এনবিআরের রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা প্রতি বছর বাড়ে, অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব। বর্তমানে সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (এসডিএফ) চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন। সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জেসের (এসএএফই) চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের এনবিআর সংস্কারের জন্য গঠিত পরামর্শক কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছিলেন। বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট সংসদে পাস হলো। এর মধ্যে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব পুরোপুরি আদায়ে আমাদের ব্যর্থতা একেবারেই নতুন নয়। এ লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত মনে হয়?

লক্ষ্যমাত্রা তো লক্ষ্যমাত্রাই। এর হিসাবটাও সরল। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল ব্যয়ের বাজেট। সচরাচর বাজেটের সুনির্দিষ্ট অংশকে ঘাটতি হিসেবে দেখানো হয়। আর বাকি অংশ রাজস্ব। এবারের বাজেটে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ ঘাটতি দেখানো হয়েছে। এ হিসাব দেখিয়েই প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ দেখানো হয়েছে। বাজেটের এ প্রাক্কলন কতটা বাস্তবসম্মত বা গ্রহণযোগ্য হয়েছে তার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে। বাস্তবায়ন শুরু হলে বোঝা যাবে প্রাক্কলন বেশি না কম, বাস্তবিক না অসম্ভব। ব্যয়ের বিপরীতে আয় করতে হয়। আয় না হলে ঋণ করতে হয়। এজন্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে।

তবুও বাজেটের বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা জরুরি। অনেকে বলেন আয় অনুযায়ী ব্যয় করা দরকার। জাতীয় অর্থনীতিতে এমন কথা খাটে না। এখানে ব্যয় অনুযায়ী আয় করতে হবে। কল্যাণকামী অর্থনীতি হলেও আমাদের প্রবৃদ্ধি দরকার। পৃথিবীর সব দেশেই ঘাটতি বাজেট দেখা যায়। সৌদি আরব আর দুই-একটা দেশ বাদে কেউই উদ্বৃত্ত বাজেট করতে পারে না। সম্ভব হয় না। অর্থনীতির তাগিদেই ব্যয় বেশি দেখাতে হয়। এ ব্যয় অনুযায়ী নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে রাজস্ব আহরণের চেষ্টা লাগে। অর্থাৎ বাজেট ব্যয় অনেকটা পুশ ফ্যাক্টরের মতো কাজ করে।

বাজেট প্রস্তাবে সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক অর্থনীতি গড়ার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে। এজন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর মতো বিষয়ের পাশাপাশি অনেক পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এগুলো আমাদের অর্থনীতিকে কীভাবে সক্রিয় করবে?

বাজেটে যখন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয় তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক থাকলে সমাজের উন্নতির পাশাপাশি অর্থনীতিরও উন্নতি হয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে চাহিদা বাড়ে ও অর্থনীতিতে ক্রেতার ভোগ স্বাভাবিক থাকে। রাজস্ব আয়ের প্রথম উৎসই হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এটি নানা উৎস থেকে আসতে হয়। আমদানি-রফতানি, বাণিজ্য ও উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়। তখন তারা নিজ চাহিদাও পূরণ করতে পারে। যখন ভোগ বাড়বে তখন ভ্যাটও বাড়বে। তখন বাজারে বিনিয়োগকারীরাও পুঁজির সরবরাহ বাড়াবেন। তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বলয় যেন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য রাজস্ব আহরণ অনেক জরুরি। কিন্তু আমাদের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এনবিআরের ওপর নির্ভরশীল। আমরা কি আর কোনো উপায়ে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারি না?

বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটি সম্পূর্ণভাবে এনবিআরের ওপর নির্ভরশীল। বাকিটা কর-বহির্ভূত আর এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব খাত থেকে আসবে। এ দুই ধরনের রাজস্ব আহরণ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু বাজেটে এনবিআরকেই রাজস্ব আদায়ের জন্য লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়। অন্য ক্ষেত্রগুলোতে তেমন মনোযোগ দেয়া হয় না। এদিকে এ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানই কিছু না কিছু রাজস্ব আদায় করে থাকে। এগুলোতে বাজেটে অর্থায়ন করা হয় কিন্তু রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা সেভাবে বেঁধে দেয় না। ভূমি কর, ভূমি উন্নয়ন কর, বিআরটিএর গাড়ির ওপর শুল্ক, ফিটনেস সার্টিফিকেট, শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম, জলমহাল ইজারা দেয়া বাদেও অন্য অনেক লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া আছে। এগুলো থেকে সরকার নানাভাবে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে। এগুলো সঠিকভাবে আহরণ করা হচ্ছে কিনা সেদিকে নজরদারি বাড়ানো দরকার।

