আর্থিক প্রতিষ্ঠান

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এ মুহূর্তে বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক তথা এ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য অনাপত্তিপত্র অর্থাৎ ব্যবসায়িক ছাড়পত্র ইস্যু করা হয়।

নিয়োগ দেয়া হয় প্রশাসক। সেই সময় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয় যিনি আবার পদত্যাগও করেছেন। পরিচালনা পরিষদের অন্য পরিচালকদের তালিকা সময়ে সময়ে পরিবর্তন হলেও তা জনসমক্ষে সেভাবে প্রকাশিত হয়নি। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কেন্দ্রীয় অফিস খোলা হয় এবং অফিস পরিচালনায় স্বল্প কিছু জনবল নিয়োজিত হয়। বহুল আলোচিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ধরা হয় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে এবং প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের আমানত তহবিল থেকে শেয়ার হিসেবে জোগান দেয়ার কথা বলা হয়। এরই মধ্যে আর্থিকভাবে নাজুক এবং প্রায় ভেঙে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংককে মার্জার বা একীভূতকরণের মাধ্যমে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। একীভূত পাঁচটি ব্যাংক যথাক্রমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।

নিকট অতীতে উল্লেখিত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক আরো বেশকিছু ব্যাংকের মতো প্রচণ্ড তারল্য সংকটে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে পটপরিবর্তনের পর এ দেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকভুক্ত পাঁচটিসহ প্রায় ১১টি ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ ভেঙে দেয় এবং অধিকাংশ ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালকদের সমন্বয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করে দেয়া হয়। অনেক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা পদত্যাগ করেন, আবার অনেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান।

নতুন পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই এসব ব্যাংকের আর্থিক ভগ্নদশার প্রকৃত চিত্র জনসম্মুখে তুলে ধরে। ২০২৪ সালের শেষের দিকের পরিসংখ্যান মতে, আলোচিত পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে এসব ব্যাংকে জনগণের মোট আমানত ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে। কোনো কোনো ব্যাংকের ঋণ আমানতের অনুপাত ছিল ১০০ শতাংশের বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পরিচালিত এসব ব্যাংকের চলতি হিসাবের স্থিতি ছিল ঋণাত্মক এবং তার পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের একাধারে সম্পদ ও আয়ের অনুপাত, মূলধন ও আয়ের অনুপাত এবং সার্বিক মূলধনের পরিমাণও ঋণাত্মক ছিল।

উল্লেখিত পরিসংখ্যানগুলো অন্তর্বর্তী পরিচালনা পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ, দেশীয় ও বিদেশী নিরীক্ষকদের নিরীক্ষার মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হয়। পরিতাপের বিষয় হলো উল্লেখিত পরিসংখ্যান পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, পরিচালনা পর্ষদ এমনকি সরকারের সংশ্লিষ্ঠ মহল চেপে যায়, যা পূর্ববর্তী সময়ে নিয়োজিত নিরীক্ষকদের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছিল। তথাকথিত ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ অর্থাৎ কারসাজির মাধ্যমে ভুয়া, মনগড়া তথ্য দিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন করে বরং বিশাল লোকসানের বিপরীতে বড় অংকের মুনাফা দেখানো হয়। অথচ ওই সময়ের প্রকৃত চিত্র যথাসময়ে যথার্থভাবে জনসম্মুখে এলে জনগণ সচেতন হতো এবং প্রতারণার হাত থেকে হয়তো রেহাই পেত।

