ড. নাভিদ সালেহ অধ্যাপনা করছেন আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে পরিবেশ প্রকৌশল অনুষদে। পাশাপাশি তিনি কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণার বিষয় জল-বিশোধন, পরিবেশ, ন্যানো প্রযুক্তি ও জলবায়ু। বাংলাদেশে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জল-বিশোধন পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রুহিনা ফেরদৌস
বাংলাদেশের
পরিপ্রেক্ষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের পরিস্থিতি বিবেচনায় কী ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা
যেতে পারে?
বাংলাদেশের ওপর প্রভাব অত্যন্ত প্রকট হবে এ কারণে যে
আমাদের মোট উপকূল অঞ্চল ভূমি অঞ্চলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। চাষযোগ্য জমির এক-তৃতীয়াংশই উপকূলবর্তী অঞ্চলে রয়েছে। সরকার ঘোষণা করেছে, বাংলাদেশের প্রায় নয় কোটি মানুষ বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকির
সূচকের আওতায় রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান অবস্থান জোরালো। জলবায়ু উন্নয়ন
প্রকল্পের মাধ্যমে সোলার প্যানেল তৈরি করা,
১০টির মতো কয়লাভিত্তিক
বিদ্যুত্ কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা, পারমাণবিক বিদ্যুত্সহ
বিকল্প বিদ্যুতের দিকে সরকার অগ্রসর হচ্ছেন,
যা অত্যন্ত ভালো দিক। তবে
দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রভাবগুলো বহুমুখী। পুরো দেশের কথা যদি ধরা হয় তাহলে দুটো মূল
বিষয়। এক. বন্যা বা জলাবদ্ধতা। দুই. ঝড় ও সাইক্লোনের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং এর ঘনঘন আঘাত হানা, যা পুরো দেশকে আঘাত করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ২০৫০ সালের
মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির নিচে রাখা না যায়, তাহলে এ প্রভাবগুলো প্রকট হয়ে দেখা দেবে। তবে দক্ষিণাঞ্চলের
প্রভাবগুলোর কথা যদি ধরা হয় তাহলে সেখানে আরো অনেকগুলো দিক জড়িয়ে যায়। যেমন
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই-তিন ফুট বাড়লে
দক্ষিণাঞ্চলের চিংড়ির ঘেরগুলো বিলীন হয়ে যেতে পারে। সুন্দরবন আমাদের অর্থনীতির
পাশাপাশি পৃথিবীর পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবন
থেকে যে কাঠ উত্পন্ন হয় তা ৫০ ভাগ পর্যন্ত কমতে পারে। তাছাড়া ম্যানগ্রোভ
মিসোহ্যালাইন বা মধ্যবর্তী লবণাক্ত অঞ্চলে বেঁচে থাকে। তাই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির
কারণে লবণাক্ততা বাড়লে আমরা মিসোহ্যালাইন থেকে পলিহ্যালাইন বা অতিমাত্রায় লবণাক্ত
অঞ্চলের দিকে চলে যাব। এতে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে
আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ১৪০টি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে চার হাজারের বেশি পরিবার পুনর্বাসিত হবে। কিন্তু
ভাবতে হবে আমরা যে হারে পদক্ষেপ নিচ্ছি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কী সে হারে হচ্ছে, না বেশি হারে হচ্ছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে ছেড়া
দ্বীপ রাষ্ট্র ফিজি যেমন পরিকল্পিত পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে অগ্রসর হচ্ছে।
দ্রুত মানুষকে পুনর্বাসিত করছে। আমাদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ওপর আমাদের আরো জোর দিতে
হবে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সর্বাগ্রে পুনর্বাসিত করতে হবে। দি আই অব
দ্য স্টর্ম নামে সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে স্তর বিন্যস্ত ভূমিকা গ্রহণের কথা বলা
হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের ভূমিকা খুবই কম, আমরা মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ বা তার নিচে গ্রিনহাউজ গ্যাস
নিঃসরণ করি। অথচ পশ্চিমা দেশগুলো ৫০ ভাগের বেশি নিঃসরণ করছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে
আমাদের দায় কতটুকু এবং পশ্চিমের দায় কতটুকু সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে
বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ঠেকানো যেহেতু খুব মুশকিল তাই এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জরুরি প্রস্তুতি
প্রয়োজন।
আপনার গবেষণার অন্যতম
বিষয় জল-বিশোধন। দক্ষিণাঞ্চলসহ
আমাদের উপকূলজুড়ে লবণাক্ততা বাড়ছে। লবণাক্ততা থেকে পরিত্রাণের জন্য কী ধরনের
কৌশলের দিকে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দেবেন?
