রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

প্রফেসরশিপ থেকে প্রেসিডেন্সি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু জীবন যেন কেবল ব্যক্তির জীবন নয়, একটি সময়েরও দলিল।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক যাত্রা তেমনই এক আখ্যান—যেখানে শ্রেণীকক্ষের অধ্যাপক ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছেন রাজনীতির অনিশ্চিত অঙ্গনে; পৌর রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি, মন্ত্রিসভা থেকে বিরোধী দলের মহাসচিব, মামলা-হয়রানি থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে উপনীত হওয়া—সব মিলিয়ে তার জীবন যেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ পরিক্রমা।

একজন শিক্ষক থেকে রাজনীতিক, রাজনীতিক থেকে মন্ত্রী, তারপর একটি বিপন্ন রাজনৈতিক দলের মহাসচিব এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের শীর্ষ সাংবিধানিক পদে—এ যাত্রা নিছক ব্যক্তিগত উত্থানের গল্প নয়। এর মধ্যে আছে বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তন, প্রতিকূলতার স্মৃতি, ক্ষমতার পালাবদল এবং ইতিহাসের এক অদ্ভুত প্রত্যাবর্তন। প্রায় এক যুগ আগের একটি ঘটনা মনে পড়ে। আইনজীবী বন্ধু আজিজ উল্লাহ ইমনকে নিয়ে অ্যানেক্স ১৬-এর শেষ বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করছিলাম মামলার শুনানির জন্য। আদালত কক্ষের সেই পরিবেশে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির এক চেনা প্রতিচ্ছবি যেন উপস্থিত ছিল—উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, মামলার ভার এবং দীর্ঘ অপেক্ষা। পাশে বসা এক প্রৌঢ় নারী হতাশা ও আশার দোলাচলে আইনজীবীদের সাবমিশন শুনছিলেন গভীর মনোযোগে। হঠাৎ চোখে পড়ল কজলিস্টে—দেখি, তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। পাশে থাকা সেই নারী ছিলেন তার সহধর্মিণী।

সেই সময় বিরোধী দলের রাজনীতির একটি বড় অংশের ঠিকানা হয়ে উঠেছিল আদালতের বারান্দা, হাজিরার খাতা এবং কারাগারের ফটক। রাজনীতির ভাষা অনেকাংশেই পরিণত হয়েছিল মামলা, দমন ও পাল্টা প্রতিশোধের ভাষায়। আদালত থেকে বের হওয়ার সময় ইমন তাকে অভয় ও সান্ত্বনা দিয়েছিল। দৃশ্যটি তখন হয়তো নিছক একটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত ছিল; আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, সেটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক সময়ের একটি ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।

রাজনীতি কখনো কখনো মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসকে একই ফ্রেমে বন্দি করে। আদালতের সেই অপেক্ষা কক্ষ তাই আজ কেবল একটি স্মৃতি নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একসময়ের প্রতীক। সময়ের নিজস্ব গতি আছে। ইতিহাসের চাকা একই জায়গায় থেমে থাকে না। যে মানুষ একদিন রাজনৈতিক মামলার আসামি হিসেবে আদালতের সিঁড়িতে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিই যদি একদিন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আসনে অধিষ্ঠিত হন, তবে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির ভাগ্য পরিবর্তন নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও এক সম্ভাব্য সংকেত। এখানেই ইতিহাসের পরিহাস, আবার গণতন্ত্রের সৌন্দর্যও।