বিগত কয়েক বছরের বাজেট প্রক্ষেপণ থেকে দেখেছি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেলায় রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা বাড়ে না। দেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ছে। অনেক রেজিস্ট্রেশন, স্ট্যাম্প ডিউটি, লাইসেন্সিং ফি বাদেও নানা জায়গায় এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব আয়ের সুযোগ বেড়েছে। সরকারই এগুলোর নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যে ব্যয় হচ্ছে তার বিপরীতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হবে না, এমনটি ঠিক নয়। এটি সেবামূলক খাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা হয় সেবার গুণগত মান বাড়াতে। হাসপাতালে বরাদ্দ দিলে রোগীদের যেন নিজ পকেট থেকে বাড়তি খরচ দিয়ে চিকিৎসা নিতে না হয় সে সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। অর্থাৎ একটা রিটার্ন তো প্রত্যাশিত থাকবে। তাই সরকারকে এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে।

বাজেটের বড় একটি অংশ যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। এদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ অর্থ কীভাবে ব্যয় করছে সে হিসাব জানা নেই। সম্প্রতি বণিক বার্তার দুটো প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারের ৩৯২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০৮টি বার্ষিক অডিট রিপোর্ট জমা দিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যয়ের নিরীক্ষা স্বচ্ছ না করতে পারলে কি লক্ষ্যমাত্রা দেয়ার সুযোগ হবে?

কর-বহির্ভূত রাজস্ব আর এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্বের ব্যাপক লেনদেন হচ্ছে। অথচ এফআরসিতে সম্ভবত ৫০ বা ৪৪ শতাংশের মতো রিটার্ন জমা হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছ প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আইনও করা হলো। সেটি কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না স্পষ্ট নয়। সরকারের অডিট বিভাগ এমনকি আইসিএবির অধীন অডিট কোম্পানিগুলোর এক্ষেত্রে দায় থাকে। ক্লায়েন্টের অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনার সময় কোনো প্রকার কর ফাঁকি দেয়া হচ্ছে কিনা এটা দেখার দায়িত্ব তাদের। আমরা প্রশ্ন করতেই পারি, বড় বড় প্রকল্প বা ব্যাংকের অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার সময় হিসাববিদরা তা ধরেননি কেন? তারা তো অডিট করেছেন। অর্থাৎ তারা দায়িত্বে ফাঁকি দিয়েছেন। এফআরসিতে কম প্রতিবেদন পড়ার মূল কারণ অডিটটা ঠিকভাবে করা হয়নি। অথবা এমন অডিট হয়েছে যা জমা দিলে তাদের এফআরসির প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।

এজন্যই স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকলে রাজস্ব আয় বাড়বে। অনেকে মনে করেন, যারা কর দেয় না তাদের করজালে যুক্ত করলে রাজস্ব বাড়বে। তার আগে পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বরতদের জবাবদিহির আওতায় আনলে স্বচ্ছতা বাড়বে, রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

প্রতিবারই এনবিআরকে একটি লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয় আর প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারে না। এখানে সমস্যাগুলো আসলে কোথায়?

এখনো আমরা ঔপনিবেশিক সময়ের কর আদায় আইন ও পদ্ধতি অনুসরণ করি। ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের এনবিআর অ্যাক্টই পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কার্যকর ছিল। ১৯৮৪ সালে আমরা নতুন আয়কর করেছি। কিন্তু আইনটিতে পুরনো কর আদায় দৃষ্টিভঙ্গিই থেকে যায়। মানে আপনি গত বছর কত আয় বা ব্যয় করেছেন তা বিবেচ্য নয়। আপনাকে এ বছর এত পরিমাণ অর্থ কর দিতে হবে, এমন নির্দেশনা দেয়া হয়। এটা করদাতাদের ওপর অদৃশ্য এক চাপ তৈরি করে। তাই তারা কর ব্যবস্থাকেই ভয় পান।

আবার যিনি কর আহরণ করেন তারও কিছু দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা থাকে। আগে কর আহরণকারীরা একটা কমিশন পেতেন। তাদের নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো ছিল না। কিন্তু এখন তো ব্যবস্থাপনা সরকারি নিয়ন্ত্রণে, বেতন কাঠামোর অধীনে। তবুও এনবিআরে যারা কাজ করেন তাদের কিছু বাড়তি প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। তাদের দায়িত্বে কিছু ঝুঁকি থাকে। আইন ব্যাখ্যা করে তারা রাজস্ব আহরণ করেন। এখন আহরণের যে কাঠামো এনবিআর অনুসরণ করছে সেখানে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের উপস্থিতিই আতঙ্কের হয়ে আছে।

কর আহরণের পদ্ধতিটাও সহজ নয়। করদাতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে হয়। ২০২৩ সালের আয়কর আইনেও এমন অনেক ভয়ভীতির বিষয় যুক্ত হয়েছে। আইনটা প্রত্যক্ষ করের হলেও পরোক্ষ করনির্ভর হয়ে গেছে। জরিমানা ও উৎস কর সরাসরি আহরণ করা যাচ্ছে না। অথচ এসব সমস্যা দ্রুতই সমাধান করা যায়। অর্থাৎ ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন চালু করলেই হয়।

কিন্তু এনবিআরের কর আদায়ের ব্যবস্থাপনাকে অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশনের পথে কেন নেয়া যাচ্ছে না? এটি কি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণে? না কাঠামোগত দুর্বলতা?

রাজস্ব অর্থনীতিতে আইনজীবী গোষ্ঠী, এনবিআর কর্মকর্তাদের একাংশ এমনকি স্বয়ং করদাতাদেরও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় এক্ষেত্রে মৌন প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। তারাই অনেক সময় এ পদ্ধতি চান না। অনেক করদাতা কর মওকুফের দরকষাকষির সুযোগ রাখতে চান। এজন্যই রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকার পরও এনবিআরকে ডিজিটালাইজড ও অটোমেটেড করা যায়নি। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। সাত-আট বছর আগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ভ্যাটের একটি অনলাইন প্রকল্প নেয়া হয়। প্রচুর অর্থ ব্যয় করে যন্ত্রপাতি কেনা হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। বলা হলো আমাদের কাঠামোর সঙ্গে এ পদ্ধতি সামঞ্জস্যপূর্ণ না। আবার ব্যবস্থার মধ্যেও নানা কারিগরি ত্রুটির কথা বলা হলো। এটা মূল সমস্যা ছিল না। আসলে এ ব্যবস্থা চালু হলে স্বার্থসংশ্লিষ্টদের সমস্যা হতো। সব তথ্য থাকবে। দরকষাকষি হবে না। রিটার্ন সাবমিটের সময় বাড়ানো-কমানো যাবে না। গোটা ব্যবস্থার ভেতর থেকেই এ ধরনের একটা প্রতিরোধ চলে আসছে।

আমাদের টপ ডাউন অ্যাপ্রোচে যেতে হবে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক নির্দেশনা থাকতে হবে। যারা ব্যবস্থাপনায় থাকবেন তাদের ভালো বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনজীবী বা কোনো এনবিআর কর্মকর্তার কাছে না গিয়েই যেন করদাতারা সহজে কর দিতে পারেন এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে। বিদ্যমান কর আইনের ভেতর আহরণকারীকে এখনো ডিসক্রিশনারি পাওয়ার বা বিবেচনার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আইনের ভেতর উল্লেখ আছে ‘কমিশনার যদি মনে করেন’ বা ‘ডেপুটি কমিশনারের মতে’। অর্থাৎ এমন ডিসক্রিশনারি ক্ষমতা রেখে দেয়ার জন্যই আইনের সঠিক প্রয়োগ হয় না। এখন আইনই যদি এমন হয় যে যা বলা হয়েছে সে অনুযায়ীই আপনাকে কাজ করতে হবে, তাহলে আর এমন দোলাচলের অবস্থা তৈরি হতে পারবে না।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য আইএমএফের একটি বড় চাপ আছে। সেজন্য অটোমেশন লাগবে। আপনার কী মনে হয়? এ চাপের জন্য হলেও আমরা অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশন শুরু করতে পারব?

আইএমএফ চাপ দিচ্ছে কারণ তারা আগে নিশ্চিত হতে চায় যাদের ঋণ দেয়া হচ্ছে তারা ওই ঋণ শোধের মতো রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা রাখে কিনা। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেই সবচেয়ে কম। আইএমএফের চাপে কিছু কিছু সংস্কার উদ্যোগ এরই মধ্যে নেয়া হচ্ছে। নতুন আয়কর আইন বা কাস্টমস অ্যাক্ট করা হচ্ছে। কিন্তু ব্যবস্থার ভেতরের দৃষ্টিভঙ্গিই যদি আগের মতো থাকে তাহলে আইনের ধারাই শুধু বদল হবে, ফল আসবে না। তাই যত প্রতিবন্ধকতাই থাকুক, সরকারকে অটোমেশনের দিকে হাঁটতে হবে। একই সঙ্গে কর আদায় ব্যবস্থাপনার সংস্কার করতে হবে।

এদিকে করের আওতা বাড়ানোর জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সঙ্গে টিআইএন নাম্বার যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এটি কি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে হয় আপনার?

