জুলাই গণ-অভ্যুত্থান

কেউ একা নয়, বরং সম্মিলিত সংগ্রামের ফল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান

সম্প্রতি এক বছর পূর্ণ হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের। সরকারি চাকরিতে অন্যায্য কোটা প্রথার বিরুদ্ধে তরুণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল।

সম্প্রতি এক বছর পূর্ণ হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের। সরকারি চাকরিতে অন্যায্য কোটা প্রথার বিরুদ্ধে তরুণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল। ধীরে ধীরে এ আন্দোলন একটি শক্তিশালী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার শাসন উৎখাত করা।

এ অভ্যুত্থান দেশের নাগরিক শক্তির এক অসাধারণ ও দুঃসাহসী ঐক্যের ফল। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার নির্মমতার সঙ্গে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিল। পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড চালায়। এ নিষ্ঠুরতা সাধারণ মানুষকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তোলে। মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে তারা দলে দলে রাজপথ দখল করে এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।

গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, যখন সাধারণ মানুষ নিজেদের অধিকারের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো স্বৈরাচারী শক্তি টিকে থাকতে পারে না। তরুণদের নেতৃত্বে সফল আন্দোলন দেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছে।

অভ্যুত্থানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে বস্তির শ্রমজীবী, রিকশাচালক, হকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্রিয়ভাবে লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছিল।

আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল স্কুল ও মাদ্রাসার ছাত্র, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নারী, শ্রমিক ও নানা পেশাজীবী। বাম, ডান, মধ্যপন্থী—বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকরাও রাজপথে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। নারী, শ্রমজীবী এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর অবারিত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, এ আন্দোলন ছিল এক সর্বজনীন জনজাগরণ, যেখানে কেউই পিছিয়ে ছিল না।

কোটা ব্যবস্থা থাকা না থাকার সঙ্গে মাদ্রাসাপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের কোনো লাভ-লস নেই। তাদের নানাভাবে ট্যাগ দিয়ে একঘরে করে রাখা হয়েছিল, বাকস্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছিল এবং কেবল মাদ্রাসাপড়ুয়া বলে তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও আন্দোলন জমে উঠলে তারা সাহসের সঙ্গে এগিয়ে এসেছিল। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ চার মুখ যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা ব্রিজ, উত্তরা ও মোহাম্মদপুরে মাদ্রাসাছাত্রদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। লাভ-লসের হিসাব পাশে রেখে দেশপ্রেমের নজরানা দিতে গিয়ে আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন অর্ধশতাধিক মাদ্রাসাছাত্র ও শিক্ষক। তাদের এ নজরানার স্বীকৃতি প্রদান করে মূলধারায় যুক্ত করা সময়ের দাবি।

এ আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল সেই নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও বিচারহীনতার চক্রে বন্দি ছিল। বিশেষ করে ঢাকার বস্তির কিশোর ও তরুণরা সক্রিয় ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিল গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর; যারা ঘাম ও শ্রমে এ শহরের চাকা অবিরত ঘোরায়। তারা রাজপথে এসেছিল কোনো ফেসবুক লাইভ বা মিডিয়ার কাভারেজ পাওয়ার আশায় নয়, বরং ভেতরের ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং ভালো রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে। তাদের হাতে ব্যানার ছিল না, মুখে স্লোগানও ছিল না। তবু তাদের উপস্থিতি আন্দোলনের ভিত্তিকে আরো শক্তিশালী করেছিল। গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পার হলেও তাদের অধিকার ও হিস্যা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে কিনা, তা প্রশ্নের বিষয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ছিল এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে শহর ও গ্রামের প্রতিটি কোণ থেকে নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে র‌্যাব-পুলিশের তাক করা অস্ত্রের সামনে তারা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যা তাদের অসীম সাহসের পরিচয় দেয়। নজিরবিহীন অভ্যুত্থানে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ বিরল ঘটনা। তারা শুধু সরাসরি অংশ নেননি, বিভিন্ন কৌশল ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আন্দোলনের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। যখন সরকার অহিংস আন্দোলনে গুলি চালিয়ে দমন-পীড়ন শুরু করে, তখন নারী শিক্ষার্থী, পোশাককর্মী, গৃহিণী, মা, চিকিৎসক ও নার্সসহ নানা পেশার নারীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসেন। তাদের প্রতিবাদ আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। চিকিৎসকরা আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন, আর কর্মজীবী ও গৃহিণী মায়েরা পানি ও খাবার সরবরাহ করে সাহস জুগিয়েছেন। নারীরা ছিলেন এ আন্দোলনের অনুপ্রেরণার উজ্জ্বল আলো এবং স্বৈরাচারী শাসন চিরতরে সরিয়ে দেয়ার অগ্রণী শক্তি। নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্র কি তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করেছে?

রাজনৈতিক ঐক্যও এ আন্দোলনের একটি বড় অর্জন। বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দল ও জোট, যারা আগে দ্বন্দ্বে বিভক্ত ছিল, স্বৈরাচারী শাসন পতনের প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে পারস্পরিক সহানুভূতি দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এ ঐক্য রক্ষা করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের আন্দোলনের ইতিহাসে প্রবাসীদের অবদান প্রায়ই অবহেলিত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও প্রবাসীরা নানা মাধ্যমে—বিক্ষোভ মিছিল, অর্থ সাহায্য, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রচার ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করা হাসিনা সরকার পতনের অন্যতম কারণ। তাদের এ অবদান ইতিহাসে স্মরণীয় হবে এবং যথাযথ স্বীকৃতি পাওয়ারযোগ্য। নতুন বাংলাদেশে প্রবাসীদের নানা সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরি।

এ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সব শ্রেণী-পেশার মানুষ মিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে। কেউ একা নয়, কোনো এক দলের নয়, বরং সম্মিলিত সংগ্রামের ফলাফল এটি। বহু তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ ছেড়ে রাজপথে নেমেছেন। যারা আগে রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন তারা ফেসবুকে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। সামগ্রিকভাবে এ জুলাইয়ে বিশাল সামাজিক রূপান্তর ঘটেছে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুরু। ইতিহাস বলে, বড় আন্দোলনের পর কাঠামোগত সংস্কার না হলে স্বপ্ন কেবল কাগজে-কলমে আটকে থাকে। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের জন্য ঐকমত্য তৈরি এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নতুন বাংলাদেশ গড়ার যাত্রা এখান থেকেই শুরু হবে।

আকরাম হুসাইন: যুগ্ম সদস্য সচিব, জাতীয় নাগরিক পার্টি

আরও