নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বাংলাদেশ একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাটারি সংযুক্ত রুফটপ সোলার ব্যবস্থার জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। নতুন এ ব্যবস্থায় ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রুফটপ সোলার ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে ভোক্তারা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন। সরকার সর্বোচ্চ উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ধরে এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে এ ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে।
এটি একটি ইতিবাচক নীতিগত পদক্ষেপ, যা স্বাগত জানানোর মতো। এ প্রণোদনা রুফটপ সোলারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াবে, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা কমাবে এবং আবসিক, ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তাদের ছাদকে অব্যবহৃত জায়গা হিসেবে না দেখে উৎপাদনশীল জ্বালানি সম্পদ হিসেবে ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এমন এক সময়ে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনো আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। সৌরবিদ্যুৎ রাতারাতি এসব ঝুঁকি দূর করতে পারবে না, প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকেও পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। তবে এটি আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসে বৈচিত্র্য আনতে পারে। একবার স্থাপন করা হলে একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। অবশ্য সময়ের সঙ্গে এর উৎপাদনক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশের আয়ুষ্কালও এক নয়।
এ কারণে প্রণোদনা ব্যবস্থায় ব্যাটারি সংযুক্ত করার সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুতের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা হলো, সূর্যের আলো বিদ্যুতের চাহিদার সময় অনুযায়ী পাওয়া যায় না। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি হলেও অধিকাংশ পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে সন্ধ্যার দিকে। ব্যাটারি দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে পরে ব্যবহারের সুযোগ দেয়। রুফটপ সোলারের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়লে ব্যাটারি সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনের ওঠানামা সামাল দিতে এবং বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের ওপর চাপ কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। সরকার বলছে, নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের জন্য ভোক্তারা প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন। প্রশ্ন হলো, একটি সাধারণ পরিবার বাস্তবে কতটা উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে?
এমন ধারণা করা ঠিক হবে না যে রুফটপ সোলার স্থাপন করলেই প্রতিটি পরিবার নিজেদের শতভাগ বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করতে পারবে। একটি পরিবার কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে, তা নির্ভর করে ছাদের আয়তন, ব্যবস্থার সক্ষমতা, সূর্যালোকের পরিমাণ, ছায়া পড়ার মাত্রা, ছাদের অবস্থান ও দিক, পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে রুফটপ সোলারের প্রধান সুবিধা হবে গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানো; উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করা নয়।
ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউএবল এনার্জি প্লাটফর্মের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ১০ শতাংশ পরিবার যদি ১ থেকে ৫ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার রুফটপ সোলার ব্যবস্থা স্থাপন করে, তাহলে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট-পিক সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে এবং দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ পূরণের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। জাতীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বোঝাতে এ হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি পরিবার নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার ১৫ শতাংশ উৎপাদন করতে পারবে।
