শিশুর জন্মনিবন্ধনে ভোগান্তি

সেবা সহজীকরণের মাধ্যমে জনভোগান্তি হ্রাস হোক অগ্রাধিকার

একটি শিশুকে স্কুলে ভর্তি করানোর মতো স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াও যদি অভিভাবকের জন্য জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘ ভোগান্তিতে পরিণত হয়, তাহলে তা কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; বরং তা নাগরিক সেবা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

জীবনের শুরুতে শিশুকে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির যেসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তার অন্যতম জন্মনিবন্ধন। এ অভিজ্ঞতা শিশু ও তার পরিবারের জন্য সুখকর হচ্ছে না, এটা বলাই বাহুল্য। আমরা যে জনবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চাই তার পথে প্রথম প্রতিবন্ধকতা জন্মনিবন্ধনের মতো অতি স্বাভাবিক ও অতি প্রয়োজনীয় নথি পেতে ভোগান্তি। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক পেতে চাই অথচ নাগরিক হয়ে ওঠার পথে প্রথম নথি প্রাপ্তিতে এ ধরনের জটিলতা ও ভোগান্তি অত্যন্ত হতাশাজনক। এ সম্পর্কিত বণিক বার্তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে হতাশা ও ভোগান্তির ছবিই ফুটে উঠেছে।

একটি শিশুকে স্কুলে ভর্তি করানোর মতো স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াও যদি অভিভাবকের জন্য জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘ ভোগান্তিতে পরিণত হয়, তাহলে তা কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; বরং তা নাগরিক সেবা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। স্কুলে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অনেক অভিভাবককে সন্তানের জন্মনিবন্ধনের আগে নিজেদের জন্মনিবন্ধন অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা, তথ্য সংশোধন, ঠিকানা ও নামের অসামঞ্জস্য দূর করা কিংবা একাধিক কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। কোথাও সার্ভার জটিলতা, কোথাও নথির অমিল, আবার কোথাও ভিন্ন দপ্তরের ভিন্ন নির্দেশনা—সব মিলিয়ে একটি প্রয়োজনীয় সেবা পেতে নাগরিককে যে সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

জন্মনিবন্ধন একটি মৌলিক নাগরিক নথি। শিক্ষা, পাসপোর্ট, সরকারি সুবিধা ও বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থা একটি দেশের প্রশাসনিক সক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে সব নাগরিককে জন্মনিবন্ধনের আওতায় আনা এবং তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবশ্যই দায়িত্ব। কিন্তু এ লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়াটি এমন হওয়া উচিত নয়, যেখানে একটি শিশুর জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে তার মা-বাবাকেও নতুন করে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় ২০১৩ সালের পর জন্ম নেয়া শিশুর জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে মা-বাবার জন্মনিবন্ধন নম্বর প্রয়োজন হচ্ছে। এর যৌক্তিকতা রয়েছে। অভিভাবকের পরিচয় যাচাই, পারিবারিক তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে একটি নির্ভরযোগ্য পারিবারিক তথ্যভাণ্ডার তৈরির জন্য এ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বাস্তব সমস্যা দেখা দিচ্ছে তখনই, যখন বহু বছর আগে করা মা-বাবার জন্মনিবন্ধন অনলাইনে নেই, কিংবা সেই নথির সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বা বর্তমান ঠিকানার তথ্যের অমিল রয়েছে। তখন শিশুর নিবন্ধন কার্যত অভিভাবকের পুরনো নথি সংশোধনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

