প্রতি বছরের মতো এবারের বাজেটও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বিশ্ববাজার অর্থনীতির সঙ্গে যোগসূত্র থেকে প্রোথিত। সে কারণে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আছে বিবিধ সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি। তবে এ কথা সত্যি যে এবারের বাজেটে কিছু ভিন্ন দিক আছে যার গুরুত্ব আলোচনার দাবি রাখে।
ভিন্ন দিকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা, কালো টাকা সাদা না করা, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের অঙ্গীকার, ৪২ লাখ কৃষককে কৃষি কার্ড প্রদানের প্রতিশ্রুতি, নিত্যপণ্যের ওপর করছাড়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করছাড়, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষা ঋণ, শিশুখাদ্য ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড়, কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা হ্রাস, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো, ডিজিটাল ই-লোন চালু, ‘সৃজনশীল’ অর্থনীতির বিকাশে উদ্যোগ গ্রহণ ইত্যাদি।
এবারের বাজেটের ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বাজেটে উল্লেখিত ব্যয়ের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি; অর্থাৎ ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। এ হিসাব ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেটে ব্যয়ের বিপরীতে আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকায়; যা আয়ের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এ ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে তা বাজেটে উল্লেখ করা হয়। বাজেট ঘাটতির ৫২ শতাংশ ঋণ নেয়া হবে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে; ৪৬ শতাংশ ঋণ নেয়া হবে বিদেশী উৎস থেকে, বাকি ২ শতাংশের উৎস ধরা হয়েছে বিদেশী অনুদান।
বাজেট ঘাটতি মানে দেশী-বিদেশী ব্যাংক আর সংস্থার ওপর নির্ভরতা। এ নির্ভরতার দিকটা প্রতি বছরের বাজেটে লক্ষণীয়। সে কারণে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ১৪ শতাংশ ঋণের সুদ পরিশোধে খরচ করতে হয়। এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত হিসেবে নির্ধারিত। ঋণের সুদ পরিশোধে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করার প্রভাব পড়ছে দুটো মৌলিক খাতের ওপর। একটি শিক্ষা খাত আরেকটি স্বাস্থ্য। বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ করা হয়েছে, যদিও এ হার গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। অথচ জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের অপরিহার্যটা তুলে ধরে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দের এ হার মানবসম্পদ উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য অপ্রতুল। শিক্ষা খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মেধা মূল্যায়ন, শিক্ষকদের মানসম্মত বেতন-ভাতা প্রদান এবং ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার মান উন্নয়ন যদি উচ্চমানের বরাদ্দের অভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, তা জাতির উন্নয়নকে মন্থর করবে। তবু এ সীমাবদ্ধতার মধ্যে ২ শতাংশ বরাদ্দের সঠিক ও মানসম্পন্ন ব্যবহার অত্যাবশ্যক।
মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ব্যয়ের ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা জিডিপির ১ শতাংশ। তার আগে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের অবস্থা ছিল আরো করুণ। গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছর স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ করা হয়। স্বাস্থ্য খাতে যতটুকু বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল তার প্রায়োগিক দিকটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কারণে বিগত বছরগুলোয় সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ছিল অতি নিম্নমানের। প্রতিটি থানায় সরকারি মডেল হাসপাতাল নির্মাণের পাশপাশি মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় ডাক্তারদের উপযুক্ত প্রণোদনাসহ উচ্চমানের চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবস্থা করলে স্বল্প আয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। স্বাস্থ্যসেবায় আমলাদের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরলে আর পরিকল্পনামাফিক আঞ্চলিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে বেশি।
এক্ষেত্রে অর্থনীতির চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঋণনির্ভরতা যত কমানো সম্ভব হবে, বাজেট ঘাটতি তত কমে আসবে। ঋণনির্ভরতা কমাতে পারলে বিদেশী সংস্থা বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রভাব কমে আসবে। ৪৬ শতাংশ ঘাটতি পূরণের জন্য বিদেশী সংস্থার শরণাপন্ন হলে তাদের নিরূপিত বা আরোপিত নীতি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হবে। বর্তমানে বিদেশী ঋণ পাওয়া যায় প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে বিদেশী ঋণ প্রাপ্তির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানের দ্বিগুণ। এ পরিমাণ ঋণপ্রাপ্তি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং বা দুরূহ বিষয়। এত অধিক অংকের ঋণ পেতে হলে ‘নিওলিবারেল পলিসি’ মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। আইএমএফের ৩০ শর্তের চুক্তিপত্র দেখলেই সেই পলিসির মান ও অভিঘাত বোঝা সহজ। বিদেশী সংস্থার শর্ত মানতে গেলে মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সরকারীকরণের প্রভাব কমিয়ে বেসরকারীকরণের বাধ্যবাধকতা বাড়িয়ে দেয়া হতে পারে। ফলে ভুক্তভোগী হবে স্বল্প আয়ের মানুষ। এক্ষেত্রে সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপ জরুরি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত ছাড়াও বৈদেশিক ঋণনির্ভরতার প্রভাব পড়ছে কৃষি ও শিল্পের ওপর। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অতি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো কৃষি ও শিল্প। আমাদের কৃষি ও শিল্প খাত যদি দুর্বল করা যায় তাহলে এ দেশকে বিদেশী কোম্পানির বাজারে পরিণত করা অনেক সহজ হবে। ঋণনির্ভরতা সেই ফাঁদে আমাদের আটকে ফেলার চেষ্টা করে। এবারের বাজেটে কৃষিতে ২৯ হাজার ৮২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে; যা গত অর্থবছরের সমান। এ পরিমাণ বাজেট ও ভর্তুকি কৃষকদের জন্য অপ্রতুল। যদিও সার আমদানিতে শুল্কহার কমানো হয়েছে, সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ বা সেচের জ্বালানির ব্যবস্থা না হলে কৃষিকাজকে লাভজনক করা কঠিন হয়ে পড়বে। তদুপরি ৪২ লাখ কৃষককে যদি সঠিকভাবে কৃষক কার্ড ও সে অনুযায়ী প্রণোদনা দেয়া হয়, তার সুফল কৃষকরা পাবেন। এর জন্য প্রয়োজন ন্যায্যতাভিত্তিক ডেটাবেজ ও বাস্তবায়ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সার শিল্পের জাতীয়করণ। নিজ দেশে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সার উৎপাদন করতে পারলে আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে। এর ফলে কৃষিকাজে উৎপাদন খরচ কমবে। এছাড়া বিনা সুদে কৃষকদের ঋণ প্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদের কৃষি ব্যবস্থা উন্নত হবে। খাদ্য আমদানির নির্ভরতা কমবে। দেশীয় অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হবে।
আমাদের শিল্প খাতকে উন্নত করার প্রায়োগিক পদ্ধতি থাকা জরুরি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ আবশ্যক। এতে শ্রমিকদের সাংসারিক খরচ কমবে। ব্যাংক খাতকে বিনিয়োগবান্ধব করতে পারলে শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে। দেশের অর্থনীতি যেখানে ব্যাংক খাতনির্ভর, সেখানে খ্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। খেলাপি ঋণের পরিমাণ এতই বেশি যে তা এবারের বাজেটে উত্থাপিত মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় সমান। ব্যাংক খাতের ৩৬ শতাংশ যদি ঋণখেলাপি হয় আর বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য যদি ৪৬ শতাংশ অর্থ ব্যাংক খাত থেকে নেয়া হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মধ্যে শুধু ব্যাংক পড়বে না, এর প্রভাব পড়বে বিনিয়োগে। ব্যাংকে তখন তারল্য সংকট প্রকট হবে। এর ফলে শিল্প খাত দুর্বল হয়ে পড়বে।
এদিকে জ্বালানি খাতকে যদি আমরা বিদেশনির্ভরতা থেকে সরিয়ে আনতে না পারি এবং দেশীয় জ্বালানি সম্পদ উত্তোলনে যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগাতে না পারি; এর ফলে আমাদের শিল্প ও কৃষি দুটোই ক্ষতির মধ্যে পড়বে। জ্বালানি আমদানি কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারের উদ্যোগ এখানে জরুরি। এতে আমাদের রিজার্ভ বাড়বে। কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন খরচ কমবে। মূল্যস্ফীতি কমানো সহজ হবে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিদেশনির্ভরতা আমরা কমাতে পারি। এবারের বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও আগাম করমুক্ত করার প্রস্তাব আছে। এর মধ্য দিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কমে আসবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্রা বাড়াতে পারলে বিদ্যুৎ বিলের বেশি চাপ কমে আসবে। এতে শিল্প উৎপাদনের খরচও কমে আসবে।
রফতানি খাতকেও অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের কৃষি ও শিল্পকে রফতানিমুখী করতে পারলে আমাদের জাতীয় আয় বাড়বে। আমাদের জাতীয় আয়কে অতিমাত্রায় কর ও ভ্যাটনির্ভর করা হয়েছে। রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি হওয়ায় কর, ভ্যাট আর ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে সরকারকে। যদিও কর ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক ও কার্যকর করা প্রয়োজন। আয় ও মুনাফা থেকে কর প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। অনেক ক্ষেত্রে কর ছাড় দেয়া হয়েছে। করপোরেট কর আগের মতোই বহাল আছে। সমস্যা হলো করপোরেট কর খুব কমই আদায় করা হয়। দেখা যায়, দেড় লাখ কোম্পানির মধ্যে মাত্র ২৬ হাজার কর দিচ্ছে। অধিকাংশ কর অনাদায়ী থাকে। এনবিআরকে আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হলে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের কাছ থেকে কর আদায় সম্ভব হবে। ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থার সংস্কার করলে আর অর্থ পাচার রোধ করতে পারলে সেই টাকা শিল্পে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। ফলে আমাদের জাতীয় আয় বাড়বে। এতে সরকারের ঋণনির্ভরতা কমে আসবে। এ দিকগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখলে আগামী দিনের অর্থনীতি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে।
ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়