প্রাথমিক স্বাস্থ্য হচ্ছে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী, তা তার প্রাথমিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো দেখে বোঝা যায়। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ যেসব দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অতি শক্তিশালী, সেসব দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যের বুনিয়াদও অনেক মজবুত। ১৭৬৪ সালে বেঙ্গল মেডিকেল ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বেঙ্গলে তথা ভারতবর্ষে আধুনিক চিকিৎসাসেবার প্রচলন হলেও পুরো ব্রিটিশ আমল এবং পাকিস্তানি আমল শেষেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭২-১৯৭৮ যা ১৯৮০ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়) প্রাথমিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়, যা ১৯৭৮ সালে আলমাআতার ‘সবার জন্য স্থাস্থ্য’ ঘোষণার মূলনীতির সঙ্গে মিলে যায়। এ পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রত্যেক থানায় ৩১ শয্যাবিশিষ্ট একটি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপিত হয়, যা বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত। ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমেও গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮ সালে প্রতি ছয় থেকে আট হাজার জনগণের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন এবং ২০১০ সালে কমিউনিটি ক্লিনিকের পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়। বর্তমানে গ্রাম থেকে শুরু করে জেলা পর্যন্ত স্বাস্থ্য অবকাঠামোর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বিদ্যমান। তবে বর্তমান বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো পুরোপুরি ঢেলে সাজানো দরকার।
অন্যদিকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় বিভাগীয় শহরে (সিটি করপোরেশন এলাকায়) অবস্থিত হলেও শহর এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কোনো সুসংগঠিত অবকাঠামো নেই। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ এবং চারটি বিভাগীয় শহরে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা) ৩৬টি আরবান ডিসপেন্সারি হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নগরের জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর স্বাস্থ্যসেবা নামে (বর্তমানে যা আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট-২ নামে পরিচিত) একটি প্রকল্প ১৯৯৮ সালে শুরু হয়ে ২২ বছর ধরে চলমান। বর্তমানে প্রকল্পটি ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ১৩টি পৌরসভায় সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান পর্যায়ের মেয়াদ শেষে ২০২২ সালের পরে এর মেয়াদ আর বাড়বে না।
এ প্রকল্প স্বানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থাৎ সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে সরাসরি বাস্তবায়ন না করে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের আদলে এনজিওর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করায় এত দীর্ঘ মেয়াদকালীন বাস্তবায়নের পরেও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের কোনো সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। তাছাড়া পেমেন্ট পদ্ধতিসহ কাঠামোগত নানা দুর্বলতা এবং দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কারণে জনগণও কাঙ্ক্ষিত সেবা পায়নি। তাই নগরের দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অনেকটাই ওষুধ দোকাননির্ভর। অন্যদিকে নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে অভিজাত শ্রেণীর মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ব্যক্তি খাতকেন্দ্রিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকনির্ভর। সূর্যের হাসি নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, আদ দ্বীন, মেরী স্টপসসহ কিছু এনজিও নগর এলাকার স্বাস্থ্যসেবাদানে সচেষ্ট হলেও তাদের সেবা কেন্দ্রের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে সন্ধ্যাকালীন খোলা না থাকার কারণে নগরের শ্রমজীবী মানুষের এসব সেবা কেন্দ্র থেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ নেই। তাই নগরের প্রায় ৮৫ শতাংশের অধিক মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল।
যদিও বর্তমানে ৩৬ শতাংশের বেশি মানুষ নগরে বসবাস করে, তবুও নগরের মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কে প্রদান করবে, তার স্থায়ী মীমাংসা এখনো হয়নি। সরকারের রুলস অব বিজনেস ও অ্যালোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী সারা দেশের জনগণের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার দায়িত্ব স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। সামগ্রিকভাবে সরকার ও জনগণের ধারণাও তাই। কেননা চলমান করোনা পরিস্থিতি এবং বিগত সময়ে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সব ব্যর্থতার দায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই বহন করতে হয়েছে।
অন্যদিকে ২০০৯ সালের সিটি করপোরেশন আইন এবং ২০১০ সালের পৌরসভার আইনে অন্যান্য সেবার মতো স্বাস্থ্যের দায়িত্বও সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে দেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ এক দশক পার হওয়ার পরও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের তেমন কোনো মনোভাব তাদের মধ্যে তৈরি হয়নি। আর সেজন্যই সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বাজেটে স্বাস্থ্যের জন্য তেমন কোনো বরাদ্দ থাকে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও জনবলের অভাবে তা অনেকটাই অচল। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে থাকা সত্ত্বেও ক্যারিয়ার বিকাশের সুযোগ না থাকায় অনেকেই এখানে নিয়োগ পেতে ইচ্ছুক নন। পৌরসভাগুলোয়ও একই অবস্থা বিরাজমান। প্রতিটি পৌরসভায় মেডিকেল অফিসারের একটা পদ থাকলেও বেশির ভাগ পৌরসভায় পদটি খালি রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো ক্যারিয়ার বিকাশের সুযোগ না থাকায় এ পদে নিয়োগ পাওয়া বেশির ভাগ ডাক্তার চাকরি ছেড়ে দেন। একই অবস্থা পুলিশ ও রেলওয়ে হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত সব হাসপাতালে। সরকারি কর্মচারী হাসপাতালও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই এটা স্পষ্ট যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চালানো সম্ভব না। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব নিতে হবে। আর এজন্য দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
মন্ত্রণালয় পর্যায়ে নগর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনেক সভা ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হলেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ফয়সালার দ্বার এখনো উন্মোচিত হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ধারণা নগর এলাকায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সহযোগিতা ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব নয়। আর যদিও আইন অনুযায়ী নগরের মানুষের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার ওপর বর্তায়, একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে নগর এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক ২২ বছর ধরে নগর স্বাস্থ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এ ধারণা জন্মেছে এবং পাকাপোক্ত হয়েছে। বিষয়টা মীমাংসা করার তেমন কোনো প্রচেষ্টা এখনো পরিলক্ষিত হয়নি। উল্লেখ্য, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার কর্মপরিধি অনেক ব্যাপক বিধায় এর আওতাভুক্ত অনেক কাজ অন্যান্য মন্ত্রণালয়/দপ্তর কর্তৃক সম্পাদিত হয়। আর নগরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্পাদিত হওয়া যুক্তিসংগত। তাই এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা কর্তৃক আহ্বান জানানো উচিত।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ নগরে বসবাস করবে। তাই নগরের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৩ নম্বর লক্ষ্যসহ কোনো লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। আর যেহেতু স্বাস্থ্যের কোনো সূচক কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই জবাবদিহি করতে হয়, তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে নগরের মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সচেষ্ট হওয়া। প্রয়োজনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আশ্রয় নেয়া। করোনা মহামারী রাজনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলকে নিশ্চয় স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা এবং তা নিরসনে করণীয় বিষয় উপলব্ধি করাতে সক্ষম হয়েছে। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে বিষয়টির একটি স্থায়ী সুরাহা করতে পারে।
উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় সাম্প্রতিককালে ন্যাশনাল আরবান হেলথ স্ট্র্যাটেজির চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করেছে, যেখানে নগর এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সম্ভাব্য সব উপায় কর্মপরিকল্পনাসহ লিপিবদ্ধ করা রয়েছে। এ স্ট্র্যাটেজিতে উল্লিখিত সুপারিশ (যেমন সরকারি হাসপাতালে সন্ধ্যাকালীন বহির্বিভাগ সেবা চালু করা, ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক আরবান ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা, আশ্রয়হীন এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্য মোবাইল ক্লিনিক চালু করা) সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে নগর স্বাস্থ্যের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়