অধ্যাপক ডগলাস নর্থের ‘লিমিটেড অ্যাকসেস অর্ডার’ তত্ত্বটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালে খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয়। এখানে সেবা বা সম্পদ সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ‘এলিট’ বা সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে আঁতকে উঠতে হয়, বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৮ দশমিক ৫ থেকে ৭৪ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে (আউট অব পকেট) খরচ করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ। এর সোজা অর্থ হলো, রাষ্ট্র এখানে অনুপস্থিত। প্রতি বছর চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রায় ৪৫-৫০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। একে অর্থনীতিবিদরা বলছেন ‘মেডিকেল পভার্টি ট্র্যাপ’।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সবাই স্বাস্থ্য খাত নিয়ে নতুন রূপরেখা দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের স্বাস্থ্য খাত কি আসলেই কোনো সেবা খাত, নাকি এটি একটি নিয়ন্ত্রণহীন ‘ব্ল্যাক বক্স’?
‘মিসিং ডক্টরস সিনড্রোম’ ও বৈষম্যের পরিসংখ্যান: আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ভোগান্তি শুধু টাকার অভাবেই নয়, বরং চরম অব্যবস্থাপনা ও বৈষম্যের কারণে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট চিকিৎসকের ৭৫ শতাংশই শহরাঞ্চলে কর্মরত, অথচ জনসংখ্যার বড় অংশ থাকে গ্রামে। শহরাঞ্চলে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ডাক্তারের অনুপাত যেখানে ১৮ দশমিক ২, সেখানে গ্রামীণ এলাকায় এ অনুপাত মাত্র ১ দশমিক ১। অর্থাৎ গ্রামের মানুষ ডাক্তার পায় না বললেই চলে। সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির হার প্রায় ৩৫-৫৯ শতাংশ পর্যন্ত। এ কাঠামোগত বৈষম্যের কারণেই গ্রামের একজন রোগী সামান্য সর্দি-জ্বর বা ডায়রিয়ার জন্যও সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে আসছেন।
একে গবেষকরা বলছেন ‘বাইপাসিং’ বা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র এড়িয়ে যাওয়া। ফলে টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোয় রোগীর উপচে পড়া ভিড়, বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা নেয়ার অমানবিক দৃশ্য, আর অন্যদিকে উপজেলা হাসপাতালগুলো পড়ে আছে ফাঁকা বা অকার্যকর হয়ে।
রাজনৈতিক ইশতাহারের ব্যবচ্ছেদ: স্বপ্ন ও কাঠামোগত বাস্তবতা
আসন্ন নির্বাচনের ইশতাহারে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাস্থ্য ভাবনায় যে ‘প্যারাডাইম শিফট’ দেখা যাচ্ছে, তা ইতিবাচক।
১. বিএনপি ও কাঠামোগত সংস্কার: বিএনপি তাদের ৩১ দফার রূপরেখায় যুক্তরাজ্যের এনএইচএসের আদলে ‘হেলথ কার্ড’ এবং জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত আধুনিক প্রস্তাবনা। বিশেষ করে ‘হেলথ কার্ড’-এর মাধ্যমে ক্যাশলেস চিকিৎসার ভিশন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বড় স্বস্তির কারণ হতে পারে। তবে চ্যালেঞ্জ হলো, এ কার্ড কার্যকর করতে যে বিশাল ডাটা আর্কিটেকচার প্রয়োজন, তার প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?
২. জামায়াত ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ: সদ্য সমাপ্ত ‘পলিসি সামিট-২০২৬’-এ জামায়াতে ইসলামী স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাদের পরিকল্পনায় ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের নাগরিক এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশেষায়িত হাসপাতাল অর্থাৎ ‘৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল’ নির্মাণের ঘোষণা এবং গর্ভধারণ থেকে শিশু বয়স পর্যন্ত ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেজ প্রোগ্রাম’ বা পুষ্টিনিরাপত্তার বিষয়টি তাদের ইশতাহারে গুরুত্ব পেয়েছে।
৩. এনসিপি ও সাংবিধানিক অধিকার: জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) এখনো তাদের আনুষ্ঠানিক স্বাস্থ্যনীতি বা পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ঘোষণা করেনি। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাদের জোটগত সম্পর্কের সমীকরণ থেকে ধারণা করা যায়, তারা হয়তো জামায়াতের ‘জনকল্যাণমুখী’ বা ‘ওয়েলফেয়ার’ মডেলের কাছাকাছি কোনো নীতি গ্রহণ করতে পারে। তবে নীতি যা-ই হোক, জুলাই বিপ্লবে আহতদের পুনর্বাসন এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা যে তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