কিছু কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে যা হয়তো আমাদের
মানুষের সুপেয় পানির অভাব কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারে বলে আমি ধারণা করি। অনেকে
রিভার্স অসমোসিস বা মেমব্রেন প্রযুক্তির মাধ্যমে লবণাক্ত পানিকে সুপেয় পানিতে
পরিণত করার কথা বলবেন। কিন্তু এটির জ্বালানি খরচ অনেক বেশি ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
তাই আমার মনে হয় না মেমব্রেন প্রযুক্তি এখানে কোনো সমাধান দিতে পারবে। আমি দুটি
বিষয়ের কথা বলব। অতিসম্প্রতি পশ্চিমে ইন্টিগ্রেটেড ক্যাচমেন্ট ম্যানেজমেন্ট নামে
একটি পদ্ধতি গ্রহণ করা হচ্ছে। অর্থাত্ যেকোনো একটি অঞ্চলের পানি পরিকল্পনার
ক্ষেত্রে একটি নয় সামগ্রিক দিকগুলো বিবেচনা করতে হবে; যেমন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কাজ করা, জলবায়ুর পূর্বাভাস সম্পর্কে সময়মতো মানুষকে জানানো এবং
জলাবদ্ধ ও লবণাক্ত অঞ্চলের ফসল উত্পাদনের সম্ভব্যতা মূল্যায়ন সম্পর্কিত গবেষণা।
সুপেয় পানি পাওয়ার একটি ভালো উপায় হতে পারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ। আমাদের দেশে
প্রচুর বৃষ্টি হয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অনেক বাড়িতে টিনের চাল রয়েছে, সেখানে যদি আমরা জল সংগ্রহের উপায় রাখি এবং খুব স্বল্প খরচে
তা বিশোধন করে নিই তাহলে তা পান করা যেতে পারে। যদিও এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
নয়। কিন্তু প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল এবং বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে জনগণের আয় ততটা
নয়, সেখানে প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমার
গবেষণা এখানে খুব একটা ফলপ্রসূ হবে বলে মনে হয় না।
কিন্তু বাংলাদেশে
মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুত্
কেন্দ্রসহ অনেক বড় প্রকল্প হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কেন আপনার গবেষণাটি এখানে ফলপ্রসূ
হবে না?
সরকার যদি ভর্তুকি দেয় বা বিনামূল্যে জল সরবরাহের
ব্যবস্থা করে তাহলে রিভার্স অসমোসিস পদ্ধতি বাংলাদেশে কিছুটা হলেও সুপেয় পানির
ব্যবস্থা করতে পারে। তবে মনে রাখা জরুরি,
এটি অত্যন্ত শক্তি
উদ্দীপক। আমরা জানি যে বাংলাদেশে বিদ্যুতের সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশ এখন
লোডশেডিংয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমস্যা একটি নয়,
সমস্যা বহুবিধ। সুতরাং
রিভার্স অসমোসিসের মতো ব্যয়বহুল জল বিশোধন পদ্ধতি বাংলাদেশে নিতে হলে তার
সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করতে হবে, যা অত্যন্ত জরুরি ও দ্রুত
করা প্রয়োজন। কারণ আমাদের খুব বেশি সময় হাতে নেই। আমাদের দেশের অভ্যন্তরণে জলের
আধিক্য রয়েছে। এ প্রযুক্তিকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে এক্সপার্টাইজ দরকার তাও
বাংলাদেশের রয়েছে। বুয়েটের গবেষকেরা রয়েছেন। যারা এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে
পারেন। তাছাড়া বাংলাদেশে জল বিশোধনের কিছু ছোট ছোট ডিভাইস বিক্রি হয়। মালয়েশিয়া ও
জাপান থেকে এগুলো আসে। অনেক ডিভাইসে এ মেমব্রেন প্রযুক্তি রয়েছে, যা মূলত শহরাঞ্চলে ব্যবহার করা হয়। শুধু পানের জন্য নয়, চাষাবাদের জন্যও মিঠা পানির প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রিভার্স
অসমোসিস প্রযুক্তির জন্য সরকারকে প্রচুর অনুদান দিতে হবে। আমার মনে হয় বিআইডিএস ও
বুয়েট একটি যৌথ গবেষণা করতে পারে যে কী মাত্রায় সরকারকে অনুদান দিতে হবে এবং
কোনদিকে এর প্রভাব পড়বে। বুয়েট এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা যাচাই-বিষয়ক গবেষণাটি করতে পারে।
ঢাকাসহ দেশের
শহরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কী করণীয় বলে মনে করেন?
