এত বড় একটা গণ-অভ্যুত্থান করেও আমরা এতটুকু এগিয়েছি বলে মনে হচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মবতন্ত্র, পত্রিকা অফিস ও দেশের সংস্কৃতির ওপর হামলা এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দলীয় ভিসি কর্তৃক শত শত অবৈধ নিয়োগ-নৈরাজ্য আমাদেরকে প্রতিনিয়ত হতাশ করছে। আমরা মুখে গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লব বলে নিজেরা কিছুটা আহ্লাদিত বোধ করি, কিন্তু যার সন্তান প্রাণ দিল তার একদিনের কষ্ট আমরা কেউ নিতে পারব না। অথচ যেই উদ্দেশ্যে প্রাণ বলি তার কতটুকু আমরা অর্জন করলাম তা সচেতন নাগরিক হিসেবে ভাবিয়ে তুলছে।
শুধু গত ১৫ মাসে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের দিকে নজর দিলেই আমরা হতাশায় ডুবে যাই। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, এ শিক্ষালয়ে বর্তমান ভিসি গত ১৫ মাসে নিয়োগ দিয়েছেন ৪০৩ জন শিক্ষক-কর্মচারী আর বিগত বিতর্কিত ভিসি ইফতেখারের আমলে চার বছরে নিয়োগ পেয়েছিলেন ৪৯৯ জন। সময়ের হিসেবে বর্তমান ভিসির নিয়োগ বিগত ভিসির নিয়োগের দ্বিগুণেরও বেশি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বর্তমান ভিসি দ্রুত নিয়োগে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ১৫ বছরের মোট নিয়োগকে লক্ষ্য ধরে এগোচ্ছেন যেখানে প্রো-ভিসির মেয়েও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ইতিহাসের সেই তুঘলকি কাণ্ডই যেন সচেতন জনগণ প্রত্যক্ষ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অনুমতি সাপেক্ষে নিয়োগ বৈধ হলেও কেউ নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করছেন না, বরং সবাই দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে স্বার্থ হাসিলে তৎপর। যারা এ অনিয়মে সহযোগিতা করছেন তারা কি বিগত স্বৈরাচারী আমলের ভিসিদের অপকর্ম নিয়ে কথা বলার নৈতিক অধিকার রাখেন? এ সরকার এসেই বিগত আমলের দুর্নীতিগ্রস্ত ভিসিদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারত, তাহলে অন্তত ভিসিরা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতেন না। কিন্তু সরকার সে পথে না হেঁটে নতুনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয়করণের সুযোগ দিয়েছে যা অনাকাঙ্ক্ষিত। সরকারের শেষ সময়েও নিয়োগের একটি সুষ্ঠু নীতিমালা হয়েছে বলে শুনিনি যেখানে উপদেষ্টা পরিষদে একগুচ্ছ খ্যাতিমান শিক্ষক রয়েছেন। আর ইউজিসির কাজটাই বা কী বোঝা দুরূহ যা শুধু সাক্ষী গোপালের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, যেখানে একজন অশীতিপর বৃদ্ধ অধ্যাপককে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
দলীয়করণের বিরুদ্ধে এত বড় পরিবর্তন হলো, কিন্তু দলবাজি বন্ধ হলো না। তাহলে দল নিরপেক্ষ যোগ্যলোক কীভাবে যোগ্যস্থানে বসবে এবং দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনই কীভাবে আসবে! বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় এবং নির্বাচিত ছাত্ররাও এ দলবাজিতে সমর্থন দিচ্ছেন যা চব্বিশের জুলাইয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা অন্য দলের শিক্ষকদের মব সৃষ্টি করে পদত্যাগ করাচ্ছেন এবং শিক্ষা কার্যক্রম থেকে জোর করে বিরত রাখছেন। আবার নিজ দলীয় শিক্ষকদের অপকর্মে নীরব সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ ছাত্রদের উচিত ছিল নতুন ব্যবস্থায় যোগ্যতার পক্ষে দাঁড়ানো। মনে রাখতে হবে, দুর্নীতি সবসময় আত্মঘাতী যা কোনো না কোনো সময় নিজেদের আঘাত করবে। আজকে অবৈধ নিয়োগে ছাত্ররা নীরব সমর্থন দিলে আগামী দিনে তাদের নিজেদের ভাইবোন এবং আত্মীয়স্বজনরা এসব অযোগ্য শিক্ষক দ্বারা সঠিক শিক্ষা পাবে না। এসব অকাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে টাকা নষ্ট হবে তা বাঁচিয়ে হলের খাবার-দাবারের উন্নয়ন এবং গবেষণা সরঞ্জাম উন্নত করার জন্য ছাত্ররা ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, কেন বর্তমান অরাজনৈতিক সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিরপেক্ষ রাখতে পারল না! গত চারটা অরাজনৈতিক সরকারের শাসন আমল তো এত দলবাজি, দুর্নীতি, মবতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি! এখন তো সরকারের বিমান থেকে গম ক্রয় নিয়ে পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন তুলছে যা আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের কাছে কষ্টদায়ক। তাই ভাবি, মানুষ শুধু খ্যাতিমান হলেই বড় হয় না বরং নীতিনৈতিকতা ও বিবেকবোধে বড় হতে হয়।
নুরুল আমিন: প্রাক্তন ছাত্র, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়