ডিজিটাল সেবার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নাগরিকের দপ্তরে যাতায়াত কমানো। অথচ জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে অনেক নাগরিকের অভিজ্ঞতা তার বিপরীত। একাধিক কার্যালয়ে যাওয়া, কাগজপত্র নিয়ে বারবার হাজির হওয়া, সার্ভার সচল হওয়ার অপেক্ষা কিংবা কোন দপ্তরে আবেদন করতে হবে তা নিয়ে বিভ্রান্তি—এসব ডিজিটাল ব্যবস্থার সুফলকে অনেকটাই ম্লান করে দেয়। বিশেষ করে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বসবাসকারী এমন নাগরিকের সংখ্যা কম নয়, যাদের স্থায়ী ঠিকানা এক জায়গায়, জন্মস্থান অন্য জায়গায় এবং জাতীয় পরিচয়পত্রে বর্তমান ঠিকানা ভিন্ন। এ বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে আবেদনকারীকে কেবল জন্মস্থান বা স্থায়ী ঠিকানার দপ্তরে পাঠানো হলে সেবা সহজ হওয়ার পরিবর্তে আরো জটিল হয়। আরো উদ্বেগজনক হলো এ জটিলতার সুযোগে দালালনির্ভরতা তৈরি হওয়া। প্রতিবেদনে দ্রুত সেবা পাওয়ার আশায় নির্ধারিত ফির বাইরে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের অভিযোগ এসেছে। জন্মনিবন্ধনের নির্ধারিত ফি যেখানে তুলনামূলকভাবে সামান্য, সেখানে একজন নাগরিককে যদি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাহলে বোঝা যায় সেবাপ্রক্রিয়ায় কোথাও না কোথাও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। শুধু অনলাইন আবেদন চালু করলেই দালালনির্ভরতা দূর হয় না; আবেদন থেকে যাচাই, সংশোধন ও সনদ প্রদান—পুরো প্রক্রিয়াটিকেই ব্যবহারবান্ধব ও স্বচ্ছ করতে হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার নামে যেন অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি না হয়। জন্মনিবন্ধনের তথ্য যাচাই কঠোর হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু যাচাইয়ের দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের। নাগরিকের কাজ হওয়া উচিত সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় প্রমাণ সরবরাহ করা; তথ্য যাচাইয়ের জন্য তাকে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরতে বাধ্য করা নয়। কোনো তথ্যের অমিল থাকলে কোন নথি প্রয়োজন, কোথায় আবেদন করতে হবে, কত সময় লাগবে এবং সংশোধনের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি কী—এসব বিষয়ে একক ও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি।

একই সঙ্গে অনলাইন ব্যবস্থার কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। বিপুলসংখ্যক মানুষ একই সময়ে আবেদন করলে সার্ভারে চাপ পড়বে—এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু নাগরিক সেবা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এমন কারিগরি সীমাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সার্ভারের সক্ষমতা, ব্যাকআপ ব্যবস্থা, তথ্য যাচাইয়ের আন্তঃসংযোগ এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কার্যালয়গুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। কোনো একটি কারিগরি সমস্যার কারণে যেন একটি শিশুর স্কুলে ভর্তি আটকে না যায়, সেজন্য জরুরি বিকল্প ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

জন্মনিবন্ধন শতভাগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো সেবা কতজন মানুষ গ্রহণ করেছে, শুধু সেই পরিসংখ্যান দিয়ে সেবার সাফল্য বিচার করা যায় না। সেবাটি পেতে নাগরিককে কতবার অফিসে যেতে হয়েছে, কত সময় ব্যয় হয়েছে, কত খরচ হয়েছে এবং কতটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে—এসব সূচকও বিবেচনায় নিতে হবে। ডিজিটাল রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল অনলাইনে একটি আবেদন করার সুযোগ তৈরিতে নয়; বরং সেই আবেদন যেন দ্রুত, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্যভাবে নিষ্পত্তি হয়, সেটি নিশ্চিত করার মধ্যেই।

একটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার শুরুটা হওয়া উচিত আনন্দ ও প্রত্যাশার। জন্মনিবন্ধনের মতো একটি মৌলিক নাগরিক নথি সংগ্রহ করতে গিয়ে সেই প্রক্রিয়াই যদি পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তা, দৌড়ঝাঁপ ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়ে ওঠে, তাহলে সেবা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

আরও