এটিও অত্যন্ত জটিল সমস্যা, যার সরাসরি কোনো সমাধান নেই। টিউবওয়েলগুলোকে আমরা আরো গভীর
করতে পারি, যদিও তা অত্যন্ত
ব্যয়সাপেক্ষ। সুতরাং এটা কোনো সমাধান নয়। ঢাকার কাছে বুড়িগঙ্গা নদী রয়েছে, কিন্তু ট্যানারিসহ অন্যান্য দূষণে এর পানি বহু বছর আগেই
বিষাক্ত হয়ে গেছে। আমার মনে হয়, ঢাকাকেন্দ্রিক সুপেয়
পানির আধিক্য বৃদ্ধির জন্য কেন্দ্রীয় বিশোধন প্লান্ট তৈরি এবং ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের
পানি ব্যবহার একটি সমাধান হতে পারে। পাশাপাশি আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ
কমাতে হবে। কিন্তু কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধি করাটা মুশকিল। আবার
টিউবওয়েলগুলোকে গভীরে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। এক্ষেত্রে সহজ ও কার্যকর
প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। যেমন আমি ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করি। আমরা চেষ্টা
করছি কী করে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে জল বিশোধন করা যায়। মূলত ডিজইনফেক্ট করা
যায় বা পানিকে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের এ
পরিস্থিতিতে আমাদের নদী হারানোর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর ওপর কী ধরনের প্রভাব
পড়বে সে-বিষয়ক সম্পূর্ণ একটি তথ্য আমি দিতে চাই। আমরা জানি, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ রয়েছে। আমি হিমবাহ নিয়ে কাজ
করছি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ বিশেষ করে উত্তর মেরুতে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে
তা নিয়ে গবেষণা করছি। হিমবাহ থেকে নদ বা নদীর জন্ম। সিন্ধু নদ হিমালয়ের প্রায় ৬০০
হিমবাহ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক একইভাবে গঙ্গা,
যা আমাদের পদ্মা বা মেঘনা
হয়ে এসেছে এবং বহ্মপুত্র এ তিনটি হিমবাহ সৃষ্ট নদী। হিমালয়ের মোট যে হিমবাহ রয়েছে
তার এক-তৃতীয়াংশ ২১০০ সালের মধ্যে গলে যাবে। আমরা বৈশ্বিক উষ্ণতা
বৃদ্ধির পরিমাণ ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার কথা বলছি, কন্তু হিমবাহের দ্রুত গলন কতটা ভয়াবহ প্রভাব রাখতে পারে তা
নিয়ে কথা বলছি না। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় থোয়াইটস গ্ল্যাসিয়ার নামে একটি হিমবাহ
আছে। আগামী বছরের মধ্যে এটি অ্যান্টার্কটিকার বরফ খণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে
পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি সরে গেলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর অর্থাত্ ২০৩০-এর
মধ্যে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়াবে দুই-তিন ফুট। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চল কিন্তু ডুবে যাবে। এবার আমি
ফিরে আসছি নদীর নাব্যতা-বিষয়ক আলোচনায়।
পাশ্চাত্যে কেবল ড্রেজিং করাই শেষ নয়,
বরং এর মাধ্যমে নদীর
গতিপথ উল্টে দেয়া হয়। এতে জমে থাকা পলল সরে যায়। নাব্যতা পুনঃস্থাপিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের
ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কায়াহোগা নদীর ওপর এ ধরনের প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে বাংলাদেশের সরকার যেহেতু
অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বাবলম্বী, এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের
কথা ভাবা যেতে পারে।
আপনি হিমবাহ গলে
যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বলছিলেন। আমাদের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোর জন্যও কি হুমকি
হয়ে দাঁড়াতে পারে?
