অষ্টাদশ
শতকের বিখ্যাত
ব্রিটিশ নৈতিক
দার্শনিক ও
সমাজবিজ্ঞানী অ্যাডাম
স্মিথ অর্থশাস্ত্রের
জন্য অত্যন্ত
মূল্যবান কিছু
অবদান রেখে
গেছেন। তার
মধ্যে অন্যতম
প্রথমটি হলো,
‘অদৃশ্য
হাত’-এর
ধারণা, যা
তিনি তার
লেখা বই
‘The
Theory of Moral Sentiments’-এ
উপস্থাপন করেছেন।
আরো দুটো
তিনি বিস্তারিতভাবে
ব্যাখ্যা করেছেন
তার দ্বিতীয়
গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ
‘The
Wealth of Nations’-এ।
এ দুটোর
একটি হলো
‘Mercantilism’-এর
ওপর তার
আপত্তিসহ ‘Wealth
of Nations -এর
অভিনব ধারণা।
তার তৃতীয়
বড় কাজটি
হলো, ‘Physiocrat’-দের
সমালোচনাসহ ‘শ্রমবিভাজন’
তত্ত্বের উপস্থাপনা।
এছাড়া তিনি
অর্থনীতির আরো
বেশকিছু মৌলিক
বিষয়ের ওপর
তার জ্ঞানগর্ভ
বক্তব্য রেখেছেন।
এসব কারণে
তাকে অর্থশাস্ত্রের
পিতা বলা
হয়ে থাকে।
উনিশশ চৌষট্টি
সালে চতুর্দশ
শতকের আরব
অর্থনীতিবিদ ইবনে
খালদুনের ‘আল্-মুকাদ্দিমা’-এর
ওপর জোসেফ
জে স্পেংলারের
লেখা একটি
যুগান্তকারী প্রবন্ধ
প্রকাশিত হয়েছে।
এর ফলে
ইংরেজিভাষী পাঠক,
লেখক ও
গবেষকদের মধ্যে
বেশ সাড়া
পড়ে যায়
এবং ইবনে
খালদুনের ওপর
আরো অনেক
লেখালেখি হয়েছে।
এখন জানা
যাচ্ছে অ্যাডাম
স্মিথ, আর্থার
ল্যাফার, আলফ্রেড
মার্শাল, টমাস
মাল্থাস এবং
জন ম্যানার্ড
কেইন্সেরও শত
শত বছর
আগে তাদেরই
কথা, খালদুন
তার ‘আল্-মুকাদ্দিমা’য়
বিশদভাবে ব্যাখ্যা
করে গেছেন।
তাই আমরা
বলতে পারি
ইবনে খালদুন
অ্যাডাম স্মিথের
অনেক তত্ত্বের
মৌলিক পূর্বচিন্তক
ও আধুনিক
অর্থশাস্ত্রের একজন
অন্যতম পূর্বসূরি।
দার্শনিক-সমাজবিজ্ঞানী
অ্যাডাম স্মিথ
যা লিখে
গেছেন তার
মধ্যে অন্তত
দুটো বই
আমার এ
প্রবন্ধের জন্য
খুবই প্রাসঙ্গিক।
প্রথমটি ‘The
Theory of Moral Sentiments’, যা
প্রথম প্রকাশিত
হয় ১৭৫৯
সালে। দ্বিতীয়টি
‘An
Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations’-যার
সংক্ষিপ্ত নাম
‘The
Wealth of Nations’।
এটি প্রথম
বাজারে আসে
১৭৭৬ সালে।
এ দুই
বইয়ে স্মিথ
অনেকগুলো দার্শনিক,
নৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক
এবং অর্থনৈতিক
তত্ত্বকথা ও
অন্যান্য বিভিন্ন
বিষয়ের ওপর
আলোকপাত করেছেন।
অনেকে মনে
করে থাকেন,
এর মাঝে
তার তিনটি
অবদান বিশাল
বড় মাপের।
প্রথমটি হলো,
‘অদৃশ্য
হাত’-এর
ধারণা, যা
তিনি ‘The Theory of Moral
Sentiments’-এ
স্পষ্ট করে
বলেছেন। দ্বিতীয়টিও
কোনো অংশে
এর চেয়ে
কম চমকপ্রদ
নয়। ‘Mercantilism’-এর
ওপর তার
ঘোরতর আপত্তি
এবং ‘Wealth of Nations’-এর
অভিনব ধারণা
যা তিনি
ব্যাখ্যা করেছেন
তার দ্বিতীয়
বই ‘The Wealth of Nations’-এ।
একই বইয়ে
তিনি তার
তৃতীয় যে
বড় কাজটি
করে গেছেন
তাহলো, তার
সমসাময়িককালের ‘Physiocrat’-দের
কঠোর সমালোচনা
ও ‘শ্রমবিভাজন’
তত্ত্বের উপস্থাপনা।
এখন এসব
বিষয়ই আমি
একে একে
সংক্ষেপে আপনাদের
সামনে তুলে
ধরব।
অদৃশ্য হাত
অ্যাডাম
স্মিথের ‘অদৃশ্য
হাত’ হলো
মুক্তবাজার অর্থনীতির
অন্তরাত্মা। তার
মতে, বাজার
ব্যবস্থার মধ্যে
এমন এক
অন্তর্নিহিত শক্তি
লুকিয়ে থাকে,
যা কিনা
আপনাআপনি পণ্য
উৎপাদন এবং
সঙ্গে সঙ্গে
তার মূল্য
স্বাভাবিক রাখার
নিশ্চয়তা দেয়।
এভাবে বাইরের
হস্তক্ষেপ ছাড়া
সফল, কার্যকর
এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে
বাজার নিজেকেই
নিজে নিয়ন্ত্রণ
করতে পারে।
ব্যাপারটা উদাহরণ
দিয়ে এভাবে
বোঝানো যায়—কোনো
কারণে যদি
আড়ংয়ে কোনো
পণ্যের ঘাটতি
দেখা দেয়,
তাহলে তার
দাম বাড়ে।
দাম বাড়লে
বিক্রেতাদের মুনাফা
ফুলে-ফেঁপে
ওঠে। বাড়তি
লাভের লোভে
শিল্পে নতুন
নতুন উদ্যোক্তাদের
আগমন ঘটে,
পণ্য উৎপাদন
ও সরবরাহ
বৃদ্ধি পায়
এবং ধীরে
ধীরে দাম
নিচের দিকে
নামতে থাকে।
পণ্যমূল্য তার
স্বাভাবিক জায়গায়
আসার আগ
পর্যন্ত এ
প্রক্রিয়া চলতেই
থাকে। ‘স্বাভাবিক
জায়গাটা’ কোথায়,
সেটাও বাজারই
তার নিজস্ব
নিয়মে নির্ধারণ
করে, যেখানে
চাহিদা সরবরাহের
ভারসাম্য থাকে
এবং ক্রেতা-বিক্রেতা
কেউ-ই
কোনো ধরনের
অস্থিরতায় ভোগেন
না।
ঠিক উল্টোভাবে
কোনো কারণে
যদি বাজারে
কোনো জিনিসের
প্রাচুর্য দেখা
দেয় তাহলে
তার দাম
কমে যায়।
দাম কমলে
প্রথমদিকে বিক্রেতাদের
ব্যবসা-সুফল
হ্রাস পায়
এবং অবশেষে
তারা লোকসান
গুনতে বাধ্য
হয়। বেশিদিন
ক্ষতি-ধারা
চলতে থাকলে
বাজার থেকে
অধিকতর দুর্বল
উদ্যোক্তা ও
উৎপাদনকারীরা সময়ের
সঙ্গে সরে
দাঁড়ায়। ফলে
পণ্যের উৎপাদন
ও সরবরাহ
কমতে থাকে।
সরবরাহ কমার
সঙ্গে সঙ্গে
চাহিদার চাপে
মূল্য আবার
ঊর্ধ্বমুখী হয়
এবং এ
ধারাও অব্যাহত
থাকে দাম
স্বাভাবিক জায়গায়
ফিরে না
আসা পর্যন্ত।
বাজারে যদি
বাইরের হস্তক্ষেপ
না থাকে,
প্রতিযোগিতা থাকে
অবাধ এবং
ন্যায্য, ক্রেতা-বিক্রেতার
সংখ্যা থাকে
প্রচুর, তাহলে
কোনো ব্যক্তি
বা গোষ্ঠী
বাজার ব্যবস্থার
ওপর কোনো
অশুভ প্রভাব
ফেলতে পারে
না এবং
মূল্য স্বাভাবিক
থাকে, অতিরিক্ত
বাড়েও না,
আবার কমেও
না। বিক্রেতারা
লোকসান গোনেন
না, আবার
বেশি বেশি
লাভও করতে
পারেন না।
ক্রেতা-ভোক্তারা
চাহিদামতো জিনিস
পান। তবে
সরকারি আনুকূল্যে
অথবা অন্য
কোনো কৃত্রিম
কিংবা অসৎ
উপায়ে বাজারে
যদি কেউ
একচেটিয়া আধিপত্য
বিস্তার করে
তবে স্মিথের
মুক্তবাজার অর্থনীতি
মুখ থুবড়ে
পড়ে। এ
অবস্থায় রাষ্ট্রকে
ত্বরিত ব্যবস্থা
নিয়ে বাজারে
ক্রিয়াশীল ‘অদৃশ্য
হাত’কে
মুক্ত করে
দিতে হয়,
যাতে সে
সঠিক নিয়মে
সহজে আবার
কাজ করতে
পারে। এ
পবিত্র দায়িত্ব
পালনে রাষ্ট্রের
হাতে একাধিক
যথাযথ ও
কার্যকর ব্যবস্থাপত্র
আছে, যার
বিশদ আলোচনা
এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
‘সম্পদ’
কী এবং
একটি ‘সম্পদশালী’
দেশ বলতে
কী বোঝায়,
স্মিথ তা
গভীর ও
নিবিড়ভাবে সন্ধান
করেছেন এবং
এর একটি
চমত্কার সমাধানও
খুঁজে পেয়েছেন।
তবে এটা
বুঝতে হলে
আগে Mercantilism-এর
কথায় ফিরে
যেতে হয়।
স্মিথের আগে
এ মতাদর্শে
বিশ্বাসী পণ্ডিতরা
সাধারণ জনগণ
ও ভোক্তাদের
চেয়ে উদ্যোক্তা
এবং উৎপাদকদের
স্বার্থকে অনেক
বড় করে
দেখতেন। এ
গোষ্ঠীভুক্ত লোকজন
মনে করত,
উৎপাদকরা পণ্য
উৎপাদন করে
রফতানির মাধ্যমে
সোনাদানা ও
টাকা-পয়সা
জমা করে
দেশের ‘সম্পদ’
বাড়ান। অন্যদিকে
ভোক্তারা কোনো
কিছু সৃষ্টি
না করে
সব খেয়ে-দেয়ে
অথবা খরচ
করে ধ্বংস
করে ফেলেন।
স্মিথ তাদের
এ দাবি
মানতে একদম
নারাজ। তিনি
বললেন, সাধারণ
জনগণ এবং
ভোক্তারা তাদের
চাহিদা দিয়ে
উৎপাদনকে উৎসাহিত
করেন বলেই
পণ্য উৎপাদন
বৃদ্ধি পায়
এবং ব্যবসায়ীরা
সুফল ঘরে
তুলে আনেন।
সুতরাং উৎপাদকদের
চেয়ে সাধারণ
জনগণ এবং
ভোক্তারাই বড়।
এখানে স্মিথ
আরো দুটি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়ে তার
বক্তব্যকে পরিষ্কার
করে সামনে
নিয়ে আসেন।
প্রথমত, পণ্য
উৎপাদনের লক্ষ্য
ও উদ্দেশ্য
বিদেশে বিক্রি
করে টাকা-পয়সা
এবং মূল্যবান
ধাতবদ্রব্যের পাহাড়
গড়ে তোলা
নয়, বরং
সাধারণ ক্রেতা-ভোক্তাদের
মধ্যে পণ্য
ও সেবার
সুষম বণ্টন
ও তাদের
ভোগের মাধ্যমে
প্রকৃত জনকল্যাণ
নিশ্চিত এবং
তা বৃদ্ধি
করা। দ্বিতীয়ত,
সম্পদের মাপকাঠি
টাকা-পয়সার
অংক নয়,
বরং টাকা-পয়সা
দিয়ে কী
পরিমাণ প্রকৃত
পণ্য ও
সেবা জনগণ
কিনতে পারে
ও ভোগ
করতে পারে,
সে সক্ষমতা।
অতএব, যে
দেশে যত
বেশি মানুষ
যত বেশি
পণ্য এবং
সেবা উপভোগ
করতে পারে,
সে দেশ
তত বেশি
‘সম্পদশালী’,
তত বেশি
‘ধনী’।
স্মিথের ভাষায়,
প্রকৃতপক্ষে এটাই
হলো ‘Wealth of Nations’-এর
মর্মকথা।
মার্কেন্টাইলিস্টদের আরেকটা
ভুল ধারণা
ছিল। তারা
মনে করতেন,
যেসব দেশ
সোনাদানার বিনিময়ে
পণ্য রফতানি
করে তারা
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
থেকে লাভবান
হয়, আর
যারা পণ্য
আমদানি করে
তারা ধনরত্ন
হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত
হয়। রফতানিকারকদের
লাভ, আমদানিকারকদের
ক্ষতির সমান,
তাই আন্তর্জাতিক
বাণিজ্যে সার্বিক
লাভালাভ শূন্যের
কোটায় থিতু
হয়ে থাকে।
স্মিথ তার
‘Absolute
advantage’
ধারণাকে ব্যবহার
করে এর
ঠিক উল্টোটাই
প্রমাণ করে
ছাড়লেন। তিনি
বললেন, যার
যে পণ্যে
‘Absolute
advantage’ আছে, সে
যদি সেটা
রফতানি করে
এবং যার
হাতে নেই
সে যদি
সেটা আমদানি
করে তাহলে
মুক্ত আন্তর্জাতিক
বাণিজ্যের ফলে
বাড়তি পণ্য
ও সেবা
ভোগের মাধ্যমে
আমদানি এবং
রফতানিকারক উভয়
দেশই ‘সম্পদশালী’
হয়, ‘উপকৃত’
হয় এবং
‘জনকল্যাণ’
বৃদ্ধিতে সফল
হয়।
শ্রমবিভাজন সম্পর্কে স্মিথের বক্তব্য
এবার
দেখুন, স্মিথ
কীভাবে তার
‘The
Wealth of Nations’-এ
ফিজিওক্রেসির অসারতা
প্রমাণ করে
শ্রমবিভাজনের গুরুত্ব,
তাত্পর্য এবং
গূঢ় অর্থ
টেনে বের
করে আনলেন।
ফিজিওক্রেটদের বিশ্বাস
ছিল, উৎপাদন
এবং মূল্যসংযোজন
প্রক্রিয়ায়, জমি
বা ভূমিই
হলো মূল
উপাদান। স্মিথ
বললেন, ভূমির
চেয়ে শ্রমিকের
অবদান বেশি
ও বড়।
তিনি উদাহরণ
দিয়ে দেখিয়ে
দিলেন, বিশেষায়িত
কাজ এবং
শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে
একই কাজ
বার বার
সম্পাদন করে
শ্রমিকরা তাদের
দক্ষতা ও
উৎপাদন ক্ষমতা
বাড়িয়ে তোলেন।
ফলে নির্দিষ্টসংখ্যক
শ্রমিক একই
পরিমাণ জমি
ব্যবহার করে
অনেক গুণ
বেশি পণ্য
উৎপাদন করতে
পারেন। এতে
বোঝা যায়,
পণ্য উৎপাদনের
উপাদান হিসেবে
ভূমি থেকে
শ্রমিক অনেক
বেশি কার্যকর,
শক্তিশালী, ফলপ্রসূ
ও উপযোগী।
আলোচ্য দুই
পুস্তকে অ্যাডাম
স্মিথ তার
মূল বক্তব্যগুলো
ছাড়াও অর্থশাস্ত্রের
আরো অনেক
বিষয়ের অবতারণা
করেছেন। যেমন—মজুরি,
টাকার অভ্যুদয়
ও তার
ব্যবহার, জমির
খাজনা, মজুদ
ও মুনাফা,
পুঁজির উন্মেষ
ও বিকাশ,
ধারদেনা, সুদ
ও আরো
অনেক কিছু।
অর্থনীতিতে তার
এসব অবদানের
কারণে, উনিশশ
ষাটের দশক
পর্যন্ত তিনি
ছিলেন সমাজবিজ্ঞানের
গুরুত্বপূর্ণ এ
শাখার অবিসংবাদিত
‘পিতা’। (চলবে)
(নিবন্ধটির
প্রাথমিক খসড়া
পড়ে মূল্যবান
মন্তব্য ও
পরামর্শের জন্য
অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন
মাহমুদের প্রতি
আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ)
[লেখাটি
প্রথম প্রকাশ
হয়েছে কলকাতা
থেকে প্রকাশিত
অর্থনীতিবিষয়ক ষাণ্মাসিক
বাংলা জার্নাল
‘অর্থবিশ্লেষণ’-এ
(ষষ্ঠ বর্ষ:
প্রথম ও
দ্বিতীয় যুগ্ম
সংখ্যা: ২০২১-২২)]
আবু এন
এম ওয়াহিদ: অধ্যাপক,
টেনেসি স্টেট
ইউনিভার্সিটি
এডিটর,
জার্নাল অব
ডেভেলপিং এরিয়াজ