ক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা কেবল ক্ষমতা অর্জনে নয়; ক্ষমতা অর্জনের পর অতীতের ক্ষতকে কীভাবে ধারণ করা হয়, তার মধ্যেই তার বড় পরীক্ষা। যে রাজনীতি একদিন প্রতিপক্ষকে পরাজিত করাকে সাফল্যের মাপকাঠি মনে করেছে, গণতন্ত্র সেই রাজনীতিকে শেষ পর্যন্ত পুনর্মিলনের দিকে নিয়ে যেতে চায়। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—আজকের পরাজিতকে আগামী দিনের ইতিহাসের কেন্দ্রে ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা তার আছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা অবশ্য সহজ নয়। দীর্ঘদিনের বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিহিংসামূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে বারবার এক ধরনের সংঘাতময় অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। তিনি চাইলে হয়ে উঠতে পারেন রাজনৈতিক উত্তরণের একটি নৈতিক প্রতীক—রাষ্ট্রের এমন এক অভিভাবকসুলভ প্রতিষ্ঠান, যার কাছে মতভেদ থাকলেও কেউ যেন নিরাপত্তাহীনতা অনুভব না করে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে আলতাফ পারভেজের লেখায় যে বৃহত্তর বাস্তবতাটি বারবার প্রতিফলিত হয়, তা হলো এ অঞ্চল কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের সংকট নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও সংকট। নির্বাচন, সরকার পরিবর্তন কিংবা সাংবিধানিক পদে নতুন ব্যক্তির অধিষ্ঠান তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার মধ্য দিয়ে সমাজে নতুন আস্থা, নতুন রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং নতুন সহাবস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি পদ গ্রহণের নয়, পদটির অর্থ নির্ধারণের। তিনি কি অতীতের ক্ষতকে ভবিষ্যতের সমঝোতায় রূপ দিতে পারবেন? তিনি কি দেখাতে পারবেন যে রাষ্ট্রপতির পদ ক্ষমতার অলংকার নয়, বরং জাতির বিবেকের একটি সাংবিধানিক অবস্থান? এপিজে আবদুল কালামের বহুল উদ্ধৃত একটি বাণী এখানে স্মরণ করা যায়—ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না, দায়িত্বই মানুষকে বড় করে। বাংলাদেশের মতো বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় শক্তি তাই সাংবিধানিক ক্ষমতার পরিমাণ নয়; নিরপেক্ষতার নৈতিক মর্যাদা। তাকে এমন এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে হবে, যেখানে সরকার যেমন আস্থা রাখবে, বিরোধী মতও তেমনি ন্যায্যতার আশ্রয় খুঁজে পাবে। তবে এ পথ সহজ নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল বহুবার প্রতিশোধের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এক সরকারের মামলা পরবর্তী সরকারের আমলে নতুন মামলায় পরিণত হয়েছে; এক পক্ষের রাজনৈতিক বঞ্চনা অন্য পক্ষের প্রতিহিংসার যুক্তি হয়েছে। এ বৃত্ত ভাঙাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। রাষ্ট্রপতির ঐতিহাসিক সাফল্য তাই নির্ভর করবে তিনি কতটা তার দলীয় অতীতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐকমত্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন তার ওপর। অতীতকে অস্বীকার করে নয়, অতীতকে অতিক্রম করেই তাকে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে।

প্রফেসরশিপ থেকে প্রেসিডেন্সি—এ যাত্রা শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের এক পরীক্ষা। আদালতের বেঞ্চ থেকে বঙ্গভবনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর এ যাত্রা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে—রাজনীতি কি কেবল প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার শিল্প, নাকি শেষ পর্যন্ত একটি জাতিকে একত্র করার নৈতিক দায়িত্ব? মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিতে পারেন, তবে তার রাষ্ট্রপতি হওয়া কেবল একটি সাংবিধানিক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে না; তা বাংলাদেশের দীর্ঘ সংঘাতময় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শান্তি, সহনশীলতা ও পুনর্মিলনের একটি নতুন সম্ভাবনার সূচনা করতে পারে।

কখনো কখনো ইতিহাস তার অদৃশ্য কলমে মানুষের জীবনের পাণ্ডুলিপি এমনভাবে লিখে দেয়, যেখানে প্রথম পৃষ্ঠার সঙ্গে শেষ পৃষ্ঠার কোনো দৃশ্যমান মিল থাকে না। একদিন যিনি ছিলেন শ্রেণীকক্ষের মানুষ—যুক্তি, জ্ঞান ও নৈতিকতার পাঠদানকারী এক অধ্যাপক; সময়ের দীর্ঘ নদী পেরিয়ে তিনিই দাঁড়ান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আসনের দ্বারপ্রান্তে। জীবনের এ পরিহাসের মধ্যেই ইতিহাসের গভীর নাটক লুকিয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনও যেন বাংলার ধানসিঁড়ি নদীর মতো—কখনো কুয়াশায় ঢাকা, কখনো রৌদ্রের স্বচ্ছতায় উন্মুক্ত। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যে মানুষ একদিন আদালতের অপেক্ষাকক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিই হয়তো একদিন রাষ্ট্রের নীরব বিবেক হয়ে উঠবেন।

সময় মানুষের পরিচয় বদলায়, পদ বদলায়, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায় কিন্তু ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে মানুষের রেখে যাওয়া মানবিকতার আলো।

এমএম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

আরও