প্রণোদনা ব্যবস্থার নকশার ক্ষেত্রে এ পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি আর্থিক সুবিধা মূলত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রির ওপর নির্ভর করে, তাহলে কোন ধরনের ভোক্তা বাস্তবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, তা নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে। কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ব্যবহারকারীর বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন পরিবারের তুলনায় ভিন্ন। তাই প্রণোদনা থেকে কারা বাস্তবে বেশি উপকৃত হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। একই সঙ্গে দেখতে হবে, এ সুবিধা সাধারণ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, নাকি মূলত বিনিয়োগের সক্ষমতা থাকা সচ্ছল শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
ভারত, শ্রীলংকা ও ভিয়েতনাম থেকে শিক্ষা
আর্থিক সহায়তার সঙ্গে অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থা যুক্ত করলে পরিবার পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো সম্ভব, ভারতের অভিজ্ঞতা তার উদাহরণ। ভারতের মিনিস্ট্রি অব নিউ অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জির পিএম-সূর্য্যঘর: মুফত বিজলি ইয়ুজানার আওতায় ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রুফটপ সোলার কর্মসূচিতে ৫০ লাখের বেশি পরিবার সুবিধাভোগী হয়েছে। কর্মসূচিতে মূলধনি ভর্তুকি, ডিজিটাল প্রক্রিয়াকরণ ও সরাসরি সুবিধা হস্তান্তরের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ভারত সরকার জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২ লাখের বেশি পরিবার উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। একটি নিশ্চিত ক্রয়মূল্য মানুষকে উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থায়ন, সহজ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নির্ভরযোগ্য স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির কার্যকর অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আকর্ষণীয় ট্যারিফ ঘোষণা করলেই ব্যাপক হারে রুফটপ সোলার স্থাপন হবে, এমনটি ধরে নেয়া ঠিক হবে না।
শ্রীলংকার অভিজ্ঞতাও প্রাসঙ্গিক। সেখানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রাধিকারমূলক অর্থায়ন দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রীলংকা সাসটেইনেবল এনার্জি অথরিটি সৌরবিদ্যুৎ সেবা প্রদানকারীদের নিবন্ধন ব্যবস্থা পরিচালনা করে। সংস্থাটি কারিগরি ও ওয়ারেন্টি-সংক্রান্ত শর্ত নির্ধারণ করে এবং কম বিদ্যুৎ উৎপাদন বা দুর্বল বিক্রয়োত্তর সেবার মতো সমস্যায় গ্রাহকদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও রেখেছে। বাংলাদেশেরও এমন সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভোক্তাদের শুধু আকর্ষণীয় ট্যারিফ নয়, সাশ্রয়ী ঋণ, বিশ্বস্ত সরবরাহকারী, মানসম্মত যন্ত্রপাতি, দক্ষ স্থাপনকারী, ওয়ারেন্টি এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও দিতে হবে।
ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। দেশটি প্রথমে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে আকর্ষণীয় ফিড-ইন ট্যারিফ ব্যবহার করেছিল। ২০১৭ সালে গ্রিড সংযুক্ত সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৯ দশমিক ৩৫ মার্কিন সেন্টের ট্যারিফ চালু করা হয় এবং পরে ২০২০ সালে রুফটপ সোলারের জন্য ৮ দশমিক ৩৮ মার্কিন সেন্টের ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়। এ প্রণোদনার ফলে অল্প সময়ে রুফটপ সোলারের সম্প্রসারণ দ্রুত বেড়ে যায়। কিন্তু দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্কের ধারণক্ষমতার ওপর চাপ ও গ্রিড ব্যবস্থাপনার সমস্যা তৈরি হয়। ফলে ভিয়েতনাম ধীরে ধীরে উচ্চ ফিড-ইন ট্যারিফনির্ভর সম্প্রসারণ থেকে সরে এসে নিজস্ব উৎপাদন ও নিজস্ব ব্যবহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
২০২৪ সালে ভিয়েতনাম রুফটপ সোলারের জন্য ‘নিজে উৎপাদন, নিজে ব্যবহার’ ভিত্তিক একটি নতুন কাঠামো চালু করে। এর আওতায় নিজের ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রির সুযোগ রাখা হলেও তা সীমিত ছিল। ২০২৫ সালের নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানি কাঠামোতেও এই self-production and self-consumption ধারণা বজায় রাখা হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুনে ভিয়েতনাম সরকার এ সীমা আরো শিথিল করেছে। নতুন বিধানে নির্দিষ্ট ধরনের রুফটপ সোলার ব্যবস্থার উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে; আগের সীমা ছিল ২০ শতাংশ। গ্রিডের ধারণক্ষমতা ও নিরাপদ পরিচালনার শর্ত পূরণ হলে ২০৩০ সালের শেষ পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশের বেশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রির বিষয়েও পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য দুটি বিপরীতমুখী শিক্ষা দেয়। প্রথমত, আকর্ষণীয় ফিড-ইন ট্যারিফ দ্রুত বিনিয়োগ ও রুফটপ সোলারের বিস্তার ঘটাতে পারে। দ্বিতীয়ত, গ্রিডের ধারণক্ষমতা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন এবং বিতরণ অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে এ সম্প্রসারণ ঘটলে পরবর্তী সময়ে নীতিকে পুনর্গঠন করতে হয়। তাই বাংলাদেশে ১০ টাকা ৫০ পয়সার প্রণোদনা কার্যকর করার পাশাপাশি কোন এলাকায় কতটা রুফটপ সোলার যুক্ত করা যাবে, কোন ফিডারে কতটা বিদ্যুৎ গ্রহণের সক্ষমতা রয়েছে এবং দিনের কোন সময়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে প্রবেশ করবে, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি প্রশ্ন হলো, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ কতটা উদার হওয়া উচিত। ভিয়েতনাম দেখিয়েছে যে নীতিতে প্রথমে একটি সীমা নির্ধারণ করে পরে গ্রিডের সক্ষমতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেই সীমা বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে শুধু ‘নিজের ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত’ ধারণার ওপর নির্ভর না করে; গ্রিডের সক্ষমতা, উৎপাদন ও চাহিদার সময়গত পার্থক্য এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিস্তার বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে অধিক নমনীয় বিক্রয় ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তবে ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে সতর্ক করে যে আর্থিক প্রণোদনার চেয়ে গ্রিড পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা দুর্বল হলে দ্রুত সম্প্রসারণ নিজেই নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিকেও নজর দিতে হবে
আর্থিক চ্যালেঞ্জের চেয়ে শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জই বড় হয়ে উঠতে পারে। চীনের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয়। ২০২৪ সালে চীনের মোট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতার ৪০ শতাংশ ছিল বিকেন্দ্রীভূত ফটোভোল্টাইক ব্যবস্থা, যা চার বছর আগে ছিল ৩০ শতাংশ। দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে দেশটির বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্কের ওপর চাপ বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। বর্তমানে ৫০ শতাংশের বেশি সৌরবিদ্যুৎ থেকেই সরবরাহ হচ্ছে বলে সম্প্রতি জানা গেছে।
বাংলাদেশে রুফটপ সোলারের ব্যাপক সম্প্রসারণের আগে তাই বিদ্যুৎ বিতরণ ফিডারগুলোর সক্ষমতা মূল্যায়ন করা জরুরি। একই এলাকার হাজার হাজার ভোক্তা যদি একই সময়ে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেন, তাহলে ভোল্টেজের ওঠানামা, নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ এবং বিদ্যুতের ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোন এলাকায় কতগুলো ব্যবস্থা স্থাপন হচ্ছে, সেগুলোর সক্ষমতা কত, সম্ভাব্য উৎপাদন কত এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ধরন কী হবে, সে বিষয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোর ফিডারভিত্তিক তথ্য থাকা দরকার।
শুরু থেকেই কর্মসূচির সঙ্গে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণকারী ভোক্তা ও তাদের স্থাপিত ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে একটি ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা থাকা উচিত। স্মার্ট বা যথাযথভাবে ক্যালিব্রেট করা দ্বিমুখী মিটারে গ্রিড থেকে নেয়া ও গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ রেকর্ড হতে হবে। প্রকৃতপক্ষে কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এবং কতটুকু গ্রিডে যাচ্ছে, সরকারকে তা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে অথবা নিয়মিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে সক্ষম হতে হবে।
জবাবদিহির বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদিত যন্ত্রপাতিই স্থাপন করা হয়েছে কিনা, তা কে যাচাই করবে? ব্যাটারি কার্যকর আছে কিনা, তা কে পরীক্ষা করবে? গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ কম দেখানো হলে ভোক্তার অভিযোগ কে তদন্ত করবে? নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহারকারী স্থাপনকারীর বিরুদ্ধে কে ব্যবস্থা নেবে?
