শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরো গভীর ও বিস্তৃত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ডিজিটাল প্রযুক্তি শৈশবকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। শিশু-কিশোররা কীভাবে শেখে, খেলে এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে—সবকিছু ক্রমেই এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে।
আমাদের কাজ প্রযুক্তিকে অন্ধভাবে উদযাপন করা কিংবা একে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং একটি সহজ সত্য মেনে নেয়া জরুরি। ডিজিটাল পরিবেশ যেমন সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে, তেমনি শিশুদের স্বাস্থ্য ও বিকাশের জন্য গুরুতর ঝুঁকিও তৈরি করছে। আমাদের দায়িত্ব হলো সম্ভাবনাগুলোকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগানো এবং ঝুঁকিগুলো প্রতিরোধ করা। পদক্ষেপ নেয়ার সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি, কিন্তু ধীরগতির বা খণ্ডিত সংস্কারের সময় অবশ্যই শেষ হয়ে এসেছে।
শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে, যোগাযোগ সহজ করতে এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল কিংবা সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে বসবাসকারী শিশুদের জন্য এসব প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে। একইভাবে বহু তরুণ-তরুণীর জন্য অনলাইন পরিসর সৃজনশীলতা বিকাশ, সামাজিক সংযোগ গড়ে তোলা এবং নিজের একটি সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। বাস্তব জীবনে যারা নানা ধরনের বঞ্চনার মুখোমুখি হয়, তাদের জন্য এ সুযোগ আরো তাৎপর্যপূর্ণ। এসব সুফল এমনি এমনি নিশ্চিত হয় না। কারা প্রযুক্তির নাগাল পাচ্ছে, প্রযুক্তি কীভাবে নকশা করা হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ের ওপরই এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ধীরে ধীরে উপলব্ধি করছে যে অনলাইন পরিসরে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্যের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্লাটফর্মগুলোকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে ফ্রান্স ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছে, স্পেন একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এদিকে আয়ারল্যান্ড ১৬ বছরের কম বয়সীদের সুরক্ষায় বয়সসীমা ও বয়স যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে।
যুক্তরাজ্যও সম্প্রতি ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেবা নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে সরাসরি সম্প্রচার (লাইভস্ট্রিমিং) সীমিত করা এবং অপরিচিত ব্যক্তিদের যোগাযোগের সুযোগ নিয়ন্ত্রণের মতো অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে। কানাডা ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি প্লাটফর্মগুলোকে ‘নিরাপত্তা-অন্তর্ভুক্ত নকশা’ (সেফটি-বাই-ডিজাইন) অনুসরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করেছে।
সমষ্টিগতভাবে এসব উদ্যোগ একটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ঐকমত্যের প্রতিফলন। তা হলো শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ডিজিটাল পরিবেশের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, বয়সোপযোগী নকশা এবং আরো শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণা জোরদার করছে, বিভিন্ন দেশকে কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছে এবং নিরাপদ ও বৈষম্যহীন ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছে।
এ মুহূর্তে ডিজিটাল পরিসরের বেলাগাম বিস্তারের রাশ টেনে ধরা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ ডিজিটাল পরিসর কখনই নিরপেক্ষ নয়। এটি কীভাবে নকশা করা হচ্ছে, কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং কীভাবে এর মাধ্যমে আয় করা হচ্ছে—এসব বিষয় আমাদের জীবনের বহু দিককে প্রভাবিত করে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অন্যতম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একই ধরনের কনটেন্টের বারবার উপস্থিতি, যৌন আবেদননির্ভর, সহিংস বা বৈষম্যমূলক কনটেন্টের সংস্পর্শে আসা শিশুদের নিজেদের সম্পর্কে এবং তাদের চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা গঠনে প্রভাব ফেলে। একইভাবে বিভিন্ন অ্যালগরিদম এখন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যকে নির্ভুলতার ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যবহারকারীর মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বাছাই করে উপস্থাপন করছে। ফলে বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার, ব্যবহারকারীর প্রোফাইল তৈরি এবং লক্ষ্যভিত্তিক বিপণনের জন্য সেই তথ্য কাজে লাগানো গোপনীয়তা, প্রভাবিত করার অপচেষ্টা এবং সামগ্রিক কল্যাণ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
বর্তমান গবেষণালব্ধ তথ্য বলছে, অতিরিক্ত ডিজিটাল সংস্পর্শের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের ব্যাঘাত, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং গুরুতর ক্ষেত্রে আত্মহত্যাপ্রবণতার মতো সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এ প্রভাব আরো বেশি দেখা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্মের বিপণন কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তামাক, অ্যালকোহল ও জুয়ার মতো ক্ষতিকর পণ্যের প্রচারের মুখোমুখি হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেমিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার একাকিত্বকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করতে পারে। দীর্ঘ সময় এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যায় এবং ঘুমের সময়ও হ্রাস পায়। অথচ এ দুই বিষয়ই অসংক্রামক রোগের সুপরিচিত ঝুঁকির কারণ।