আমি পরিকল্পনাবিদ নই। একজন বিজ্ঞানী কিংবা প্রকৌশলীর
দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে পারি। পৃথিবীর অন্যান্য ক্লাইমেট ভালনারেবল দেশগুলোর গৃহীত
পদক্ষেপ থেকে শেখা যেতে পারে। আমাদের সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
পদক্ষেপ। তবে প্রকল্পটিকে সুপরিচালনা করা,
এর গতিপথ সুনির্দিষ্ট, অর্থাত্ প্ল্যানড
রিলোকেশন করা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি মালদ্বীপে একটি ভাসমান শহর গড়ার পরিকল্পনা
নেয়া হয়েছে, যেখানে ৪০ হাজার ক্লাইমেট
ভালনারেবল মানুষকে স্থানান্তর করা হবে। তবে বাংলাদেশের জন্যে এ ধরনের প্রকল্প কতটা
প্রযোজ্য তা আমাদের দক্ষ পরিকল্পক ও সরকারই কেবল নির্ধারণ করতে পারে। তবে এটুকু
বলতে পারি যে বাংলাদেশের সীমিত সম্পদকে যদি সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবহার
করা হয় তবে সেটি সবচেয়ে কার্যকর হবে।
তবে জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন যে সম্ভব নয় এ কথা
ভুললে চলবে না। পশ্চিমা বিশ্বেও এ ধারণা সম্প্রতি বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। Niue
পশ্চিম প্রশান্ত
মহাসাগরের একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র। এ অঞ্চলের আদিবাসীরা Ovava tree নামের একটি গাছকে
বিশেষভাবে ব্যবহার করে। এ গাছের শেকড় এবং জটা মাটির ওপরে এতটা বিস্তৃত হয় যে তা
গুহার মতো সংরক্ষিত অঞ্চল তৈরি করে প্রাকৃতিকভাবেই। আদিবাসীরা জলোচ্ছ্বাস, ঝড় কিংবা বন্যার কবল থেকে বাঁচার জন্য এই Ovava গাছের গুহায় আশ্রয় নেয়। এ
পদক্ষেপ এতটাই কার্যকর হয়েছে যে ওশেনিয়া অঞ্চলের অন্যান্য রাষ্ট্র এখন দালান
নির্মাণ করছে Ovava গাছের এই প্রাকৃতিক
স্থাপত্যকে অনুকরণ করে। আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের স্থানীয়দের, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী বন্যা আর সাইক্লোন মোকাবেলা করে
চলেছে, তাদের জ্ঞানকে ব্যবহার করলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ
রোধে আরো কার্যকারী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।
একজন পরিবেশ প্রকৌশলী
হিসেবে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে আণবিক শক্তি চুল্লির স্থাপনা কতটা যুক্তিযুক্ত বলে
মনে করেন?
আমি আবারো বলছি,
বাংলাদেশের ‘ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’ একটি অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ। সরকার গত বছর কপ২৬-এ বলেছে, আমাদের দেশে উইন্ড ফার্ম করা হবে। সৌরবিদ্যুতের ওপরও জোর
দেয়া হচ্ছে। এ বিকল্প জ্বালানির পদক্ষেপগুলো নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখে। জলবায়ু
পরিবর্তনকে শ্লথ করতে ক্লিন এনার্জির কোনো বিকল্প নেই। আর এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সরকার আণবিক চুল্লি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটিও
ভালো একটি পদক্ষেপ। প্রশ্ন হচ্ছে এই আণবিক চুল্লি প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব কী? আমার মতে, বাংলাদেশের পরিকল্পক ও
প্রযুক্তিবিদেরা এ বিষয়ে নিশ্চয়ই অবগত এবং তারা সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিয়ে চলেছেন
নিশ্চয়ই। যুক্তরাষ্ট্রে বসে, দেশ থেকে বিযুক্ত অবস্থায়
কোনো মন্ত্রণা দেয়ার আমি কেউ নই। তবে এটুকু বলতে চাই যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে
উদ্ভূত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি,
কিংবা তীব্রতর সাইক্লোন
আর জলোচ্ছ্বাসের যে প্রকোপ দেখে দিচ্ছে,
এতে বাংলাদেশের
দক্ষিণাঞ্চলে জলের সীমা আগামী কয়েক দশকে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিবিড়ভাবে
পর্যালোচনা করা দরকার। রূপপুরের আণবিক চুল্লির স্থাপনার পর যদি জলের উচ্চতা বাড়ে, অনেক দীর্ঘ সময়ব্যাপী জল না সরে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি এক দশকের মধ্যে তিন ফুট বেড়ে যায়, তবে আণবিক চুল্লির স্থাপনার সুরক্ষা আমাদের করতে হবে। আণবিক
শক্তি তৈরি এমন একটি প্রক্রিয়া যা সুরক্ষা করা না গেলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে
দাঁড়াতে পারে। আমরা জাপানের ফুকুশিমা দাইচি আণবিক স্থাপনা এবং ২০১১ সালের ৪৫ ফুট
উঁচু সুনামিতে তার ভয়াবহ পরিণতির কথা জানি। আমরা জানি চেরনোবিলের ১৯৮৬-এর
দুর্ঘটনার কথা, যদিও তা বৈশ্বিক
উষ্ণায়নের সঙ্গে জড়িত নয়। তবে এর প্রভাবের ভয়াবহতা প্রায় প্রবাদতুল্য। আণবিক
চুল্লি তাই একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তির উত্সই নয়, এর সংরক্ষণ তার চেয়েও বেশি পরিকল্পনা ও মনোযোগের দাবি রাখে। আগামী তিন দশকে, কিংবা পাঁচ দশকে,
কিংবা এক শতাব্দীতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে কতটুকু, জলাবদ্ধতা বাড়বে কতটুকু, কোথায় বাড়বে তা,
এমন জ্ঞান অতিজরুরি। আমি
জোর দিয়ে বলতে চাই যে বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য এই আণবিক চুল্লির যথাযথ সংরক্ষণ
অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তনকে পরিকল্পনার সমীকরণে না রাখলে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ
অভিশাপে রূপান্তরিত হতে পারে।
এই আণবিক চুল্লির
সঙ্গে কয়লা থেকে নির্গত শক্তির পার্থক্য কোথায়?
কয়লা থেকে শক্তি নির্গত করার প্রক্রিয়া আণবিক চুল্লির
প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কয়লা পুড়িয়ে,
কার্বন-কার্বন রাসায়নিক বন্ধনকে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে এর মাঝে
লুপ্ত শক্তিকে আহরণ করা হয়। এটি সনাতন একটি ধারা, যা একটি অপরিছন্ন শক্তি প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত। কারণ এ প্রক্রিয়ায়
গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গত হয় যা জলবায়ু পরিবর্তনে ইন্ধন জোগায়। অন্যদিকে আণবিক
চুল্লিতে ফিশন প্রক্রিয়ায় আণবিক রাসায়নিক বিক্রিয়া সঞ্চার করা হয়। এ প্রক্রিয়ায়
স্বতঃপ্রণোদিতভাবে শক্তির সঞ্চার হয়। এখানে কোনো দহনের প্রয়োজন নেই। এ কারণে একে
পরিচ্ছন্ন শক্তি হিসেবে ধরা হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে
শ্লথ করার জন্য কাম্য। তবে এ শক্তি সঞ্চার নিয়ন্ত্রিত হতে হয়। আণবিক চুল্লির
অবস্থান সুরক্ষিত থাকা অপরিহার্য, আগে যেমনটি বলেছি। তাই
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি তিন দশকে তিন ফুট বাড়ে, আর পাঁচ দশকে সাত ফুট বাড়ে, তবে রূপপুরের এই আণবিক
চুল্লির প্রতিরক্ষা তেমন হতে হবে। আর তাই এ ভবিষ্যত্ জলসীমা বাড়ার বিচারে রূপপুরই
কি এ স্থাপনার জন্য আদর্শ? নাকি একে বাংলাদেশের আরো
উত্তরে স্থানান্তর করতে হবে? এ সিদ্ধান্তগুলো আমাদের
সরকার এবং আমাদের পরিকল্পক ও প্রযুক্তিবিদরা যথাযথভাবে নেবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
এ পর্যায়ে আপনার
বর্তমান কাজ বা গবেষণাগুলো নিয়ে শুনতে চাই।
গত দুই দশকে আমি মূলত ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে
জল বিশোধনের গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছি। সম্প্রতি আলাস্কার হিমবাহ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের
কারণে এর গলন নিয়ে গবেষণা শুরু করেছি। এ গবেষণায় আলাস্কার আদিবাসীদের সহস্রাব্দ
প্রাচীন জ্ঞানকে আত্তীকরণের একটি একনিষ্ঠ চেষ্টা আমাদের রয়েছে। আমার গবেষণা
প্রকল্পটি হিমবাহ ও পার্মাফ্রস্ট গলনের কারণে জলের গুণগত মানের কী পরিবর্তন হবে তা
পর্যালোচনা করছে। জলের গুণাগুণ বিচার ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হিমাঙ্কের কাছাকাছি
তাপমাত্রায় যে অণুজীবগুলো বিরাজ করে,
তাদের নিয়ে কাজ করছি। এ
গবেষণালব্ধ জ্ঞান যে কেবল আলাস্কাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে তা আমি মনে করছি না। বরং আমরা
যে ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছি আদিবাসী জ্ঞানকে পশ্চিমা বিজ্ঞানের সঙ্গে সমন্বনের জন্য, তা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলেও কার্যকর হবে বলে আমি মনে করি।