মাদরাসায় শিশুর নিরাপত্তা: নীরবতার বদলে জবাবদিহি দরকার

বাংলাদেশে মাদরাসায় শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এ আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো ধরনের উত্তেজনা তৈরি করা নয়। উদ্দেশ্য হলো সচেতনতা তৈরি করা, শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে প্রকাশ্য আলোচনায় আনা এবং সমস্যাটিকে তথ্যের ভিত্তিতে দেখা। আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার রাখা দরকার। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ, নিয়মিত, সরকারি জাতীয় তথ্যভাণ্ডার সহজলভ্য নয়। ফলে যেটুকু দৃশ্যমান, তার বড় অংশই আসে বড় জাতীয় পত্রিকার প্রতিবেদন, পুলিশি মামলা ও আদালত-সংক্রান্ত সংবাদ থেকে। তাই ২০২৩-২৬ সালের মধ্যে যে প্রতিবেদনগুলো আমি দেখেছি এবং গ্রহণযোগ্য সংবাদমাধ্যমে পাওয়া গেছে, লেখাটি সে ভিত্তিতেই লেখা।

ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পর্যালোচনা বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুধু শারীরিক শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে যৌন নির্যাতন, ভয়, লজ্জা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতাও রয়েছে। আইন ও সালিস কেন্দ্রও তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন বড় সমস্যা হলেও সামাজিক কলঙ্কের কারণে বহু ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। অর্থাৎ, যে ঘটনাগুলো পত্রিকায় আমরা দেখি, সেগুলোই পুরো বাস্তবতা নয়। অনেক সময় দৃশ্যমান অংশটি অদৃশ্য অংশের চেয়ে ছোট।

২০২৩ সালের প্রতিবেদনগুলোই এ সমস্যার গভীরতা বুঝতে সাহায্য করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ প্রথম আলো রাজশাহীতে এক আবাসিক মাদরাসাছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে আবাসিক শিক্ষক গ্রেফতারের খবর প্রকাশ করে। ২ এপ্রিল ২০২৩ প্রথম আলো গৌরনদীতে এক মাদরাসাছাত্রীকে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণচেষ্টার মামলায় শিক্ষক গ্রেফতারের কথা জানায়। ১৯ জুন ২০২৩ প্রথম আলো সাতকানিয়ায় ১৫ বছর বয়সী এক ছাত্রকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে শিক্ষককে কারাগারে পাঠানোর সংবাদ প্রকাশ করে। ১০ আগস্ট ২০২৩ ঢাকা ট্রিবিউন চট্টগ্রামে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের মামলায় এক মাদরাসা শিক্ষকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের খবর দেয়। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ প্রথম আলো নাসিরনগরে এক মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেফতারের সংবাদ প্রকাশ করে। কয়েকটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। ভুক্তভোগী শুধু মেয়ে শিশু নয়, ছেলে শিশুও। এবং আবাসিক বা ধর্মীয় কর্তৃত্বপূর্ণ পরিবেশে অভিযোগ তোলা অনেক সময় আরো কঠিন হয়ে পড়ে।

২০২৪ সালেও এ প্রবণতা থামেনি। ২৭ জানুয়ারি ২০২৪ ঢাকা ট্রিবিউন নোয়াখালীর চাটখিলে চার কিশোর ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে এক মাদরাসা শিক্ষককে জেলে পাঠানোর খবর দেয়। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ প্রথম আলো গোপালগঞ্জে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রীর ধর্ষণের অভিযোগভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, আর ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ঢাকা ট্রিবিউন একই ঘটনায় পাঁচ মাদরাসা শিক্ষককে জেলে পাঠানোর সংবাদ ছাপে। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ প্রথম আলো এবং ঢাকা ট্রিবিউন দুই পত্রিকাই চট্টগ্রামে চার শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের মামলায় এক মাদরাসা শিক্ষকের মৃত্যুদণ্ডের খবর প্রকাশ করে। ২৪ এপ্রিল ২০২৪ ঢাকা ট্রিবিউন নওগাঁয় এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় এক শিক্ষকের ১০ বছরের কারাদণ্ডের কথা জানায়। ৫ জুলাই ২০২৪ প্রথম আলো ময়মনসিংহের নান্দাইলে এক মাদরাসাছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেফতারের খবর ছাপে। ২৯ আগস্ট ২০২৪ প্রথম আলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই মাদরাসাছাত্রীর ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে দুই শিক্ষককে আসামি করে মামলার খবর প্রকাশ করে। ২৯ নভেম্বর ২০২৪ ঢাকা ট্রিবিউন রংপুরে এক ১০ বছর বয়সী মাদরাসাছাত্র ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে বলে জানায় এবং সেখানে এক শিক্ষক ও এক ছাত্রকে গ্রেফতারের কথা উল্লেখ করে। অর্থাৎ ২০২৪ সালে অভিযোগ, গ্রেফতার, বিচার, দণ্ড, একক ভুক্তভোগী এবং একাধিক ভুক্তভোগী, সব ধরনের চিত্রই সামনে আসে।

২০২৫ সালের প্রতিবেদনগুলো দেখায়, সমস্যাটি কেবল টিকে নেই, বরং ধারাবাহিকভাবে দেখা দিচ্ছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ দ্য ডেইলি স্টার লালমনিরহাটে ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেফতারের খবর দেয়। ৯ মার্চ ২০২৫ ঢাকা ট্রিবিউন গাজীপুরের শ্রীপুরে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির অভিযোগে শিক্ষক গ্রেফতারের সংবাদ প্রকাশ করে। ২৮ এপ্রিল ২০২৫ প্রথম আলো ফটিকছড়ির একটি আবাসিক মাদরাসার চতুর্থ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে তিন শিক্ষক গ্রেফতারের কথা জানায়। ২৮ জুলাই ২০২৫ প্রথম আলো চট্টগ্রামে ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেফতারের সংবাদ ছাপে। ২৭ আগস্ট ২০২৫ দ্য ডেইলি স্টার চট্টগ্রামে নয় বছর বয়সী এক ছাত্রকে ধর্ষণের মামলায় সাবেক মাদরাসা শিক্ষকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের খবর দেয়। ২৯ আগস্ট ২০২৫ প্রথম আলো কুমিল্লার বুড়িচংয়ে ১১ বছর বয়সী দুই ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষককে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর কথা জানায়। ১৩ অক্টোবর ২০২৫ প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণ চট্টগ্রামে ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের মামলায় এক মাদরাসা শিক্ষকের মৃত্যুদণ্ডের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ বছরের ঘটনাগুলোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কিছু মামলা আদালতে গিয়েছে এবং রায়ও হয়েছে। তার মানে, অভিযোগ উঠলে আইনগত প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বোঝা যায় সেই পর্যায়ে পৌঁছতে পরিবার, ভুক্তভোগী, চিকিৎসা, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা সবকিছুরই সক্রিয় ভূমিকা লাগে।

২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসেও একই উদ্বেগজনক ধারা দেখা যায়। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দ্য ডেইলি স্টার নোয়াখালীতে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মাদরাসা শিক্ষক গ্রেফতারের কথা জানায়। ১৬ মার্চ ২০২৬ প্রথম আলো কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ১০ বছর বয়সী এক আবাসিক মাদরাসা শিক্ষার্থীকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি এবং প্রাথমিক পরীক্ষায় যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়ার খবর দেয়। ১৭ মার্চ ২০২৬ দ্য ডেইলি স্টার একই ঘটনার প্রতিবেদনে জানায়, শিশুটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, এবং তিনজনকে আটক করা হয়েছে। ১৭ মার্চ ২০২৬ প্রথম আলোর পরবর্তী প্রতিবেদনে পরিবারের ওপর আপসের চাপের অভিযোগ সামনে আসে। ২২ মার্চ ২০২৬ প্রথম আলো জানায়, সেই শিশুর ঈদ কেটেছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। ৩ এপ্রিল ২০২৬ প্রথম আলো নোয়াখালী শহরের একটি মাদরাসায় এক আবাসিক ছাত্রকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে শিক্ষক গ্রেফতারের সংবাদ দেয় এবং একই দিন দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ওই শিক্ষককে আদালত কারাগারে পাঠিয়েছে। কয়েকটি প্রতিবেদন একত্রে পড়লে দেখা যায়, আবাসিক পরিবেশ, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক আঘাত এবং অভিযোগকে স্থানীয়ভাবে মিটিয়ে ফেলার চাপ এ তিনটি বিষয় বারবার ফিরে আসছে।