এসব বিষয় কোনো অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেয়া যাবে না।
সরকার এরই মধ্যে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও মিটারকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআই এবং স্রেডা নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছে। এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে মানদণ্ড নির্ধারণের চেয়ে তার যথাযথ প্রয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে চীনসহ বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি আমদানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনও বাড়তে পারে। বাজার দ্রুত বাড়লে নিম্নমানের পণ্য প্রবেশের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তাই মান নিয়ন্ত্রণের আওতায় পুরো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আনতে হবে। এর মধ্যে ফটোভোল্টাইক মডিউল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, প্রয়োজনে চার্জ কন্ট্রোলার, স্থাপন কাঠামো, কেবল, সংযোগকারী, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং দ্বিমুখী মিটার অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। পরীক্ষা ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। আমদানীকৃত পণ্যের প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারীকে শনাক্ত করা যায়, এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি মানদণ্ডও নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতি তিন থেকে ছয় মাস অন্তর গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনার একটি পূর্বানুমেয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে এ পর্যালোচনা হতে হবে তথ্যপ্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ, খেয়ালখুশিভিত্তিক নয়। নতুন কোনো শর্ত কার্যকর করার আগে প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারকদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।
ব্যাটারি বর্জ্যের প্রস্তুতি এখনই
ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া দরকার। ব্যাটারি রুফটপ সোলারকে আরো কার্যকর করে তোলে, বিশেষ করে সন্ধ্যার চাহিদা ও গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্নের সময়। তবে এর সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যয়, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকিও যুক্ত। তাই ব্যাটারির রাসায়নিক গঠন, নিরাপত্তা পরীক্ষা, তাপ নিয়ন্ত্রণ, ওয়ারেন্টি, স্থাপন ও কার্যক্ষমতার জন্য ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা উচিত। স্থাপনকারীদের নিরাপদ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণও দিতে হবে।
আর ব্যাটারি বড় আকারে বাজারে আসার আগেই বাংলাদেশকে ব্যাটারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটির সমাধান করতে হবে।
একটি জ্বালানি রূপান্তরকে প্রকৃত অর্থে টেকসই বলা যাবে না, যদি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে ভবিষ্যতে ব্যবস্থাপনাহীন ইলেকট্রনিক ও ব্যাটারি বর্জ্যের পাহাড় তৈরি হয়। ব্যাটারিতে মূল্যবান উপাদান রয়েছে, কিন্তু যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে এগুলো পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই রুফটপ সোলার নীতির শুরু থেকেই ব্যাটারি সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
সোলার প্যানেলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। IRENA ও IEA-এর Photovoltaic Power Systems Programme-এর হিসাব অনুযায়ী, একটি সাধারণ ফটোভোল্টাইক প্যানেলের আয়ুষ্কাল প্রায় ৩০ বছর। বর্তমানে স্থাপিত প্যানেলগুলো পুরনো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারের অযোগ্য ফটোভোল্টাইক বর্জ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। পুনর্ব্যবহার ও পুনঃউপযোগীকরণের মাধ্যমে মূল্যবান উপাদান উদ্ধার করা সম্ভব। তবে এর জন্য ব্যবহারের শেষ পর্যায়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আগেই তৈরি করা প্রয়োজন।
তাই রুফটপ সোলার খাতে বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা বা Extended Producer Responsibility (EPR) ব্যবস্থা চালু করা উচিত। কোনো প্যানেল, ব্যাটারি বা গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ব্যবহারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছলে সেগুলো সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার বা যথাযথ নিষ্পত্তির দায়িত্ব প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারকদের ওপর স্পষ্টভাবে দিতে হবে। সরবরাহকারীদের জন্য ফেরত-গ্রহণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। গ্রাহক পুরনো যন্ত্রপাতি বদলানোর সময় সরবরাহকারী তা গ্রহণ করবে। ভবিষ্যতে সংগ্রহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় মেটাতে প্রাথমিক বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সামান্য পুনর্ব্যবহার বা পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ফি যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এটি সৌরবিদ্যুতের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি নয়, বরং সৌরবিদ্যুৎকে প্রকৃত অর্থে টেকসই করার জন্যই এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অর্থায়নে দরকার নতুন ভাবনা
একটি রুফটপ সোলার ব্যবস্থা স্থাপনে সাধারণ পরিবারের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। কর্মসূচি যদি পুরোপুরি ভোক্তার নিজস্ব অর্থ প্রদানের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তাহলে এর সুবিধা সচ্ছল পরিবার ও বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারের উচিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করে সাশ্রয়ী দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, ঋণ নিশ্চয়তা ও কিস্তিভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করা। তৃতীয় পক্ষের মালিকানা এবং সেবাভিত্তিক মডেলও বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে ভোক্তাকে পুরো প্রাথমিক মূলধন একসঙ্গে বহন করতে না হয়।
এক্ষেত্রে জাপানের নীতি থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে। দেশটির বর্তমান সহায়তা কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ ফিড-ইন ট্যারিফের ওপর নির্ভর না করে রুফটপ সোলারের প্রাথমিক বিনিয়োগে সহায়তার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালেও জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় রুফটপ ফটোভোল্টাইক ব্যবস্থার প্রাথমিক বিনিয়োগে সহায়তার পদ্ধতি অব্যাহত রেখেছে।
বাংলাদেশেরও ১০ টাকা ৫০ পয়সার এ প্রণোদনাকে স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে একটি অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। যন্ত্রপাতির মূল্য, ব্যাটারির দাম, প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিদ্যুতের ট্যারিফ এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ট্যারিফ নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। প্রযুক্তির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে প্রণোদনার কাঠামোও স্বচ্ছভাবে পরিবর্তন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের আরো একটি শিক্ষা নেয়ার আছে: নীতির সাফল্য নির্ভর করে তার বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর। শ্রীলংকার নিবন্ধিত সেবা প্রদানকারী ব্যবস্থা, কারিগরি শর্ত, ওয়ারেন্টি ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনা দেখায় কীভাবে ভোক্তা সুরক্ষাকে রুফটপ সোলার নীতির অংশ করা যায়। ভারতের দ্রুত পরিবারভিত্তিক সম্প্রসারণ দেখায় আর্থিক সহায়তার সঙ্গে প্রশাসনিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থা যুক্ত করার গুরুত্ব। আর চীনের অভিজ্ঞতা দেখায়, বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন যদি গ্রিডের ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্রুত বাড়ে, তাহলে কী ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের উচিত তিন দেশের অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নেয়া।
সরকারের প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সার প্রণোদনা সমর্থনযোগ্য, সময়োপযোগী, অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এ প্রণোদনাকে নীতির সমাপ্তি নয়, সূচনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
লাখ লাখ ছাদ ছোট ছোট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আগে বাংলাদেশকে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ উৎপাদককে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য মিটার, শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষিত কারিগরি কর্মী, বিশ্বস্ত স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান, সহজলভ্য অর্থায়ন, স্বচ্ছ অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা এবং কার্যকর ভোক্তা সুরক্ষা। একই সঙ্গে ব্যাটারি, সোলার প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ব্যবহারকাল শেষ হওয়ার পর সেগুলোর কী হবে, তারও একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারকে কর্মসূচির সাফল্য ঘোষণা দিয়ে নয়, ফলাফল দিয়ে পরিমাপ করতে হবে। বাস্তবে কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে? কতটুকু উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে যাচ্ছে? কোন ধরনের ভোক্তা বেশি উপকৃত হচ্ছে? কর্মসূচির মোট ব্যয় কত? পাঁচ বা দশ বছর পর কতগুলো ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে? কত পরিমাণ ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে?
এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রুফটপ সোলার উদ্যোগ একটি দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংস্কারে পরিণত হবে, নাকি বাস্তবায়নগত ঘাটতির কারণে আরেকটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের হাতে থাকা এমন কয়েকটি জ্বালানি সম্পদের একটি হলো সূর্য, যা আমদানি করতে হয় না। সরকারের নতুন প্রণোদনা ভোক্তাদের সেই সম্পদ কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো ও সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা নিশ্চিত করবে প্রথম সোলার প্যানেল স্থাপনের বহু বছর পরও এর সুফল টেকসই থাকবে।
ড. মুহাম্মদ বদরুল হাসান: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়