নগর তাপদ্বীপ প্রভাব, বায়ুদূষণ, যানজট, আবাসন সংকট, জলাবদ্ধতা, উন্মুক্ত সবুজ এলাকার ক্রমহ্রাস, ভবনের জ্বালানি দক্ষতা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলা—এসব বিষয়ে পরিচালিত অধিকাংশ গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ঢাকা। দেশের অন্যান্য শহর রয়ে যায় তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত। সন্দেহ নেই যে রাজধানী হিসেবে ঢাকা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগর অঞ্চল। প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের আবাসস্থল এ মহানগর দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৩৫ শতাংশেরও বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়, বাংলাদেশ মানে কি শুধুই ঢাকা? দেশের অন্য শহরগুলো কি গবেষণার জন্য অপেক্ষা করবে যতক্ষণ না তারা ঢাকার বর্তমান সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে?
গবেষণার উদ্দেশ্য কখনই কেবল বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা নয়; বরং ভবিষ্যতের সমস্যা প্রতিরোধ করাও গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু আমাদের গবেষণার প্রবণতা যেন উল্টো পথে এগোচ্ছে। আমরা এমন শহর নিয়ে গবেষণা করছি, যেখানে সমস্যা এরই মধ্যে প্রকট আকার ধারণ করেছে। অথচ যেসব শহর দ্রুত নগরায়ণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এখনো পরিকল্পিত উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে, সেগুলোকে নানাভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে একটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে—আমরা কি চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা কিংবা কক্সবাজারকে ঢাকার মতো পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত সংকটে পৌঁছানোর অপেক্ষায় আছি? নাকি এখনই গবেষণার মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নেয়া উচিত?
প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনযাত্রার আশায় শহরমুখী হচ্ছে। এ নগরায়ণের চাপ শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের অধিকাংশ শহর দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, পর্যটন কেন্দ্র এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে আগামী দুই দশকে এসব শহরের চেহারা আমূল পরিবর্তন হবে। অথচ এ পরিবর্তনের পেছনে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি এখনো অত্যন্ত দুর্বল। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাও আমাদের গবেষণার পরিধি বিস্তৃত করার দাবি রাখে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি এবং পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। উপকূলীয় খুলনা, সাতক্ষীরা ও কক্সবাজার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়ই ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে এবং তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব প্রতি বছর বাড়ছে। সিলেট অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা এখন নিয়মিত ঘটনা। চট্টগ্রামে পাহাড়ধস, ভারি বৃষ্টিপাত এবং উপকূলীয় ঝুঁকি একই সঙ্গে বিদ্যমান। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের রংপুর ও দিনাজপুরে শীতকাল তুলনামূলক দীর্ঘ এবং তাপমাত্রার ওঠানামা ভিন্ন ধরনের স্থাপত্য পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রতিটি শহরের জলবায়ু-সংবেদনশীল নকশা আলাদা হওয়া উচিত। কিন্তু গবেষণার অধিকাংশই যখন ঢাকার সমস্যাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, তখন এ আঞ্চলিক বৈচিত্র্য পরিকল্পনার বাইরে থেকে যায়।
বর্তমানে বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৩৭ শতাংশ ভবন ও নির্মাণ খাত থেকে আসে। এর মধ্যে ভবনের পরিচালনাজনিত জ্বালানি ব্যবহার প্রায় ২৮ শতাংশ এবং নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন ও নির্মাণ কার্যক্রম থেকে আসে আরো প্রায় ৯ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ। বাংলাদেশে এখনো বিপুল পরিমাণ নগর অবকাঠামো নির্মাণাধীন। এ পর্যায়ে যদি গবেষণার মাধ্যমে কম কার্বন নির্মাণসামগ্রী, প্রাকৃতিক বায়ুচলাচল, প্যাসিভ কুলিং, শক্তি-দক্ষ ভবন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সবুজ অবকাঠামো এবং স্থানীয় উপকরণের ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তবে ভবিষ্যতের শহরগুলোকে অনেক বেশি টেকসই করা সম্ভব। কিন্তু যদি এসব গবেষণা শুধু ঢাকার জন্য সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অন্যান্য শহর একই ধরনের পরিকল্পনাগত ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে এবং ভবিষ্যতে সেগুলোর সমস্যার সমাধানে অনেক বেশি অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হবে।
