রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা ব্যবসাবান্ধব হয়ে উঠতে পারছে না কেন

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সেবাসহায়তা কার্যক্রম ব্যবসাবান্ধব হয়ে উঠতে পারছে না কেন—এ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এখানে মূলত এনবিআরের কার্যক্রম নিয়েই আলোচনা করা হলো। তবে অন্যান্য খাত ও প্রতিষ্ঠানের সেবাসহায়তা নিয়ে এখানে আলোচনা করা না হলেও সাধারণভাবে এটুকু বলা যেতে পারে যে বাংলাদেশের প্রায় সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সেবার মানই সেবাগ্রহীতাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি নিম্নবর্তী। আর হয়রানি, অস্বচ্ছতা ও অনৈতিকতার মানদণ্ডে এনবিআরের ভাবমূর্তি অন্য অধিকাংশের তুলনায় আরো অধিক নিম্নবর্তী।

ব্যবসায় সহায়তা কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন অভাব-অভিযোগ সরাসরি শোনার উদ্দেশ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতি মাসের দ্বিতীয় বুধবার তাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবে। এ মর্মে ৩ সেপ্টেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। ওই বিজ্ঞপ্তির ধারাবাহিকতায় এ-সংক্রান্ত প্রথম সভা এরই মধ্যে রাজস্ব ভবনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে, যেখানে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এনবিআরের এ উদ্যোগকে হয়তো আপাতদৃষ্টে প্রশংসনীয় বলেই মনে হবে। তবে এ উদ্যোগের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত এনবিআরের ব্যবসায় সহায়তা কার্যক্রমে কতটা গতি আসবে এবং সেখানে কতটা হয়রানিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। কারণ দেশব্যাপী বিস্তৃত এসব কার্যক্রমের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির যে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছেন, তাদের মানসিক গঠন ও আচরণে পরিবর্তন না এলে কিংবা তাদেরকে পরিপূর্ণ জবাবদিহিতার আওতায় আনা না গেলে এ ধরনের মাসিক অংশীজন সভা আয়োজন করে খুব একটা ফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। অতএব, এ ধরনের অংশীজন সভা করার চেয়েও এ মুহূর্তে অধিক জরুরি হচ্ছে উল্লিখিত সেবাসহায়তাদানে জড়িত এনবিআর কর্মীদের দ্বারা দক্ষ, দুর্নীতিবিহীন ও হয়রানিমুক্ত সেবা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা (অংশীজন সভাকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে না)।

এনবিআরের কাছ থেকে সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা কোথায় কী ধরনের সমস্যায় পড়ছেন এবং সেসব সমস্যা নিরসনে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার, তা উদ্যোক্তাদের চেয়ে এনবিআর কর্মীরাই বেশি ভালো জানেন। কারণ এ সমস্যাগুলো তাদের দ্বারাই সৃষ্ট এবং এক্ষেত্রে বিরাজমান অদক্ষতা, নিম্নগতি, জটিলতা, হয়রানি ও ব্যয়বহুলতার পরতে পরতে যে গোমর, রহস্য ও ফাঁকফোকর তা তাদেরই নিপুণ হাতের কারসাজিতে বোনা। বস্তুত এসবের কোনোটিই উদ্যোক্তারা সৃষ্টি করেননি বা তাদের কারণে সৃষ্টি হয়নি। ফলে এসব সমস্যার সমাধান যদি করতে হয়, তাহলে তা এনবিআর বা তার কর্মীদেরকেই করতে হবে। কিন্তু সেটি না করে ব্যবসায়ীদেরকে মাসে মাসে সভায় ডেকে তাদের কাছ থেকে লোক দেখানো মতামত শোনার বাস্তব কোনো কার্যকারিতা আছে বলে মনে হয় না। তো যেসব সমস্যা এনবিআরের নিজেরই জানা আছে, সেই একই সমস্যা পুনরায় ব্যবসায়ীদের মুখ থেকে শুনতে চাওয়াকে আসলে এক ধরনের লোক দেখানো কর্মকাণ্ড ছাড়া আর কিই-বা বলা যায়?

