জন্মদাগ আজন্ম থাকে না। সময় পরিক্রমায় কখনো তা মিলিয়েও যায়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার অব্যাবহিত পর দ্য বাংলাদেশ (অ্যাডাপ্টেশান অব একজিস্টিং ল’জ) অর্ডার ১৯৭২ পাস হয় যার ফলে বাংলাদেশ ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এর পূর্বে পাসকৃত সকল আইনের উত্তরাধিকারী ও ব্যবহারকারী হিসেবে গন্য হয়।স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের বিচার বিভাগ সাবেকি,সংস্কার অনীহ, মামলাজট জনিত দীর্ঘসুত্রতা দোষে দুষ্ট এমন সব নেতিবাচক প্রত্যয় বয়ে বেড়াচ্ছে জন্মদাগের মতো। উল্লেখিত দাগগুলোর মধ্যে মামলাজটের দাগটি বেশি জ্বলজ্বলে, মামলাজটের সার্বভৌমত্বে বিচারবিভাগের স্বকীয়তা হারানোর দশা।
করোনা উদ্ভূত মহামারী যেমন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে আইনগত জটিলতা।এই ক্রান্তিকালীন সময়ে অনেক রাষ্ট্র অমনিবাস ক্লজ(ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী) সহ আইন পাস করেছে। ইউরোপের কিছু দেশ কন্টিনেন্টাল কনভেনশনের আশ্রয় নিয়ে আপৎকালীন পদক্ষেপ ও নির্বাহী সিদ্ধান্তগুলোর বৈধতা দেয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে।খুব জোরালো না হলেও বাংলাদেশেও আইন পাস অথবা সংশোধন করে আইনগত জটিলতার অবসান চেয়ে সরকারকে কার্যক্রম গ্রহন করতে পরামর্শ দিতে দেখা গেছে, প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সংসদ না বসলেও অধ্যাদেশ জারী করতে পারেন রাষ্ট্রপতি।
ইউরোপিয়ান কনভেনশান অন হিউম্যান রাইটস (ইসিএইচআর) স্বাক্ষর করেছে ৪৭ টি ইউরোপিয়ান দেশ।এ র ১৫ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রগুলোকে জরুরি অবস্থা জারি করার ক্ষমতা দিয়েছে যুদ্ধকালীন ও প্রাণসংহারী জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কয়েকটি দেশ (আর্মেনিয়া, লাটভিয়া, রোমানিয়া, মালডোভা, জর্জিয়া এবং এস্তোনিয়া) কনভেনশনটির ক্ষমতা বলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে মহামারী মোকবেলা করছে তবে ইতালি ও স্পেন তাদের সংবিধানিক ধারা মেনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। উল্লেখ্য ইউরোপীয় মানদণ্ডে দুর্বল মানবাধিকার চর্চাকারী দেশগুলো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে ‘ইসিএইচআর’ এর আওতায় । জরুরি অবস্থায় অনেক মৌলিক মানবাধিকার স্থগিত থাকে যৌক্তিক কারণেই।
খোদ ইউরোপেই এর ব্যতিক্রম আছে। যুক্তরাজ্য শাস্ত্রীয়ভাবে অগ্রসর হয়েছে, রীতি অনুযায়ী আইন পাস করেছে। মার্চ মাসের ২৫ তারিখে ‘করোনা ভাইরাস এ্যাক্ট ২০২০’ পাস করেছে। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে উদ্ভূত আইনি জটিলতা আইনগতভাবে নিরসনে যুক্তরাজ্যই প্রথম সমাধানের পথ খুঁজেছে। আইনটি একটি সময় নির্দিষ্ট (সানসেট প্রভিশন) আইন, ধারা ৮৯ মতে এর মেয়াদ দুই বছর আর ধারা ৯৮ বলছে সংসদীয় পর্যালোচনা সাপেক্ষে আরো ৬ মাস।কার্যত এই আইন দ্বারা ব্রিটিশ সরকারকে অবারিত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ডিএনএ প্রোফাইলের মতো তথ্য সংরক্ষণের বর্ধিত অধিকার, যেটি ২৪ ধারায় উল্লেখ আছে।আইন পাসের পর ই-জুডিশিয়ারি ব্যবস্থায় বিচার কাজ চলছে । আইনটির ৫৩-৫৭ ধারায় শারীরিকভাবে আদালতে উপস্থিতি না থেকেও অডিও ও ভিডিও মাধ্যমে শুনানি করার ও লাইভ স্ট্রিম করার (যদিও রেকর্ড করা নিষিদ্ধ) বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে।ভবিষ্যত জটিলতা এড়াতে বিদ্যমান কার্যপদ্ধতি সংশোধন করা হয়েছে।
করোনার প্রকোপ বাড়ার ফলে দেশের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতো বিচার বিভাগও সধারণ ছুটিজনিত বিরতিতে আছে। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ক ফ্রম হোম পদ্ধতিতে দৈনন্দিন কাজ ও উৎপাদনশীলতা বজায় রেখেছে।প্রথম বিশ্বের দেশগুলোয় বেশ আগে থেকেই ঘর থেকে কাজ করার সংস্কৃতি চালু ছিল। তবে রাষ্ট্রের প্রধান তিন অঙ্গের একটি বিচার বিভাগ সাধারণ ছুটির আওতায় বিচারিক কার্যক্রমের বাইরে বড় পরিসরে এবারই প্রথম।
সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে সুপ্রিম কোর্টের অন্তত একটি বেঞ্চে বিচার কাজ চালু রাখাসহ জনস্বার্থে কিছু নির্দেশনা চেয়ে প্রধান বিচারপতির বরাবর আবেদন করেছিলেন দুই আইনজীবী। এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে সীমিত পরিসরে আদালত কার্যক্রম শুরুর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়।অধিকাংশ আইনজীবীর বাস্তবসম্মত চাপে এবং সংক্রমণ শঙ্কায় সে অবস্থান থেকে সরে আসতে হয় বিচারিক প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায়, সে সিদ্ধান্ত যৌক্তিকও বটে । কেবল আদালত সংশ্লিষ্ট যারা তারাই নন দেশের জনগনও ওয়াকিবহাল আদালত প্রাঙ্গণগুলো কী পরিমাণ জনাকীর্ণ । শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কোনো অবস্থা নেই, যতোই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক।
ই -জুডিশিয়ারি অনেক দিন ধরেই বিচার ব্যবস্থার আধুনিকতা স¡চ্ছতা এবং গতিশীলতা সংশ্লেষে আলোচিত বিষয়। দক্ষ ও যুগোপযোগী বিচার প্রক্রিয়ার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তন, বিচার প্রশাসন এবং বিচারিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়করণ, ই-আদালত কক্ষ প্রতিষ্ঠা, আইসিটি বিষয়ের ব্যবহারিক দক্ষতার মাধ্যমে বিচারক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প নিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। ইত্যবসরে এর কার্যক্রম শুরু হলে এই সংকটকালীন সময়ে ই-জুডিশিয়ারির সুফল পেত বিচার সংশ্লিষ্ট সবাই। ওয়ারেন বার্জার যিনি গত শতকের আশির দশকে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি থাকাকালে ন্যায় সাধনের পদ্ধতির কথা বলতে গিয়ে বলেন, সর্বাবস্থায় সম্ভাব্য ন্যূনতম ব্যয়ে, সম্ভাব্য ন্যূনতম সময়ে এবং বিবদমান পক্ষদের ওপর ন্যূনতম চাপ প্রয়োগ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হবে বিচার বিভাগের কাজ। করোনা উত্তর সময়ে বিচার বিভাগের ই -জুডিশিয়ারিতে রূপান্তরের প্রশ্নে স্বাভাবিক আন্তরিকতার চাইতে বেশি আন্তরিকতা কাম্য। ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে বিচার কাজ চলতে পারে এমন অভিমত প্রকাশ পায় মন্ত্রিসভা বৈঠকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৯ মে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জারি করেন ‘আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০’ (অধ্যাদেশ নং-০১, ২০২০ খ্রি.)। অধ্যাদেশের ৫ ধারার ক্ষমতাবলে ১০ মে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে আদালতে শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া শুধু জামিন শুনানির জন্য উচ্চ আদালতসহ অধস্তন আদালতের জন্য ‘বিশেষ প্র্যাকটিস নির্দেশনা’ জারি করেন। ১১ মে থেকে মূলত বাংলাদেশের উচ্চ আদালতসহ অধস্তন আদালতে ভার্চুয়াল কোর্টের যাত্রা শুরু হয়।
একটি রাষ্ট্রের আর্থিক সামর্থ্য এবং রাজনৈতিক চরিত্র তৈরিতে যে বৌদ্ধিক প্রণোদনা জ্বালানির মতো কাজ করে তার অন্যতম জোগানদাতা বিচার বিভাগ।
শুরুতে যে জন্মদাগের কথা বলা হচ্ছিল ,আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় ‘লেজার ট্রিটমেন্ট’ এর সাহায্যে চাইলে তা দূর করা যায়। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্মদাগ মোচনের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগগুলো কাজে লাগানো বাঞ্ছনীয়। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা আকাশ সমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে মহামারী মোকাবেলায় টিকা আবিষ্কারে ব্যস্ত। আর বিচার বিভাগের সামনে এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ প্রয়োগযোগ্য কোনো উপায় বের করে অতি দ্রুত আইনগত সংকট ও জিজ্ঞাসার প্রতিবিধান করা। মনে হতে পারে এক অন্ধকার নৈরাজ্যের দিকে অগ্রসরমান সবাই। নৈরাজ্যের উপায়হীন অবস্থায় নির্বাসন নয় বরং উত্তরণের নতুন পথ খুঁজে পাওয়াতেই সভ্যতার জয়।
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট