স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন এপ্রিলে (২০, ২০২৫) চূড়ান্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান উপদেস্টার হাতে তুলে দিয়ে একই দিনে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে একটি প্রেস ব্রিফিং করে। গত জুলাইয়ে (২২, ২০২৫) প্রতিবেদনের বর্ণনা, বিশ্লেষণ ও সুপারিশের অংশ-সংবলিত প্রথম খণ্ডটি মূল প্রতিবেদন হিসেবে সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনের দ্বিতীয় খণ্ডে তিনটি মৌলিক আইনের খসড়া ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা পরিষদ (খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি) আইনের তিনটি সংশোধনী প্রস্তাব রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিতরণ সম্পর্কে কমিশনের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে দুই খণ্ড প্রতিবেদনই ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। আগস্ট (২০, ২০২৫) পর্যন্ত এই চার মাসে প্রতিবেদনটি বিভিন্নভাবে আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছে। অনেকে পত্রিকায় প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন, সেমিনার-গোলটেবিল এবং টিভি টক শোতে কথা বলেছেন; দেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন প্রথিতযশা অধ্যাপক প্রথম আলোয় (১৮ জুলাই) কমিশন প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়ে একটি যৌথ প্রবন্ধ লিখেছেন। কমিশনবোদ্ধা ব্যক্তিদের এ বিপুল আগ্রহের জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
অতিসম্প্রতি বণিক বার্তার বর্ষপূর্তির বিশেষ সংখ্যায় (আগস্ট ১৪, ২০২৫) সৈয়দা লাসনা কবীর ও মোহাম্মদ ঈসা ইবন বেলাল যৌথভাবে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের বেশকিছু প্রস্তাব ঝুঁকিপূর্ণ’। বণিক বার্তায় ওই একই সংখ্যায় আমার একটি সাক্ষাৎকার এবং আমার কমিশন সহকর্মী প্রফেসর তারিকুল ইসলামেরও একটি লেখা প্রকাশিত হয়।
প্রথমে বলতে চাই প্রতিটি সংস্কারে কিছু না কিছু ঝুঁকি থাকে বৈকি। তবে লেখকরা যেসব জায়গায় ‘ঝুঁকি’ দেখেছেন সেখানে ঝুঁকিযুক্ততা ও ঝুঁকিমুক্ততার বিশ্লেষণ ভিন্নভাবে হতে পারত। বর্তমানে প্রচলিত একনায়কসুলভ ‘চেয়ারম্যান ও মেয়র’ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ করলে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, পরিকল্পনা, অংশগ্রহণ ও উন্নয়নের দুর্দশার অনতিক্রম্য বৃত্তাবদ্ধতার একটি চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমান রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের আদলের এক ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণাধীন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় কারো অংশগ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়ররা তাদের কার্যকালে কয়টি কাউন্সিল সভা করেছিলেন? সে প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য হবে। বাস্তবে পরিষদ বা কাউন্সিলের সভা নিয়মিত হয় না, স্থায়ী কমিটিগুলো প্রায় অস্তিত্বহীন, প্রকল্প বেচাকেনা এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ একটি সাধারণ রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে একটি নির্বাচনে গড়পড়তা পাঁচজনের মধ্য থেকে পাঁচ বছর পর পর একজনকে নির্বাচিত করে এ ব্যবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। একক শক্তি কেন্দ্রের বিপরীতে একাধিক শক্তি কেন্দ্রের সৃষ্টি, ক্ষমতার ভারসাম্য ও ব্যবস্থার স্বচ্ছতার প্রয়োজন সর্বাগ্রে। এখানে প্রশ্ন ও ‘ঝুঁকি’ যাই বলুন হতে পারে; একাধিক শক্তি কেন্দ্র একাধিক দুর্নীতি কেন্দ্রে রূপান্তরও হতে পারে। তবে শিরোনাম ছিল স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় নাগরিক কোথায়? শুধু নির্বাচন ও সরাসরি নির্বাচন এবং বড় বড় নির্বাচন বেশি বেশি গণতন্ত্র নিয়ে আসে এটি সব সময় সত্যি নাও হতে পারে। সংসদীয় ও মন্ত্রিপরিষদশাসিত সরকারের আদলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পুনর্বিন্যাসের যে সুপারিশ তার পটভূমি ও যৌক্তিকতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ অধ্যায় ৩, ৪, ৫ ও ৬-এ করা হয়েছে এবং যেসব ঝুঁকির বিষয় আলোচিত প্রবন্ধে বলা হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকি বিশ্লেষণ কমিশন প্রতিবেদনে করা হয়েছে।
একই রকমের একটি ভিন্ন বক্তব্য বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গোলটেবিল বৈঠক, যা প্রথম আলোর সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত হয় (২০ জুলাই ২০২৫), শিরোনাম ছিল স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় নাগরিক কোথায়? সেখানে বিআইজিডির সেলিনা আজিজ একটি উপস্থাপনা দেন। তিনি বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোয় এলিট বায়াস বেশি, গণবান্ধবতা বা জনগণমুখিতা কম। আমরা জানতে চেয়েছিলাম কীভাবে সেটি প্রকাশ পেল। তখন তাদের একটি উত্তর ছিল, ইউনিয়ন পর্যায়ের ৯+৯+৯ মোট ২৭টা ‘ওয়ার্ড সভা’ বন্ধ করে উপজেলায় তিনটি ওয়ার্ডে বছরে তিনটি ওয়ার্ড সভা প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রশ্নটির উত্তর অনেক দীর্ঘ। সংক্ষেপে বললে বলতে হয়, বছরে ২৭টি ওয়ার্ড সভা গত ১০ বছরে কোথায় কয়টা হয়েছে তার অনুসন্ধান জরুরি, না হলে কেন হয়নি এবং হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী, তা জানতে হবে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে সাতটি অনুচ্ছেদে চার পৃষ্ঠাব্যাপী ‘ওয়ার্ড সভা’র ক্ষমতা, কার্যাবলি ও দায়িত্ব ইত্যাদির কথা লেখা রয়েছে। প্রথমে তিনটি থাকলেও পরে একটি সভা কমিয়ে দুটি সভা করার নির্দেশ রয়েছে। প্রায় ২১টি নির্বাহী কাজ ও ১০টি গুরুতর দায়িত্ব ওয়ার্ড সভাকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার নেই কোনো কার্যালয়, নেই বাজেট। এ ‘নির্মম রসিকতা’ আমাদের আইনে কীভাবে স্থান পেল! এটি ভারতীয় সংবিধানের ৭৩তম সংশোধনীর আলোকে করা কেরালা এবং পশ্চিমবঙ্গের ‘পঞ্চায়েত রাজ’ আইনের হুবহু নকল। ভারতের হিন্দি বলয় ছাড়াও অন্যান্য অনেক রাজ্যে ‘সভা’ বলতে তারা ‘পরিষদ বা কাউন্সিল’ বোঝেন। আমাদের বাংলাদেশে ‘সভা’ বলতে আমরা মিটিং বুঝি। এ ভ্রান্তি এড়ানোর জন্য ভারতে সব রাজ্যে ‘গ্রামসভা’ বলা হলেও পশ্চিমবঙ্গে ‘গ্রাম সংসদ’ বলা হয়। কিন্তু আমাদের আইনপ্রণেতা বা আইন যারা মুসাবিদা করেন তারা পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার আইন কপি করতে গিয়ে বিভ্রাটটি তৈরি করেছেন। আমি এ বিষয়ে লন্ডন থেকে প্রকাশিত কমনওয়েলথ জার্নাল অব লোকাল গভর্ন্যান্স ও কুমিল্লা একাডেমির জার্নালে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামসভা এবং বাংলাদেশের ওয়ার্ড সভার তুলনামূলক আলোচনা করেছি। এটি সর্বাংশে অলীক ও ব্যর্থ একটি একাডেমিক কল্পনা। এ ব্যবস্থা বাংলাদেশে কাজ করেনি। এখন ভারতেও কাজ করছে না। আমরা এ ব্যবস্থার অধীনে উপজেলার তিনটি ওয়ার্ডে বছরে তিনটি সভা করার সুপারিশ করেছি। এ ওয়ার্ড সভার কোনো নির্বাহী দায়িত্ব থাকবে না। এটি হবে ডেলিভারেটিভ ডেমোক্রেসির একটি হাতিয়ার বা ইনস্ট্রুমেন্ট। বছরে তিনবার সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে ভোট নিয়ে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ সদস্য, উপজেলা পরিষদ সদস্য, পৌরসভার কাউন্সিলর ও ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যরা তাদের তিন মাস বা ছয় মাসের কাজের জবাবদিহির জন্য ভোটারদের প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন। এটি হবে মূলত ভোটার ফোরামে নির্বাচিত নেতাদের মুখোমুখি করার একটি ব্যবস্থা। স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় নাগরিক কোথায় তার আংশিক উত্তর যেখানে পাওয়া যেতে পারে।
সঠিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া আলোচিত (কবীর ও ইবন) রচনায় কতগুলো মন্তব্য রয়েছে, যেমন কমিশনের প্রস্তাবিত কাঠামো আয়ুব খানের ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ মডেলের অনুকরণে তৈরি, গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল করার ঝুঁকি থাকবে, কারণ চেয়ারম্যান ও মেয়ররা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন।
জাতীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন লেখকরা কীভাবে চান? সরাসরি জনগণের ভোটে নয় কেন এবং সেখানে গণতন্ত্রের লাভ-ক্ষতি কীভাবে নিরূপিত হচ্ছে। ভারত ও ব্রিটেনসহ পৃথিবী বিভিন্ন দেশে পরোক্ষ নির্বাচনে মেয়র ও স্থানীয় সরকারের প্রধানরা নির্বাচিত হন। সেসব দেশে এটি আয়ুবের ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’র আদল নয়। এটি একটি গণতান্ত্রিক বাস্তবতার গ্রহণযোগ্যতার সাক্ষাৎ রূপ। আমরা একবার চুন খেয়ে মুখ পুড়ে বারবার দই দেখলে ভয় পাই। এখানে সদস্য ও কাউন্সিলর এবং পরিষদ ও কাউন্সিলকে একক একজন চেয়ারম্যান ও মেয়রের বদলে ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য পরিষদের কাছে সর্বাংশে জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় চেয়ারম্যান ও মেয়রদের পরিষদ ও কাউন্সিলকে এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে, কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন একক হস্তে অর্পিত। ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণের দুই মেয়র তাদের কার্যকালে কাউন্সিলের কয়টি সভা করেছেন, যে সভাগুলো করেছেন সেগুলোর স্থায়িত্ব কয় ঘণ্টা, তাতে আলোচ্য বিষয় কী কী ছিল—খতিয়ে দেখা উচিত। সেসবের অবসান প্রয়োজন, সেজন্যই ক্ষমতার পৃথক্করণ, সমন্বয়ন ও সক্ষমতার একটি স্বচ্ছ পদ্ধতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা হয়েছে। গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের দর্শন ও চর্চাকে সামনে রেখে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একটি সমজাতীয় কাঠামোর অধীনে আসবে এবং প্রতি স্তরে এক একটি ‘মিনি পার্লামেন্ট’ কার্যশীল হবে। শুধু সভা নয়, সব পরিষদ ও কাউন্সিলে অধিবেশন বসবে, তা প্রতি মাসে না হলেও তিন মাসে একবার দিনব্যাপী, এমনকি দুইদিনও একনাগাড়ে হতে পারে। কাউন্সিলের বা পরিষদের আস্থা-অনাস্থার ওপর চেয়ারম্যান ও মেয়রের ক্ষমতাকাল নির্ভরশীল হবে। মন্ত্রণালয় বা জেলার কোনো কর্তা এ কাজ করতে পারবেন না। বর্তমান সিকি গণতান্ত্রিক বা ১৯৬০-এর মৌলিক গণতন্ত্র থেকে কি এ ব্যবস্থা মৌলিকভাবে ভিন্ন এবং উন্নত নয়!
আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সার্বক্ষণিক ও খণ্ডকালীন কোনো প্রভেদ নেই। সবাই সার্বক্ষণিক, আবার সবাই খণ্ডকালীন। সবারই সুনির্দিষ্ট মাসোয়ারা আছে। ওখানে আবার সরকারি চাকরির মতো পদসোপানও থাকে। যা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে কিছুটা বেমানান। চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র, সদস্য পৃথক পৃথক অংকে বেতন-ভাতা পান। কারো পূর্ণকালীন কোনো দায়িত্ব নেই। উপস্থিতি-অনুপস্থিতি স্বেচ্ছাধীন, কিন্তু ভাতা বা সম্মানী প্রাপ্তির বিষয়টি আইনগতভাবে নিশ্চিত। কমিশন এখানে খণ্ডকালীন ও পূর্ণকালীন কাজের দায়িত্ব বণ্টন করেছে। চেয়ারম্যান ও মেয়র এবং নিজ নিজ নির্বাহী পরিষদ ও সভাধিপতির কাজ পূর্ণকালীন। বাকি সব সদস্য ও কাউন্সিলর খণ্ডকালীন, তারা নিজ নিজ পেশা (চাকরি, ব্যবসা, স্বাধীন পেশা) থেকে মূল আয় স্বাধীনভাবে আহরণ করবেন। পরিষদ ও কাউন্সিলের সভা ও অধিবেশনে যোগ দিলে তারা সভা ও অধিবেশনের জন্য দৈনিক ভাতা পাবেন। তারা কেউই পূর্ণকালীন বেতন-ভাতা পাবেন না। সেজন্য সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের সদস্য ও কাউন্সিলর নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। পরিষদ বা কাউন্সিলের পদ-পদবি ব্যবহার করে ব্যবসা, দখল-বেদখল বাণিজ্য চিরতরে বন্ধ করতে হবে। তার জন্য পরিষদ ও কাউন্সিলগুলোয় শিক্ষিত ও