ইন্দো-প্যাসিফিক বিশ্ব

আন্দোলনরত কৃষক বনাম ভারত রাষ্ট্র

সম্প্রতি ২০ লাখ কৃষক কর্তৃক অবরোধের শিকার হয়েছে ভারতের রাজধানী শহর দিল্লি। কয়েক সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া জোর আন্দোলনের জের ধরে এ কৃষকরা দিল্লি-হরিয়ানা সীমান্তে এসে জড়ো হন। এ দলে কে নেই! কৃষক পরিবারের তরুণ সন্তান থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ, নারী এমনকি শিশুরা পর্যন্ত দিল্লির তীব্র ঠাণ্ডা আবহাওয়ার মধ্যে খোলা রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। কভিড-১৯ সংক্রমণের শঙ্কাকে উপেক্ষা করে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য কৃষকরা কয়েক মাসের খাবার পর্যন্ত সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন।

সম্প্রতি ২০ লাখ কৃষক কর্তৃক অবরোধের শিকার হয়েছে ভারতের রাজধানী শহর দিল্লি। কয়েক সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া জোর আন্দোলনের জের ধরে কৃষকরা দিল্লি-হরিয়ানা সীমান্তে এসে জড়ো হন। দলে কে নেই! কৃষক পরিবারের তরুণ সন্তান থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ, নারী এমনকি শিশুরা পর্যন্ত দিল্লির তীব্র ঠাণ্ডা আবহাওয়ার মধ্যে খোলা রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। কভিড-১৯ সংক্রমণের শঙ্কাকে উপেক্ষা করে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য কৃষকরা কয়েক মাসের খাবার পর্যন্ত সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন।

আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল ভারতের পাশাপাশি দুই রাজ্য পাঞ্জাব হরিয়ানা থেকে, কয়েক হাজার কৃষক যখন তাদের ট্রাক্টরগুলো নিয়ে দিল্লি অভিমুখে যাত্রা করে আশায় যে কেন্দ্রীয় শহরে এসে তারা তাদের অভিযোগ সমস্যাগুলো সবার সামনে তুলে ধরতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজ্য থেকে অসংখ্য কৃষক তাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার মাধ্যমে তা বিক্ষোভে রূপ নেয়, ঘটনাটি এখন আর সাধারণ কোনো বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভারতজুড়ে পাঁচশরও বেশি কৃষক সংগঠন আন্দোলনরত কৃষকদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। কৃষকদের আন্দোলনকে বলা হচ্ছে ভারত বন্ধ কিংবা জাতীয় অবরোধ। ডিসেম্বর পর্যন্ত ট্রেড ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দলও আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছে।

আন্দোলনের সূত্রপাত হয় কভিড-১৯-এর সময়কালে তড়িঘড়ি করে সরকার প্রণীত নতুন তিনটি কৃষি আইন প্রণয়ন ঘিরে। সরকার অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই অর্থাৎ কৃষক কিংবা রাজ্য সরকার, তাদের কারো সঙ্গে কোনো ধরনের যুক্তি-পরামর্শ না করেই নয়া কৃষি আইন প্রবর্তন করে।

সাদা চোখে দেখলে মনে হয় নতুন আইন কৃষকের জন্য ইতিবাচক বা উপকারী। যেখানে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য কেনা-বেচার ক্ষেত্রে বিধিবিধান শিথিল, প্রয়োজনীয় পণ্য আইন, ১৯৫৫-এর মজুদসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো দূরীকরণ লিখিত চুক্তির মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদকে সমর্থন করা হয়েছে। আরো মনে হয়, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষি ব্যবস্থার মধ্যে একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করা। যেখানে কৃষক ব্যবসায়ীরা তাদের পছন্দের স্বাধীনতা উপভোগ করবেন বিকল্প প্রতিযোগী ট্রেডিং চ্যানেলের মাধ্যমে। একই সঙ্গে যা দক্ষ, স্বচ্ছ বাধামুক্ত বাণিজ্যের প্রচার ঘটাবে।

কৃষকদের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য ভিন্ন। তারা শঙ্কা প্রকাশ করছেন এসব আধুনিকীকরণ আইন আরোপের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সুসংযুক্ত পুঁজিপতিদের নেতৃত্বে ভারতীয় কৃষি মূলত লুুটেরা করপোরেট বাণিজ্যিকীকরণের শিকার হবে। যদিও অন্যরা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে খামারে উৎপাদিত পণ্যের লেনদেন, চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ এবং যে ধরনের মজুদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, আইনগুলো তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু প্রান্তিক ক্ষুদ্র কৃষকরা ভয় পাচ্ছেন নতুন আইনের মাধ্যমে তারা বরং চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

চলমান আন্দোলন অবশ্য অনেক কৃষকের কাছে স্রোতে ভেসে যাওয়ার বিপরীতে শেষ খড়টি আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা। জীবিকা নির্বাহের বিপরীতে বেড়ে চলা ব্যয় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাদের আরো বেশি হুমকিতে ফেলেছে এবং প্রতিবাদী করে তুলেছে। সত্যিটা হচ্ছে, ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই কৃষি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছিল। এদিকে নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এই কৃষকরাই। বিশেষ করে মোদি যখন কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির (সরকারি সংস্থার কাছে) ক্ষেত্রে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপিএস) প্রস্তাবের কথা বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে এতে পাঁচ বছরের মধ্যে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ হবে। তাছাড়া তার প্রস্তাবিত এমএসপিএস কৃষকের সামগ্রিক উৎপাদন খরচের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল।

তবে ক্ষমতায় আসার পর মোদি তার প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হন, বরং বিগত সরকারের আমলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে যা আয় করতেন, সে তুলনায় তাদের উপার্জন আরো কমে যায়। শুধু এটাই নয়, কৃষি খাতের সংস্কার ঘিরে মোদি তার অন্যান্য প্রতিশ্রুতি পরিপালনেও ব্যর্থ হয়েছেন, সংগত কারণেই মোদি প্রশাসনের ওপর কৃষকরা ক্ষুণ্ন হয়েছেন এবং আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতীয় অর্থনীতিতে কৃষিপণ্যের চাহিদা হ্রাসের ফলে কৃষিজাত পণ্যের দামও কমেছে, যা মূলত সরকারের ভুল নীতির খেসারতবিশেষ করে দুটি নীতির কথা বলব, যা অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধ্বংস করার পাশাপাশি জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২০১৬-এর নভেম্বরে ভারত সরকার কর্তৃক ৫০০ হাজার টাকার নোটের মুদ্রা রহিতকরণ (নোট বাতিল) এবং পরবর্তী সময়ে দুর্বল পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয় পণ্য পরিষেবা কর আরোপ।

কর্মসংস্থান চাহিদা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার আর্থিক নীতি ব্যবহার না করায় আয় ভোগের পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে কৃষিপণ্যের দাম আরো কমে যায়। এর মধ্যে কভিড মহামারী পণ্য উৎপাদন তা বাজারে বিক্রির বিষয়গুলোকে আরো বেশি কঠিন করে তোলার ফলে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম আর বাড়েনি। 

তাই কৃষকরা ধারণা করছেন নতুন কৃষি আইন বেসরকারি খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার কণ্ঠ রোধ করবে। বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেও অসংগতি রয়েছে, তবে বাজার স্বেচ্ছাচারিতার বিপরীতে এটি অন্তত তাদের কিছু মৌলিক নিরাপত্তা দিতে সমর্থ। তাছাড়া তারা আরো জানেন যে বিহারের মতো রাজ্যগুলোয় (যেখানে বাজার নিয়ন্ত্রণের একচেটিয়াত্ব শেষ হয়েছে) তাদের উৎপাদিত ফসলের দাম ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের অনেক নিচে নেমে গেছে।

নতুন কৃষি আইনে কমিশন এজেন্টের মতো মধ্যস্থতাকারীদের বিতাড়নের লক্ষ্য হাতে নেয়া হয়েছে। কিন্তু কৃষকরা বলছেন, তারা বরং কমিশন এজেন্টদের সঙ্গে লেনদেন সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। কারণ এটি তাদের প্রয়োজন অনুসারে কিছু ছাড় বা নীতি শিথিলতার অনুমতি দেয়। আর অচেনা অজ্ঞাত সংস্থাগুলোযেমন ক্রয়কালীন মান নিয়ন্ত্রণ’—তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করবে।

এদিকে কৃষকরা অবশ্যই রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীলতা, খরা, দূষিত পানি এবং জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা মাটি ক্ষয়ের বিষয়গুলো নিয়েও বেশ উদ্বিগ্ন। তারা আরো ভয় পাচ্ছেন এটা ভেবে যে মোদি সরকারের নীতি, তাদের বিদ্যমান সমস্যাগুলোয় আরো বেশি মাত্রা যোগ করবে।

যতদূর সম্ভব ক্ষুব্ধ কৃষকদের সঙ্গে সরকার চুক্তিতে যাওয়ার উপায় খুঁজছে। তবে শুরুর দিকে তারা সামগ্রিক বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তীকালে আন্দোলনরত কৃষকদের দুর্বৃত্তবিরোধী শক্তির ইন্ধনে বিভ্রান্ত বিপথগামী হিসেবে আখ্যায়িত করার অপব্যাখ্যার চেষ্টাও বাদ রাখেনি। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনরত শিখ কৃষকদের রাষ্ট্রদ্রোহী সন্ত্রাসী অপবাদ দিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশে সরকারি বাহিনী দিয়ে হামলাও চালানো হয়।

মূলধারার গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয়ও কৃষকদের গণআন্দোলনকে খাটো করা কিংবা তাদের দাবিগুলোকে দুর্বল করার প্রবণতা চোখে পড়ে, ঠিক যেভাবে তারা ছয় বছর ধরে সব ভিন্ন মত বা বিরোধী মতাবলম্বীদের নির্লজ্জভাবে আক্রমণের চর্চায় নিয়োজিত।

নতুন আরোপিত আইনগুলো অপসারণের মাধ্যমে কৃষকদের মূল দাবি মেনে নিতে সরকার এখনো অনীহা প্রকাশ করছে। তারা হয়তো মনে করছে, খোলা আকাশের নিচে অবস্থানরত কৃষকদের আন্দোলন বাতাসের এক ঝটকায় উড়ে যাবে, বিশেষ করে দিল্লির তীব্র ঠাণ্ডার কাছে হার মানতে বাধ্য হবেন তারা। এর মধ্যে যেমন তীব্র শীতের কারণে আন্দোলনরত কয়েকজন কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

কৃষক আন্দোলনকে উপেক্ষা করাটা ঔদ্ধত্য হতে পারে। ভারতের অর্ধেকের মতো কর্মসংস্থান আজও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ (এবং গ্রামীণ জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ) প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল কৃষির ওপর। আন্দোলনরত কৃষকদের দৃঢ় সংকল্প, তাদের প্রতি জনগণের ব্যাপক সমর্থন আভাস দেয় যে এবারের পরিস্থিতি ভিন্নও হতে পারে। 

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

জয়তী ঘোষ: ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক;

ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস অ্যাসোসিয়েটসের এক্সিকিউটিভ

সেক্রেটারি এবং ইনডিপেনডেন্ট কমিশন ফর দ্য রিফর্ম অব ইন্টারন্যাশনাল

করপোরেট ট্যাক্সেশনের সদস্য

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও