এ মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) জগতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। এআইকে আরো দ্রুত ও শক্তিশালী করে তোলার জন্য যারা একে অন্যের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, তাদেরই কেউ কেউ এখন বলছেন—একটু থেমে ভাবা দরকার।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সম্প্রতি এআই উন্নয়নের গতি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার বক্তব্যের মূল কথা, প্রযুক্তির সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতিও এগোচ্ছে কিনা সে প্রশ্ন এখন জরুরি। ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিস এবং মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলাসহ এআই খাতের আরো অনেক শীর্ষ ব্যক্তিও দ্রুত অগ্রগতির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অল্টম্যান আরো জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে ওপেনএআই কোনো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে না। তার মতে, বর্তমান নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এ মুহূর্তে সেটি উপযুক্ত নয়।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই যে তারা এআইয়ের বাইরের কোনো সমালোচক নন; তারাই এ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় নির্মাতা এবং এর ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। একই গ্রাহক, বিনিয়োগ ও মেধাবী কর্মীর জন্য যারা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন, তাদের কেউ যখন বলেন যে এ দৌড়ের গতি নিয়েও ভাবা দরকার, তখন বিষয়টি সহজে উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। কিন্তু হঠাৎ এ উদ্বেগ কেন?
যে জায়গায় বদলে যাচ্ছে এআই: আমোদেইয়ের আশঙ্কার একটি দিক বেশ চমকপ্রদ। তার মতে, এআইয়ের সক্ষমতা এমনভাবে বাড়ছে যে তাড়াতাড়িই শত শত বা হাজার হাজার এআই এজেন্ট সমন্বিতভাবে কাজ করে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালানোর ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
আসলেই, এআই এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তাকে শুধু প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়—এমন ধারণা পুরনো হয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের এআই পরিকল্পনা করতে, সফটওয়্যার ব্যবহার করতে, তথ্য সংগ্রহ করতে এবং একের পর এক কাজ সম্পন্ন করতে পারে। অর্থাৎ প্রতিটি ধাপে মানুষের নির্দেশের প্রয়োজন ক্রমেই কমছে। এখানেই সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
ধরা যাক, একটি এআইকে কোনো প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার, আর্থিক তথ্য বা সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করার অনুমতি দেয়া হলো। সে দ্রুত কাজ করতে পারবে—এটি সুবিধা। কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সেই ভুলও একই গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি চ্যাটবটের ভুল উত্তরের ক্ষতি এক রকম; আর একটি স্বায়ত্তশাসিত এআইয়ের ভুল সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানের অর্থ, তথ্য বা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।
আরো বড় প্রশ্ন হলো, এআই কি একদিন নিজেই নিজের উন্নয়নে বড় ভূমিকা নিতে পারবে? প্রযুক্তিবিদরা যাকে ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ বলেন, সেটি বাস্তব হলে উন্নয়নের গতি আরো বাড়তে পারে। তখন মানুষের পক্ষে এআই কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে এবং কোথায় তাকে থামাতে হবে—এসব বোঝা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আমোদেই অবশ্য এআই উন্নয়ন বন্ধ করার কথা বলেননি। তার মূল বক্তব্য অনেক বেশি বাস্তবসম্মত—প্রযুক্তির গতি যতটা বাড়ানো হচ্ছে, নিরাপত্তা তৈরিতেও ততটাই মনোযোগ দিতে হবে। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয় যেন নিরাপত্তাকে দ্বিতীয় সারিতে ঠেলে না দেয়।
ভুলটা যে কারণে হয়: এআই নিয়ে একটি ভুল ধারণা হলো—শক্তিশালী মডেল মানেই নির্ভুল মডেল। বাস্তবে তা নয়। এআইয়ের ফলাফল নির্ভর করে ডেটা, মডেলের নকশা, নির্দেশনা বা প্রম্পট এবং প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপটের ওপর। মানুষের বিচারবুদ্ধিও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ডেটা ভুল, অসম্পূর্ণ, পুরনো বা পক্ষপাতদুষ্ট হলে এআইয়ের সিদ্ধান্তও দুর্বল হতে পারে। জেনারেটিভ এআই আবার এমন তথ্য তৈরি করতে পারে, যা দেখতে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য, কিন্তু বাস্তবে ভুল। ভুল পরিসংখ্যান, বানানো সূত্র বা অস্তিত্বহীন তথ্যের উদাহরণ আমরা এরই মধ্যে দেখেছি।
