খাদ্যের বাজার

কৃষিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করা এবং খাদ্যসংক্রান্ত যেকোনো উদ্যোগ সঠিকভাবে পরিচালনা জরুরি

খাদ্য বা কৃষি কোনোটার সঙ্গেই বাণিজ্যের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। এটা মূলত খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজটা হচ্ছে বাজারের মূল্য পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করা।

খাদ্য বা কৃষি কোনোটার সঙ্গেই বাণিজ্যের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। এটা মূলত খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজটা হচ্ছে বাজারের মূল্য পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। কাজটা একটু জটিল যেহেতু উৎপাদনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এই কাজটাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে করতে হয়। মন্ত্রণালয়ের সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করি, সেখানে সচিব, অতিরিক্ত সচিবরা ছিলেন। যেটাকে বলে ব্যাকওয়ার্ড রিজনিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ড থিংকিং। ব্যাকওয়ার্ড রিজনিং করার চেষ্টা করলাম আমাদের রমজানে আল্লাহর রহমতে দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা ছিল, ওখান থেকে আমরা কী শিখতে পারি? কী করতে পারি? দেখলাম যে অনেকগুলো কাজ আমরা রমজানে করেছিলাম। তা থেকে পর্যালোচনা করলাম, কোনটা কাজ করেছে? কোনটা কাজ করেনি। সবকিছু তো আসলে কাজ করে না। আমরা তখন সামগ্রিকভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম যে এর প্রত্যেকটা কাজ আবার করব। যতগুলো সম্ভব, সব তো সম্ভব নয়।

কারণ আমরা অনেক ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কিছু কর হ্রাস নিয়েছিলাম। সেগুলো হয়তোবা সম্ভব নয়। কারণ কর অব্যাহতি দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন সমস্যা আছে। কিন্তু এগুলো বাদে যে কাজগুলো করণীয় তা আমরা পুনরায় করতে পারি। যেমন টিসিবি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওএমএস কার্যক্রম, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা, ভোক্তা অধিকার এমনকি আমাদের রাষ্ট্রীয় যে বিভিন্ন এজেন্সি আছে, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আমরা সবার সঙ্গে কাজ করেছিলাম। আপনাদের হয়তো খেয়াল আছে যে বণিক বার্তা একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল টিসিবির সঙ্গে ব্যবসা করা নিয়ে। আমরা একই জিনিস আবারো করছি। তবে আমি বলতে চাই যে আমি যে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট তা নয়। কেন তা বলছি, আজকে এখানে আমাদের যারা বক্তা তাদের কাছ থেকে আমি আসলে বিপণন পর্যায়ে আলোচনা শুনেছি। কিন্তু আমরা যখন খাদ্যনিরাপত্তার কথা বলছি, তখন সরকার কর্তৃক আমাদের ১৭টা প্রয়োজনীয় দ্রব্যের তালিকা করা আছে।

যদি আমরা প্রয়োজনীয় দ্রব্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবসার কথা বলি, তাহলে বিপণন মূলত কৃষির সুযোগকে আর্থিকভাবে কাজে লাগানোর একটি পদ্ধতি। আমাদের যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে এ সম্ভাবনাকে কীভাবে কাজে লাগাব। আমাদের কৃষি মানেই যে খাদ্য এমন নয়। কৃষি মানে খাদ্যের বিপরীতও হতে পারে। কৃষি মানে ফুল ও অন্যান্য জিনিসও হতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের কৃষি ও খাদ্যকে সমার্থক করতে হয়েছে! কারণ আমাদের দেশের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে কৃষিকে একমাত্র খাদ্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে। আমরা কৃষি বলতে কেবল খাদ্যকেই চিন্তা করতে পারছি এবং সঠিকভাবেই করছি। কিন্তু একদিন ইনশা আল্লাহ আমরা এখান থেকে বের হতে চাই। আবার কৃষি মানেই মানুষের খাদ্য নয়, পশুখাদ্যও কৃষির আওতাধীন। কারণ পশু যে খাদ্য খায় এটাও কৃষি থেকে আসে, আবার আমরাও পশুকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। পশুর খাদ্যমূল্যের সঙ্গে আমাদের খাদ্যমূল্যের ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। সুতরাং এটা নিয়েও আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে।

