্রায় পঁচিশ বছর সাংবাদিকতার সহিত সংশ্লিষ্ট থাকিয়া এবং এ সম্পর্কে বিদেশী বই পুস্তক ও সংবাদপত্র পড়িয়া সাংবাদিকের দায়িত্ব সম্পর্কে আমার সামান্য যা কিছু জ্ঞান লাভ হইয়াছিল, তার সবটুকু ‘ইত্তেহাদে’ প্রয়োগ করিবার চেষ্টা আমি করিয়াছিলাম।

‘ইত্তেহাদ’ সত্যিকারার্থে আবুল মনসুর আহমদের সাংবাদিকতা-সম্পাদকতা জীবনকে পূর্ণতা দান করে এবং এখানেই তিনি সংবাদপত্রকে ‘ইন্ডাস্ট্রি’করণে যোগ্যতার পরিচয় দেন, সার্থক হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেটাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এর মধ্যে ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটো স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটে। ‘ইত্তেহাদ‘ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হলেও তার পাঠক ছিল মূলত পূর্ববঙ্গের মানুষ। সে কারণে ‘ইত্তেহাদ’কে স্বাধীন পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের চেষ্টা করা হয় বারবার। কিন্তু অফিসের জন্য একটু জায়গা দেয়া হয়নি। এমনকি পূর্ববঙ্গের প্রবেশাধিকারও বন্ধ করে দেয়া হয়। নাজিমুদ্দিন সরকারের রোষানল ও অসহযোগিতা এবং অনৈতিক ও অন্যায্য আচরণের কারণে ‘ইত্তেহাদ’-এর প্রকাশ হুমকির মুখে পড়ে। নানামুখী সংকট-বৈরিতা ও বাধাগ্রস্ততায় ‘ইত্তেহাদ’-এর অকালমৃত্যু হয় ১৯৫০-এর গোড়ার দিকেই। এর মধ্য দিয়ে আবুল মনসুর আহমদের সক্রিয় সাংবাদিকতা-সম্পাদকতা জীবনেরও ইতি ঘটে। পরবর্তী দুই যুগ তিনি একজন কলাম লেখক হিসেবে সাংবাদিক সত্তাকে সচল ও অর্থবহ করে তোলেন।

আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত ‘ইত্তেহাদ’ পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের অনুমতি না পেলেও পূর্ব পাকিস্তানে বিংশ শতাব্দীর পাঁচ-এর দশকে যে সাংবাদিকতার চর্চা শুরু হয় তাতে এর প্রভাব রোধ করা যায়নি, সেটা সম্ভবও না। ‘ইত্তেহাদে’র দেখানো পথেই সবাই হেঁটেছেন, সমৃদ্ধ হয়েছেন। পত্রিকার নামকরণ থেকে শুরু করে এর পরিচালন কৌশল, উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগকৃত মূলধনের লাভজনক ভাবনা, অঙ্গসজ্জা, বিভাগ-বিন্যাস, ভাষার প্রয়োগ, সম্পাদকীয় নীতিনির্ধারণ, পত্রিকার কাগজ ও আঙ্গিক, প্রকাশনা ও বিতরণ ব্যবস্থা সর্বত্র ‘ইত্তেহাদ’-এর ছায়া এসে পড়ে, সেটা যৌক্তিকও বটে। ‘ইত্তেহাদ’ একটা মানসম্পন্ন, প্রভাবশালী, পাঠকপ্রিয় ও ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক পত্রিকার বৈশিষ্ট্য গুণাবলি ও গুণাবলি কী হওয়া উচিত তার মানদণ্ড ও চর্চার যে নমুনা হাজির করেছিল একদা তার অনুশীলন ও অনুসরণ জারি আছে আজ অবধি, থাকবে আগামীতেও। এসবের মধ্যেই নীরবে-নিভৃতে আবুল মনসুর আহমদের সাংবাদিকতার প্রাসঙ্গিকতা দেদীপ্যমান রয়েছে।

ড. কাজল রশীদ শাহীন: সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও গবেষক

আরও