সমস্যাটি শুধু ডাক্তার বা বাজেটের নয়, সমস্যা প্রযুক্তির: একজন তথ্যপ্রযুক্তি গবেষক হিসেবে আমি মনে করি, স্বাস্থ্য খাতের এ দুরবস্থা কেবল ডাক্তার, প্রশাসন বা বাজেটের অভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বরং সমস্যাটি একটি ‘টেকসই প্রযুক্তি প্ল্যান’-এর অভাব। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ডাটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) দিয়ে জটিল সব সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে, অথচ আমাদের স্বাস্থ্য খাত চলছে অ্যানালগ পদ্ধতিতে।
সরকার যদি হাজার কোটি টাকা বাজেট বাড়ায় কিন্তু ‘ডাটা ম্যানেজমেন্ট’ ঠিক না করে, তবে সেই টাকা ছিদ্রযুক্ত বালতিতে পানি ঢালার মতো বেরিয়ে যাবে। আগামীর যারাই সরকার গঠন করবেন, একটি আধুনিক ও কার্যকর হেলথকেয়ার সিস্টেম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য তাদের অবশ্যই আইটি বিশেষজ্ঞ এবং ডাটা সায়েন্টিস্টদের সঙ্গে নিতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নয়, বরং প্রযুক্তির মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েই এ সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।
ইউকে-ইউএসএ মডেল: প্রযুক্তির ব্যবহার
উন্নত বিশ্বের মডেলগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা দুটি পরিষ্কার সমাধান পাই:
যুক্তরাজ্যের গেটকিপিং: যুক্তরাজ্যের এনএইচএস মডেলের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো ‘গেটকিপিং’ বা জিপি (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) সিস্টেম। সেখানে চাইলেই কেউ সরাসরি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে পারেন না; প্রথমে তাকে পারিবারিক চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। আমাদের দেশেও যদি উপজেলা পর্যায়ে এ ‘গেটকিপিং’ বাধ্যতামূলক করা যায়, তবে ঢাকা মেডিকেলের ওপর চাপ নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইএইচআর ও ভারতের এবিডিএম: যুক্তরাষ্ট্রে ‘হাই-টেক অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে হাসপাতালগুলোকে ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (ইএইচআর) ব্যবহারে বাধ্য করা হয়েছে। আর ভারত তাদের ‘আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল মিশন’ (এবিডিএম)-এর মাধ্যমে ফেডারেটেড আর্কিটেকচার তৈরি করেছে, যেখানে এক হাসপাতালের তথ্য অন্য হাসপাতালে দেখা যায়। প্রযুক্তির এ ব্যবহার ছাড়া দুর্নীতি ও অপচয় রোধ অসম্ভব।
একটি প্রস্তাবনা: ‘নিরোগ বাংলা’র অভিজ্ঞতা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাবেক আইসিটি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের কাছে আমরা কয়েকজন মিলে ‘ন্যাশনাল হেলথ ডাটাবেজ (এনএইচডি)’ বা ‘নীরোগ বাংলা’ নামে একটি কারিগরি ধারণাপত্র জমা দিয়েছিলাম। প্রস্তাবনাটির মূল আইডিয়া ছিল একটি সেন্ট্রালাইজড হেলথ ইকোসিস্টেম তৈরি করা।
প্রস্তাবিত সিস্টেমটির কাজের ধরন ছিল নিম্নরূপ:
ইউনিক হেলথ আইডি: প্রতিটি নাগরিকের একটি ইউনিক আইডি থাকবে। রোগী যে হাসপাতালেই যাক না কেন, তার মেডিকেল হিস্ট্রি, টেস্ট রিপোর্ট এবং প্রেসক্রিপশন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকবে।
সিন্ডিকেট ভাঙা: ডাক্তার বদলালে ফাইল টানার ভোগান্তি থাকবে না এবং একই টেস্ট বারবার করানোর বাণিজ্যের পথ বন্ধ হবে।
এআই ও মনিটরিং: এআই ব্যবহার করে প্রেসক্রিপশনের জটিলতা নিরসন এবং লাইসেন্সবিহীন ওষুধের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব হবে। রাষ্ট্রকে অ্যানালগ ফাইলের জঞ্জাল সরিয়ে একটি স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও সেন্ট্রালাইজড ইকোসিস্টেমের দিকে হাঁটতেই হবে—নাম তার ‘নিরোগ বাংলা’ হোক কিংবা ভিন্ন কোনো পোশাকি নাম। বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি আগামীর মসনদে যারাই আসুক, তাদের ইশতাহারের চটকদার প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এবং সিন্ডিকেটের অদৃশ্য দেয়াল ভাঙতে হলে একটি ‘ডাটা-ড্রিভেন’ বা তথ্যভিত্তিক মহাসড়ক তৈরি করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
ভোগান্তিমুক্ত বাংলাদেশের প্রত্যাশায়: অধ্যাপক নর্থের ভাষায়, রাস্তা-ঘাট বা বড় দালান উন্নয়ন নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোই আসল উন্নয়ন। আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যেখানে গ্রাম ও শহরের এই ১৮:১ অনুপাতের বৈষম্য থাকবে না এবং মানুষ চিকিৎসার অভাবে নিঃস্ব হবে না। স্লোগান বা আবেগের রাজনীতির বাইরে এসে, একটি জবাবদিহিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্বচ্ছ স্বাস্থ্য কাঠামো গড়ে তোলাই হোক ২০২৬-এর মূল এজেন্ডা। নীতিনির্ধারকদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি পুরনো জরাজীর্ণ পদ্ধতিতেই থাকবেন, নাকি আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই ও ভোগান্তিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন?
তাওসীফ বিন পারভেজ: প্রভাষক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, পোর্ট সিটি ইউনিভার্সিটি