তবে হ্যাঁ, এনবিআর যদি এক্ষেত্রে সত্যিকার সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ শুনতে চায়, তাহলে সেটি তারা করতেই পারে এবং সেটির প্রয়োজনও রয়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা শুরু না করেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এভাবে ঘন ঘন বসতে যাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় বিরাজমান সমস্যার দায় কৌশলে তাদের (ব্যবসায়ীদের) ওপরই চাপিয়ে দেয়া। আর এ ধরনের সভা করার পরও যদি পরিস্থিতির কোনো বাস্তব উন্নতি না হয়, তাহলে এনবিআর তখন ব্যবসায়ীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলতে পারবে যে: আমরা তো আপনাদেরকে সঙ্গে নিয়েই সমস্যা মোকাবেলা করার চেষ্টা করেছি; ফলে এক্ষেত্রে অগ্রগতি না হওয়ার দায় একই সঙ্গে আপনাদেরও। এখন কথা হচ্ছে, যেসব সমস্যা, হয়রানি, জটিলতা ও অনিয়ম উদ্যোক্তারা সৃষ্টি করেননি, সেসবের দায় উদ্যোক্তাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা কতটা যৌক্তিক? এছাড়া সে দায় উদ্যোক্তারা নেবেনই-বা কেন? এনবিআরের দ্বারা সৃষ্ট সমস্যা ও অনিয়মের দায় এবং তাদের নিজেদের অদক্ষতা ও হীনচিন্তা দূরীকরণের উদ্যোগ বস্তুত তাদেরকেই নিতে হবে, যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে।

সে যা-ই হোক, ধারণাগত আলোচনা আর না বাড়িয়ে এবার এনবিআরের সেবাসহায়তাগুলোকে কীভাবে সহজে, হয়রানিমুক্তভাবে ও বাড়তি অর্থ ব্যয় ছাড়াই উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছানো যেতে পারে এবং সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণের কাজটি কোন পদ্ধতিতে করলে তা থেকে কার্যকর ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক, সেসব নিয়ে খানিকটা আলোচনা করা যেতে পারে। প্রথমেই এনবিআরের অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে এর সেবাসহায়তাগুলোকে দক্ষ ও গতিশীল করা প্রসঙ্গে। এ-সংক্রান্ত কাজের দুটি অংশ, যার প্রথমাংশে রয়েছে এনবিআর কর্মীদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতার উন্নয়ন, তাদের কারিগরি ও প্রাযুক্তিক সামর্থ্য বৃদ্ধিকরণ এবং সর্বোপরি এ দুইয়ের সমন্বয়ে এনবিআরকে একটি উদ্যোক্তাবান্ধব চৌকস প্রাতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানো। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলব, এনবিআরের পক্ষে এটি খুবই সম্ভব। তবে সেজন্য প্রয়োজন মেধাবী, দক্ষ ও দেশপ্রেমের বোধসম্পন্ন দূরদর্শী নেতৃত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এনবিআরের ভবনাদি ও অন্যান্য বাহ্যিক আয়োজনের জৌলুশ বাড়লেও উল্লিখিত দক্ষতা ও সেবার মানের ক্ষেত্রে তেমন কোনোই উন্নতি ঘটছে না। এবারে আসা যাক এনবিআরের সেবাসহায়তাগুলোকে দক্ষ ও গতিশীল করা সংক্রান্ত কাজের দ্বিতীয় অংশ প্রসঙ্গে, যার মূলে রয়েছে এনবিআর কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিক গঠন ও পেশাগত আচরণে পরিবর্তন আনয়নের বিষয়টি। আর কাজের অগ্রাধিকার বিবেচনায় এটিই হচ্ছে বস্তুত প্রথম কাজ।

এনবিআর যদি তার কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা ও দৈনন্দিন পেশাগত আচরণে পরিবর্তন আনতে না পারে, তাহলে প্রথমোক্ত কাজগুলোও এক্ষেত্রে কোনো বাস্তব ও ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কীভাবে করা সম্ভব অথবা তা আদৌ সম্ভব কিনা? জবাব হচ্ছে, অবশ্যই তা সম্ভব এবং সেক্ষেত্রে একেবারে প্রথম শর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আর এটি শুধু এনবিআরের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী বা উপদেষ্টার রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয়—রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত পুরো সরকারের সামগ্রিক রাজনৈতিক ইচ্ছা বা অনিচ্ছাই এক্ষেত্রে মূল নিয়ামক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ ধরনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো সুদূরপরাহত।

এ অবস্থায় এই মুহূর্তে অবশিষ্ট থাকে আমলাতান্ত্রিক সদিচ্ছার বিষয়টি। এনবিআরের সঙ্গে যুক্ত আমলাতন্ত্রের সদস্যরা কি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একযোগে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, মনমানসিকতা ও আচরণ বদলাতে সম্মত হবেন? কারো কারো পক্ষে এটি সম্ভব হলেও সামগ্রিকভাবে একযোগে তা বদলানো প্রায় অসম্ভব। তবে যা সম্ভব তা হচ্ছে, আমলাতন্ত্রের শীর্ষ নির্বাহীরা ইচ্ছা করলে তার সদস্যদের জবাবদিহিতার বিষয়টি বহুলাংশে নিশ্চিত করতে পারেন, যেমনটি করে চলেছেন ভারত, শ্রীলংকা ও নেপালের আমলাতন্ত্রের সদস্যরা। ভারতের রাজনৈতিক চর্চার ধরন ও প্রবণতা নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, তার আমলাতান্ত্রিক কাঠামো কিন্তু ঠিকই যৌক্তিক ও জবাবদিহিতাপূর্ণ আচরণ করে যাচ্ছে। দেশটির ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি ও তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের জন্য নির্বাচন কমিশন ও বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহারের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমলাতন্ত্র ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।

দেশটির বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম যে এত দ্রুত গতিতে প্রসারিত হচ্ছে, তার পেছনেও ওই আমলাতন্ত্রের ভূমিকাই মুখ্য। বিনিয়োগ কার্যক্রমে রাষ্ট্রসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সে দেশের রাজনীতিকরা মাঝে মাঝেই বিভিন্নভাবে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলেও (উদাহরণস্বরূপ: মোদি সরকার কর্তৃক ২০২৪ সালের আগস্টে আদানি গ্রুপের ৪৫ হাজার কোটি রুপির ঋণ মওকুফ করে দেয়া) আমলাতান্ত্রিক দৃঢ়তার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেসব প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে এর উল্টোটি, যেটি এনবিআরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাজনীতিক বা তদস্থানীয়রা ঈশারা করা মাত্র চাহিত কর বা শুল্ক এখানে কোনোরূপ যাচাই-বাছাই বা নিয়মমাফিক প্রতিবাদ ছাড়াই সঙ্গে সঙ্গে মওকুফ হয়ে যাচ্ছে। আর এমনটি শুধু যে রাজনৈতিক সরকারের আমলেই ঘটছে তা নয়—বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও তা একই ধারায় ঘটে চলেছে এবং এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও চালু আছে। অথচ ভারত, শ্রীলংকা বা নেপালের আমলাতন্ত্রের মতো বাংলাদেশের এনবিআর সদস্যরা যদি নিজেদের দায়িত্ব ও এখতিয়ারের পরিধিতে অটল থেকে দায়িত্ব পালন করে যেতেন, তাহলে তাদের রাজস্ব আহরণের পরিমাণই শুধু বাড়ত না, একই সঙ্গে তাদের এ-সংক্রান্ত সেবাকার্যক্রমও বহুলাংশে সহজ, হয়রানিবিহীন ও দুর্নীতিমুক্ত হয়ে উঠতে পারত।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতি বা আমলাতন্ত্র কোনোটিই সহসা জনবান্ধব বা উদ্যোক্তাবান্ধব হয়ে উঠবে—এমন কোনো লক্ষণ বা প্রবণতা মোটেও চোখে পড়ছে না। এ অবস্থায় এসব নিয়ে যত লেখালেখি ও বসাবসিই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত এসব লেখা ও বসার বক্তব্য ও আলোচনা কোনোটিই কোনো কাজে আসবে বলে মনে হয় না। উদাহরণস্বরূপ, এনবিআরের ১০ সেপ্টেম্বরের অংশীজন সভার কথাই ধরা যাক। এ সভা থেকে ফিরে যাওয়ার পর, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, ব্যবসায়িক সেবার বিষয়ে কোনো এনবিআর কর্মীর মানসিক গঠনে কি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে কিংবা তাদের মানসিকতা পরিবর্তনে এনবিআর কি বস্তুতই কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পেরেছে? যদি না পেরে থাকে, তাহলে এসব বসাবসির আসলেই কি কোনো অর্থ আছে? কিন্তু তার পরও দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বিবেকের দায় ও পরিবর্তনকামী চিন্তার তাড়না থেকে এনবিআরের সেবাসহায়তা কার্যক্রমকে উদ্যোক্তাবান্ধব করে তোলার লক্ষ্যে কতিপয় প্রস্তাব নিম্নে তুলে ধরা হলো।