ওপরে যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে তার মাধ্যমে কোনোভাবেই কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না। উল্লেখিত পরিসংখ্যান ব্যাংকিংয়ের প্রচলিত মূলনীতিবিরোধী এবং ন্যায়নীতির কোনো তোয়াক্কা করেনি। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রচলিত বিধিমতে কোনো ব্যাংক যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করে তার সর্বোচ্চ ৯২ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারে। অথচ এসব ব্যাংকের বিনিয়োগ ১০০ শতাংশের বেশি। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যেখানে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত থাকার কথা, সেখানে এসব ব্যাংকের চলতি হিসাবের স্থিতি ঋণাত্মক হওয়া প্রচলিত ব্যাংকিং বিধিবিধানের ঘোরতর লঙ্ঘন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যখন এসব বিধ্বংসী পরিসংখ্যান গোপন করা হয় এবং কিছুই ঘটেনি এরূপ আচরণ প্রকাশ করা হয়। এসব কারণে জনগণ প্রতারিত হয়েছে এবং ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনায় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে এসব ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার অন্যান্য খাতের মতো ব্যাংক খাতেও সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ব্যাংক খাতে সংস্কারের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। ব্যাংকিং এবং অন্যান্য খাতে আর্থিক তছরুপ এবং তার মাত্রা নিরূপণের জন্য একটি শ্বেতপত্র কমিটিও করে। সরকার ২০২৫ সালের মাঝামাঝি ‘ব্যাংক রেজলুশন অধ্যাদেশ’ জারি করে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক খাতে সংস্কারের জন্য মার্জার বা একীভূতকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়।

২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে দুর্বল ব্যাংকগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালকদের সমন্বয়ে গঠন করা পরিচালনা পর্ষদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা ছিল না। সরকারের পক্ষ থেকেও নির্দিষ্ট করে একীভূত করার কোনো রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনার কথা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। নতুন পর্ষদ তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা ব্যাংকের গ্রাহক ও আমানতকারীদের দায় মেটাতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু লুটপাটের শিকার এসব ব্যাংকে মন্দ ঋণের বিনিয়োগ স্থিতি ক্রমাগত বাড়তে থাকায়, ঋণ অনাদায়ী থাকায় এবং তহবিল সংকটে নতুন ঋণ বা বিনিয়োগ মঞ্জুর করতে ব্যর্থ হয়। অথচ এসব ব্যাংকের চলমান খরচ যেমন বেতন-ভাতা, বিল-বাট্টার খরচ আগের মতোই নির্বাহ করার তাগিদ থাকায় আমানতকারীদের দাবি মেটাতে ব্যর্থ হয়। নিরুপায় হয়ে এসব ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শরণাপন্ন হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য কথিত ‘লিকুইডিটি গ্যারান্টি স্কিম’ চালু করে। লিকুইডিটি গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় দুর্বল ব্যাংক ওই সময়ে তারল্যে উদ্বৃত্ত ব্যাংকের কাছে তারল্য সহায়তার জন্য দ্বারস্থ হয়। তারল্যে উদ্বৃত্ত ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকে তারল্য সহায়তার বিনিময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে দুর্বল ব্যাংকের পক্ষে ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তাপত্র পায়। উল্লেখ্য, লিকুইডিটি গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় প্রদত্ত ঋণে সুদের হার ছিল কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ শতাংশের বেশি। উচ্চ সুদে দুর্বল ব্যাংকগুলো তারল্য সহায়তা নিয়ে আরো বিপদে পড়ে, কারণ তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তখন এসব ব্যাংকে সরাসরি ‘লিকুইডিটি সাপোর্ট স্কিম’ ঘোষণা করা হয়। কথিত ‘লিকুইডিটি সাপোর্ট স্কিমের’ আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সস্তা মুদ্রানীতির আশ্রয় নেয়। যে গভর্নর একসময় টাকা না ছাপানোর জন্য গর্ব করত, তার হাত দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা টাঁকশাল থেকে ছাপিয়ে এসব দুর্বল ব্যাংকে প্রদান করা হয়। শর্ত দেয়া হয় এসব অর্থ শুধু আমানতকারীদের আমানত পরিশোধের জন্য ব্যয় করা যাবে। বেশ কিছু শর্ত আরোপ করে তহবিল প্রদান করা হলেও একদিকে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে পরিচলন ব্যয় সেভাবে না কমায় লিকুইডিটি সাপোর্ট স্কিম মুখ থুবড়ে পড়ে। ঘাঁটাঘাঁটি করে জল অনেক দিকে গড়ায় এবং অনেকের মতে সেই সময়ের উচ্চমহলের অনেকের ‘অতিকথনের’ কারণে এবং সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ সহযোগিতা না পাওয়ায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর উদ্ধার প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়, যা ব্যাংকগুলোকে তারল্য সংকটের দুষ্ট চক্রে ফেলে দেয়। একটা সময়ে আমানতকারীরা কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি উত্তোলনে অনাগ্রহী তথা কিছুটা আস্থা দেখালেও পরবর্তী সময়ে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশকিছু কর্মকাণ্ডে তারা এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি চূড়ান্তভাবে আস্থাহীন হয়ে পড়ে। আমানতকারীরা নিজ নিজ ব্যাংকে উত্তোলনের জন্য দীর্ঘ সারি দেয়, কোনো কোনো জায়গায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বচসা এমনকি আরো কিছু অপ্রীতিকর অবস্থার তৈরি হয়।

