জুলাই গণ-অভ্যুত্থান

জুলাইয়ের অমীমাংসিত গ্রাফিতি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই প্রতিরোধী দৃশ্যমান প্রবণতা ছিল শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ এবং দেশজুড়ে গ্রাফিতি। কিন্তু সেসব দুর্বিনীত পাবলিক আওয়াজ ক্রমেই ‘অদৃশ্য’, ‘অপর’ এবং ‘অস্বীকৃত’ হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের পর যেমন গান গাওয়া হয়েছিল, ‘হয়তোবা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না’, গণ-অভ্যুত্থানেও অপরায়ণ হয়েছে শ্রমজীবী, আদিবাসী, শিশু ও নিম্নবর্গের ইতিহাস। টান মেরে গ্রাফিতির পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। নিদারুণভাবে জনআকাংখা গ্রাফিতিকে অস্পষ্ট করে তোলা হয়েছে। এত রক্তদাগের পরও গ্রাফিতির জনআকাংখা অস্বীকৃত হলো কেন?

কারণ জনআকাংখার ব্যাকরণ পাঠের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বরাবরই উপেক্ষিত। অধিপতি ইতিহাস গ্রন্থনের কায়দা ও প্রবল উপস্থাপন ভঙ্গির কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়ায় জুলাইকেও করে তোলা হচ্ছে এক খণ্ডিত বয়ান। অথচ জুলাই এক চলমান ঐতিহাসিক প্রতিরোধী পরম্পরা। এটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ‘রেজিম পরিবর্তন’ মাত্র নয়। ক্ষমতার উপনিবেশ, কাঠামোগত বৈষম্য আর নিউলিবারেল প্রবল ব্যবস্থার বিপরীতে এ জুলাই ইতিহাসে বারবার জান-জবান নিয়ে দাঁড়ায়। জুলুমকে প্রশ্ন করে। এ জনপ্রতিরোধ কেবল জালিমের নয়, জুলুমের অবসান চায়। বিদ্যমান ঔপনিবেশিক, বাইনারি ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন চায়। হাতিখেদা, টংক, তেভাগা, নানকা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, কাপ্তাই বাঁধ, ফারাক্কা, মধুপুর, ফুলবাড়ী, ইয়াসমীন, আলফ্রেড কী ৯০ থেকে ২৪ গণ-অভ্যুত্থান এ জীবনবাজির সাক্ষী।

অধিপতি চশমায় দেয়ালের গ্রাফিতিকে কেবল ‘শিল্পকর্ম’ হিসেবে নয়, দেখতে হবে সামাজিক স্মৃতি ও জনসংস্কৃতির দলিল হিসেবে। জুলাই গ্রাফিতি নিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিভুক্তকরণ হয়েছে। কিছু আলাপ ও লেখালেখি হয়েছে গ্রাফিতির রাজনৈতিক ভাষা, ভিজ্যুয়াল প্রতীক, প্রতিবাদের নন্দনতত্ত্ব কিংবা দেয়ালকে রাজনৈতিক পাঠ্য হিসেবে ব্যবহার নিয়ে। অনেকেই দেখিয়েছেন, জুলাই গ্রাফিতি ছিল রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রচার ও তথ্যপ্রবাহের বিপরীতে এক বিকল্প জনপরিসর। বিশেষত নগরের দেয়াল, সেতু, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস ও অবকাঠামো হয়ে ওঠে জনআকাংখা প্রকাশের রাজনৈতিক যোগাযোগমাধ্যম। শহীদদের প্রতিকৃতি, রক্তের প্রতীক ও লালরঙের ব্যবহারের ভেতর দিয়ে আন্দোলনের এক যৌথ স্মৃতি সাক্ষ্য নির্মাণের প্রচেষ্টাও ছিল জুলাই গ্রাফিতিতে।