এক. গত সাড়ে পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলে: রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ব্যতীত কেবল দেশপ্রেম, জনস্বার্থ, দায়িত্ববোধ ইত্যাদি নীতিবোধের কথা বলে এনবিআর কেন বাংলাদেশের কোনো পর্যায়ের কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মচারীর মানসিক গঠনই আপাতত আর পাল্টানো যাবে বলে মনে হয় না। সেক্ষেত্রে এনবিআর নেতৃত্ব যদি কঠোর তত্ত্বাবধান ও পরিধারণের মাধ্যমে তার কর্মীদেরকে কার্যভিত্তিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সচেষ্ট হন, তাহলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেকটা বাধ্য হয়ে হলেও উদ্যোক্তাদেরকে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তারা হয়তো কিছুটা হলেও যত্নবান হবেন। তবে এটি নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখাতে হবে। নইলে কোনো আদেশ-নির্দেশ বা অনুশাসনই এক্ষেত্রে কোনো কাজে আসবে না।

দুই. এনবিআরকে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা তদস্থানীয় তদবির, চাপ ও মব উপেক্ষা করে কাজ করার ব্যাপারে সাহসী ও উদ্যোগী হতে হবে। এ ধরনের ও এভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রের আইন, বিধি ও কাঠামোতে এনবিআরকে যথেষ্ট ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দেয়া আছে। তবে এ ধরনের তদবির ও চাপ উপেক্ষা করার মতো সাহস কেবল তখনই দেখানো সম্ভব হবে যখন তারা নিজেরা যেকোনো ধরনের লোভ-লালসা, অনৈতিকতা ও অনিয়মের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারবেন।

তিন. বাজেটকে সামনে রেখে প্রতি বছরই নতুন করে কর-শুল্কের হার নির্ধারণের গতানুগতিক ধারা থেকে এনবিআরকে বেরিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য কারো মুখের দিকে না তাকিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য এমন একটি জনস্বার্থমুখী স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি কর ও শুল্ককাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যা বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে। তবে হ্যাঁ, মূল কাঠামোকে ঠিক রেখে প্রতি বছরের বাজেটের প্রাক্কালে সেটি সীমিত পরিসরে পর্যালোচনা ও সমন্বয় করা যেতে পারে। আর ওই স্থায়ী কর ও শুল্ককাঠামোটি প্রণয়নের জন্য বাজেট মৌসুমের বাইরে অন্য সময়ে দেশের উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ, পেশাজীবী, সাধারণ করদাতা ও সংশ্লিষ্ট অন্যদেরকে নিয়ে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা যেতে পারে।

চার. অংশীজনদের সঙ্গে প্রতি মাসে সভা না করে সভাটি প্রতি তিন মাস অন্তর করা যেতে পারে, যাতে এসব সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোক্তাদের উত্থাপিত মতামত ও অভিযোগগুলোর বাস্তবায়ন ও নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত অগ্রগতি নিয়ে ওইসব সভায় কার্যকর আলোচনা করা সম্ভব হয়। অভিজ্ঞতা বলে, প্রতি মাসে সভা হলে সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেয়ে এর আয়োজনের বিষয়টিতেই অনেক বেশি সময়, পরিশ্রম ও মনোযোগ চলে যায়।

পাঁচ. অংশীজন সভা শুধু রাজধানীতে বসে করলেই হবে না—এটি মাঠ পর্যায়েও করতে হবে এবং সেসব সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সেখান থেকে প্রাপ্ত মতামত, সমস্যা ও সুপারিশগুলোকেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আর রাজধানী ও মাঠপর্যায় উভয় স্থান থেকে প্রাপ্ত মতামতগুলোকে একীভূত করে সেগুলো সমন্বিত আকারে বাস্তবায়নের ব্যাপারেও এনবিআরকে উদ্যোগী হতে হবে।

