শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ পদ্ধতির স্থায়ী সমাধান জরুরি

কয়েক বছর পরপর একই দৃশ্য—এক মাসে বোর্ড বসে, পরের মাসে রাস্তা জ্বলে, তার পরের মাসে নতুন মজুরি কার্যকর হয়। শ্রমিক বলেন, যথেষ্ট নয়। মালিক বলেন, সামর্থ্যের বাইরে। ক্রেতা বলেন, দাম বাড়বে না। সরকার বলে, এটাই চূড়ান্ত। কারখানার শাটার নামে, যন্ত্র থামে, চালান আটকে যায়। ধোঁয়া মিলিয়ে গেলে আমরা আবার সেখান থেকেই শুরু করি, যেন কিছুই শিখিনি।

পোশাক শ্রমিকদের মজুরি ঠিক করার প্রক্রিয়া আমাদের মুখস্থ। শ্রমিক পক্ষ একটা অংক দেয়, মালিক পক্ষ আরেকটা। শেষে সরকার মাঝামাঝি একটা সংখ্যা ঘোষণা করে, যা কেউ মন থেকে মানে না।

২০২৩ সালে শ্রমিক প্রতিনিধিরা ২০ হাজার ৩৯৩ টাকা প্রস্তাব করেন, মালিক পক্ষ ১০ হাজার ৪০০ টাকা। এরপর পুলিশের হিসাবে অন্তত ৭০টি কারখানায় ভাংচুর হয়, ১৫০টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়, ১১ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়, চারজন শ্রমিক নিহত হন। মজুরি দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫০০ টাকায়, শ্রমিক সংগঠনগুলো তা-ও প্রত্যাখ্যান করে।

দুটি বিষয় মনে রাখা দরকার—সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন মজুরি নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত পোশাক শ্রমিকের মজুরি প্রতি বছর মূল ৫ শতাংশের সঙ্গে বাড়তি ৪ শতাংশ মিলিয়ে মোট ৯ শতাংশ হারে বাড়ানো বাধ্যতামূলক। আগে পাঁচ বছর পরপর বোর্ডের মাধ্যমে পূর্ণ পর্যালোচনা হতো, এখন তিন বছরে। অন্যদিকে পোশাকের দাম সেই হারে বাড়েনি। সবচেয়ে বড় দুই বাজার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অনেক ক্ষেত্রে দাম বরং কমছে, অথচ উৎপাদন খরচ বেড়েছে অনেক।

ক্ষতি টাকায়, ক্ষতি আস্থায়

কারখানা বন্ধ থাকলে চালান সময়মতো যায় না। তখন ক্রেতা বড় ছাড় চান, নয়তো উড়োজাহাজে পণ্য পাঠাতে হয়, নয়তো ক্রয়াদেশ বাতিল হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আশুলিয়ার অস্থিরতার কারণ পুরোপুরি মজুরি বোর্ড ছিল না, কিন্তু ক্ষতির ধরন একই। একদিনে ২১৯টি কারখানা বন্ধ ছিল। তখনকার শ্রম উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন, ১৫-২০ শতাংশ ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। মার্কিন ক্রেতারা আশুলিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেন, ক্রয়াদেশের একটা অংশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় চলে যায়। রফতানিকারকরা বলেছিলেন, ক্রেতার আস্থা হারানোই সবচেয়ে বড় ক্ষতি। চলে যাওয়া ক্রয়াদেশ সহজে ফেরে না।

বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তির ক্ষতিও কম নয়। ২০২৩ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, আর ক্লিন ক্লোথস ক্যাম্পেইন নতুন মজুরিকে "দারিদ্র্যের মজুরি" বলেছিল। শ্রমিকের ওপর গুলি আর পুড়ন্ত বাসের ছবি ক্রেতার বোর্ডরুমে যায়, বাণিজ্য সুবিধার আলোচনায় আমাদের বিপক্ষে কাজ করে।

এবারো আমরা একই মোড়ে। তিন বছরের হিসাবে বর্তমান মজুরির মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। শ্রমিক নেতারা ৩০ হাজার টাকা দাবি তুলেছেন। সরকার বোর্ড গঠন করেছে। মালিক পক্ষ প্রতিনিধির নাম দিয়েছে। শ্রমিক পক্ষের নামের প্রস্তাবও এসেছে। অর্থাৎ বোর্ড বসছে, কিন্তু সব এগোচ্ছে সেই পুরনো ধাঁচেই।

গোলমালটা পদ্ধতিতে

শ্রমিক পক্ষ জীবনযাত্রার ব্যয়ের যে কথা বলে, তা মিথ্যা নয়। মালিক পক্ষ যখন বলে ক্রেতা দাম বাড়ায় না, সেটাও সত্য। সমস্যা হলো, দুই সত্যকে এক ছকে মেলানোর লিখিত নিয়ম নেই। তাই প্রত্যেক পক্ষ চরম অবস্থান থেকে শুরু করে। এটা কারো অসততা নয়, ব্যবস্থার যুক্তি।

বর্তমান কাঠামো অযৌক্তিক নয়, ত্রিপক্ষীয় আলোচনার জায়গা এতে আছে। বোর্ড অস্থায়ী, প্রজ্ঞাপনের পর ভেঙে যায়, মাঝের বছরগুলোতে তথ্য জমানোর কেউ থাকে না। আইনে জীবনযাত্রার ব্যয়, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতার মতো বিবেচ্য বিষয়ের কথা আছে, কিন্তু কোনটির ওজন কত, তা লেখা নেই। দুই পক্ষের প্রস্তাব কোন হিসাবে তৈরি, তা-ও প্রকাশ হয় না। শ্রমিক প্রতিনিধিও একজন, সরকার মনোনীত, তাই অনেক সংগঠন নিজেদের এর বাইরে মনে করে। তাই কাঠামো রেখেই পদ্ধতি বদলানো দরকার।