ভাঙা শেকল, খাঁচা ভেঙে পাখির উড়াল, মুষ্টিবদ্ধ হাত, প্রধান ধর্মের প্রচলিত প্রতীকের সম্মিলন, রক্ত, চোখ, পতাকা, মানচিত্র এমন প্রতীক চিহ্নের ভেতর দিয়ে বৈশ্বিক শিল্প সংযোগের ভাষাও তৈরি করেছে গ্রাফিতি। অনেকে আলাপ করেছেন, দেয়ালের গ্রাফিতি ডিজিটাল মাধ্যমে আরো বিস্তৃত পরিসরে দ্রুততার সঙ্গে স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে রাজনৈতিক বার্তাকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। জুলাই গ্রাফিতির ধরন এবং উপস্থাপনের বদল ঘটেছে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতির ধারাবাহিকতায়। প্রথম দিকের স্প্রে বা স্টেনসিলে করা গেরিলা গ্রাফিতির নির্মাতাদের নাম আমরা জানি না। পরের দিকে বহু রঙ-তুলিতে সবাই মিলে করা সামাজিক গ্রাফিতির শিল্পীদের নাম বহু গ্রাফিতির পাশে লেখা হয়েছে। জুলাই গ্রাফিতি কোনো একক শিল্প-খতিয়ান ছিল না, এর নির্মাণে অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অনুশীলন জারি ছিল। জুলাই গ্রাফিতির বিষয়ভিত্তিক শ্রেণীকরণ, ডিসকোর্স বিশ্লেষণ, স্মৃতি রাজনীতি, ভাষাগত বিবরণ, রঙ ও প্রতীকের বিশ্লেষণ, আদিবাসী আত্মপরিচয়, শ্রেণীপ্রশ্ন, অন্তর্ভুক্তির বয়ান, ভৌগোলিক বিস্তার কিংবা উৎপাদন কাঠামোপ্রশ্নের অনুপস্থিতি ও পরিবেশগত ন্যায়বিচার নিয়ে বিস্তর গবেষণা দরকার। একই সঙ্গে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রাফিতির জনআকাংখার বাস্তবায়নে প্রায়োগিক রাষ্ট্রীয় তৎপরতা জরুরি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব গ্রাফিতি আমি দেখিনি। ঢাকা, গাজীপুর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, রংপুর, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, সাতক্ষীরা, মানিকগঞ্জ, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ফরিদপুর, চুয়াডাঙ্গা, শেরপুর ও ঝিনাইদহের কিছু গ্রাফিতি আমি সরজমিনে দেখেছি। তাও সামগ্রিক নয়। এছাড়া গণমাধ্যম, বই, সাময়িকী ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত গ্রাফিতিগুলো দেখার চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে আমারও জুলাই গ্রাফিতি পাঠের অভিজ্ঞতা সীমিত এবং খণ্ডিত। এ খণ্ডিত অভিজ্ঞতা কিন্তু বাইনারি ও উপনিবেশবিরোধী পরিসর থেকেই চলতি আলাপে জুলাই গ্রাফিতির ভেতর দিয়ে জনআকাংখার অমীমাংসিত বয়ান হাজির করছি।

আমার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ হলো গেরিলা গ্রাফিতি বাদ দিলে রেজিম পতনের পর আঁকা সামাজিক গ্রাফিতিগুলো মূলত প্রতিরোধ, স্মৃতি, পরিচয়, ব্যঙ্গ, সংহতি এবং আশার ভাষার ভেতর দিয়ে জনআকাংখার বয়ানকে হাজির করেছে। ভৌগোলিক অঞ্চল ও সাংস্কৃতিক পরিসর অনুযায়ী দেশজুড়ে আঁকা গ্রাফিতির প্রতিবেশগত বিন্যাসকে বিবরণ করার মতো রসদ এ মুহূর্তে আমার কাছে নেই। আঁকার ধরন এবং বিষয় উপস্থাপনে আঞ্চলিক ভিন্নতা থাকলেও কিছু সিগনেচার গ্রাফিতি দেশজুড়ে আঁকা হয়েছে। যেমন হাত প্রসারিত করে বুকচিতিয়ে গুলির সামনে দাঁড়ানো প্রথম শহীদ আবু সাঈদ কিংবা পানির বোতলসহ আঁকা মুগ্ধর পানি লাগবে পানি, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-আদিবাসী পাতা ছেঁড়া নিষেধ, কল্পনা চাকমা কোথায়, কাঁটাতারে ফেলানী, পাহাড় থেকে সমতলে লড়াই চলবে, সংস্কার, মুক্তি ও স্বাধীনতা, বৈষম্যের অবসান, হামাক ব্যাটাক মারলু ক্যানে, হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ, রিকশাশ্রমিকের স্যালুট, ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার কিংবা ৩৬ জুলাইয়ের দিনপঞ্জি। এসব গ্রাফিতিকে ‘সাধারণ বা কমন’ হিসেবে নয়, বরং মৌলিক জনজিজ্ঞাসা হিসেবে দেখা জরুরি।

প্রতিরোধ ও মুক্তির আকাংখা

জুলাই গ্রাফিতির ভেতর দিয়ে জনপ্রতিরোধ ও মুক্তির আকাংখাকে এক ঐতিহাসিক পরম্পরা হিসেবে হাজির করা হয়েছে। উঁচু করা মুষ্টিবদ্ধ হাত (এ হাতের জাতিগত, জেন্ডার ও অন্যান্য বর্গীয় পরিচয় এখানে টানছি না, কিন্তু এটি জরুরি মৌলিক প্রশ্ন। কারণ বর্ণবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে আমাদের এক প্রতিষ্ঠিত স্লোগান হলো ‘শোষকের কালো হাত ভেঙে দাও’), ছেঁড়া শেকল, আগুনের শিখা, লাল সূর্য, খাঁচা ভেঙে পাখির উড়াল বা উড়ন্ত পতাকার প্রতীক এঁকে বহু গ্রাফিতিতে লেখা হয়েছে ‘লড়াই চলবেই’, ‘বিপ্লব চলছে’, ‘জেগেছে বাংলাদেশ’, ‘জাগো বাংলাদেশ’, ‘রুখে দাঁড়াও’, ‘এবার মুক্তি’, ‘প্রতিরোধ’, ‘রেভল্যুশন’, ‘দ্য রেভল্যুশন লাইভস’, ‘রেজিস্ট’। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বোঝাতে গ্রাফিতিতে নানাভাবে প্রতীক ও ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। ‘স্বাধীনতা মানে কথা বলার অধিকার’, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’, ‘ডেমোক্রেসি ইজ আওয়ার রাইট’, জনগণের রাষ্ট্র চাই’ কিংবা মানুষের বাংলাদেশ চাই’ এমন ভাষ্যগুলো গ্রাফিতিতে প্রকাশিত।

কর্তৃত্ব, রাষ্টীয় সহিংসতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

গুলির খোসা, রক্তাক্ত হাত, রক্তঝরা দেয়াল, ভাঙা হাতকড়া, ভাঙা দাঁড়িপাল্লা হাতে চোখ বাঁধা লেডি জাস্টিস, বুটজুতা, কাঁটাতারের প্রতীক ব্যবহার করে বহু গ্রাফিতিতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে প্রশ্ন করে ন্যায়বিচারের আওয়াজ তোলা হয়েছে। ‘আমার ভাইকে মারল কেন’, ‘হত্যার বিচার চাই’, ‘গুলি কেন’, ‘আর কত লাশ’, ‘স্টপ স্টেট ভায়োলেন্স’, ‘জাস্টিস ফর জুলাই’, ‘রক্তের বিচার চাই’, ‘গুম খুন কেন’, ‘বিচারহীনতা আর নয়’, ‘এনাফ ইজ এনাফ’ এমন ভাষ্যের ভেতর দিয়ে কাঠামোগত জুলুমকে প্রশ্ন করা হয়েছে।

ভাঙা সিংহাসন, দাবার ছক থেকে গুটি উল্টে যাওয়া, কালো মুখোশ (!), পুতুল প্রতীকের ভেতর দিয়ে জুলাই গ্রাফিতিতে কর্তৃত্ববাদকে মূলত ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচার হিসেবে বিবৃত করা হয়েছে। কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে এসব গ্রাফিতির লিখেছে, ‘স্বৈরাচারের পতন হোক’, ‘ডিকটেটর নেভার উইন’, ‘ভয় দেখিয়ে লাভ নেই’, ‘গণতন্ত্র বন্দি নয়’, ‘ক্ষমতা জনগণের’, ‘পাওয়ার বিলংস টু দ্য পিপল’, ওয়ান ডে ইউ উইল ফল’ কিংবা ‘নো মোর ডিকটেটরশিপ’।

অন্তর্ভুক্তি, ঐক্য ও সংহতি

জুলাই গ্রাফিতির এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য নানা বর্গের সংহতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আওয়াজ। যদিও চিত্রণে শিক্ষার্থী এবং তরুণ যুবদের প্রতীকায়ন বেশি হয়েছে, তার পরেও নানা বর্গের উপস্থিতিকে নিশ্চিত করা হয়েছে। যেমন বহু গ্রাফিতি আছে যেখানে, জেন-জি প্রজন্মকে প্রতীকায়িত করা হয়েছে, যা বিশেষ বয়সের উত্তরাধিকারদের সূচিত করে। বই, ব্যাগ, কলম, খালি জুতা এবং আলো এঁকে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে গ্রাফিতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে। ‘ছাত্ররাই ইতিহাস লেখে’, ‘স্টুডেন্ট ক্যান চেঞ্জ হিস্ট্রি’, ‘ছাত্র-জনতা এক হও’ স্লোগানের ভেতর দিয়ে গ্রাফিতিতে শিক্ষার্থীর ছবি চরিত্রায়ণে নারী-পুরুষ উভয়ের (হয়তো স্টেরিওটাইপ, কিন্তু অন্যান্য জেন্ডার সম্পর্কে নিশ্চিত নই) অংশগ্রহণকে দেখানো হয়েছে। কেবল শিক্ষার্থী নয়, শ্রমজীবী ও কৃষকের কথাও গ্রাফিতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ‘ছাত্র-জনতা এক হও’, ‘ওয়াকার্স স্ট্যান্ড টুগেদার’, ‘ইউনাটেড উই স্ট্যান্ড’, ‘এক দেশ এক মানুষ’, ‘বিভক্তি নয় ঐক্যবদ্ধ’ গ্রাফিতির ভেতর দিয়ে শ্রেণীগত ঐক্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংহতি তৈরিতে গ্রাফিতিতে লেখা হয়েছে, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ওয়াচিং’, ‘সাইলেন্স ইজ ভায়োলেন্স’, ‘ফ্রিডম নোজ নো বর্ডার’, ‘হিউম্যান রাইটস ম্যাটার’, ‘স্ট্যান্ড উইথ বাংলাদেশ’।

আঞ্চলিক ভাষায় লেখা হয়েছে ‘হামার বেটাক মারলু কেন’, ‘এই মাটি হামার’ কিংবা চাকমা ভাষায় লেখা হয়েছে, ‘জ্বলি ন উধিম কিত্তেই’। লেখা হয়েছে, ‘নারীর কণ্ঠ রুখবে না’, ‘মেয়েরাও লড়ছে’, ‘প্রতিবাদ নারী-পুরুষ সবার’।

আদিবাসী আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের স্মৃতি

জুলাই গ্রাফিতির অন্যতম সুর আদিবাসী আত্মপরিচয় এবং আদিবাসী-বাঙালি জাতিগত সংহতি। একই সঙ্গে জুলাই গ্রাফিতি বাইনারি বিভাজন এবং বাঙালি জাত্যাভিমানকে প্রশ্ন করেছে। আদিবাসী জীবন ও বসতিতে সামরিকায়নকে জিজ্ঞাসার পাটাতানে হাজির করেছে। মূলত বাংলা ভাষা ও বর্ণমালাতেই বেশির ভাগ গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে, কিছু আঞ্চলিক ভাষাও আছে। ইংরেজি ও আরবি ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি চাকমা ও সাদরি ভাষাতেও কিছু গ্রাফিতি দেখা গেছে।

কল্পনা চাকমা অপহরণকে প্রতীক হিসেবে নিয়ে দেশব্যাপী আদিবাসী নিপীড়ন ও বঞ্চনার প্রশ্ন এবং প্রতিরোধের স্মৃতিকে গ্রাফিতির বিষয় করা হয়েছে। কল্পনা চাকমার প্রতিকৃতি, ঐতিহ্যবাহী চাকমা পোশাক, পাহাড়, জুমচাষ, পাহাড়ের পটভূমি, আদিবাসী নারী-পুরুষ, প্লুং বাঁশি হাতে আদিবাসী, ফং ও রাও পানির পাত্র, বাঁশ, সামরিক শাসনের প্রতীকী উপস্থাপন এঁকে লেখা হয়েছে, ‘কল্পনা চাকমা কোথায়’, ‘জাস্টিস ফর কল্পনা চাকমা’, ‘মিসিং নট ফরগটেন’, ‘১৯৯৬-২০২৪: বিচার কোথায়’, ‘‌পাহাড়ে সেনাশাসন কেন’ ইত্যাদি। ‘আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি’, ‘ইনডিজেনাস লাইভস ম্যাটার’, ‘উই আর ইনডিজেনাস’, ‘পাহাড় বাঁচাও’, ‘বন বাঁচাও’, ‘ল্যান্ড ইজ লাইফ’, ‘প্রকৃতি বাঁচাও’, ‘পরিবেশ রক্ষা কর’ এসব গ্রাফিতির ভেতর দিয়ে কেবল আদিবাসী আত্মপরিচয় নয়, প্রকাশিত হয়েছে প্রাণ-প্রকৃতি ঘিরে আদিবাসী জীবনের বিশ্ববীক্ষা ও দার্শনিকতা।

মিম ও ডিজিটাল সংস্কৃতি

জুলাই গ্রাফিতির গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল ডিজিটাল দুনিয়ার ভাষাকে পাবলিক দেয়ালে স্থানান্তর। এমনকি এটি বোঝাতে কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ অনেক প্রযুক্তিগত উপকরণ এবং বিভিন্ন ডিভাইসের স্ক্রিণ আঁকা হয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘নো সিগন্যাল’, ‘লোডিং ডেমোক্রেসি...’, ‘এরর ৪০৪: জাস্টিস নট ফাইন্ড’, ‘কন্ট্রোল+অল্ট-ডিলিট ডিকটেটরশিপ’, ‘রীবোট বাংলাদেশ’, ‘ডাকাতেরা জানে না জেনজিরা রাতে ঘুমায় না’।

ইতিহাসের উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ

বহু ব্যঙ্গ ও স্যাটায়ার গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে জুলাইয়ে। আঁকা হয়েছে বহু রাজনৈতিক কার্টুন। ‘নাটক কম করো পিও’, ‘এই মামা না প্লিজ’, ‘মুখে গণতন্ত্র হাতে বন্দুক’, ‘নাটক বন্ধ করো’, ‘ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি নিজে নিজে বন্ধ হয়েছে’ গ্রাফিতিগুলো ক্ষমতা ব্যবস্থাকে যাপিতজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যঙ্গ করার ভেতর দিয়ে প্রতিরোধী আওয়াজকে স্পষ্ট করতে পেরেছে।

জুলাইয়ের গ্রাফিতি বাংলাদেশের ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করেছে। পূর্বাপর সব জনবিদ্রোহ ও সংগ্রামকে অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবে পাঠ করেছে। টর্চ লাইটের আলো ফেলে ‘৭১ থেকে ২৪’ আঁকা হয়েছে। লেখা হয়েছে ’৭১-এর চেতনা’, ’৯০-এর পথ ধরে’, ইতিহাস আবার রেখা হচ্ছে’, ‘জুলাই ভুলবে না বাংলাদেশ’। রঙের বালতি, তুলির আঁচড়, বই, মুখোশ, বাঁশি কিংবা কবিতার লাইন লিখে গ্রাফিতিতে লেখা হয়েছে ‘কিবাতা থামানো যায় না’, ‘গান থামে না’, ‘শিল্প বেঁচে থাক’।

সংস্কার ও রূপান্তরের আকাংখা

সবুজ ধানখেত, গ্রামের ছবি, সূর্যোদয়, উড়ন্ত পাখি ও শিশুর ছবি প্রতীকের মাধ্যমে নতুন এক বাংলাদেশের আকাংখায় লেখা হয়েছে, ‘নতুন বাংলাদেশ’, ‘ভবিষ্যৎ আমাদের’, ‘হোপ নেভার ডাইস’, ‘নতুন ভোর’, ‘নতুন সূচনা’, ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’। সংস্কার ও রূপান্তরের আকাংখা নিয়ে বহু গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। খণ্ডিত অভিজ্ঞতা থেকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ হলো জুলাই গ্রাফিতিতে পরিবেশ-ন্যায়বিচার এবং কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার প্রশ্নগুলো স্পষ্টভাবে উত্থাপিত হয়নি। এটি হয়তো হতে পারে, উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে একটা প্রজন্মের দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা কিংবা হয়তো আমাদের যাপিতজীবনের সুশীল অনভ্যাস।

তাই দেখা যায়, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সংস্কারের প্রশ্নেও রাষ্ট্রের উৎপাদন ব্যবস্থার মৌলিক জিজ্ঞাসাকে রাজনৈতিক পক্ষগুলো সরব ও সক্রিয় করতে পারেনি। ভূমি, কৃষি, খাদ্য ব্যবস্থা, জ্বালানি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং লোকায়ত জ্ঞানকাঠামোর ওপর জারি থাকা কর্তৃত্ব, ঔপনিবেশিকতা ও নিউলিবারেল বাহাদুরি তাই প্রশ্নহীনভাবেই বহাল আছে। জুলাই গ্রাফিতি বিস্মৃত, নিখোঁজ বা মুছে না যাক। মুক্তির আকাংখার পরিসর জেগে থাকুক, জাগিয়ে রাখুক। রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার ও রূপান্তরে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো গণপরিসরের দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি হয়ে উঠুক।

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক

আরও