ভৌত পরিকল্পনা

অবকাঠামো, অবকাঠামো দর্শন ও অবকাঠামো বাস্তবতা

দেশে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের বিয়য়টি মূলত আশির দশকের শেষ থেকে প্রাধান্য পেয়েছে। তখন এলজিইডি শহর ও গ্রামকে সংযুক্ত করার জন্য ফিডার রোডের উদ্যোগ নিয়েছিল। এর রূপকার ছিলেন প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। এ ফিডার রোডগুলো একটি একীভূত জাতীয় অর্থনীতির বাস্তবতা তৈরির ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। সেদিক থেকে অর্থনৈতিক

দেশে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের বিয়য়টি মূলত আশির দশকের শেষ থেকে প্রাধান্য পেয়েছে। তখন এলজিইডি শহর গ্রামকে সংযুক্ত করার জন্য ফিডার রোডের উদ্যোগ নিয়েছিল। এর রূপকার ছিলেন প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। ফিডার রোডগুলো একটি একীভূত জাতীয় অর্থনীতির বাস্তবতা তৈরির ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। সেদিক থেকে অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন বৃহত্তর উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, নিজেই উন্নয়নের মূল লক্ষ্যবস্তু নয়। বর্তমান বাংলাদেশে অবকাঠামো দর্শনে মারাত্মক কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে, যা কার্যত সুষম জনকল্যাণমূলক উন্নয়নকেই ব্যাহত বা শ্লথ করছে।

অবকাঠামো তিনটি মৌলিক স্তর বিবেচনার দাবি রাখে। প্রথমত, অগ্রাধিকারগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিতকরণ। অবকাঠামো ব্যক্তিগত ভোগের বিষয় নয়; এটি খাত, অঞ্চল গোষ্ঠীর আন্তঃসংযোগ সমন্বিত কানেকটিভিটি সৃষ্টির বিষয়। অবকাঠামো অনেক ধরনের। সময় প্রয়োজনের নিরিখে বিশ্বাসযোগ্য সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি হওয়াই বাঞ্ছনীয় কাজের কথা। বিভিন্ন অবকাঠামোর মধ্যে যেমন রেল সড়ক সমন্বয় হচ্ছে কিনা, সেদিকে নজর রেখেই অগ্রাধিকার নিরূপণ করা দরকার। অনেক অবকাঠামো প্রকল্প প্রয়োজনের মাপকাঠিতেই হয়তো হাতে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে সবকিছু ছাপিয়ে যেন একটি দৃষ্টিভঙ্গি একটি বাস্তবতা অবকাঠামো প্রকল্প নির্বাচনেবিশেষ করে বড় অংকের প্রকল্পেপ্রধান নিয়ামক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবকাঠামো যে নিজেই উন্নয়নের লক্ষ্য অভীষ্ট নয়, বরং উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম বাস্তব সত্যের বিপরীতে বর্তমান ক্ষমতাবলয়ের এক উল্লেখযোগ্য অংশ অবকাঠামোকে নিছক উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেই দেখতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছে এবং দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতায় অবকাঠামো প্রকল্প অগ্রাধিকার নির্মাণে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার চেয়ে প্রতীকী বিষয়াদিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

অবকাঠামো প্রকল্প নির্বাচনে আরো একটি নতুন নিয়ামক ফ্যাক্টর দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তা হলো প্রকল্প পাস করিয়ে নেয়ার ক্ষমতা। সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা সঠিকভাবে হয়েছে কিনা, সমীক্ষা অনুযায়ী ডিজাইন বিষয়াদি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে কিনা, বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সঠিক জনবল আছে কিনাএই অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্তগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প নির্বাচন বিবেচনায় গৌণ হয়ে যাচ্ছে। মুখ্য হয়ে উঠছে প্রকল্প পাস করিয়ে নেয়ার ক্ষমতা এর অবধারিত ফল হচ্ছে বহু অবকাঠামো প্রকল্প মারাত্মক ত্রুটি-বিচ্যুতিতে আক্রান্ত হয়ে উপযোগিতা ব্যবহার যোগ্যতার সংকটে পড়ছে। ধরনের ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে মেগা সিটি থেকে গ্রাম সর্বত্র।