ঢাকা আজ একটি বাস্তব উদাহরণ। একসময়ের খাল, জলাভূমি এবং উন্মুক্ত সবুজ এলাকা দ্রুত কংক্রিটে রূপান্তরিত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে ঢাকার সবুজ উন্মুক্ত এলাকার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং অনেক স্থানে ভূমির তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় ৫-৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, বায়ুদূষণের কারণে বহুদিন ধরে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান শীর্ষে থাকে এবং যানজটে বছরে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এ পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি; বরং কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত গবেষণার অভাবের ফল। এখন যদি অন্যান্য শহরের জন্য একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে ভবিষ্যতে সেগুলোকেও একই সংকট মোকাবেলা করতে হবে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহরগুলো এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। চট্টগ্রামে উপকূল ও পাহাড়কে সমন্বয় করে জলবায়ু সহনশীল নগর পরিকল্পনা নেয়া সম্ভব। খুলনায় লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতাকে মাথায় রেখে আবাসন ও নগর অবকাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। রাজশাহীতে তাপ সহনশীল নগর নকশা, বৃক্ষ আচ্ছাদন বৃদ্ধি এবং প্রতিফলক নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় কার্যকর হতে পারে। সিলেটে বন্যা সহনশীল অবকাঠামো, বরিশালে নদীকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনা এবং কক্সবাজারে পর্যটন ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাকারী উন্নয়ন কৌশল এখনই গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব। অর্থাৎ প্রতিটি শহরের জন্য প্রয়োজন আলাদা গবেষণা, আলাদা পরিকল্পনা এবং আলাদা নীতিমালা।
গবেষণার আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো তথ্যের বৈষম্য। ঢাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা, বায়ুদূষণ, ট্রাফিক, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন, শক্তি ব্যবহার এবং জনসংখ্যার তথ্য তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য। কিন্তু অধিকাংশ জেলা শহরের ক্ষেত্রে এ ধরনের তথ্য হয় অনুপস্থিত, নয়তো বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত। ফলে গবেষকরা বাধ্য হয়ে ঢাকাকেই গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।
বর্তমান বিশ্বে শূন্য কার্বন নগর, জলবায়ু সহনশীল নগর উন্নয়ন, প্রকৃতিনির্ভর সমাধান, নীল-সবুজ অবকাঠামো, ১৫ মিনিটের শহর এবং স্পঞ্জ সিটির মতো ধারণাগুলো টেকসই নগর পরিকল্পনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কিন্তু এসব ধারণার সফল বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব, যখন গবেষণা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাস্তবতা ও বৈচিত্র্যকে সমান গুরুত্ব দেবে। বাংলাদেশের প্রতিটি শহরের নিজস্ব জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি, অর্থনৈতিক কাঠামো, সামাজিক বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে। তাই প্রতিটি শহরের পরিকল্পনাও হতে হবে সেই স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিল্ট এনভায়রনমেন্ট গবেষণার প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করা, অতীতের ভুল শুধরে নেয়া নয়। ঢাকা আমাদের দেখিয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণের মূল্য কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে। তাই বাংলাদেশের অন্যান্য শহরকে ঢাকার মতো সংকটে পৌঁছানোর অপেক্ষা না করে এখনই গবেষণার মূলধারায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। আজ যদি আমরা চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর কিংবা কক্সবাজারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করি, তবে আগামী প্রজন্ম একটি অধিকতর বাসযোগ্য, জলবায়ু সহনশীল, কম কার্বন এবং বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত বাংলাদেশের সুফল ভোগ করবে। একটি টেকসই বাংলাদেশ কখনই শুধু একটি টেকসই ঢাকার মাধ্যমে গড়ে উঠবে না; বরং দেশের প্রতিটি শহরের সমন্বিত, গবেষণানির্ভর এবং দূরদর্শী উন্নয়নের মধ্য দিয়েই সত্যিকার অর্থে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই নগর ভবিষ্যৎ নির্মিত হবে।
ড. সজল চৌধুরী: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট); ভবন পরিবেশ ও জ্বালানি দক্ষতাবিষয়ক গবেষক