এটি অবশ্যই একটি বাধা। মানুষ অর্থের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক লেনদেনের সুবিধার জন্যই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলে। অল্প পুঁজি আছে এমন মানুষও অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। বেশি পুঁজির অ্যাকাউন্টধারীর লেনদেন বেশি হয়। সেখানে একটু বাড়তি কর পাওয়ার সুযোগ থাকে। করের টাকাটা নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে জমা দেয়ার স্বচ্ছতা থাকে। সমস্যাটা হলো আইনের বিধানে বলা হয়েছে যেকোনো লোক অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে তার টিআইএন লাগবে।

টিআইএন খোলার ক্ষেত্রে মানুষের মনোভাবটা বোঝা দরকার। এটি খোলার কিছু নিয়মকানুন আছে। কেউ এ সার্টিফিকেট খুলতে গেলে তাকে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। অনেক কিছু নিজে থেকে করতে হয়। দেশের প্রশাসনিক জটিলতা বেশি থাকায় এসব বিষয়ে মানুষ যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করে। আইনটি সহজ করা গেলে মানুষের উৎসাহ বাড়ত। এ ব্যাপারে আমার স্পষ্ট অভিমত, নতুনদের এখনই টিআইএন খোলার শর্ত দেয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হোক। মানুষকে এখন অ্যাকাউন্ট খুলতে আগ্রহী করতে হবে। অ্যাকাউন্ট খোলার পরের এক-দুই বছর তার লেনদেন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। লেনদেন ১-২ লাখ টাকার বেশি হলে বা করের আওতায় আসে এমন লেনদেন হলে তাকে টিআইএন নিতে হবে, এমন নিয়ম করা যেতে পারে।

এখানে ব্যাংকেরও ভূমিকা আছে। রাজস্ব শুধু এনবিআর আহরণ করবে এমন না। বরং ব্যাংকের ভূমিকা এখানে অনেক বড়। কেউ অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে ব্যাংক যদি বলে যে আগে টিআইএন খুলে আসেন তখন আমানতকারীদের আলাদা ভোগান্তিতে পড়তে হবে। এমনটি অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা। মানুষ ভোগান্তির কথা ভেবেই টিআইএন খুলতে রাজি হবে না। যাদের সামান্য অর্থ বা পুঁজি আছে তারাই খুলবেন। সরকার ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে চাচ্ছে। এর সফলতার জন্য সবাইকে ব্যাংকিং সিস্টেমের আওতায় আনা দরকার। তাই নতুন অ্যাকাউন্টধারীদের বিষয়ে আরেকটু সংবেদনশীল হওয়া দরকার। দেশে বহু লোকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। তাদের অ্যাকাউন্টগুলো দেখা দরকার। শুধু নতুনদের বেলায় এ নিয়ম খাটালে ঠিক হবে না। এজন্য পর্যালোচনা বাড়াতে হবে ও সঠিক নির্দেশনা দিতে হবে। তাহলে টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়বে। ভীতি দেখিয়ে গ্রাহকদের বিপাকে ফেলার মতো নিয়ম থাকলে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়া কঠিন।

আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। বৈশ্বিক মানদণ্ডের হিসাবে অনেক কম। এদিকে সরকার ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে যাত্রার প্রত্যাশা করছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে না পারলে তা সম্ভব না। এটি বাড়ানোর জন্য কী করা যেতে পারে?

পরামর্শ হবে কর আদায়ের প্রক্রিয়াটা সহজ করা। করদাতাদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমি যে কর দিচ্ছি তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়ছে কিনা আর ওই করের টাকায় উন্নয়নমুখী কাজ হচ্ছে কিনা—এর নিশ্চয়তা পাওয়া দরকার। করদাতা যখন দেখবেন তার করের টাকায় উন্নয়ন হচ্ছে আর শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য ক্ষেত্রে সেবার মানোন্নয়ন হচ্ছে, তখন তারা কর দিতে আগ্রহী হবেন।

দ্বিতীয়ত, এনবিআরের সংস্কার করতে হবে। এটিকে একটি কর আদায়ের যন্ত্র হিসেবে রাখলে হবে না। বরং এটিকে আধুনিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে। করদাতাদের হয়রানি বা ভীতি দেখানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। করদাতারা যেন এনবিআরের প্রতি বিদ্বেষ ভাবনা না রাখেন তেমনভাবে সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। এমনিতে বড় প্রকল্প বা অন্য অনেক ক্ষেত্রে কর ফাঁকির সুযোগ থাকে। সেগুলোকে কঠোর তদারকির আওতায় আনতে হবে। ছোট খামারি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ দিলে চলবে না। বড় উৎসগুলোকে করের আওতায় আনতে হবে। এমনটা করতে পারলে কর-জিডিপি অনুপাত অবশ্যই বাড়বে। অর্থনীতির জন্যও তা টেকসই হবে।

আরও