অবকাঠামো থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে ব্যয় দক্ষতা। এটি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য আরো বেশি বিবেচ্য। কেননা সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় সম্পদের সদ্ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক প্রকল্পে অপচয় মানেই হচ্ছে অন্য প্রয়োজনীয় খাতের বঞ্চিত হওয়া। ব্যয় দক্ষতার নানা সূচকে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাত সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সড়ক বলি, সেতু বলি, বাঁধ বলি, রেল বলিঅবকাঠামোর প্রতিটি উপখাতের অযৌক্তিক প্রকল্প ব্যয় এখন মহামারীর পর্যায়ে চলে গেছে। ব্যয় অদক্ষতার আরেকটি দিক বাস্তবায়ন বিলম্ব, যা শেষ পর্যন্ত প্রকল্প ব্যয়কে মূল প্রাক্কলনের বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান বাংলাদেশে অবকাঠামো ব্যয়ের অদক্ষতা প্রকারান্তরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য মনিটরিং চিহ্নিত গাফিলতি শোধরানোর দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাবে ব্যয় অদক্ষতা তথা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি সুষম কার্যকর উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা হিসেবে গেঁড়ে বসেছে।

অবকাঠামো উন্নয়নে সার্বিক ভূমিকা রাখল কিনা তা পরীক্ষার জন্য চারটি সূচক প্রধান বিবেচ্য। প্রথমটি হলো যাতায়াতের সময় কমল কিনা। দ্বিতীয়টি হলো যাতায়াত আরো স্বস্তিদায়ক যাত্রীবান্ধব হলো কিনা। তৃতীয়টি হলো যাতায়াতের নিরাপত্তা নানা ধরনের হয়রানি যেমন যৌন হয়রানি থেকে মুক্ত কিনা। চতুর্থত, যাতায়াতের খরচ আয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সহনীয় কিনা। অবকাঠামো নিয়ে অনেক প্রকল্প হাতে নিলাম, বহু খরচ করলাম কিন্তু উল্লিখিত চারটি সূচকে যদি উন্নতি ফুটে না ওঠে তাহলে শেষ বিচারে অবকাঠামো নিছক খরচের বিষয় থেকে যাবে।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। আবারো মহাসড়ক আলোচনায় এসেছে। এটা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। অথচ সংস্কারের অল্পদিনের মধ্যেই এর ব্যবহার উপযোগিতা কমে গেল। এটা কেন মেনে নেব? এর তো একটা জবাবদিহিতা থাকতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের ফ্লাইওভারের র্যাম্পের একটা পিলারে ফাটল দেখা দেয়ার একটা খবর বেরিয়েছে। এখানে উঠে এসেছে যে নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হয়নি। এগুলো তো খামখেয়ালের বিষয় নয়। বিশেষ করে অবকাঠামোয় খামখেয়ালিপনার কোনো সুযোগ নেই। ঢাকার কথা ধরা যাক। এখানে কয়েকটা ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। মেট্রোরেল নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে চলাচলের গতি কমে যাচ্ছে। বিপরীত এক প্রবণতাঅবকাঠামো বাড়ছে, গতি কমছে। ঢাকা-চট্টগ্রামে যাতায়াতের সময় কিছুতেই আমরা - ঘণ্টার নিচে আনতে পারছি না। এত খরচ করে অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, সময় কমিয়ে আনা ইজ অব ট্রাভেল, সিকিউরিটি, কস্ট অব ট্রাভেল চারটি সূচকের প্রবণতা সাধারণ জনগণের পক্ষে নয়। বিদেশের সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার রাস্তাগুলো ছোট নয়। সেখানেও রাস্তা ছোট। অনেক দেশেই ছোট ছোট রাস্তা। আমাদের সঙ্গে তাদের তফাতটা কোথায়? রাস্তার ব্যবহার পুরোপুরিভাবে একটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। এখানে রোড গভর্ন্যান্সের চরম ঘাটতি আছে। রোড গভর্ন্যান্সের স্বীকৃত সমাধানগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে সর্বক্ষণ। কিন্তু এখানে আমি বলব যে ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল গভর্ন্যান্সে কিছু দুষ্টচক্র রয়ে গেছে। বিশেষ করে আমরা যদি ঢাকা শহরে দেখি রোড ফ্র্যাঞ্চাইজ করে একটা শৃ্ঙ্খলা আনার চেষ্টা মেয়র আনিসুল হকের সময় থেকে হয়েছিল। এখনো সেটি করা যায়নি। কেন তাহলে মুখ থুবড়ে পড়ছে বারবার? রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ২০১৮ হলো, কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এজন্য খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই। এটা খুব পরিষ্কার যে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী কিছু দুষ্টচক্র এই বাধা তৈরি করছে।

রাজধানীতে মেগা প্রকল্পের ছড়াছড়ির যেন শেষ নেই। মেট্রোরেল, এক্সপ্রেস ওয়ে, বিআরটি, এমআরটি সবই হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো একটা সমন্বিত ধারণার ভিত্তিতে (ইন্টিগ্রেটেড নোশন) হচ্ছে না। প্রতিটি আলাদা প্রকল্পই হয়তো নিজস্ব স্টাইলে করতে যাচ্ছে, যেগুলো আগে উল্লিখিত চারটি বিষয় যেমন সময়, ইজ অব ট্রাভেল, সিকিউরিটি, ট্রাভেল কস্ট প্রভৃতিতে উন্নতি ঘটাচ্ছে না। সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে সূচকগুলো কিছুতেই আয়ত্তের মধ্যে আসছে না। তদারকি জবাবদিহিতার অভাবে খুব দ্রুত অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাওয়ারও একটা প্রবণতা দৃশ্যমান।

বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ ব্যয় অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি। অনেকেই বলে যে ভূমি অধিগ্রহণসহ সব প্রক্রিয়ায় ব্যয় বেশি, সেজন্য সড়ক ব্যয় বেশি। ধরনের ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। এটা কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা নয়। বেশি ব্যয়ে যে সুফল মিলছে তাও নয়। এর জ্বলজ্বলে উদাহরণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। সড়কে যানজট যাত্রা সময় কিছুতেই সহনীয় পর্যায়ে আনা যাচ্ছে না। একটা সময় নির্বিঘ্নে (স্মুথলি) যাওয়া যাচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। অনেক জায়গা ভেঙেচুরে একাকার। ফলে নতুন করে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোরগুলোর সংকট কাটছে না। অনেক অর্থ ব্যয় করেও সুফল মিলছে না।

এখানে আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না। অবকাঠামো ব্যবহারের সঠিক সংস্কৃতিও নিশ্চিত করতে হবে। কেউ হয়তো দক্ষিণ চট্টগ্রামে যাবে। দেখা যাবে সেখানকার কর্ণফুলীর সেতুটি বিশ্বমানের। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে গেলে একই ধরনের সেতু দেখা যাবে। কিন্তু সেতুর গোড়াটা ব্যাপকভাবে বিশৃঙ্খল। মনে হয় এটাই যেন বাংলাদেশের আসল চিত্র। সেখানে সেতুর প্রবেশ মুখে মনে হবে শাসন বলে কিছুই নেই। এখানে অবশ্য আমাদের নিজেদেরও (মানুষের) দোষ দিতে হবে। আমাদের আচার-আচরণে অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু একটা সিস্টেমের মাধ্যমে আচরণগত উন্নয়নটা হয়। দুই দশক আগে ঢাকায় কিছু ভালো মানের গণপরিবহন সেবা চালু হয়েছিল। তখন লাইন ধরে টিকিট কেটে বাসে ওঠার একটা চর্চা শুরু হয়েছিল। এগুলো যদি পরিচর্যা করা না হয় এবং সহায়ক গভর্ন্যান্স স্ট্রাকচার যদি তৈরি করা না হয় তাহলে সুফল মিলবে না। এখানে কিছু রিফর্ম মেজারসেরও জরুরি প্রয়োজন। বিশেষ করে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট। বিশ্বের কোথাও আমার মনে হয় না যে একটি বাড়তি নৈমিত্তিক দায়িত্ব হিসেবে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট পুলিশের কাছে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যেই অনেক সমস্যা নিহিত। এটা কেন পরিবর্তন করা হচ্ছে না? এখানে হয়তো স্বার্থান্বেষী কোনো দুষ্টচক্র গভীরভাবে জেঁকে বসেছে। এমনকি পুলিশের আওতায় আলাদা প্রশিক্ষিত ট্রাফিক পুলিশ, জনশক্তি উন্নয়নের যথেষ্ট প্রয়োজন আছে। একটা ডেডিকেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট একাডেমি করার চিন্তা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। পুলিশকে অন্য দায়িত্বের সঙ্গে ট্রাফিকও ম্যানেজ করো দৃষ্টিকোণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কর্ণফুলী সেতুর গোড়ায় যে চিত্রটির বর্ণনা দিয়েছি তার মতো আরেকটি চিত্র ঢাকা শহরে বিদ্যমান। ট্রাফিক লাইট জ্বলছে-নিভছে কিন্তু আসলে যান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক কনস্টেবলের মাধ্যমে। হাত দেখাচ্ছে থামো এবং যাও। এটাই কিন্তু বাস্তবতা। কাজেই অবকাঠামো নিয়ে আমার মনে হয় বাংলাদেশে খণ্ডিত চিন্তাগুলো বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

সার্বিকভাবে আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার চালকেও নজর দিতে হবে। নিয়ামক হয়ে গেছে প্রকল্প পাস করিয়ে নেয়ার রাজনৈতিক সক্ষমতা। সেটিও কোনো সুশৃঙ্খলভাবে হচ্ছে না। এখানে মূল বিষয় হলো খরচ হচ্ছে। খরচ থেকে অনেকেই লাভবান হচ্ছে। অবকাঠামো বাংলাদেশে দুর্নীতির অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো, এটা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে রূপ নিয়েছে। যেদিকে মনোযোগ আছে সেটি হলো, কত বেশি খরচ করা যাবে, জবাবদিহিতা যেন পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকে এবং সহজেই যেন লোপাট করা যায়। সব ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই না। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে বটেই।

এখানে আরেকটি সমস্যাও হয়েছে। এক ধরনের উন্নয়ন দর্শনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে। আমরা অবকাঠামো চিন্তাকে কিছু উন্নয়নের প্রতীকের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছি। বাংলাদেশে মেট্রো আছে, ফ্লাইওভার আছে, টানেল আছেএগুলো শুধু যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, এক ধরনের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। আসলে এগুলো প্রতীক হতে পারে না। টানেল, সেতু দিয়ে অনেক কিছু হতে পারে কিন্তু ভ্রমণ ব্যয়, সময়, নিরাপত্তা ইজ অব ট্রাভেলওই চারটা বিষয় নিশ্চিত না করা গেলে এত অবকাঠামো, এত ব্যয়ের সুফল মিলবে না। প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক নেতৃত্বের উন্নয়ন দর্শনটা আরো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ শুধু প্রতীকের চিন্তার মধ্যে নয়, চূড়ান্তভাবে অবকাঠামোর ভূমিকা হচ্ছে ইনপুট। এটা আউটপুট নয়। এটা আমাদের চলার জন্য একটা ইনপুট। পণ্য মানুষ পরিবহন এবং দ্রুত যোগাযোগ, কম খরচে যোগাযোগ, নিরাপদ যোগাযোগ এগুলোর একটা ইনপুট হিসেবে আমরা দেখি। আসলে আমরা উন্নয়ন দর্শনের একটা জায়গায় আটকে গেছি যে এগুলোকে আউটপুট হিসেবে চিন্তা করতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। আউটপুট বলতে বোঝাচ্ছি এগুলোই হয়ে গেছে চূড়ান্ত লক্ষ্য। জায়গায় উন্নয়ন দর্শনের ফাঁকটা নজরে আনাটা খুব জরুরি। এগুলো অবশ্যই একটা তাত্ক্ষণিক লক্ষ্য, লক্ষ্য হলো আরেকটা লক্ষ্যের জন্য। এটি মাথায় রাখতে হবে।

আশির দশকের ফিডার রোডগুলোর সুফল আমরা পেয়েছি নব্বইয়ের দশকে এসে। শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোয় বড় যোগাযোগ অবকাঠামোর সুফল এখনো পাচ্ছি না। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকায় গাড়ি হাঁটার গতি প্রায় একই হয়ে গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রামে নিরাপদ, সহজ, আরামদায়ক নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। - ঘণ্টার ভ্রমণ সময় কিছুতেই কমানো যাচ্ছে না। কিছুদিনের জন্য হয়তো - ঘণ্টার মধ্যে চলে আসে কিন্তু আবার একই সময়ে চলে যায়। এভাবেই চলছে।

এখন একটা হিড়িক পড়েছে জেলায় জেলায় বিমান চলাচল। এটা বৈষম্যের একটা দিকও। আবার সমস্যার উপজাতও। ধনীরা, যারা হয়তো দুর্নীতি করে ধনী হয়েছে, তারা আর কষ্টটা করতে রাজি নয়। রাস্তাটা ঠিক করার দিকে আর তাদের নজর নেই। তারা যেন দ্রুত পৌঁছতে পারে, সেদিকেই নজর। বৈষম্যের অর্থনীতিতে যারা ওপরের দিকে চলে যাচ্ছে তারা জনগণের কষ্টের ভাগীদার হতে চাইছে না। তারা বলছে, ওরা কষ্ট করলে করুক কিন্তু আমাদের তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে। সেজন্য তারা বিমানটাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু তার পরেও এয়ারপোর্টে তো পৌঁছতে হবে, অন্তত তার জন্য হলেও রাস্তাটা দরকার। প্রকৃতপক্ষে তা- হচ্ছে। এয়ারপোর্টে যেতেও অনেক সময় পার হচ্ছে। চট্টগ্রাম ঢাকায় এয়ারপোর্ট থেকে শহরে যাওয়াটা প্রাণান্তকর অবস্থা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পৌঁছতে - ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার উপকণ্ঠে পৌঁছার জন্য একটা সময়, আবার উপকণ্ঠ থেকে ঢাকায় পৌঁছার আরেকটা সময় চিন্তা করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে এটা সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম ঘাটতিরই ইঙ্গিত দেয়। রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য অনুসারে আমরা উন্নত অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছি কিন্তু তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ গতিশীল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে না উঠলে ওই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। কাজেই একটি সমন্বিত, টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলাটা এখন সময়ের প্রয়োজন দাবি।

 

. হোসেন জিল্লুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান

আরও