একই সঙ্গে অনলাইনে শিশুদের যৌন শোষণ ও নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। শিশুদের যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত উপকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নির্যাতনের ছবি এবং ডিপফেকভিত্তিক যৌন বা বুলিং কনটেন্টও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এসবের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, পারস্পরিক আস্থা এবং নিরাপত্তাবোধের ওপর।
বাণিজ্যিক স্বার্থনির্ভর কার্যক্রম এসব ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ডিজিটাল প্লাটফর্ম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য কিংবা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেখানে যথেষ্ট নয়।
অবৈধ, চরমপন্থী কিংবা সহিংস ও বিভীষিকাময় কনটেন্টের সংস্পর্শ কমানো অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু ক্ষতিকর বিষয় থেকে শিশুদের দূরে রাখলেই তাদের কল্যাণ নিশ্চিত হয় না। তাদের সুস্থ বিকাশ নির্ভর করে স্থিতিশীল পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক, বয়সোপযোগী সীমারেখা, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং বাস্তব জীবনে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও মেলামেশার সুযোগের ওপর। ডিজিটাল পরিবেশ যখন এসব সুস্থ বিকাশকে সহায়তা না করে বরং ব্যাহত করে, তখন ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
জেনারেটিভ এআই শিশুদের কল্যাণের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা হলে বিশেষ উদ্দেশ্যে তৈরি এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি শিক্ষা, প্রবেশগম্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। তবে শিশুদের সম্পর্কবোধ, সহমর্মিতা কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো মানসিক ও সামাজিক সক্ষমতার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। যত দিন এ অনিশ্চয়তা থাকবে, তত দিন সতর্কতাভিত্তিক নীতি গ্রহণকে উদ্ভাবনবিরোধী হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটি শিশুদের স্বার্থ রক্ষারই একটি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ডিজিটাল ভারসাম্য নিশ্চিত করা। ডিজিটাল পরিবেশে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অধিক স্বচ্ছতা, বয়সোপযোগী নকশা, শক্তিশালী নিরাপত্তা ও আস্থার ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণাও এগিয়ে নিতে হবে। বিভিন্ন আয়স্তর ও অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের আজকের তরুণ প্রজন্মের কথা শুনতে হবে। প্রযুক্তির সক্রিয় ব্যবহারকারী হিসেবে তারা ডিজিটাল পরিবেশকে আরো দায়িত্বশীলভাবে বিকশিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন ও অফলাইন জগৎ এখন কার্যত একীভূত একটি পরিসর, যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশে সহায়কও হতে পারে, আবার সেই বিকাশকে বাধাগ্রস্তও করতে পারে। তাই যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা ও নীতিমালা নির্ধারণে তরুণদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবক, পরিচর্যাকারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কেও এ আলোচনার সক্রিয় অংশীদার হতে হবে।
এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার, প্রযুক্তি খাত, নাগরিক সমাজ এবং জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত সহযোগিতা অপরিহার্য। এ সহযোগিতার ভিত্তি হতে হবে একটি অভিন্ন অঙ্গীকার—ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফল সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া এবং সম্ভাব্য ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষায় আরো বেশি স্বচ্ছতা, তথ্য বিনিময়, স্বাস্থ্যসমর্থক প্রযুক্তি নকশা এবং কার্যকর নিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নে করপোরেট খাতের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ডব্লিউএইচও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নীতিমালা প্রণয়নে সমন্বয়কারী এবং প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারে।
আমাদের শিশু ও তরুণরা কোনো পরীক্ষাগারের পরীক্ষণ-উপকরণ নয়, তারা কোনো বন্দি বাজারও নয়, কিংবা কেনাবেচার পণ্যও নয়। তাদের সুস্থ ও নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করে এমন ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলা আমাদের যৌথ দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব আমাদের পালন করতেই হবে। কারণ আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তার প্রতিধ্বনি আগামী বহু প্রজন্ম ধরে শোনা যাবে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
ইমানুয়েল মাখোঁ: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট
টেড্রোস অ্যাডহ্যানম গেব্রেইসুস: ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক
ইংরেজি থেকে অনূদিত