প্রেক্ষাপটের অভাবেও সমস্যা হতে পারে। কয়েক বছরের বিক্রয়-তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি এআই হয়তো উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিল। কিন্তু সে জানে না, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় ক্রেতা অর্ডার বাতিল করেছেন। একজন অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক এ তথ্য জানেন। তাই হিসাব ঠিক হলেও সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে।
অর্থাৎ এআই যত বুদ্ধিমানই হোক, তার সিদ্ধান্তের মান শুধু মডেলের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে তাকে কী তথ্য দেয়া হয়েছে, কী নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং মানুষ তার ফলাফল কতটা যাচাই করছে তার ওপরও।
বাংলাদেশের জন্য সতর্কতার কারণ: আমরা যদি উন্নত এআই ব্যবহার করতে চাই, শুধু ভালো সফটওয়্যার কিনলেই হবে না। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ডেটা, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল এবং এমন ব্যবস্থাপনা, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য মানুষ দায়ী থাকবে।
আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানে তথ্য এখনো বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত হয়। এক বিভাগে এক ধরনের ফরম্যাট, অন্য বিভাগে আরেকটি। কোথাও তথ্য বাংলায়, কোথাও ইংরেজিতে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য পুরনো, অসম্পূর্ণ বা অগোছালো। ফলে সমস্যা শুধু ডেটার অভাব নয়; ভালো মানের, নির্ভরযোগ্য ও সুশাসিত ডেটার অভাবও বড় সমস্যা।
এ ভিত্তি শক্ত না করে এআইয়ে বড় বিনিয়োগ করলে ফল উল্টো হতে পারে। ভুল তথ্যকে আরো দ্রুত বিশ্লেষণ করা হবে এবং আরো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল সিদ্ধান্ত সামনে আসবে।
তাই বাংলাদেশের সামনে আসল প্রশ্ন এআই গ্রহণ করা হবে কিনা তা নয়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে গ্রহণ করলে এর সুফল পাওয়া যাবে এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তাড়াহুড়ো নয়, আবার পিছিয়েও থাকা নয়
যেখানে এআই দ্রুত উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে এবং ঝুঁকি সীমিত, সেখানে এগোনো দরকার। কিন্তু মানুষের জীবিকা, আর্থিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য বা জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।
সরকারকে এআই ব্যবহারের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিগত কাঠামো তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি, শিল্প, সাইবার নিরাপত্তা, আইন, অর্থনীতি ও শিক্ষার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় এআই নিরাপত্তা ও সুশাসন পরিষদ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এর কাজ এআইয়ের গতি থামানো নয়, বরং কোন ক্ষেত্রে কতটা ঝুঁকি রয়েছে, কোথায় মানুষের তদারকি প্রয়োজন, কীভাবে তথ্য সুরক্ষিত থাকবে এবং গুরুতর ভুল হলে দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব বিষয়ে কাঠামো তৈরি করা।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এআই ব্যবহারের আগে তাদের কিছু প্রশ্ন করা উচিত। ডেটা কি নির্ভরযোগ্য? কর্মীরা কি প্রযুক্তিটি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত? গ্রাহকের গোপনীয় তথ্য কি সুরক্ষিত? গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষ কি শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হবে: ‘আমরা কোথায় এআই ব্যবহার করতে পারি?’—এর আগে জিজ্ঞাসা করা উচিত, ‘আমাদের কোন সমস্যার সমাধান দরকার এবং সেই সমস্যার জন্য এআই কি সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ উপায়?’
পিছিয়ে নয়, প্রস্তুতি নিয়ে: এআই নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা থামবে না, বরং আরো বাড়বে। বাংলাদেশও এ প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থাকতে পারবে না। উৎপাদন, রফতানি, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সরকারি সেবা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই ধীরে ধীরে অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
কিন্তু শুধু এআই কিনে বা ব্যবহার করে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। আসল প্রশ্ন এআই আমাদের চাকরি নেবে কিনা, শুধু সেটি নয়। আরো বড় প্রশ্ন হলো আমরা কি দায়িত্ব এআইকে দিয়ে দিচ্ছি, যা সামলানোর মতো ডেটা, অবকাঠামো, দক্ষতা ও সুশাসন এখনো আমাদের নেই?
এআইয়ের ভবিষ্যৎ হয়তো আরো দ্রুত, আরো শক্তিশালী এবং আরো স্বায়ত্তশাসিত হবে। তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এআইয়ের দৌড় থেকে পিছিয়ে না পড়া—কিন্তু দৌড়ানোর আগে নিজের পা শক্ত করে নেয়া।
প্রযুক্তির গতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কিন্তু সেই গতি কীভাবে, কোথায় এবং কতটা কাজে লাগাব—সেই সিদ্ধান্তটি এখনো আমাদের হাতে।
এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও প্রাক্তন উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