সক্রিয় সমাজকর্মীর অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয় নির্বাচনের গুণগত পরিবর্তন ও নির্বাচনী সংস্কৃতিতেও কিছু পরিবর্তন আশা করা যায়। পরিষদগুলোয় রাজনীতিকে ব্যবসা ও পেশা হিসেবে নেয়া ব্যক্তিরা ও পেশাজীবীদের রাহুমুক্ত হয়ে সাধারণ ও শিক্ষিত সমাজসেবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। স্থানীয় নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকমুক্ত হবে, তবে প্রভাবমুক্ত হবে তা হলফ করে বলা যাবে না, তাতে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলীয় মনোনয়ন বন্ধ হবে। ফলে যে কোটারিভুক্তি ও দলীয়করণের আশঙ্কা করা হয়েছে তা হ্রাস পাবে। সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে তা বলার অবকাশ নেই।
ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় একটি সুনির্দিষ্ট ফর্মুলার ভিত্তিতে ওয়ার্ড সৃষ্টি হবে। কোন কোন ইউনিয়ন পরিষদে (ধামসোনা, সাভার ও শুভাঢ্যা কেরানীগঞ্জ) চার লাখ জনসংখ্যার জন্য নয়টি ওয়ার্ড, আবার ভোলার মনপুরার দশ হাজার জনসংখ্যার জন্যও নয় ওয়ার্ড। সিটি করপোরেশনগুলোয়ও একই অবস্থা বিরাজমান। সমন্বিত আইনের অধীনে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা চলে এলে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান সম্পর্ক শক্তিশালী হবে। একটি পেশাদার জনবল কাঠামোর অধীনে সব প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় জনবল পাবে। একটি সুনির্দিষ্ট অর্থায়ন নীতির ভিত্তিতে স্থানীয় সরকারে অর্থায়ন হবে। জাতীয় পরিকল্পনার বিকেন্দ্রীকরণ করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ের পরিকল্পনা জাতীয় উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কৌশলের সঙ্গে সমন্বিত হবে।
নারী প্রতিনিধিত্বের ঘূর্ণ্যমান পদ্ধতির সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু অন্য বিকল্প কী করা যেতে পারে তা বলা হয়নি। ঘূর্ণ্যমান পদ্ধতির সুফল হচ্ছে নারী প্রতিনিধি একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ড, জমি, মাটি ও জনমানুষ পাবেন। বর্তমানে তা পান না, এখন তিনি একটি মুক্ত আকাশ এবং একরাশ হতাশা পান। একবার ঘূর্ণ্যমান পদ্ধতিতে একটি ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে পরবর্তী সময়ে তিনি নিজ শক্তিতে সাধারণ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। একজন বারবার সংরক্ষিত আসন ধরে রাখতে পারবেন না। অন্যকে সে সুযোগ দিতে হবে। এর চেয়ে কোনো ভালো বিকল্প চিন্তা থাকলে প্রস্তাব করতে পারেন।
বিচার ও শাসনকে পৃথক্করণের সাংবিধানিক নির্দেশনার নিরিখে জাতীয়ভাবে কার্যরত বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নতুন একটি বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক স্থানীয় বিচার পদ্ধতির সুপারিশ করা হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনেরও সমর্থন লাভ করেছে (অধ্যায় দশ)। স্থানীয় নির্বাচনকে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত করে সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী একটি নির্বাচন ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে (অধ্যায় ছয়)। যা বাস্তবায়ন হলে সারা দেশে একসঙ্গে একটি তফসিলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সর্বাধিক ৪৫ দিনের মধ্যে করা সম্ভব। তাছাড়া মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তর পর্যায়ে অনেক আমূল সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে (অধ্যায় চৌদ্দ, পনেরো ও ষোল) যা জনপ্রশাসনের শিক্ষক-গবেষকদের মূল্যায়ন করে দেখা উচিত। পরিশেষে বলব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এবং আইনের খসড়াগুলো মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। বাকি কাজের দায় ও দায়িত্ব সরকার ও দেশবাসীর।
ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন