শোভন ভবিষ্যতের লক্ষ্যে কার্যকর অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের জন্য বর্তমানের কিছু বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন জরুরি। কিন্তু আমরা যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে যাই তাহলে প্রস্তাবটি কঠিন, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। কেননা নির্বাচিত নেতাদের জন্য খুব সহজেই নিজ নিজ ভোটারদের প্ররোচিত করা সহজ। যেমন ভোটারদের প্রলুব্ধ করা হলো এমন আশ্বাস দিয়ে যে তাদের অফিসগুলোয় আর কোনো বিদ্যুৎ বিল যাবে না বা তারা এখন থেকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন। তবে শোভন একটি নীতির জন্য যারা উদ্যোগী হন বা নির্দিষ্ট পীড়া সহ্য করেন, তারা যে সবসময় পরিবর্তনের মাধ্যমে লাভবান হবেন তা কিন্তু নয়।
তাই বর্তমানের উন্নত অর্থনীতি এমন সব মেকানিজম তৈরি করেছে, যা প্রয়োজনানুসারে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুমতি দেয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গুরুত্বপূর্ণভাবে, রাজনৈতিক দলগুলো অঘোষিতভাবে একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছে যে তারা তাদের সুবিধা অনুযায়ী ওই মেকানিজমগুলোকে কখনো নিষ্ক্রিয় রাখবে এবং কখনোবা ব্যবহার করবে। একটির পর একটি সংকট কেন উদীয়মান বাজারগুলো আন্দোলিত করছে, তার একটি কারণ হলো, তারা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তুলে ধরে যে উন্নত অর্থনীতিগুলোও এমন পীড়া আর সহ্য করতে পারছে না। তারাও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। কারণ তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ঐকমত্যও সম্ভবত নষ্ট হয়ে গেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে তার আর্থিক নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর করতে হতে পারে—এমন আশঙ্কার কারণে আর্থিক বাজারগুলো ফের অস্থির হয়ে পড়েছে। তবে অনেক বিনিয়োগকারী এখনো আশা করছেন সম্পদের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করলে ফেড এতটা কঠিন পদক্ষেপের দিকে যাবে না। তবে তাদের অনুমান যদি সঠিক হয়, অর্থাৎ ফেড যদি এ পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হয় তাহলে ভবিষ্যতে আর্থিক অবস্থা স্বাভাবিক করা আরো বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, ফেডারেল রিজার্ভ এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। ১৯৯৬ সালের শেষ দিকে ফেড সভাপতি অ্যালান গ্রিনসপান আর্থিক বাজারের ‘অযৌক্তিক
উচ্ছ্বাস’ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তার সে হুঁশিয়ারিকে উড়িয়ে দেয়া হয়। উল্টো গ্রিনসপানের বক্তব্যের বিপরীতে কড়া রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যদিও ফেড কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে না।
এদিকে ২০০০ সালে হঠাৎ যখন শেয়ারবাজারে ধস নামে তখন ফেড সুদহার কমিয়ে দেয়। কাজটি তারা করে এটা নিশ্চিত করতে যে মন্দা যেন মাঝারি হয়, তীব্র আকার ধারণ করতে না পারে। গত বছর কংগ্রেসের জয়েন্ট ইকোনমিক কমিটির কাছে দেয়া এক সাক্ষ্যদানকালে গ্রিনসপান যুক্তি দেখিয়েছিলেন, ফেড যদিও ‘অনিবার্য
অর্থনৈতিক অপ্রীতিকর পরিণাম’-এর কারণে ঘটিত সম্পদের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাটি প্রতিরোধ করতে পারেনি, তবে বিষয়টি যখন ঘটে, তখন তারা পতনের মাত্রা প্রশমন করে পরবর্তী মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় রাখতে পারত। ফেড তখন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের আশ্বস্ত করে যদি তারা সম্মিলিতভাবে একই পরিমাণের সম্পদের ওপর বিনিয়োগ করে এবং তার ফল যদি খারাপও হয়, তবে তাদের লাভের পরিমাণ না বাড়লেও ক্ষতির মাত্রা কম হবে।
ফেডের এ ধরনের হস্তক্ষেপ পরবর্তী সময়ে ওই বিশ্বাসকে আরো উসকে দেয়। পাশাপাশি ফেডের জন্য বিনয়ী পদক্ষেপের মাধ্যমে আর্থিক বাজারের লাগাম টানার বিষয়টিকেও অনেক বেশি কঠিন করে তোলে। আর তাই সুদহার প্রসঙ্গে এখন আরো বেশি বিরোধের মুখোমুখি হতে হবে এবং কাঙ্ক্ষিত পীড়া বরণ করতে হবে। তাছাড়া সুদহার বৃদ্ধির পক্ষে ঐকমত্য অর্জন করাও অনেক বেশি কঠিন হতে পারে।
আমি মনে করি, পীড়াহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য আর্থিক নীতিও অনেকাংশে দায়ী। অনেকেই সম্মত হবেন যে মহামারী আমাদের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুসারে সুনির্দিষ্ট খরচের মাত্রা বেঁধে দিয়েছে। যেমন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রক্ষা করতে বর্ধিত বেকার ভাতা প্রদান। এক্ষেত্রে খরচ যে খাতেই হোক না কেন, আমাদের মনে রাখতে হবে এটি নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট।
আমরা জানি, সবার কাছে ন্যূনতম সহযোগিতা পৌঁছে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ পাস করে। উদাহরণস্বরূপ, পে-চেক প্রটেকশন প্রোগ্রামের (পিপিপি) আওতায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৮০০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ অনুদান (কার্যকরভাবে) সরবরাহ। এমআইটি ডেভিড অটোর ও তার সহযোগীরা নতুন একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন পিপিপি কর্মসূচিটি ১৪ মাসের ওপরে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন চাকরি বছরের সমতুল্য কর্মসংস্থান সংরক্ষণ করতে সাহায্য করেছে। প্রতি চাকরি বছর অনুযায়ী ওই খরচের পরিমাণ ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫৭ হাজার ডলার।
তবে খারাপ দিকটি হচ্ছে, এ অর্থের মাত্র ২৩ থেকে ২৪ শতাংশ সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছেছে, যারা কোনো না কোনোভাবে চাকরি হারিয়েছেন। অনুদানের বেশির ভাগ অংশ মূলত গিয়েছে ঋণদাতা, ব্যবসায়ের মালিক ও শেয়ারহোল্ডারদের কাছে। সবাই বলছেন, পিপিটি সুবিধার আনুমানিক তিন-চতুর্থাংশ অর্থ পেয়েছেন শীর্ষ এক-পঞ্চমাংশ উপার্জনকারী।
এটি নাকচ করার উপায় নেই যে পিপিপি কর্মসূচির মাধ্যমে কিছু প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো গেছে। না হলে সেগুলো বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু কথা হচ্ছে, কী পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে? অনেক সময় পুঁজিপতিরা লাভের প্রত্যাশায় নিজ থেকে ব্যবসায় ক্ষতি করতে উদ্যোগী হন। অন্যদিকে পর্যাপ্ত সাংগঠনিক সামর্থ্য ছাড়াই অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা ছোট পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। যদি একটি ছোট বেকারি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তবে বর্ধিত বেকারত্ব বীমা দ্বারা অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রশমন করা সম্ভব হবে। এছাড়া তাদের যদি বিশ্বস্ত ক্লায়েন্ট থাকে, তবে মহামারী-পরবর্তী কারখানাটিকে আবার চালু করা সম্ভব। এক্ষেত্রে হয়তো ব্যাংকের পক্ষ থেকে সামান্য সহযোগিতা করার প্রয়োজন পড়বে।
স্বীকৃত বিষয়টি হচ্ছে, করোনা মহামারীর মতো এমন নজিরবিহীন ঘটনার সময় নজিরবিহীন ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান হিসেবে অনিয়ন্ত্রিত বা সীমাহীন ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমরা সবসময় বিশেষ অনুভূতি দ্বারা চালিত হই। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক সংকটের সময়ও দেখা গিয়েছে আরো বিচক্ষণ নীতির তাগিদে আগের ধ্যান-ধারণা থেকে সবাই সরে এসেছিল। এদিকে দীর্ঘস্থায়ী জনঅসন্তোষের কারণ হচ্ছে, আমেরিকান সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তুলনায় ওয়াল স্ট্রিটের ধনিক বিনিয়োগকারীদের অধিক সাহায্য প্রদান; যা করোনা মহামারীকালীন প্রধান দুটি দলের রাজনীতিবিদদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়ে অনুপ্রাণিত করে। তবে ডেমোক্র্যাটরা লক্ষ্যাভিমুখী বেকারত্ব সুবিধা প্রদানের বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দেয়ায় রিপাবলিকানদের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায়ও জয় লাভের উপায় খুঁজতে হয়েছে। আমাদের মনে রাখা জরুরি ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর চেয়ে অর্থনীতিকে কে আর বেশি সাহায্য করতে পারে?
তবে রাজনৈতিক বিভাজনগুলো যখন লক্ষ্যহীন ব্যয় বাড়িয়ে তুলছিল, তখন বাজেটের বাজপাখিদের (‘বাজেট
হকস’ ইংরেজি ভাষায় ব্যবহূত রাজনৈতিক অপবাদসূচক শব্দ, যারা মূলত সরকারি বাজেটের নিয়ন্ত্রণ রাখার ওপর খুব জোর দেয়, তাদের বলা হয়) কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থনীতিবিদদের যুক্তির কাছে তারা টিকে থাকতে পারেনি। বাতিকগ্রস্ত ওই মানুষগুলো পর্যায়ক্রমে উপস্থিত হয়ে ‘ফ্রি
লাঞ্চ’ (অর্থনীতিতে এটি এমন একটি পরিস্থিতি বর্ণনা করে, যেখানে ব্যক্তি বিনা খরচে পণ্য বা পরিষেবা গ্রহণ করে) বা নিখরচার পরিষেবা প্রাপ্তির পক্ষে ওকালতি করে। এদিকে মূলধারার অর্থনীতিবিদদের অনেকেই যুক্তি দেখিয়ে আসছেন, প্রচলিত কম সুদহার উন্নত দেশগুলোর রাজস্ব ঘাটতি বাড়াচ্ছে। রাজনীতিবিদের মধ্যে যারা তাদের নীতির ন্যায্যতা প্রমাণিত করতে মরিয়া, তারা স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছেন। তারা বরং জোর দিয়েছেন কম সুদহার এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সুচিন্তিত হওয়ার দিকে। তাছাড়া শুধু শিরোনামে কী বলা হচ্ছে, তার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তাই যারা ভিন্ন পরামর্শ দিতে গেছেন, তাদের রীতিমতো খারিজ করে দেয়া হয়।
ঐতিহাসিকভাবে ফেডের কাজ হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো পাগলামি শুরুর আগেই তাদের ওপর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ। আর কংগ্রেসের কাজ হচ্ছে রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা প্রদর্শন। কিন্তু বাজারকে সহযোগিতা করার যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ফেড অগ্রসর হচ্ছে, তা ঝুঁকিগুলো বাড়িয়ে তুলছে এবং আরো বেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা জোরদার করছে। বিপরীতে ফেডের এ ধরনের কার্যক্রম আমেরিকার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতার জন্য কংগ্রেসের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে মূল্যস্ফীতি ঘটছে এবং প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে ফেড সুদহার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াবে।
সব মিলিয়ে ওই বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরো বেশি কঠিন করে তুলছে। ফেডারেল রিজার্ভ যদি সুদহার বৃদ্ধি করে, তাহলে আগের ঋণের দায় মেটাতে সরকারের ভবিষ্যৎ ব্যয় সীমিত হয়ে যাবে। ফলে বৈষম্য (যা রাজনৈতিক বিভক্তিকে উসকে দিয়েছে) হ্রাস, ভবিষ্যতের জরুরি পরিস্থিতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ কমে যাবে।
প্রতিটি অর্থনীতিতেই সুনির্দিষ্ট নীতি ও সম্পদে সীমিত সুযোগ থাকে, যা দিয়ে ভালোভাবে সমর্থদের সুরক্ষার পরিবর্তে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক দুর্দশা প্রশমন করা যায়। তাই প্রত্যেকেই যদি ‘ফ্রি
লাঞ্চে’র সুযোগ চায়, তবে যাদের সামর্থ্য সবচেয়ে কম, তাদের আর্থিক কষ্টের বিনিময়েই সে খরচ মেটাতে হবে। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই তা শিখতে হয়েছে। উন্নত দেশগুলোকে হয়তো আবারো এ শিক্ষা নিতে হবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
রঘুরাম জি. রাজন: রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) সাবেক গভর্নর ও শিকাগোর বুথ স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস