দীর্ঘদিন ধরে দেশের রফতানি আয়ের সিংহভাগ জোগান দেয়া এ খাত এখন রফতানি হ্রাস, কারখানা বন্ধ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার তীব্র চাপের কারণে বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে। এ সংকটকে মোকাবেলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক নীতিগত সংস্কার।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবির) তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাত ২০২৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার আয় করেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। ২০২৫ অর্থবছরে এ খাতের আয় ছিল ৩ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলার। এটি কেবল পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; বরং এ সংকটের গভীরতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থান হ্রাসে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে ১১৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৯৬ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে যান। একই সময়ে ১২৮টি নতুন কারখানা চালু হয়েছে। কিন্তু এসব কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। সে হিসেবে প্রায় ২২ হাজারেরও বেশি মানুষ জীবিকা হারিয়েছেন। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত আরো ৩০টিরও বেশি কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু গত ৬ মাসে বন্ধ হয়েছে ২৭টি পোশাক কারখানা। রফতানি আদেশ কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্য নিয়ে চাপ এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি— সব মিলিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে চরম মূল্য দিচ্ছেন উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা। বেশি চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে অর্থনীতিকে। চাকরি হারিয়ে অনেকেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হচ্ছেন। তাদের সামনে প্রশ্ন— কীভাবে চলবে সংসার, কোথায় মিলবে নতুন কর্মসংস্থান? কারণ শিল্পের এ সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটেও রূপ নিচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এ সংকটের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। এটি একাধিক সমস্যার সম্মিলিত ফল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বালানি সংকট। দেড় দশক ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি দেশের শিল্প খাতের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে রয়েছে। এর প্রভাব শুধু পোশাক শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়; সুতা, কাপড়, ডায়িং ও অ্যাকসেসরিজসহ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমানে উৎপাদনের একটি বড় অংশ জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। নতুন বিনিয়োগ হওয়া বহু শিল্প ইউনিটও গ্যাস সংযোগের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়মিত লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এছাড়া কাস্টমস জটিলতা, বন্ড সুবিধা পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং এইচএসকোড-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে ব্যবসার ব্যয় ও সময় উভয়ই বেড়ে যাচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিল্প পুনরুদ্ধার ও অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এখন সবচেয়ে জরুরি উৎপাদনমুখী ও ব্যবসাবান্ধব নীতি। এমন একটি অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যা বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগসহ (এফডিআই) দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে। এটি একদিকে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে উঠতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, অন্যদিকে এতে শিল্পের ভিত্তি সুদৃঢ় হবে।
অন্যদিকে শ্রম অসন্তোষ ও অস্থিরতা অনেক সময় উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শ্রমিকদের অন্যায্য আন্দোলনের ফলে বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও তারল্য সংকট পোশাক শিল্পের জন্য যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে একীভূত ব্যাংকগুলোর গ্রাহক কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। তারল্য সংকটের কারণে সময়মতো এলসি খুলতে না পারায় কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ক্রেতার নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা এবং অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়ের মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক উদ্যোক্তাকে। ফলে ব্যাংকিং সংকট সরাসরি পোশাক শিল্পের উৎপাদন, রফতানি সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এ অবস্থায় বন্ধ থাকা কারখানা চালু ও বন্ধ হওয়ার উপক্রম প্রতিষ্ঠান চালু রাখার জন্য সরকারের ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল বর্তমান পরিস্থিতিতে ইতিবাচক উদ্যোগ। সরকারের এ সময়োপযোগী উদ্যোগ দুটি দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রথমত, এটি সংকটে থাকা শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি শিল্পোন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এ ধরনের দূরদর্শী উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ। এ তহবিল যেন প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হাতেই পৌঁছে এবং এর কোনো অপচয় বা অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে কেবল আর্থিক সহায়তা দিয়ে এ শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সমস্যার মূল কারণগুলোর সমাধান না হলে অর্থায়ন সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারবে না।
অর্থায়নের পাশাপাশি এখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রের অনুসন্ধান জোরদার করা এবং একটি বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিন ধরে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে, যার প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। তাই এ স্থবিরতা কাটিয়ে দেশীয় জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য অনুকূল নীতিগত পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। বিশেষ করে শিল্প-কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। উপযুক্ত প্রণোদনা, সহজ অর্থায়ন এবং সহায়ক নীতিমালার মাধ্যমে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে শিল্প খাতের জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরো ডিজিটাল, স্বয়ংক্রিয় ও সমন্বিত করতে হবে, যাতে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম দ্রুত ও কম ব্যয়ে সম্পন্ন করা যায়। উৎপাদন ব্যয় কমাতে নীতিগত সহায়তা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করাও সময়ের দাবি। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অস্থিরতা সৃষ্টি করে কারখানা করার মতো পরিস্থিতি শক্তহাতে মোকাবেলা করতে হবে।
আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। সেখানে শিল্প মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, পরিবহন খাতের প্রতিনিধি এবং নীতিনীর্ধারকদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগই শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রফতানি হ্রাস, কারখানা বন্ধ, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে কঠিন। তবে সময়োপযোগী নীতি এবং সরকার-শিল্প মালিক-শ্রমিকের সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া গেলে এ খাত আবারো ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। কারণ পোশাক শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানো শুধু একটি শিল্পের পুনরুদ্ধার নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় করার পূর্বশর্ত।
আশিকুর রহমান তুহিন: ব্যবস্থাপনা পরিচালক
টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