সমাধানের জন্য চারটি জিনিস দরকার। এক. একটি স্থায়ী মজুরি কমিশন গঠন করা। এ কমিশন সারা বছর শ্রমিক পরিবারের খাদ্য, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচের তথ্য রাখবে। পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা, রফতানি পণ্যের একক মূল্য ও উৎপাদন খরচের তথ্যও সংগ্রহ করবে। মজুরি কোন পদ্ধতিতে হিসাব করা হবে, তা আগেই প্রকাশ করবে। মজুরি পুনর্নির্ধারণের আগেই তথ্যভিত্তিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি রাখবে এবং ঘোষিত মজুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা তদারকি করবে। এর জন্য নতুন কোনো কাঠামো বানানোর দরকার নেই। মজুরি বোর্ড মজুরি নির্ধারণের পর ভেঙে না দিয়ে সেটিকেই স্থায়ী কমিশনে রূপ দেয়া যায়, যা সারা বছর ওপরের কাজগুলো চালিয়ে যাবে। দুই. শ্রমিকদের জন্য রেশন, যাতে তারা কম দামে নিত্যপণ্য পান। সরকার যে ফ্যামিলি কার্ড চালু করছে, তার সঙ্গে এটি সমন্বয় করা যায়। তিন. আবাসন। শ্রমিকের মজুরির বড় অংশ যায় বাসা ভাড়ায়, আর প্রতিবার মজুরি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় ভাড়াও বাড়ে। ফলে মজুরি বাড়লেও তার পুরো সুফল শ্রমিকের হাতে পৌঁছায় না, আর তা নিশ্চিত না হলে শুধু মজুরি বাড়িয়ে সমস্যা মিটবে না। ভাড়ার এ চক্র ঠেকাতে হবে। পাশাপাশি সরকার ও মালিক মিলে যৌথ আবাসন প্রকল্প নিতে পারে, যা শ্রমিকের খরচ কমাবে এবং কারখানার জন্যও সুবিধাজনক হবে। চার. চিকিৎসা। এটি শ্রমিকের আরেকটি বড় খরচ, তাই কম খরচে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

মজুরির পাশে সক্ষমতার সূত্রও চাই

মজুরি যদি নিয়ম মেনে বাড়ে, তাহলে সেই খরচ বহনের সক্ষমতা গড়ার দায়ও নিয়ম মেনে নিতে হবে। শুধু মজুরির দিকে সূত্র থাকলে কাঠামো এক পায়ে দাঁড়াবে।

প্রথমত, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে নিয়মিত সরকারি সহায়তা। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি তহবিল, শ্রমিক ও মধ্যম ব্যবস্থাপকদের দক্ষতা প্রশিক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, বন্দর ও কাস্টমসে সময় কমানো।

দ্বিতীয়ত, ক্রেতারা দাম কমালে সুরক্ষা। রফতানির একক মূল্য পর্যবেক্ষণ করে একটি সূচক তৈরি করা যায়। দাম নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামলে নীতি সহায়তা, ঋণ পুনঃতফসিল বা সাময়িক প্রণোদনা আপনা থেকে চালু হবে, যেমন মজুরিতে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট আপনা থেকে যোগ হয়।

তৃতীয়ত, বেশি দামের পণ্যে যাওয়ার ভিত্তি। মৌলিক পণ্যে আমরা দামে প্রতিযোগিতা করি, সেখানে মজুরি বাড়লেই চাপ পড়ে। কৃত্রিম তন্তু, কারিগরি পোশাক, নিজস্ব নকশা ও পণ্য উন্নয়নে গেলে প্রতি পিসে বেশি মূল্য মেলে। এর জন্য নকশা ও গবেষণা কেন্দ্র, কাঁচামাল আমদানিতে সহজ শর্ত এবং বৈচিত্র্যকরণে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা দরকার।

কারখানা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মজুরি বাড়লে ক্রেতারা সাধারণত সেই হারে দাম বাড়ান না। যেসব ব্র্যান্ড ন্যায্য মজুরির কথা বলে, মজুরি সমন্বয়ের অংশ তাদের ক্রয়মূল্যে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

কাকে কী ছাড়তে হবে

মালিকদের মানতে হবে, মূল্যস্ফীতিসহ জীবনযাত্রার বাস্তবতার সঙ্গে মজুরির সমন্বয় বাস্তবসম্মত হতে হবে। শ্রমিক সংগঠনগুলোকে মানতে হবে, বোর্ড থেকে আসা সংখ্যাই ভিত্তি, প্রতিবার নতুন অংক নিয়ে রাস্তায় নামা নয়। সরকারকে বোর্ডের কাজ সময়মতো শেষ করতে এবং সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।

২০২৩ সালে চারটি প্রাণ, শত শত কারখানার ক্ষতি আর মাসের পর মাস নেতিবাচক খবরের বিনিময়ে যে সংখ্যায় পৌঁছেছিলাম তা কেউ মানেনি। তাই এবার অন্তত শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণের শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি নিয়েও কথা শুরু হোক। মালিক জানুন খরচ কত বাড়বে এবং সরকার কোথায় পাশে থাকবে, শ্রমিক জানুন মজুরি কবে কতটা বাড়বে। এ নিশ্চয়তা কোনো এক পক্ষের জয় নয়, শিল্পের টিকে থাকার শর্ত।

মহিউদ্দিন রুবেল: সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ; প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস

আরও