শেষ হওয়ার পথে ২০২৫ সাল। নানান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক টানাপড়েন, উত্থান-পতন, প্রত্যাশা-হতাশার মাঝে সমাপ্তি ঘটেছে বছরটির। সময় এখন পেছনে ফিরে তাকানোর—কী কী পেয়েছি, কী পাইনি; কী আশা করেছিলাম, কোথায় হতাশ হয়েছি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে অর্থনীতি বিষয়টিই সাধারণ মানুষের মনের বিরাট অংশ জুড়ে আছে। ২০২৫ সালে তাদের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ছিল অনেক, কিন্তু চিন্তাও তাদের কম ছিল না। সে প্রত্যাশা আর চিন্তা আবর্তিত হয়েছে তাদের জীবনের অর্থনীতি নিয়ে, যার মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি; বেকারত্ব; সুযোগের অসমতা; ঋণ, মৌলিক সামাজিক সেবার গুণগত মান; অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মব সহিংসতা ইত্যাদি। সুতরাং স্বাভাবিক ২০২৫-এর প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে শেষ হয়ে যাওয়া বছরটির দিকে ফিরে দেখার একটি বিরাট তাৎপর্য আছে—অনেকটা হিসাব মেলানোর জন্যই।
এটা অনস্বীকার্য যে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে কিছু কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। যেমন বাইরে থেকে অর্থপ্রবাহ বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের উন্নতি হয়েছে, সম্পদ পাচার আটকানো গেছে। ব্যাংক খাতে, যেসব ব্যাংক ভেঙে পড়েছে, তাদের পুনর্গঠনে সহায়তা দেয়া হয়েছে, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদগুলোকে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বেশকিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ৩ শতাংশের ওপরে ধরে রাখা গেছে।
কিন্তু সেই সঙ্গে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে শেষ হয়ে যাওয়া বছরটিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাটি ছিল অনেকটাই নেতিবাচক। বাংলাদেশের প্রবহমান সমস্যাগুলোর শীর্ষে রয়েছে দারিদ্র্য ও অসমতা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে নিকট অতীতে দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশের অর্জনের অনেকটাই সাম্প্রতিক সময়ে খোয়া গেছে। ২০১০ থেকে ২০২২ সাল—এই ১২ বছরে বাংলাদেশ তার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু গত তিন বছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য হার আবার ১৮ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে উঠে গেছে। আজকে দেশের ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। গত তিন বছরেই ৩০ লাখ লোক দারিদ্র্য ফাঁদের মধ্যে পড়েছে। আরো ৬ কোটি ২০ লাখ লোক দারিদ্র্য ফাঁদে পড়ার হুমকিতে আছে। দারিদ্র্য-বহির্ভূত মানববঞ্চনা আরো তীব্রতর হচ্ছে। প্রায় ১১ কোটি মানুষের নিরাপদ সুপেয় জলের সুবিধা নেই। অনূর্ধ্ব-৫ বছরের শিশুদের মধ্যে মাত্র ৪১ শতাংশের জন্মনিবন্ধন হয়নি এবং ৫৯ শতাংশ শিশুর জন্মসনদ নেই। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ৫৭ শতাংশ শিশু দশম শ্রেণী পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। গত ছয় বছরে শিশুশ্রম বেড়ে গেছে—২০১৯ সালের ৬ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালের ৯ শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমানে বাল্যবিবাহের হার ৫৬ শতাংশ, যার মানে ১৮ বছর অনূর্ধ্ব প্রতি দুজন বালিকার মধ্যে একজনকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটও ঘনীভূত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানব উন্নয়নের ওপরে পড়বে। আমাদের অর্থনীতির বর্তমান একটি অন্যতম বাস্তবতা হচ্ছে অসমতা ও বৈষম্য। বাংলাদেশের উচ্চতম ১০ শতাংশ মানুষ দেশের ৫৮ শতাংশ সম্পদের মালিক, আর দেশের নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ (দেশের অর্ধেক লোক) ৪ শতাংশ সম্পদ ভোগ করে। দেশের উচ্চতম ২০ শতাংশ পরিবারে অনূর্ধ্ব ৫ বছরের শিশুমৃত্যুর হার যেখানে হাজারে ২০ জন, সেখানে নিম্নতম ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সে হার হচ্ছে হাজারে ২০ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে যদিও গ্রামীণ বাংলায় আয় অসমতা স্থিতিশীল রয়েছে, দেশের শহরাঞ্চলে তা বেড়ে গেছে।