বাংলাদেশ সরকার যে বিবেচনায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যাদেশ দিয়েছে তার পেছনে যৌক্তিক পরিমাণ গবেষণার অভাব রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট মহল থেকে বলা হয়েছিল যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য দেশ-বিদেশী ‘স্ট্র্যাটেজিক’ বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে। বলা হলো এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেককে দিয়ে বলানো হলো যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক অচিরেই ‘লাভজনক’ ব্যাংকে রূপান্তরিত হবে, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই হবে না, আমানতকারীরা পূর্ণ অর্থ ফেরত পাবেন, কোনো শাখা-উপশাখা বন্ধ হবে না। উপরন্তু এ ব্যাংকের মাধ্যমে অনেক বিকল্প কর্মসংস্থান হবে ইত্যাদি ইত্যাদি কথা। পরিসংখ্যান মতে, একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের কাছে কেন্দ্রীয় বাংক তথা রাষ্ট্রের পাওনা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। যেসব ব্যাংকের গড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ ঋণ অনাদায়ী অথবা মন্দমানে শ্রেণীকৃত, যেসব ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বেনামি এবং ঋণগ্রহীতার হদিস নেই, কোনো ঋণ অথবা বিনিয়োগের কোনো অংশ আদায় না করা সত্ত্বেও যে ব্যাংকের হাজার হাজার কর্মচারী-কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে আছেন, বেতন-ভাতা বোনাস পাচ্ছেন, সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজদের কারো সে অর্থে শাস্তি হয়নি সেসব ব্যাংক একীভূত হয়ে দুই-তিন বছরের মধ্যে ‘মুনাফা’ অর্জন করা শুরু করবে তা প্রচণ্ড আশাবাদীর পক্ষেও কল্পনা করা কঠিন! দ্বিতীয়ত বলা হলো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে মুনাফা অর্জন করা শুরু করলে ‘বেসরকারি’ খাতে ছেড়ে দেয়া হবে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেয়া হয় যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিকট ভবিষ্যতে মুনাফা অর্জন শুরু করল এবং লাভজনক হয়ে উঠল, আর সরকারি ব্যবস্থাপনায় লাভজনক হয়ে ওঠা সেই ব্যাংক তখন কোন অর্থে বা কার স্বার্থে আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে? তৃতীয়ত একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সবার ঐকমত্য ছিল না এবং এখনো নেই। খবরে প্রকাশ এরই মধ্যে দুই-একটি ব্যাংক তারা তাদের স্বতন্ত্র ধারায় ফিরতে চায়। অর্থনীতির শাস্ত্রমতে মার্জার তথা একীভূতকরণ একটি ঐচ্ছিক বিষয় এবং প্রত্যেক সত্তার সম্মিলিত বেনিফিট (সিনার্জি) আলাদা আলাদা সত্তার চেয়ে বেশি। উদাহরণস্বরূপ বলা হয়, মার্জার প্রক্রিয়ায় ২ আর ২-এর যোগফল ৪-এর চেয়ে বেশি এবং তখনই ফলপ্রসূ মার্জার সম্ভব। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মার্জার প্রক্রিয়ায় ‘সিনার্জি’ বেনিফিট কতটুকু অথবা আদৌ আছে কিনা তা গবেষণার বিষয়। চতুর্থত, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে মূলধন জোগানোর ধরন নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। এটা ঠিক, রাষ্ট্র চাইলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে মার্জার, বেইল আউট তথা উদ্ধারের জন্য তহবিল বরাদ্দ দিতে পারে। কিন্তু প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন একীভূত পাঁচটি প্রায় দেউলিয়া ব্যাংকে বরাদ্দ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে? বলাবাহুল্য, ব্যাংক টিকে থাকে আমানতকারীদের আস্থার ওপরে। প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা আমানতকারীদের পাওনা। প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা মন্দ ঋণ। এর বিপরীতে মাত্র ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন! প্রচলিত বাসেল-৩ মূলধন সংরক্ষণ নীতিমালা অনুযায়ী যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের প্রায় ১২.৫ শতাংশের মতো মূলধন সংরক্ষণ বাঞ্ছনীয়। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত কোনো কোনো ব্যাংকের মূলধন প্রায় ৪০০ শতাংশ ঋণাত্মক। একীভূত এসব ব্যাংকের সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা কিছুই পাচ্ছেন না এবং তাদের শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। হিসাবের মারপ্যাঁচে এসব সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের শেয়ারের মূল্যমান শূন্য ঘোষণা করা যায় কিন্তু যাদের মনগড়া এবং ভুল তথ্যে বিশ্বাস করে এসব সাধারণ বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করেছিলেন তাদের শাস্তির বিষয়টি বেমালুম চাপা পড়ে গেছে। আবার যেহেতু বলা হচ্ছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামী ব্যাংক কিন্তু এ ব্যাংকের বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের বেতন-ভাতা পাচ্ছেন তাদের নিজ নিজ ব্যাংকের প্রচলিত নিয়মে। এটাও সত্যি এসব ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খুব চাপের মুখে কাজ করছেন, অনেকে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না অথবা কম পাচ্ছেন, কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকের চেয়ে তাদের বেতন-ভাতা, পদ, পদবি প্রায় সবকিছুই ভিন্নতর রয়েই গেছে।