এ দৃশ্যমান ঘটনাগুলো কয়েকটি সুস্পষ্ট প্যাটার্ন নির্দেশ করে। প্রথমত, আবাসিক বা আংশিক আবাসিক মাদরাসায় ঝুঁকি বেশি। শিশু পরিবার থেকে দূরে থাকে, তদারকি সীমিত থাকে এবং অভিযোগ গোপন রাখা তুলনামূলক সহজ হয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, পরিচালক বা ধর্মীয় শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা অনেক সময় শিশুর বক্তব্যকে দুর্বল করে দেয়। শিশু যা বলছে, পরিবার বা সমাজ তা সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করতে চায় না। তৃতীয়ত, ছেলে শিশুদের ভুক্তভোগী হিসেবে আমরা বারবার দেখতে পাচ্ছি, অথচ জনআলোচনায় অংশটি অনেক সময় আড়ালে থাকে। ঢাকা ট্রিবিউনের আগের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনগুলোও দেখিয়েছিল মাদরাসায় ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনা বাস্তব, কিন্তু তা প্রায়ই নীরবতার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। চতুর্থত, কিছু ঘটনায় একাধিক ভুক্তভোগীর কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ, এটি কেবল এককালীন বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রশ্ন নয়, কোথাও কোথাও ধারাবাহিক নির্যাতনের ইঙ্গিতও দেয়। পঞ্চমত, অভিযোগ ওঠার পর সামাজিক, স্থানীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক চাপ একটি বড় বাস্তবতা। কুষ্টিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনও বলেছে, মাদরাসায় শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনা সাধারণত তখনই সামনে আসে, যখন আঘাত গুরুতর হয় অথবা ঘটনা আর চাপা রাখা যায় না।

তাহলে প্রশ্ন হলো এত কম ঘটনা কেন দৃশ্যমান হয়? এর উত্তর জটিল হলেও অস্পষ্ট নয়। আইন ও সালিস কেন্দ্র বলেছে, সামাজিক কলঙ্কের কারণে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। মাদরাসার ক্ষেত্রে এ সমস্যার সঙ্গে আরো কিছু বিষয় যোগ হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে অনেক পরিবার ভয় পায়। ছেলে শিশু ভুক্তভোগী হলে লজ্জা, ভয় এবং সামাজিক ধারণা আরো বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক শিশু নিজেই বুঝতে পারে না যে তার সঙ্গে যা ঘটছে তা অপরাধ। অনেক পরিবার ভাবে অভিযোগ উঠলে সন্তানের ভবিষ্যৎ, সম্মান বা বিয়ের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল আপসের পথে যেতে চাপ দেয়। ফলে পত্রিকায় যে সংখ্যাটি দেখা যায়, বাস্তবে তার চেয়ে বড় একটি অদৃশ্য অংশ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

আমি এ লেখায় কোনো ধর্মকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাচ্ছি না। সমস্যাটি ইসলাম, মাদরাসা শিক্ষা বা ধর্মবিশ্বাসের অন্তর্নিহিত সমস্যা নয়। সমস্যাটি হলো প্রতিষ্ঠান, প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব ও দুর্বল জবাবদিহি। এ বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশে বা শুধু মাদরাসায় নেই। পাকিস্তান নিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু যৌন নির্যাতনকে দীর্ঘদিনের এবং বিস্তৃত সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। একইভাবে ক্যাথলিক চার্চকে ঘিরে বিভিন্ন দেশে বহু বছরের যৌন নির্যাতন ও ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত বাস্তবতা। রয়টার্সও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোয় দেখিয়েছে, প্রতিষ্ঠানগত নীরবতা ও নৈতিক কর্তৃত্বের আড়ালে নির্যাতন লুকিয়ে থাকার ঝুঁকি কত বড়। এ তুলনার উদ্দেশ্য এক ধর্মকে আরেক ধর্মের সঙ্গে মেলানো নয়। উদ্দেশ্য হলো একটি সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক সত্য বোঝা: যেখানে কর্তৃত্ব আছে কিন্তু স্বাধীন নজরদারি দুর্বল, সেখানে নির্যাতন চাপা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