ছয়. সভার বাইরেও যাতে উদ্যোক্তা ও করদাতারা সারা বছর ধরে এনবিআরের কাছে বিভিন্ন মতামত, সুপারিশ ও সমস্যা তুলে ধরতে পারেন, সে জন্য একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ‘অভিযোগ গ্রহণ ও পরিধারণ কোষ’ গঠন করা যেতে পারে, যেখানে করদাতারা অনলাইনে ও সশরীরে অভিযোগ, মতামত ও সুপারিশ দায়ের করতে পারবেন। আর ওই কোষ শুধু অভিযোগ ও অভিমত গ্রহণ করে সেগুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা শাখাতেই পাঠাবে না, সেসব দপ্তর থেকে এসবের বাস্তবায়ন অগ্রগতি সংগ্রহ করে দুই মাস পর পর সমন্বিত আকারে এনবিআরের বোর্ড সভায়ও উপস্থাপন করবে। পাশাপাশি তারা দেশব্যাপী বিস্তৃত এনবিআর কার্যক্রমের বাস্তবায়ন অগ্রগতিও নিয়মিত ভিত্তিতে পরিধারণ করবে।

সাত. রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজমান নানা সমস্যা, দুর্বলতা ও সংকটের মধ্যেও ভারত, শ্রীলংকা ও নেপালের আমলাতন্ত্র যেভাবে দক্ষতা ও পারঙ্গমতার সঙ্গে পক্ষপাতহীনভাবে দেশ চালিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রকেও সেভাবে দেশ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আত্মোপলব্ধি ও আত্মপর্যালোচনার মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে, যা এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রযোজ্য। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে এতটাই বিভাজিত যে এটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর সমূদয় মর্যাদাকেই বলতে গেলে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের স্থায়ী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এভাবে রাজনৈতিক চরিত্র দ্বারা বিভাজিত হওয়ার ঘটনার কথা জানা যায় না বলেই চলে। এমনকি পাকিস্তানের মতো অতি নিম্নস্তরের রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনী রাজনীতি ও বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করলেও সে তুলনায় এর আমলাতন্ত্র এখনো পেশাগত চরিত্র অনেকখানিই বহাল রাখতে পেরেছে। তাই প্রস্তাব হচ্ছে, এনবিআরসহ বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের সদস্যরা যেন আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের মূল পেশদারত্বের চরিত্রকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সচেষ্ট হন। নইলে প্রতিবার সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকেও ভাগ্য বদলের খেলায় নামতে হবে, যা তাদের জন্য মোটেও মর্যাদাকর কোনো বিষয় নয়।

পরিশেষে বলব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সেবাসহায়তা কার্যক্রম ব্যবসাবান্ধব হয়ে উঠতে পারছে না কেন—এ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এখানে মূলত এনবিআরের কার্যক্রম নিয়েই আলোচনা করা হলো। তবে অন্যান্য খাত ও প্রতিষ্ঠানের সেবাসহায়তা নিয়ে এখানে আলোচনা করা না হলেও সাধারণভাবে এটুকু বলা যেতে পারে যে বাংলাদেশের প্রায় সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সেবার মানই সেবাগ্রহীতাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি নিম্নবর্তী। আর হয়রানি, অস্বচ্ছতা ও অনৈতিকতার মানদণ্ডে এনবিআরের ভাবমূর্তি অন্য অধিকাংশের তুলনায় আরো অধিক নিম্নবর্তী। এ অবস্থায় আশা করব, একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এনবিআরের যে বিশাল গুরুত্ব, সেদিকে তাকিয়ে হলেও এর কর্মীরা এ প্রতিষ্ঠানকে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবয়বে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবেন। অন্যদিকে কৃষি, শিল্প, ব্যবসায় ও অন্যান্য খাতে সেবাসহায়তাদানে যুক্ত অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ ব্যাপারে নিজেদের সেবার মানোন্নয়নের ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানাই এ কারণে যে এসব সেবা যারা গ্রহণ করছে, সেসব তাদের প্রতি কোনো অনুকম্পা নয়। বরং রাষ্ট্রকে দেয়া নিজেদের কষ্টার্জিত করের বিনিময়েই তারা এসব গ্রহণ করছে, যা তাদের অধিকার।

আবু তাহের খান: অ্যাডজাংকট ফ্যাকাল্টি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়।

আরও