‘সবসময়ই কি এমনটা মনে হয় না—নিজের যা আছে, তা হারানোর পরই কেবল বোঝা যায় তার গুরুত্ব।’ ১৯৭০ সালে এ গানের কথা গেয়ে পরিবেশ ধ্বংসের শোক প্রকাশ করেছিলেন গায়িকা জোনি মিচেল। তবে এ উপলব্ধি আজ আরো অনেক বিষয়ের সঙ্গেই মেলে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ODA)।
প্রায় ৮০ বছর ধরে মানবিক সহায়তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক সহায়তায় বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ অর্থবছরে দেশটির সরকার বৈদেশিক সহায়তা বাবদ ব্যয় করেছে ৭২ বিলিয়ন ডলার। তবে এর বাইরেও এনজিও ও সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে আরো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ এসেছে।
তবে আয়ের অনুপাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয়কারী দেশ নয় যুক্তরাষ্ট্র। এদিক থেকে দেশটির অবদান মোট আয়ের মাত্র দশমিক ২৪ শতাংশ, যা উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর সহায়তার এক-চতুর্থাংশ মাত্র। ফলে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ২৪তম। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি মোট ব্যয়ের মাত্র ১ শতাংশই ব্যয় হয় বৈদেশিক সাহায্যে। কিন্তু অনেক মার্কিন নাগরিকরা মনে করেন, ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয়, যা বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের বহু নাগরিক, এমনকি কিছু খ্যাতনামা গবেষকও মনে করেন যে বৈদেশিক সহায়তার প্রভাব খুবই সামান্য। ড্যামবিসা ময়ো এবং উইলিয়াম ইস্টারলির মতো কেউ কেউ দাবি করেছেন, এ সাহায্য উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করে। সমালোচকরা একাধিক ব্যর্থ সহায়তা প্রকল্পকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন, যা দুর্নীতি, সরকারি হস্তক্ষেপ বা অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছে। যেমন ১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম, ১৯৮০-এর দশকে জায়ার এবং ২০০০-এর দশকে আফগানিস্তান। যদিও কিছু অর্থনীতিবিদ বিশেষ করে পল কলিয়ার জোর দিয়ে বলেন যে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে বৈদেশিক সাহায্য কার্যকর হতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে বৈদেশিক সাহায্য সন্দেহজনক।
কিন্তু এখন বৈদেশিক সাহায্য নেই বললেই চলে বা খুব দ্রুতই তা শেষের পথে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পর পরই তার প্রশাসন বিশেষ করে তার অনির্বাচিত ধনকুবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইলোন মাস্ক দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (USAID) ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করেন। এর পর পরই একের পর এক প্রতিবেদন আসতে শুরু করে, যেসব প্রকল্প অর্থায়ন বন্ধ করা হচ্ছিল, সেগুলোর অধিকাংশই ছিল জীবন রক্ষাকারী ও লাভজনক প্রকল্প।
২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘প্রেসিডেন্টের জরুরি এইডস সহায়তা কর্মসূচি’ চালু করার পর তা এইচআইভি ও এইডস থেকে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকায়। ‘প্রেসিডেন্টের ম্যালেরিয়া উদ্যোগ’ গত ২০ বছরে প্রায় ২০০ কোটি ম্যালেরিয়া সংক্রমণ রোধ করেছে এবং মৃত্যুহার অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ভ্যাকসিন সংস্থা Gavi এখন পর্যন্ত একশ কোটি শিশুকে হাম, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি এবং অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগের টিকা দিয়েছে, যা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু রোধে সহায়ক হয়েছে। পোলিও এখন কেবল দুটি দেশে সীমিত। আর গুটিবসন্ত সারা পৃথিবী থেকেই নির্মূল হয়েছে। এসব কার্যক্রমের ফলে বিশ্বব্যাপী শিশু মৃত্যুহারে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। এক শতক আগেও যেখানে ৪০ শতাংশ শিশু পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যেত, আজ সেই হার মাত্র ৪ শতাংশ।