আমাদের মুদ্রাস্ফীতির ঝুড়িটা অনেক বড় এবং আমি মনে করি প্রয়োজনীয় দ্রব্যের রেফারেন্সে আমাদের একটা মুদ্রাস্ফীতি ইনডেক্স থাকা উচিত। যেন আমরা এর ভেতর দিয়ে বাজারকে খুবই কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে পারি, সর্বোপরি ভালোভাবে বুঝতে পারি। আমরা ন্যায় বাণিজ্যের যে কথা বলছি, এটা রাষ্ট্রেরও দায় ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। এই ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে যে জিনিসগুলো কাজ করে সেটা হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গগুলোর স্বাধীন অবস্থান। আমরা কমপিটিশন কমিশনের ব্যাপারে কথা শুনলাম। আপনারা দেখেছেন, আমরা বর্তমান কমিশনকে পুনর্গঠিত করেছি এবং এখানে যোগ্য লোককে আনা হয়েছে। তাদের আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পরিসরে দক্ষ ও যোগ্য কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। তাদের স্বাধীনতায় কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না।

আগে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা একেবারে ভুল, কারণ এখানে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। কোনো একজন ব্যক্তির কথার ভিত্তিতে বিষয়টি আমলে নিয়ে কেবল বিচার বিভাগীয় নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ বিচারিক কার্যক্রমও সম্পন্ন করা হয়েছে। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দুর্নীতি ও অনিয়মের পরিচয় বহন করে। তবে এখান থেকে আমাদের উত্তরণ প্রয়োজন এবং এর জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এখনো অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের অনিয়ম চলছে, যা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন। যারা এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন, তাদের তথ্য-উপাত্তের যথার্থতা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যের অসংগতির কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে পরিসংখ্যানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তাই এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

এটার সংস্কার দরকার আমি বারবার বলে যাচ্ছি। দেশের বড় বড় অর্থনীতিবিদই এ পরিসংখ্যান তৈরি করেছেন। এ পরিসংখ্যান একমাত্র ফ্যাসাদ তৈরি করা ছাড়া আর কিছু করে না। আমরা গত বছর দেখেছি যে আলুর উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৬ লাখ টন, মজুদ হয়েছে ৮০ লাখ টন। আলুর দাম ৯০ টাকা হয়ে গেছে। কোনোভাবেই কোলাবরেট করছে না একটার সঙ্গে আরেকটা। কেন? পরিসংখ্যান ভুল ছিল। আমাদের আসলে শোধরানো দরকার। কবে শুরু করা যাবে এ পরিসংখ্যানের শুদ্ধি? আমি নিজেও খুব ভালো জানি না, কারণ এটা আমার দায় নয়। কিন্তু আমার জায়গা থেকে আমি বলছি পরিসংখ্যানের শুদ্ধি অসম্ভবভাবে প্রয়োজনীয়। আমি বণিক বার্তার একটা রিপোর্টে বেশ ক’মাস আগে পড়ছিলাম, আমাদের যে কৃষির মার্কেট এটার ভ্যালু প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার প্রতি বছর। এটাকে যদি বাংলাদেশী টাকায় রূপান্তর করি তাহলে সম্ভবত ৩০ লাখ কোটি টাকা। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্ব এখানে কত অংশ?

আমরা বিপণন ব্যবস্থা আরো কার্যকর করতে চাই। কৃষিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করা এবং খাদ্য সংক্রান্ত যেকোনো উদ্যোগকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের খাদ্য বাজারের মোট মূল্য প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা। এই বিশাল খাদ্য বাজারকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনকভাবে কাজে লাগানো এবং জনগণের মধ্যে এর ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা—কীভাবে সম্ভব?

এক্ষেত্রে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ চিন্তাধারার পাশাপাশি সুবিবেচিত নীতিমালার সমন্বয় প্রয়োজন। আমরা বাজারে নানা ধরনের অনিয়ম দেখতে পাই, যার অন্যতম উদাহরণ ডিমের বাজার। রমজানের আগে প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল ১৮০ টাকা, কিন্তু কৃত্রিমভাবে মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ডিম হিমাগারে মজুদ করে রাখা হয়, যা এক ধরনের মজুদদারি। ফলে বাজারে ডিমের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। আমরা চাই বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক, যাতে জনসাধারণ ন্যায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পেতে পারে। এজন্য বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্য নীতিমালার প্রয়োগ জরুরি।

আমরা এমটিবি ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সাহেবের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে তারা তাদের কোম্পানির জন্য একটি সংরক্ষণাগার (সাইলো) তৈরি করেছেন। বরিশাল ও চট্টগ্রামে একটি সংরক্ষণাগার স্থাপন করা হবে, যেখানে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং যখন পণ্য বাজারে ছাড়া হবে, তখনকার বাজারমূল্যে কৃষক তার অর্থ পাবেন। এটি একটি অসাধারণ পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ। এমটিবি ব্যাংককে এজন্য আমরা সাধুবাদ জানাই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার এ ধরনের অবকাঠামো কীভাবে গড়ে তুলবে? অতীতে আমরা দেখেছি, সরকার প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছে, যা দেশের জনগণের ওপর বড় ধরনের দায় সৃষ্টি করেছে। সরকারি প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের পরিমাণ দেখলে মনে হয় যেন ব্যয়ের পরিমাণই দক্ষতার মানদণ্ড! যেন যত বেশি ব্যয় করা যায়, তত বেশি যোগ্যতা প্রমাণিত হয়। এতে দেশ ও জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের একটি স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি করতে হবে। এর অংশ হিসেবে যদি আমরা পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার তৈরি করতে পারি—তা সাইলো হোক বা সমতল স্টোরেজ ব্যবস্থা—তাহলে একটি কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। বিশেষ করে নদীকেন্দ্রিক (রিভারাইন) পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশজুড়ে সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এটি রাতারাতি সম্ভব নয়, তবে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করতেই হবে।

সঠিকভাবে সংরক্ষণাগার ব্যবস্থাপনা করা গেলে বাজারে ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখা যাবে। তবে মজুদদারির বিষয়টি ন্যায্যভাবে পরিচালিত হওয়া জরুরি। এটি রাষ্ট্র, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) বা টিসিবি (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ)—যেকোনো সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হতে পারে, কিন্তু অবশ্যই আমাদের এটি বাস্তবায়ন করতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তা আমাদের প্রধান আলোচ্য বিষয়। আমাদের দেশের খাদ্য বাজারের পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা, যার যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর জন্য কৃষিতে সেচ ব্যবস্থা, সার উৎপাদন, কৃষি-পরিবেশগত গবেষণা এবং জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলার জন্য যথাযথ পরিকল্পনা নেয়া জরুরি।

এ নীতিগুলো কার্যকর করতে হলে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর প্রয়োজন। এজন্য জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা হওয়া দরকার, যাতে দেশের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও দক্ষ ব্যক্তিরা গবেষণা করে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করতে পারেন। আমাদের অবশ্যই ক্ষুধা ও খাদ্য সংকট মোকাবেলা করতে হবে এবং এটি বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্ভব। ৩০ লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজারে বিনিয়োগ করা খুব কঠিন নয়, যদি আমরা একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা তৈরি করতে পারি—চাই তা পশুখাদ্য হোক বা মানব খাদ্য। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।

এছাড়া এর বিপণন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে কীভাবে এসব পণ্য বিতরণ করা হবে, বিভিন্ন কোম্পানি যেমন ‘স্বপ্ন’ বা ‘এসিআই মসলা’ কীভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা পর্যালোচনা করতে হবে। এ আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটি যথেষ্ট নয়। আমাদের আরো দূর যেতে হবে, আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে এবং এর জন্য সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এ দায়িত্ব আমাদের সবার এবং এটি সঠিকভাবে বোঝার প্রয়োজন রয়েছে।

শেখ বশিরউদ্দীন: উপদেষ্টা, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়

[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যের বাজার, সরবরাহ ও দেশজ সক্ষমতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে]

আরও