অসমতা বা বৈষম্য তো শুধু অর্থনৈতিক নয়, তা ব্যাপ্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বলয়েও। বৈষম্য শুধু ফলাফলে নয়, তা পরিস্ফুট সুযোগেও। দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসুবিধায় বঞ্চিত। তারা বঞ্চিত সম্পদে, ঋণ সুবিধায়, তথ্যপ্রযুক্তি সেবায়। ফলে কর্মনিয়োজন এবং আয়ের দিক থেকেও তারা বঞ্চনার শিকার হয়। পরিবেশ-নাজুক অঞ্চলে যেসব প্রান্তিক মানুষের বাস, তারাও ক্রমবর্ধমান অসমতার শিকার হয়। হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যকার নিম্নবর্ণের মানুষেরা ও আশরাফ-আতরাফদের মধ্যে আতরাফেরা সামাজিক বৈষম্যমূলক একটি স্থানে অবস্থান করে। সামাজিক দিক থেকে বাংলাদেশে নগর ও পল্লীর মধ্যকার বৈষম্যের কথা সুবিদিত। রাজনৈতিক দিক থেকে বঞ্চিত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, আদিবাসীদের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব জাতীয় পর্যায়ের নানান দিকে নিতান্ত সীমিত। সমাজ অঙ্গনে ধর্মীয় বৈষম্যের কথা বারবার নানান আলোচনায় উঠে এসেছে। নানান সময়ে নানান ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের নিরাপত্তার অভাবের কথা উল্লেখ করেছে, তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ব্যাহত করার অভিযোগও উঠেছে। এসবই বৈষম্যমূলক আচরণ, কারণ ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সব নাগরিকেরই সমান অধিকার।
নারীর প্রতি বৈষম্য এবং তার বিরুদ্ধে সহিংসতা বাংলাদেশী সমাজের অসমতার একটি অন্যতম বাস্তবতা। সুযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা বৈষম্যের শিকার হয়, যা প্রতিফলিত হয় ফলাফলে। ঘরে-বাইরে নানা হয়রানি আর সহিংসতার শিকার হয় নারীরা। সেসব নির্যাতনের অংশ হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, গৃহাভ্যন্তরের সহিংসতা ও ধর্ষণ। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে যে যখন পথে-ঘাটে নারী নির্যাতিত হয়, তখন খুব কম ঘটনায় পুরুষদের তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে দেখা যায়। বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষদের দেখা যায় নারীর ব্যাপারে নৈতিক-পুলিশের ভূমিকায়। বাংলাদেশে নারীর প্রতি বৈষম্য এবং সহিংসতা শুধু অভাবনীয় একটি বাস্তবতাই নয়, বরং ঘনীভূত একটি সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রবহমান বাস্তবতাটি হচ্ছে স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো দেয় মৌলিক সামাজিক সেবার নিম্নমান। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত পরিমাণগত দিক থেকে সম্প্রসারিত হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সেসব অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কোনো দেয় সেবার কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞান কিংবা দক্ষতা অর্জন নয়, বরং সনদপ্রাপ্তিই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, উচ্চ মানসম্পন্ন সেবা প্রদান নয়। দুটো খাতেই উচ্চ মানসম্পন্ন সেবাগুলো সংরক্ষিত থাকে ধণিক শ্রেণীর জন্য এবং এ জাতীয় বৈষম্যই বাংলাদেশের সমাজে অসমতা ত্বরান্বিত করার ব্যাপারে একটা চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতির তৃতীয় প্রবহমান বাস্তবতাটি ছিল সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে একটি শ্লথতা। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সঞ্চয় হার অত্যন্ত কম। অতীত সময়ে বাংলাদেশ যথেষ্ট পরিমাণে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারেনি। ভিয়েতনামের দিকে তাকালেই এ ব্যাপারে আমাদের ঘাটতি বোঝা যায়। বাংলাদেশে কর-জাতীয় আয়ের অনুপাত মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ, নেপালে ১৯ শতাংশ এবং ভারতে ১২ শতাংশ। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই রফতানি করের মতো অপ্রত্যক্ষ করের ওপর নির্ভর করেছে এবং সে নির্ভরতা এখনো প্রত্যক্ষ করের দিকে যায়নি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা বাংলাদেশ অর্থনীতির একটি সমস্যা হিসেবে বিরাজ করেছে। একদিকে উচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় একটি সমস্যা, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেয় ভর্তুকিও একটি ভাবনা। প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তি সম্পাদন এবং সেই সঙ্গে জ্বালানি উৎপাদনে আমদানীকৃত উপকরণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। জ্বালানি খাতে যথাযথ সমন্বয়ের অনুপস্থিতি এবং সেই সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়। জ্বালানি খাতে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া দেয়, তার বেশির ভাগটাই ভোগ করেন সমাজের ধনাঢ্য এবং সম্পদশালী অংশ। আমাদের জ্বালানি খাতে দেয় ভর্তুকির ৫৪ শতাংশই যায় আমাদের দেশের ৪০ শতাংশ সবচেয়ে সম্পদশালী গোষ্ঠীর কাছে।
২০২৫ সালে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য একটি বিরাট সমস্যা হিসেবে অব্যাহত ছিল। সেই সঙ্গে সহিংসতা, সন্ত্রাস ও মবতন্ত্রের ফলে এ দেশের অর্থনীতি একটি শঙ্কার মধ্য দিয়ে অনিশ্চিত সময় পার করেছে। দেশের উৎপাদন পরিমাণ, প্রবৃদ্ধি, সঞ্চয়, বিনিয়োগ একটি শ্লথতার মাঝখান দিয়ে গেছে। এর কারণে শ্লথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং বিস্তৃত কর্মহীনতা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। দেশের কৃষি ও শিল্প উৎপাদন এখনো প্রার্থিত স্তরে পৌঁছেনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং সেই সঙ্গে সামাজিক অস্থিরতা এ উৎপাদন স্তরকে আরো বিপর্যস্ত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব মানুষের যাপিত জীবনকে প্রভাবিত করেছে এবং দেশে বিনিয়োগ নিম্নস্তরেই রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে নানান নাজুকতা ও ভঙ্গুরতার জন্ম দিয়েছে। পোশাক শিল্পে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, বহু উদ্যোক্তা কার্যকর নন, বিদেশী বিনিয়োগেও দ্বিধা আছে। ফলে দেশের উৎপাদন ভিত্তিও দুর্বল এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশের ঘনীভূত সমস্যাগুলোর তালিকা বেশ দীর্ঘ। কর্মবিহীন প্রবৃদ্ধি, বিপুল বেকারত্ব, খেলাপি ঋণ, উল্লেখযোগ্য মানববঞ্চনা বাংলাদেশ অর্থনীতিতে গেঁড়ে বসেছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪—এ সময়কালে বাংলাদেশের শিল্প খাতে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১১ লাখ কর্মসংস্থান চলে গেছে। এ সময়কালে পোশাক শিল্পের রফতানি তিন গুণ বেড়েছে, কিন্তু সেখানে কর্মসংস্থান স্থবিরই থেকে গেছে। সরকারি ভাষ্যমতে, দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্তদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশ। তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দেশের সার্বিক বেকারত্ব হারের দ্বিগুণ। বর্তমানে কর্মবিহীন প্রবৃদ্ধি এবং বেকারত্ব বাংলাদেশ অর্থনীতিতে সমস্যা হিসেবে ঘনীভূত হচ্ছে। দেশের আর্থিক খাত একটি গভীর সংকটের মধ্যে আছে। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায় পৌঁছছে, যা বর্তমানে ৬ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। বিদেশে অবৈধভাবে পাচারকৃত সুবিশাল অর্থের কিছুই উদ্ধার করা যায়নি। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এখনো ফিরে আসেনি। বাংলাদেশের ঋণভার এবং ঋণ পরিশোধের দায়ভার একটি সংকটজনক জায়গায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ও রফতানি আয়ের অনুপাত ১৯২ শতাংশ, যেখানে এ অনুপাত ১৮০ শতাংশ হলেই আন্তর্জাতিক মুদ্রাভাণ্ডার সেটাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করে।
