সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মাছ উৎপাদনে দেশ উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থার (এফএও) ‘ওয়ার্ল্ড স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২৪’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মিঠাপানির মাছ আহরণে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। মাছ উৎপাদনে এমন অগ্রগতির পেছনে নিঃসন্দেহে মাছ চাষের অবদান রয়েছে। দেশে আহরণকৃত মোট মাছের ৬০ শতাংশই চাষের। তবে চাষের মাছে ভিন্ন একটি দিকও রয়েছে। সেটি হলো চাষের মাছ কতটা স্বাস্থ্যসম্মত। এ নিয়ে জনপরিসরে প্রায় আলোচনা হতে দেখা যায়। চাষের মাছে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি একাধিক গবেষণায়ও উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে উত্তরের জেলা নাটোরের একটি বাণিজ্যিক খামারের রুই, মৃগেল, সিলভার কার্প, বাটা ও পুঁটি মাছের ওপর গবেষণা পরিচালিত হয়। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (এফআরআই) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন গবেষকের মাধ্যমে পরিচালিত সে গবেষণায় চাষের মাছে ভারী ধাতুর উপস্থিতির সন্ধান পাওয়া যায়। এ গবেষণায় দেখা গেছে চাষের মাছের মধ্যে মৃগেলে ক্রোমিয়াম মিলেছে নিরাপদ সীমার চেয়ে চার গুণ, যেখানে এফএওর তথ্য বলছে, খাবারে ক্রোমিয়াম দশমিক ১৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সহনীয়। অতিরিক্ত ক্রোমিয়াম কিডনি, যকৃৎসহ অন্যান্য অঙ্গের জন্য বেশ ক্ষতিকারক। এতে ক্যান্সারের ঝুঁকিও রয়েছে।
তবে গবেষকরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যের বরাতে দাবি করছে বর্তমানে যে পরিমাণ ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে মৃগেলে, সেটি মানবশরীরের জন্য ক্ষতিকারক নয়। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, খাবারে ১ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্রোমিয়াম গ্রহণযোগ্য। তবে মৃগেলে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি মানবশরীরের জন্য ক্ষতিকারক কিনা এর বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উদ্রেক ঘটাচ্ছে—কেন চাষের মাছে ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু পাওয়া যাচ্ছে; চাষের মাছে ভারী ধাতুর উৎস কী?
পানিতে ভারী ধাতু থাকলে সেটি মাছের মধ্যেও পাওয়ার শঙ্কা থাকে। সাধারণত উন্মুক্ত জলাশায়ে ভারী ধাতু বেশি পাওয়া যায়। কারণ বিভিন্ন জলাশয়কে বর্তমানে এক ধরনের বর্জ্য নিষ্কাশনের স্থানে পরিণত করা হয়েছে। বিশেষত কলকারখানার কঠিন বর্জ্য নদী, হাওরের মতো জলাশয়ে ফেলা হয়। এতে এসব পানিতে ভারী ধাতুর পরিমাণ বেড়েছে, যার উপস্থিতি মাছেও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু চাষের মাছে ভারী ধাতু মেলার কারণ কী? এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মত, নিয়মিত পুকুরের পানি পরিষ্কার না করা একটি কারণ হতে পারে। তবে এর অন্যতম কারণ হতে পারে মাছের খাদ্য ‘ফিশ ফিড’।
দেশে মুরগি ও মাছের খাদ্যে পশুচামড়ার বর্জ্য পাওয়ার অভিযোগ বেশ পুরনো। অথচ এ বর্জ্যে নানা ধরনের রাসায়নিক কেমিক্যাল থাকে, যা মাটি ও পানি দূষণ করে। সেটি পানি থেকে মাছের শরীরে প্রবেশ করে এবং পরবর্তী সময়ে মানুষের শরীরে। আবার চাষীরা মাছের রোগ সারাতে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ান। ওষুধ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে চাষীরা জানেন না ওষুধের পরিমাণ ঠিক কতটুকু হওয়া উচিত। আবার অনেকেই মুরগির বিষ্ঠা মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করেন। অথচ মুরগি পালনেও নানা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়। যেগুলো মুরগির বিষ্ঠার মাধ্যমে মাছের শরীরে প্রবেশ করে। এগুলোও মাছের মাধ্যমে পরে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। অথচ মাছের খাবার হিসেবে মুরগির বিষ্ঠার ব্যবহার অনেক আগেই নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
অন্যদিকে নিয়মিত পুকুর বা মাছ চাষের জন্য তৈরি জলাশয় পরিষ্কার না করলে সেখানে ক্রমেই ভারী ধাতুর পরিমাণ বাড়তে পারে। কারণ সেখানেও আবর্জনা জমে। অন্তত তিন বছর পর হলেও পুকুরের নিচ পরিষ্কার করা উচিত। কিন্তু চাষীরা সেদিকেও খুব বেশি মনোযোগী নন বলে ওই গবেষণায় উঠে এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলা যায়, মৃগেলে ভারী ধাতুর পরিমাণ ক্ষতিকারক না হলেও সেটি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। চাষের মাছে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে এখনই সতর্ক অবস্থানে না গেলে সেটি নিরাপদ মাছ উৎপাদনে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। মনে রাখা প্রয়োজন, দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের প্রধান উৎস মাছ। তাই মাছ যদি নিরাপদ না হয়, সেটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সেই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্যের ঘাটতিও বেড়ে যাবে।
এক্ষেত্রে সরকারের তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। চাষের মাছের বিভিন্ন দিক তদারকির ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষত কী পরিমাণ ফিশ ফিড ব্যবহার করা হচ্ছে সে-সংক্রান্ত কোনো সুস্পষ্ট সরকারি তথ্য পাওয়া যায় না। আবার জলাশয়গুলো কী অবস্থায় রয়েছে সেটির তদারকিও ঠিকভাবে হয় না। এ দুই ক্ষেত্রেই সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। বাজারে যেসব ফিশ ফিড পাওয়া যায় সেগুলো পরীক্ষা করা জরুরি। সেই সঙ্গে কত পরিমাণ ফিড খাওয়ানো হচ্ছে তার পরিসংখ্যান তৈরিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বদ্ধ জলাশয়ের পানি নিয়মিত পরিষ্কার নিশ্চিত করা আবশ্যক। এটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন।
দেশে ও বিদেশে মাছের চাহিদা এতটাই বেড়ে গেছে যে এর উৎপাদন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যদি সময়মতো ব্যবস্থা নিয়ে এক্ষেত্রে বিদ্যমান আশঙ্কাগুলো দূর করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে তা স্বাস্থ্যের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিও বয়ে আনবে। এটি মাছচাষীদেরও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। নয়তো তারা নিজেরাও সংকটে পড়বেন। তাদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে মাছ চাষে তাই গুরুত্ব দিতে হবে।