বৈদেশিক সাহায্যের মাধ্যমেই বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কৃষিক্ষেত্রে উন্নত ফসলের জাত, কৃত্রিম সার, নতুন কীটনাশক এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার বিকাশ ও বিস্তার সম্ভব হয়েছে। এ তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লব’ এশিয়ায় শস্য উৎপাদনের হার দ্বিগুণ করেছে। ভারতসহ অনেক দেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর হতে সহায়তা করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রাথমিকভাবে বিশ্বে শিশু মৃত্যুহার ছিল ১৮ শতাংশ, সেখান থেকে এখন তা কমেছে ২ থেকে ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের মার্শাল পরিকল্পনা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। এটি পরবর্তী ৮০ বছরের তুলনামূলক বিশ্ব শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ইউক্রেনকে সহায়তা প্রদানে, যা ছিল যুদ্ধোত্তর যুগে কোনো ইউরোপীয় দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার বিরুদ্ধে সহায়তা।
যুক্তরাষ্ট্র যে বৈদেশিক সাহায্য প্রদান করে, তা থেকে দেশটি নিজেও বিপুল সুবিধা পেয়ে থাকে। শুধু কভিড-১৯ মহামারীর কথাই মনে করলেই বোঝা যায় যে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য উদ্যোগে বিশেষ করে ইবোলা, এইচআইভি/এইডস এবং যক্ষ্মার মতো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ নিছক দানখয়রাত নয়।
আরো গভীরভাবে দেখলে দেখা যায়, দুর্যোগ ত্রাণ, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে সহায়তাসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সফট পাওয়ারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আর স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে এ সফট পাওয়ারই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে সামরিক শক্তির সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদিও সফট পাওয়ার রক্ষা করতে তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয় হয়। অথচ এখন ট্রাম্প প্রশাসন সচেষ্টভাবে সেই সফট পাওয়ার ধ্বংস করছে, যার সুফল নিঃসন্দেহে পাচ্ছে চীন।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বৈদেশিক সাহায্যের প্রভাব পরিমাপ করা কঠিন। কারণ এতে অনেক কারণও সম্পর্কিত। তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সহায়তা রাজনৈতিক বা সামরিক লক্ষ্য পূরণের জন্য তৈরি হয়। ইউক্রেনের পর যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্ত শীর্ষ দেশগুলো হলো ইসরায়েল, জর্ডান ও মিসর।
তবু আমরা জানি, রোগ-শোক কমে যাওয়া এবং পুষ্টি উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। তাই এটা যুক্তিসংগত যে বৈদেশিক সাহায্য উন্নয়নে অবদান রাখে। যদিও এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে আরো উন্নত ও দক্ষ বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক অংশীদার থাকার থেকে লাভবান হয়।
তাহলে কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে বৈদেশিক সাহায্য নিয়ে হতাশাজনক ধারণাগুলো জনসাধারণের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়ে আসছে? এর একটি কারণ হতে পারে—সরকারগুলোর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব অনেক বছর ধরেই বিরাজ করছে। ২০১৮ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধনী দেশগুলোর বেশির ভাগ মানুষ বিশ্বাস করত যে গত ২০ বছরে দরিদ্র দেশের শিশু মৃত্যুহার বেড়েছে বা অপরিবর্তিত রয়েছে। অথচ বাস্তবে শিশু মৃত্যুহার অর্ধেক কমেছে। এছাড়া ধনী দেশগুলোর ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করত চরম দারিদ্র্যের হার স্থির রয়েছে বা বেড়েছে। যদিও ১৯৯০-২০১৩ সালের মধ্যে তা ব্যাপকভাবে কমেছে। এ প্রবণতা নিয়ে যদি মানুষ এত ভুল ধারণা রাখে, তাহলে তারা কীভাবে জানবে বৈদেশিক সাহায্য এ পরিবর্তনে কী ভূমিকা রেখেছে?
নিশ্চিতভাবেই, অকার্যকারিতা, অব্যবস্থাপনা বা অনিচ্ছাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ বৈদেশিক সহায়তার কিছু দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে অতীতের কোনো সীমাবদ্ধতা থাকলেও স্পষ্ট যে ট্রাম্পের ধ্বংসাত্মক নীতিতে পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২৫]
জেফ্রি ফ্রাংকেল: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাপিটাল ফর্মেশন এবং গ্রোথ বিভাগের অধ্যাপক, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্সের গবেষণা সহযোগী এবং প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন
ভাষান্তর: দিদারুল হক