দুধকে বলা হয় আদর্শ খাদ্য। শিশুদের বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই দুধেই যদি বিপজ্জনক মাত্রায় ভারী ধাতু ও রোগ-জীবাণুর উপস্থিতি থাকে, তাহলে তা কেবল খাদ্যনিরাপত্তার ঘাটতি নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুতর হুমকি। ঢাকা ও আশপাশের বাজার থেকে সংগৃহীত দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে গবেষকরা যে দূষণের চিত্র পেয়েছেন, তা উদ্বেগজনক। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে
এমন চিত্রই উঠে এসেছে। পুষ্টির চাহিদা মেটাতে গিয়ে মানুষ যদি অজান্তে বিষাক্ত পদার্থ গ্রহণ করে, তবে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
গত আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত দুধ, পনির, দইসহ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যে সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও নিকেলের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় কিছু নমুনায় এসব ধাতুর মাত্রা সংশ্লিষ্ট নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ই কোলাই ও সালমোনেলার মতো রোগ-জীবাণুর উপস্থিতিও আছে। এসব জীবাণু ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণের কারণ হতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ভারী ধাতুর সংস্পর্শ স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতিসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ দূষিত দুধের ঝুঁকি তাৎক্ষণিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
দূষণের উৎস অনুসন্ধান এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবাদিপশুর খাদ্য, ঘাস উৎপাদনের মাটি, পানির উৎস ও খামারের পরিবেশ—সবই সম্ভাব্য দূষণপথ। একই সঙ্গে দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতের অনিরাপদ ব্যবস্থাও জীবাণুদূষণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গবেষকদের বক্তব্যে দুধে পানি মেশানো ও অস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনার অভিযোগও এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দূষণের উৎস শনাক্ত করতে হবে। শুধু বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দূষণের উপস্থিতি চিহ্নিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; দূষণ কোথায়, কীভাবে এবং কার অবহেলায় ঘটছে, তা নির্ধারণ করে প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে সরকারের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাজারে দূষিত পণ্যের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত—উভয় ধরনের বাজারে ঝুঁকিভিত্তিক নমুনা পরীক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ এবং অনিরাপদ পণ্য প্রত্যাহারের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুধ উৎপাদনকারী খামার থেকে শুরু করে সংগ্রহ কেন্দ্র, পরিবহনকারী ও বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বাস্থ্যবিধি মানা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পশুখাদ্য, পানি ও উৎপাদনস্থলের মান পরীক্ষার ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি। তবে গবেষণার ফলাফলকে নীতিনির্ধারণে ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরীক্ষা পদ্ধতি, নমুনার প্রতিনিধিত্ব, পরিমাপের একক এবং প্রযোজ্য নিরাপদ সীমার যথার্থতা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষত অত্যন্ত বেশি মাত্রায় ভারী ধাতু শনাক্ত হওয়ার দাবিগুলো স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনরায়
যাচাই করা হলে ঝুঁকির প্রকৃতি আরো স্পষ্ট হবে। এতে সমস্যাকে খাটো করা নয়, বরং কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ভোক্তার সচেতনতাও প্রয়োজন, তবে দায় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে নিলে অনেক রোগ-জীবাণু ধ্বংস হয়, কিন্তু এতে ভারী ধাতু দূর হয় না। ফলে ফুটিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দূষণকে উপেক্ষা করা যাবে না। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব উৎপাদক, সরবরাহকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার।
আদর্শ খাবার হিসেবে নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সবার ঘরেই দুধ যাচ্ছে। ফল-ফলাদি, কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রধান খাদ্যের তদারকিতে যেমন ঘাটতি রয়েছে, সে ঘাটতিরই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে দুধের ক্ষেত্রে। দূষিত দুধের কারণে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখার বদলে নানা রোগের মাধ্যম হচ্ছে তা।
আমরা যে কর্মক্ষম ও সুস্থ-সবল জাতি গঠন করতে চাই সে লক্ষ্য অর্জনে অন্যতম বাধা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে খাদ্যে দূষণ।
দুধের চাহিদা বাড়ছে, দুগ্ধ শিল্পও সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধি যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে, তবে তার সুফল জনস্বাস্থ্যে প্রতিফলিত হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, দূষণের উৎস নির্মূল, আইন প্রয়োগ এবং অপরাধের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা। মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য যে খাদ্য অপরিহার্য, সেটিই যেন অসুস্থতার কারণ না হয়—এ নিশ্চয়তা দেয়াই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।