বহু বছরের ক্রমাগত হ্রাস এবং স্থবিরতার পরে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নারীর প্রজনন হার বেড়ে গেছে। দেশের জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি এবং নগরায়ণের ওপরে এ বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে। এ বৃদ্ধি এরই মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। যেমন এরই মধ্যে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ নিয়ে ঢাকা জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা তার ধারণক্ষমতার প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছে। বায়ুদূষণ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সামাজিক সেবাকাঠামো ক্রমান্বয়ে ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। মুক্ত মাঠ, পুকুর, জলাশয় হারিয়ে গিয়ে ঢাকা আজ একটি ইট-পাথরের নগরীতে পরিণত হয়েছে। এসবই জনজীবনে আসন্ন এক সংকটের সৃষ্টি করবে।
২০২৫ সালের বাংলাদেশ অর্থনীতির একটি অন্যতম বাস্তবতা ছিল নানান বিষয়ে বৈশ্বিক চাপ। প্রথমত, এ বছর বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি প্রবৃদ্ধি-শ্লথতায় ভুগেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশ অর্থনীতিতেও পড়েছে। বিশ্বের নানান জায়গার যুদ্ধ এবং সংঘাতের প্রভাবও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কযুদ্ধের কারণে উন্নত বিশ্বে বাংলাদেশের রফতানি ব্যাহত হয়েছে। যদিও উত্তরণ সময় পিছিয়ে দেয়ার কথা উঠেছে, কিন্তু সম্ভবত ২০২৬ সালেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে উন্নীত হবে। ফলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কিছু কিছু সুযোগ হারাবে। যেমন স্বল্প বা শূন্য শুল্কে রফতানি সুবিধা, অনুদান সুবিধা ইত্যাদি। উন্নয়নশীল দেশ পর্যায়ে উন্নীত হলে বাংলাদেশ এসব সুবিধা পাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে সেসব আসন্ন সংকটের জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতখানি এবং সেই বিপৎসংকুল পথযাত্রায় বিজ্ঞতা, সংনম্যতা ও সুচিন্তিত পরিকল্পনা নিয়ে সেই বিপদ মোকাবেলা করে সব সংকট উতরে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যেতে পারবে কিনা।
দুই মাসেরও কম সময়ে বাংলাদেশ একটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে এসব সংকটকে তার চিন্তার মধ্যে রাখতে হবে এবং এগুলোকে তার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখার মধ্যে সন্নিবেশিত করতে হবে। সে ব্যাপারে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সরকারের পথযাত্রায় অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার পাবে, সেটাও চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, চিহ্নিত অগ্রাধিকারগুলোকে নতুন সরকার তাদের নীতিমালার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিস্থাপন করবেন। তৃতীয়ত, ক্ষমতা গ্রহণের পরে পরেই ক্ষমতাসীন দলটিকে বাংলাদেশের জন্যে মধ্যমেয়াদি একটি অর্থনৈতিক রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। সুনির্দিষ্ট সময়রেখাসম্পন্ন এ রূপরেখা দেশের জনগণকে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিকনর্দেশনা সম্পর্কে ধারণা দেবে। উপর্যুক্ত সময়রেখা ধরে প্রতি বছর বিশ্বাসযোগ্য উপাত্তের মাধ্যমে রূপরেখাটির লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতির একটি বস্তুনিষ্ঠ পরিবীক্ষণ এবং মূল্যায়ন করা হবে। এতে অর্থনৈতিক দিক থেকে জনগণের কাছে সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যাবে।
বস্তুনিষ্ঠ ও প্রাজ্ঞ নীতিমালা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে সরকার যদি সঠিক পথে এগোয় তাহলে বাংলাদেশ একটি অর্থনৈতিক পথযাত্রা গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে সমতা ও বৈষম্যহীনতাসম্পন্ন একটি অর্থনৈতিক গণতন্ত্র নিশ্চিত করে দেশের সব মানুষের সুকল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে। যদি সে ব্যাপারে নবনির্বাচিত সরকার ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটা হবে একটা বিশাল হৃত সুযোগ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার ঘটেছে।
সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র