এখন প্রশ্ন দায়ের। প্রথম দায় মাদরাসার নিজের। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রথম কাজ তার সুনাম বাঁচানো নয়, তার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, শিক্ষক ও কর্মীদের পূর্বপরিচিতি যাচাই, আবাসিক অংশে স্বাধীন তদারকি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ উঠলে সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ও পুলিশকে জানানো, এগুলো ন্যূনতম ব্যবস্থা হওয়া উচিত। দরজা বন্ধ করে একা শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমানো, আবাসিক অংশে নিয়মিত তদারকি রাখা এবং ‘‌স্থানীয়ভাবে মিটিয়ে ফেলা’ মানসিকতা পরিহার করা জরুরি। কারণ এ সংস্কৃতি অপরাধীকে বাঁচায়, প্রতিষ্ঠানকে স্বস্তি দেয়, কিন্তু শিশুদের নিরাপদ করে না।

দ্বিতীয় দায় সরকারের। আলিয়া, কওমি, বেসরকারি, আবাসিক, অনাবাসিক সব ধরনের মাদরাসার জন্য একক শিশু সুরক্ষা মানদণ্ড প্রয়োজন। নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগের বাধ্যতামূলক নথিভুক্তি, অভিযোগের তথ্যভাণ্ডার, শিশুবান্ধব চিকিৎসা ও মানসিক-সামাজিক সহায়তা, দ্রুত তদন্ত এবং ভুক্তভোগী ও পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া কেবল গ্রেফতারের খবর দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না। কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বেশি, কোথায় নির্যাতনের অভিযোগ, কোথায় ছেলে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে, কোথায় মেয়ে শিশুরা, কোথায় আপসের চাপ বেশি এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কার্যকর নীতি সম্ভব নয়।

তৃতীয় দায় পরিবারের। পরিবারকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না, কারণ অনেকে ধর্মীয় শিক্ষা, অর্থনৈতিক প্রয়োজন বা আবাসিক সুবিধার কারণে সন্তানকে মাদরাসায় পাঠান। কিন্তু সতর্ক থাকা জরুরি। শিশু হঠাৎ মাদরাসায় যেতে না চাইলে, নির্দিষ্ট শিক্ষককে ভয় পেলে, আচরণ বদলে গেলে, শারীরিক অসুস্থতার কথা বললে অথবা অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ হয়ে গেলে, তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। বিশেষ করে ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে ‘‌এ ধরনের কথা বলা যায় না’ ধরনের মানসিকতা ভাঙতে হবে। আর অভিযোগ উঠলে আপসের নামে চুপ করে যাওয়া মানে অনেক সময় পরের শিশুর জন্যও ঝুঁকি রেখে দেয়া।

সব মাদরাসা এক নয়, সব শিক্ষকও অপরাধী নন। কথাটি সত্য। কিন্তু এ সত্য বলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ২০২৩-২৬ সালের মধ্যে বড় পত্রিকায় প্রকাশিত দৃশ্যমান প্রতিবেদনগুলোই বলছে, এখানে একটি বাস্তব, পুনরাবৃত্ত এবং গভীর নিরাপত্তা সংকট আছে। এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা মানে সমস্যাটিকে ছোট করা। এখন প্রয়োজন অস্বীকার নয়, বরং নীরবতা ভেঙে শিশুকেন্দ্রিক সুরক্ষা, জবাবদিহি ও সংস্কারকে সামনে আনা। শিশু আগে শিশু, পরে ছাত্র। এ সহজ সত্যটি নীতির কেন্দ্রে না আনলে প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে, কিন্তু শিশু নিরাপদ হবে না।

আসিফ বিন আলী: যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো

আরও