পরিশেষে বলতে হয়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসায়িক মডেল বা ধারণা সাধারণের কাছে একেবারেই অস্পষ্ট। প্রায় ২ লাখ হাজার কোটি টাকা আদায়ের নির্দিষ্ট পথরেখা বা রোডম্যাপ নেই। ওইসব ঋণগ্রহীতার সঙ্গে কখন কোন প্রক্রিয়ায় আলোচনা হবে, কতটুকু আদায়যোগ্য সে সম্পর্কে নীতিমালা অনুপস্থিত। আমানতকারীরা তাদের ধৈর্যের চূড়ান্ত সীমায় রয়েছেন। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ঋণদানযোগ্য বিনিয়োগ তহবিল কোথায়? নতুন বিনিয়োগ না হলে এ ব্যাংক কোথা থেকে তহবিলের ব্যবস্থা করবে? বিনিয়োগ-বহির্ভূত আয়ে বিরাজমান প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারবে না। সরকার এসব ব্যাংকে বিনিয়োগ-বহির্ভূত আয়ে বিশেষ সুবিধা দিলে অন্যান্য ব্যাংক নাখোশ হবে এবং তাদের ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়বে। প্রচলিত খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এ ব্যাংক লাভের মুখ কীভাবে দেখবে? সরকারি কোষাগার থেকে সরবরাহকৃত মূলধন তহবিল বর্তমান আমানতকারীদের দায় মিটিয়ে নতুন বিনিয়োগের জন্য কিছুই থাকবে না। সেক্ষেত্রে শেষ ভরসা হবে নতুন আমানত সংগ্রহ করা। সফল হতে হলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে নতুন ও পুরনো আমানতকারীদের আস্থা অর্জন করে আমানত সংগ্রহ এবং তার উত্তম বিনিয়োগই একমাত্র পথ। কাজটি বেশ কঠিন। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পেয়ে যায়।

ড. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান

আরও